অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
হাজার দ্বীপ-এ একদিন - -অমল কৃষ্ণ রায়

হাজার দ্বীপ-এ একদিন

-অমল কৃষ্ণ রায়

 

ছবি: হাজার দ্বীপের কয়েকটি-


ছোটবেলা থেকেই আমি ভ্রমণ-পাগল - প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সন্মোহন আমাকে সবসময় তাড়িত করে বেড়ায়। তাই একটু সুযোগ পেলেই মন ছুটে যেতে চায় দূরে কোথাও - এমন জায়গায় যেখানে আছে প্রমত্তা নদী, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, আকাশ-ছোঁয়া বিশাল পাহাড় কিংবা গভীর অরণ্য।
 ক্যানাডায় এসে তাই প্রতি বছরই ছুটে যাচ্ছি এক সৈকত থেকে আর এক সৈকতে -  টার্কি পয়েন্ট-বার্লিংটন বীচ-ওয়াস্যাগা বীচ-স্যাবল বীচে এবং ক্যানাডার সবচেয়ে বড় জলাশয় লেইক-সুপিরিয়রে আর পর্বত দেখতে অনট্যারিওর গুয়েলফ শহর থেকে স্ত্রী-পুত্রদের নিয়ে টানা চারদিন ৪৮ ঘন্টা ধরে গাড়ি চালিয়ে আলবার্টার ক্যানানেস্কাসের রকি পর্বতে। সেখানে গ্রীজলি-ভল্লুকের ভীতিপ্রদ অরণ্যে তাঁবুতে রাত্রি যাপন করেছি, বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে  আট হাজার ফুট উঁচু পর্বত শিখরে আরোহণ করেছি, স্ত্রী-পুত্রদের নিয়ে রকি পর্বতমালার মাউন্ট এভারেস্ট ট্র্যাক সহ বিভিন্ন ট্র্যাকে পায়ে হেঁটে দীর্ঘ সময় ধরে ভ্রমণ করেছি আর বোটে করে গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকালে চারিদিকে পর্বত-ঘেরা মনোরম লেইকে মনের অনাবিল আনন্দে ঘুরে বেড়িয়েছি।
 প্রতি বছরের মত গত বছরও  পরিবারের সবাই মিলে আলোচনা করছিলাম এই গ্রীষ্মে কোথায় যাওয়া যায়। পরিকল্পনার তালিকায় ছিল পিলি দ্বীপ (Pelee Island), নীল পর্বত (Blue Mountain) আর "হাজার দ্বীপ" (Thousand Islands)।  শেষে পরিবারের সবার সম্মতিতে ঠিক হলো এবার আমরা যাবো হাজার দ্বীপে। সবার মত আমিও আনন্দে আত্মহারা - জলের প্রতি আমার আকর্ষণ আমার রক্তের ধারায় - কারনটা বোধ হয় এই আমার জন্ম আর বেড়ে উঠা একটা বিশাল স্রোতস্বিনীর একেবারে পাড়ে। সেদিনের সকালটা ছিল সুন্দর রোদেলা সকাল! আমার দুই পুত্র অর্ণব, অম্বর, স্ত্রী-বিজয়া আর আমি রওনা দিলাম ক্যানাডার গুয়েলফ শহর থেকে আমাদের লাল রঙের ফোর্ড ফোকাস গাড়িতে করে - গন্তব্যস্হল গ্যানানোক শহর - এবং সেখান থেকে পরেরদিন "হাজার দ্বীপে"। 

