অটোয়া, বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৯
নাটক নির্মাণ ও প্রচার - ইরানী বিশ্বাস

নাটক নির্মাণ ও প্রচার

ইরানী বিশ্বাস

 আমার জন্ম গ্রামে। খুব মনে আছে, সরকারী চাকরি বলে প্রথমেই মা’র পোষ্টিং হয়েছিল শহরে। বাসায় তখনো টেলিভিশন আনা হয়নি। আমি তখন অনেক ছোট। টেলিভিশনের সঙ্গে প্রথম পরিচয় মায়ের এক কলিগের বাসায়। সম্ভবত কোন নাটক প্রচারিত হয়েছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনে। আমি ভীষণ টেনশানে পড়ে গেলাম। এত ছোট বাক্সের মধ্যে এত মানুষ ধরলো কি করে। পরে মাকে কথাটা বলতেই তিনি আমাকে সব বুঝিয়ে বললেন। শুধু আমি নয় টেলিভিশন নিয়ে এ রকম কৌতুহল কম বেশি সকল মানুষের মনে থাকাটাই স্বাভাবিক।

’৬০ দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মের পর বাংলা নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশন মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। তখন বাংলা নাটক মানেই উৎসাহ নিয়ে টিভির সামনে বসে থাকা। বাংলা নাটক মানেই দর্শক মনের ভিন্ন ভিন্ন কৌতুহল। বলা যায় বাংলাদেশের নাটক দেখার জন্য এক সময় মুখিয়ে থাকতো পার্শবর্তী দেশের বাঙালী জনগণ। এত আলোড়ন আর আড়ম্ভর যে নাটক নিয়ে তার নির্মাণ সম্পর্কে রয়েছে সাধারণ মানুষের মনে বেশ কৌতুহল। টেলিভিশন খুললে কোন না কোন নাটকের অংশ চোখে পড়ে। সাধারণ দর্শক মনে মনে প্রশ্ন করেন, যে নাটক প্রচার হচ্ছে তা কি সরাসরি দেখানো হচ্ছে?

এক সময় মঞ্চ নাটকের মতো টেলিভিশনেও লাইভ নাটক টেলিকাস্ট হতো। ধীরে ধীরে উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে লাইভ নাটক বন্ধ হয়েছে। চালু হয়েছে রেকর্ড সিস্টেম নাটক প্রাচর। টেলিভিশনে ৩ প্রকার নাটক প্রচারিত হয়ে থাকে। 

১. খন্ড নাটক বা একক নাটক :  সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে নির্মাণ করা হয় একক বা খন্ড নাটক।

২. টেলিফিল্ম বা টেলিছবি : ৬০ থেকে ৯০ মিনিট পর্যন্ত নির্মাণ করা হয় টেলিফিল্ম বা টেলিছবি।

৩. ধারাবাহিক বা ডেইলি সোপ : ১৩ থেকে শুরু হয়ে চ্যানেল বা দর্শকের চাহিদা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়ে থাকে ধারাবাহিক বা ডেইলি সোপ।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে একটি নাটক নির্মাণ করাটা কখনো খুব সহজ আবার কখনো খুব ঝামেলাপূর্ন। একজন নাট্যনির্মাতা চাইলেই নাটক নির্মাণ করতে পারেন। কিন্তু নাটক নির্মানইতো আর নাট্যকারের সার্থকতা নয়। নাটকটি যথাযথ ভাবে যখন কোন চ্যানেলে প্রচরিত হবে তখন নাট্যনির্মাতার সফলতা। তবে এখানেই শেষ নয়। রয়েছে অর্থ লগ্নীকারকের লাভ সহ টাকা ফেরত দেয়ার দায়।

