অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
নূন্যতম মজুরি নির্ধারণ বনাম সাধারণ জীবনযাপনঃ খুরশীদ শাম্মী

নূন্যতম মজুরি নির্ধারণ বনাম সাধারণ জীবনযাপনঃ 

খুরশীদ শাম্মী

প্রতিযোগিতা সর্বক্ষেত্রে। যেমন ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, তেমন জাতিতে জাতিতে। সবাই উঁচুতে থাকার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। সাধারণ জনগণের জীবিকার মান একটি পুরো দেশ ও জাতির মান নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হয় বেশিরভাব ক্ষেত্রে।

  তাই উন্নত দেশগুলোতে সাধারণ জনগণের জীবন ও জীবিকার মান রক্ষা করতে কর্মক্ষেত্রে নূন্যতম মজুরি নির্ধারণ করে দেয়া হয়। অর্থাৎ কোনো কর্মচারী যত ছোট পজিশনেই কাজ করুক না কেন, যেন তার আয় প্রশাসন নির্ধারিত মজুরি থেকে কম না হয়। শিক্ষা ও যোগ্যতার উপর নির্ভর করে কারো কারো আয় নূন্যতম মজুরির কয়েকগুণ হতে পারে, এমন কি শতগুণ অধিকও হতে পারে; কিন্তু কোনোভাবেই এর কম নয়।

 নূন্যতম মজুরি নির্ধারণকে অনেকেই মনে করে, শ্রমিকদের আয় নির্ধারণ করা। তবে আমি মনে করি, একমাত্র মালিকপক্ষ বাদে; শ্রমিক আমরা সবাই। কেউ দেহের শ্রমের বিনিময়ে উপার্জন করি, কেউ মেধার শ্রমের বিনিময়ে।

 নূন্যতম মজুরি নির্ধারণের একটি প্রধান ও অন্যতম কারণ হচ্ছে, সবাই যেন সময়ের তালে চলমান জীবন যাপনের ব্যয় বহন করতে পারে সেটা নিশ্চিত করা। এই ক্ষেত্রে অবশ্যই নূন্যতম মজুরি বিষয়টি প্রশংসার দাবী রাখে। এই প্রশংসাটা কুড়িয়ে নেয় যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে তারা কিংবা যে রাজনৈতিক দল নূন্যতম মজুরি বাড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়।

 উদাহরণ স্বরূপ, সম্প্রতি কানাডার অন্টারিও প্রভিয়েন্সের প্রিমিয়ার, ক্যাথলিন উইন, ঘোষণা দিয়েছেন, ২০১৮ জানুয়ারিতে অন্টারিও প্রভিয়েন্সের নূন্যতম আয় ২.৬০ ডলার বৃদ্ধি পেয়ে হবে ঘন্টায় ১৪ ডলার এবং ২০১৯ এর জানুয়ারিতে ইহা আরো এক ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ঘন্টায় ১৫ হবে।

   প্রিমিয়ারের এই ঘোষণায় অনেকেই খুব খুশি হয়েছেন। বিশেষ করে সরকারি কর্মজীবীরা, যারা অধিকাংশ সময়ই মনোযোগ দিয়ে কাজ করে না। সরকারী কর্মজীবি বাদে, অন্যদের জন্য আসলেই কী ইহা খুব খুশি হওয়ার মতো ঘোষণা দিয়েছেন তিনি? এই ঘোষণা রাজনৈতিক ফায়দা লুটিয়ে নেয়া ছাড়া, মোটেও আর কিছু নয়। আসলে প্রিমিয়ার তার এই ঘোষণার মাধ্যমে পরবর্তি ভোটে তার দল পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার ফাঁদ ফেলেছেন। রাজনীতিবীদদের এই ফাঁদপাতা খেলায় আমার মতো সাধারণ মানুষদের খুব একটা আগ্রহ নেই বললেই চলে। তারপরও আমাদের হাত পা বাঁধা পড়ে যায় তাদের কাছে।

 সামাজিক দিক বিবেচনায় রেখে যদিও অনুমান করা হয়, নূন্যতম মজুরি নির্ধারণ কিছুটা হলেও সামাজিক জীবনে সমতা রক্ষা করে। বাস্তবে এই ধারণা সঠিক হয় যদি প্রত্যেক পূর্ণবয়স্ক মানুষের কাজ নিশ্চিত থাকে, কেবল তখনই।