গুয়েল্ফ থেকে রওনা দিয়েছি সকালে। যদিও আগস্ট মাসের সকাল, এবং গ্রীষ্মকাল, তবুও এ যে ক্যানাডার গ্রীষ্ম - নিশ্চিত করে আগাম বলা শক্ত আমাদের গ্রীষ্মমন্ডলীয় শরীরের জন্যে আবহাওয়া যথেষ্ট উষ্ণ হবেই। তবে সেদিন ভাগ্য ছিল আমাদের সুপ্রসন্ন - মেঘমুক্ত নির্মল নীলাকাশ আর কড়া রোদ্দুর - সাথে মৃদু মন্দ বাতাস - ভ্রমণের জন্যে একেবারে যথোপযুক্ত। গুয়েল্ফ থেকে গ্যানানোক প্রায় চারশ  কিলোমিটার - হাইওয়ে ৪০১-পূর্ব ধরে অটোয়া অভিমুখে। ঘন্টা দেড়েক পরে হাইওয়ের পাশে কিছুক্ষণের জন্যে আমাদের বিশ্রাম বিরতি। ঠিকহলো মধ্যাহ্ন-ভোজনের জন্যে আমরা আবার থামবো কিংস্টনে এবং পরে কিছুক্ষণের জন্যে যাব সেখানে ফোর্ট হেনরী পরিদর্শনে।কিংস্টনে পৌঁছতে পৌঁছতে ঘড়ির কাঁটাতে বাজলো দেড়টা। আমার দুই পুত্রই ক্ষিধায় অস্হির। তাদের মত মুখে না বললেও সাড়ে তিনঘন্টা গাড়ি চালিয়ে  আমিও ক্ষুধার্ত। তাড়াহুড়ো করে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে ঢুকলাম একটা ছোট্ট চীনা রেস্তোরায়। সেখানে লাঞ্চ  সেরে গেলাম ফোর্ট হেনরীতে। ক্যানাডার বিখ্যাত স্যাইন্ট লোরেন্চ নদীর পাড়ে কিংস্টন শহরটি - শহর থেকে অনতিদূরে একটি ঝুলন্ত সেতু পার হয়ে   নদীর পাশে সুন্দর উঁচু টিলা - আঁকা বাঁকা পথ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে পৌঁছলাম একেবারে টিলার উপরে দুর্গের ঠিক পাশে।দুর্গের বাহিরে উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকালে চোখে পড়ে দূরে আমেরিকার নিউইয়র্ক স্টেট আর নদীতে ভাসমান ছোট ছোট দ্বীপমালা।  মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য।  এই জায়গাটি স্যাইন্ট লোরেন্চ নদীর উজান দিকের শেষপ্রান্ত এবং এখান থেকেই “হাজার দ্বীপ" - এর আরম্ভ।  

আমরা ঢুকলাম ফোর্ট হেনরীর ভিতরে। চারিদিকে প্রাচীর ঘেরা অসংখ্য ছোট ছোট প্রকোষ্ঠের এই বিশাল দুর্গ দর্শনে আমার ছোট ছেলে অম্বর আনন্দে অভিভূত - আমিও তথৈবচ। এর আদি দুর্গটি তৈরী হয়েছিল ব্রিটিশ শাসিত তৎকালীন  আপার ক্যানাডায় ১৮১২ সালে ক্যানাডা কনফেডারেশন গঠনের বহুপূর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আর আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধের সময়ে। ফোর্ট হেনরীর এই জায়গাটির নাম হেনরী পয়েন্ট। কিংস্টন রয়াল ন্যাভাল ডকইয়ার্ড (বর্তমানে রয়াল মিলিটারী কলেজ অব ক্যানাডা ) এখানে অবস্হিত এবং জায়গাটি আমেরিকার কাছে বলে আমেরিকা এখানে আক্রমন করতে পারে এই সম্ভাবনা থেকে এই কেল্লার পত্তন। তবে বর্তমানের এই দুর্গটি তৈরী হয়েছে ১৮৩২ থেকে ১৮৩৭ সালের  মধ্যে। তবে সৌভাগ্যের কথা প্রথম এবং পরবর্তী কালে নির্মিত  কোনো দুর্গই কখনো আমেরিকার দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। ক্যানাডা কনফেডারেশন গঠনের তিন বৎসর পরে ১৮৭০ সালে  এখান থেকে ব্রিটিশ সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়।  তারপর ১৮৯১ সাল পর্যন্ত ক্যানাডিয়ান সৈন্যরা এর নিরাপত্তায় নিয়োজিত হয়।
 পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে আমেরিকার সাথে সম্পর্কের উন্নতি হতে থাকায় এই দুর্গ পাহারার  গুরুত্ব হারায়। প্রথম মহাযুদ্ধের পর এই দুর্গ পরিত্যক্ত অবস্হায় পরে থাকে। ১৯৩০ সাল থেকে আবার এর সংস্কার শুরু হয় এবং ১৯৩৮  সালের ১ লা আগস্ট এখানে ফোর্ট হেনরী ক্যানাডীয় গার্ড মোতায়েনের মধ্য দিয়ে এটি একটি জীবন্ত মিউজিয়ামে পরিণত হয়। বর্তমানে এটি পর্যটকদের জন্যে একটি আকর্ষনীয় স্হান। এখন প্রতিবছর বসন্ত আর গ্রীষ্মকালে প্রত্যেক দিন গার্ড বাহিনী দর্শনীর বিনিময়ে ব্রিটিশ সৌন্যদের প্যারেড প্রদর্শনী সহ নানান কিছুর আয়োজন করে থাকে।