একটা সময় ছিল, যখন অর্থ লগ্নীকারক নিজস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে বসতেন। তিনি চ্যানেলে ঘুরে নাটক প্রচারের অনুমতিপত্র নিতেন। তারপর খোঁজ করা হতো নাট্যকার এবং নাট্য পরিচালকের। সাধারণত চ্যানেল এবং নাট্যপরিচালকের মধ্যকার সমন্বয়ক ছিলেন অর্থ লগ্নীকারক বা প্রযোজক। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রযোজক শব্দটার অর্থ পরিবর্তন হয়ে গেছে। যে কেউ অর্থদাতা হিসাবে নাটক প্রযোজনায় আসতে পারছেন। মোদ্দা কথা একজন অর্থদাতা হয়েও নাট্য প্রযোজক হিসাবে পরিচিতি লাভ করছেন অনেকেই। বর্তমান সময়ে নাটক প্রযোজনা করতে কোন প্রতিষ্ঠান বা চ্যানেলে পরিচিতির কোন প্রয়োজন হয় না। কিছু টাকা কোন এক নাট্যপরিচালকের হতে তুলে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে আছেন। চুক্তি অনুযায়ী ৩ মাস বা ৬ মাস পর লাভসহ টাকা ফেরত পেলেই তিনি খুশি। অনেকটা সুদে টাকা লগ্লীকরার মতোই বিষয়টা। 

আমারদের দেশে এখন অনেক চ্যানেল। প্রতিদিন প্রচারের জন্য অনেক নাটকের দরকার হয়। এসব নাটক চ্যানেলে প্রাচারের জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ সরাসরি নিজস্ব পরিচালক দিয়ে নির্মাণ করেন। বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থা থেকে কিনে নেন। বিভিন্ন পরিচালদের নাটক নির্মাণরে জন্য অনুমতিপত্রসহ এ্যাসাইন্ট করা হয়। আবার কখনো চ্যানেল কর্তৃপক্ষ পরিচালক বা প্রযোজককে সময় বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। এটাকে চাঙ্ক বলা হয়। চাঙ্ক কখনো শেয়ারিং এর মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয়। আবার কখনো টাকার বিনিময়ে সময় কিনে নেন প্রযোজক বা পরিচালক।

নাটক নির্মাণরে প্রধান উপজিব্য হলো বাজেট বা অর্থ বরাদ্দ। এর উপরই নির্ভর করছে নাটকটির গুনগত মান কেমন হবে। আবার অনেক সময় নির্মাতার নিজস্ব কোয়ালিটির উপরও নির্ভর করে নাটকটির গুনগত মান কেমন হবে। কারণ নাট্য নির্মাতার কোয়ালিটি না থাকলে বাজেট বেশি হলেও তিনি গুনগত মানের নাটক নির্মাণ করতে পারবেন না। আমাদের দেশে নাট্যপরিচালকদের কোন শ্রেনী নির্বাচন করা নেই। যে কারণে নাটক নির্মাণরে বাজেট বরাদ্দেও কোন পার্থক্য নেই। সিনিয়র নাট্যপরিচালক এবং জুনিয়র পরিচালকদের জন্য আলাদা কোন ক্যাটাগরি নেই। কর্তৃপক্ষকে বা প্রযোজককে খুশি করে যে যত পারছে নাটক নির্মাণে বাজেট বরাদ্দ নিচ্ছে। এতে এক শ্রেনীর অপেশাদার লোক নিজেকে পরিচালক পরিচয় দিয়ে ফায়দা লুটে নিচ্ছে। এ ধরণের তথাকথিত পরিচালকরা সাধারণত নতুন কোন ব্যাবসায়ী বা বিত্তশালীকে বিভিন্ন চাকচিক্য লোভ দেখিয়ে অর্থলগ্নীকরতে উৎসাহিত করেন। তারা মনে করছেন একজন ভাল ক্যামেরাম্যান এবং একজন ভাল সহকারী পরিচালক নিলেই নাটক নির্মাণ হয়ে যায়। এভাবে নাটক নির্মাণরে নামে চলছে প্রহসন। যার ফলে এই সব পরিচালকের নাটক অনেক সময় প্রচারিত হয় না। নির্মিত নাটক পড়ে থাকে ড্রয়ারবন্দী হয়ে। ফলে নতুন প্রযোজকরা নিরুৎসাহিক হচ্ছেন। 