বিশ্ব জুড়ে বর্তমান মন্দা অর্থনৈতিক অবস্থায় অন্টারিওর চাকরির বাজারেও আছে নেতিবাচক প্রভাব। অনেকেরই ফুলটাইম, সিকিউরড কাজ নেই। অন্টারিওর জনগণের এক বিরাট অংশ প্রাইভেট কোম্পানিতে কর্মরত। এবং তার প্রায় অর্ধেকই ছোট ও মাঝারি আকারের কোম্পানিতে কর্মরত আছে। ছোট ও মাঝারি আকারের কোম্পানিগুলোতে যারা কাজ করে তাদের অধিকাংশই নানান প্রকার সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত। তারা কেবল সরকার নির্ধারিত নূন্যতম মজুরিই পেয়ে থাকেন। তবুও তাদের আয় থেকেও কাটা হয় আয়কর। এরপর প্রতিটি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ে আবার কর দেয় তারা।

 ছোট ও মাঝরি আকারের কোম্পানিগুলো বৃহদাকারের প্রতিযোগী কোম্পানিদের সাথে বাজারে টিকে থাকতে কাস্টমার সেবা ও পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করতে, ব্যয় কমাতে মালিক পক্ষ্য সচরাচর  শ্রমিক খরচ কমায়। তাই তাদের কর্মচারীরা পরিশ্রম করে তুলনামূলকভাবে অন্যান্য বৃহদাকার কোম্পানির কর্মচারীদের থেকে অধিক। এরপরও তারা কাজ করে।

 কিন্তু যখন নূন্যতম মজুরি হঠাৎ করে এক লাফে বৃদ্ধি পাবে ২.৬০ ডলার কিংবা ৩.৬০ ডলার। তখন ঐ সকল ছোট ও মাঝারি আকারের কোম্পানিগুলো কী বহন করতে পারবে এতো বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তন? তখন হয় ঐ ছোট ও মাঝারি আকারের কোম্পানিগুলোকে বন্ধ করে দিতে হবে তাদের বাণিজ্য, নতুবা তাদের কর্মচারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে পার্টটাইমের জন্য নিয়োগ দেয়া হবে।

 একটু হিসেব করলে স্পষ্ট দেখা যায়, একজন ১১.৪০ ডলারে আট ঘন্টা কাজ করে উপার্জন করে = ৯১.২০ ডলার। আর ১৪ ডলারে ছয় ঘন্টা কাজ করে পাবে = ৮৪ ডলার।

 এর অর্থ দাঁড়ায় কোনো কোনো ব্যক্তি নূন্যতম মজুরি বৃদ্ধিতে প্রতিদিন ৭.২০ ডলার কম আয় করবে, কিংবা একেবারেই চাকরি হারাবে।

 এতো গেলো একদিকের কথা মাত্র। অন্যদিকে, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের খরচ বেশী দেখিয়ে তাদের সেবা ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে দেবে কয়েকগুণ। পুরো প্রভিয়েন্স জুড়ে বেড়ে যাবে মাথা পিছু জীবনযাপন খরচ।

 কাজ হারিয়ে, বেকার সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সমাজে বৃদ্ধি পাবে সামাজিক অন্যায়ের সংখ্যা, হতাশাগ্রস্থ রোগীর সংখ্যা, এমন কি হত্যা-আত্মহত্যার সংখ্যাও।

 নূন্যতম মজুরি নির্ধারণ দরকার আছে, তবে রাজনৈতিক নেতাদের ফয়দা আদায়ের লক্ষ্যে না হয়ে যদি অর্থনৈতিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে সেটা হবে প্রকৃত উপায়। বর্তমান বাজারে নূন্যতম মজুরি বৃদ্ধির থেকেও অধিক জরুরী জনগণের কাজের নিশ্চয়তা থাকা, সুবিধা বঞ্চিত সকল কর্মজীবিদের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধার নিশ্চয়তা দেয়া। সাধারণ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ট্যাক্স তুলে ফেলা যেন নূন্যতম আয়ের জনগণ স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে।

 

 

   টরোন্ট, কানাডা