নুতন প্রযোজকদের মিডিয়ার নাটক নির্মাণ এবং প্রচারের জন্য বিক্রির বিষয়টি অজানা থেকেই যাচেছ। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেকেই ইচ্ছামতো নাটকের বাজেট নিয়ে নাটক নির্মাণ করছেন। কিন্তু প্রত্যেক টেলিভিশন চ্যানেল একই বজেটের নাটক প্রচার করছে না। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রোগ্রাম ভিত্তিক চ্যানেল আছে বেশ কিছু। তবে সব চ্যানেলে একই মানের নাটক প্রচার করে না। যে কারণে নাটকের মান বা নাটকের বাজেটে থাকে ব্যবধান। তাছাড়া এক চ্যানেল কমেডি ভিত্তিক নাটক প্রচারে আগ্রহ বেশি। অন্য অনেক চ্যানেল শহুরে প্রেমের নাটক প্রচারে আগ্রহ বেশি। আবার অন্য চ্যানেল সময়োপযোগি ম্যাসেজধর্মী নাটক প্রচারে আগ্রহ বেশি। এছাড়াও কোন কোন চ্যানেলে বিদেশি আদলের নাটক প্রচারের আগ্রহেরও কম নেই।

রয়েছে আর্টিস্ট নির্বাচনের বিষয়। এক চ্যানেলে এক এক শিল্পির চাহিদা বেশি। এছাড়াও রয়েছে এইচ ডি ক্যামেরার চাহিদা। নরমাল ক্যামেরা এবং ফুল এইচ ডি ক্যামেরার ভাড়ায় রয়েছে পার্থক্য। ক্যামেরা অপারেটরের মধ্যেও রয়েছে পার্থক্য। যে কারণে সব মিলিয়ে নাটকের বাজেটের তারতম্য ঘটতে দেখা যায়। এক কথায় বলা যায়, যত গুড় তত মিষ্টি। তবে একটা কথা বলতেই হয়, গুড় বেশি দিলে মিষ্ট হয় ঠিকই, হবে স্বাদের বিষয়টি ভিন্ন। রাধুনির নিজস্ব গুণ না থাকলে যতই গুড় দেয়া হোক, স্বাদ হবে না। একটি একক নাটক নির্মাণ করতে সাধারণত ২-৩ দিন সময় লাগে। তবে বর্তমানে নাটকের বাজেট কমে যাওয়ার কারণে প্রযোজক বা পরিচালক ১ দিনের মধ্যে নির্মাণরে কাজ সম্পন্ন করতে চেষ্টা করেন। এতে নাটকের মান কমে যাচ্ছে। 

নাটক নির্মাণরে ক্ষেত্রে প্রথমে গল্প বা স্ক্রিপ্ট দরকার। অনেক সময় চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নাটকের গল্প বা স্ক্রিপ্ট নির্বাচন করে দেন। আবার কখনো কখনো পরিচালক বা প্রযোজক কর্তৃক গল্প বা স্ক্রিপ্ট পছন্দ হলে নাটক নির্মানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরপর দরকার শিল্পী নির্বাচন। এ ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। অনেক সময় শিল্পি নির্বাচনে ঘটে অনেক বিপত্তি। গল্পের প্রয়োজনে যে শিল্পীকে নির্বাচন করা হয় দেখা যায় নির্ধারিত শুটিংয়ের দিনে তিনি সময় দিতে পারছেন না। অথবা বাজেটের চেয়ে অধিক টাকা দাবি করে বসছেন। কখনো কখনো শুটিংয়ের দিন তারিখ সব ঠিক-ঠাক। হঠাৎ করে সুটিংয়ের আগের রাতে জানিয়ে দিলো কোন কারনে শিল্পী অসুস্থ। অথবা মোবাইল ফোন অফ করে বসে আছে অথবা অন্য কোন প্রোগ্রামে এটেইন্ট করেছেন। এমন অনেক ঘটনাই ঘটছে আমাদের মিডিয়াতে। সিনিয়র পরিচালক হলে তবুও তারা প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন। নতুন অনেক মেধাবী পরিচালক মিডিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন শুধুমাত্র কিছু শিল্পীদের অপেশাদারিত্বের কারণে। চ্যানেল এবং প্রযোজক অনেক সময় শিল্পীর নাম উল্লেখ করে দেন। সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত শিল্পী না পেলে পরিচালক কাজটি করতে পারছেন না। আবার শুটিংয়ের দিন অনুপস্থিতির কারণে তাৎক্ষনিক অন্য শিল্পি পাওয়াও মুসকিল। আবার সেই মুহুর্তে শুটিং প্যাকাপ করলে অর্থদন্ড দিতে হয়। এই সব মিলিয়ে একজন পরিচালক শাকের করাত হয়ে যায়। 

একজন নাট্যকার বা নাট্যপরিচালক নিঃসন্দেহে একজন সৃজনশীল মানুষ। তিনি অন্য দশজন মানুষের থেকে আলাদা। অথচ এই শ্রেনীর মানুষের মূল্যায়ন হচ্ছে না। কারণ একজন শিল্পী প্রতিদিন যে পারিশ্রমিক নিচ্ছেন, সেই পরিমানে পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না একজন নাট্যকার বা নাট্যপরিচালক। যে কারণে শিল্পী তার দাম্ভিকতা প্রকাশ করছেন পারিশ্রমিকের জোরে। একটি নাটক যদি একটি বিল্ডিং হয়, তাহলে একজন নাট্যকার সেটার নকঁশা একে দিচ্ছেন। একজন পরিচালক অবকাঠামো গড়ছেন। একজন শিল্পী সেখানে বাইরের আবরণ হিসাবে কাজ করছেন। তাহলে একটি নাটক নির্মানের জন্য নাট্যকার-পরিচালক-শিল্পী অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। 

সব কিছু ঠিক হওয়ার পর রয়েছে নির্ধারিত দিনে শুটিংয়ের কাজ। শুটিং করার জন্য ঢাকা শহরের উত্তরাসহ কয়েকটি স্থানে রয়েছে শুটিং হাউস। এছাড়াও মফস্বলের নাটক ঢাকার আশেপাশে পুবাইল, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ সারা দেশে শুটিং করা হয়।

নাটকের ক্ষেত্রে এডিটিং একটি গুরুত্বর্পূণ বিষয়। সাধারণত এডিটিংকে নাটকের মেকাপ বলা হয়ে থাকে। এছাড়া রয়েছে মিউজিক, কালার কারেকশন, সাউন্ড ব্যালেন্স’র কাজ। সব শেষ হলেই পূর্নাঙ্গভাবে একটি নাটক চ্যানেল কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবার উপযুক্ত হয়।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ টেলিভিশন মিডিয়ার পরিচাকদের সংগঠন ডিরেক্টর’স গিল্ড নির্বাচন হয়েছে। নতুন কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ডিরেক্টর’স গিল্ডের সদস্য ছাড়া কেউ নাটক নির্মাণ করতে পারবে না। সেই সঙ্গে টেলিভিশন প্রযোজক সমিতি, শিল্পি সমিতি, ক্যামেরা ম্যান সমিতি, সহকারী পরিচালক সমিতি, ক্যামেরা হাউস সমিতি, লাইট হাউস সমিতি এবং শুটিং হাউস সমিতি একাত্ততা ঘোষণা করেছেন।

সব শেষে বলতে চাই টেলিভিশন নাটক একটি গণমাধ্যম শিল্প। এর সঙ্গে জড়িত সকল কর্মী কলাকুশলির উচিত এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা। আসুন বেশি করে দেশিয় সংস্কৃতি ধারণ করি। 

 

ঢাকা, বাংলাদশে