আমরা অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে ঘুরে দেখলাম দুর্গের ভিতরে আর বাহিরে স্যাইন্ট লোরেন্চ নদীর দিকে। বিশেষ করে আমার ছোট ছেলে দুর্গের ভিতরে প্রত্যেকটি কক্ষে সংরক্ষিত সৈন্যদের বিছানা পত্র সহ তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখল। এসব দেখতে দেখতে ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে - আমাদের আজই পৌঁছতে হবে গ্যানানোকে আগামীকাল সকালে গ্যানানোক বোটলাইনের বোটে করে 'হাজার দ্বীপ " ভ্রমণ করার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে।
   
কিংস্টন থেকে রওনা দিয়ে যখন গ্যানানোকে -  পৌঁছলাম  - সন্ধ্যা সমাগত - সারাদিন ভ্রমণে আমরা সবাই ক্লান্ত। এই সময়টায় গ্যানানোক " হাজার দ্বীপ" - ভ্রমণকারীদের আগমনে টইটম্বুর - তবুও প্রায় অনায়াসেই আমরা একটা মাঝারিগোছের হোটেল খুঁজে পেলাম। একটা ছোট্ট রেস্তোরায় রাতের খাবার সেরে - ছোট্ট গ্যানানোক শহরে পায়ে হেঁটে  একটু এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করে তাড়াতাড়ি  হোটেলে ফিরে এলাম। ক্লান্ত শরীরে গভীর নিদ্রা অবসানে পরদিন সকালে বেশ ফুরফুরে মনেই আমরা সবাই ঘুম থেকে উঠলাম।  তাড়াতাড়ি প্রাত:রাশ সেরে রওনা দিলাম গ্যানানোক বোটলাইনের উদ্দেশ্যে।

 
চিত্ত প্রসন্ন হয় এমন সোনালী রৌদ্রের আরো একটি সুন্দর সকাল - মেঘ বিহীন সুনীল অম্বর আর ক্লান্তি-হরণকরা ফুরফুরে সমীরণ।
 আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম ক্যানাডার বিখ্যাত স্যাইন্ট লোরেন্চ নদীর কূল ঘেঁষে। অনেকদিন পর আমার তৃষিত প্রাণ নদীর জলের এত কাছে গিয়ে আনন্দে নেচে উঠলো - আবার সাথে সাথে মন বেদনায়ও ভরে উঠলো। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বহে যাওয়া কতদিন না-দেখা আমার শৈশবের নিত্যদিনের অনুষঙ্গ আমার প্রাণ-প্রিয় স্রোতস্বিনী মেঘনার কথা মনে পড়ল - আমার দু-চোখ জলে ভরে এলো।


প্রায় ৭৪৪ মাইল দীর্ঘ স্যাইন্ট লোরেন্চ নদীর উৎপত্তি অনট্যারিওর কিংস্টন শহর, উওল্ফদ্বীপ আর আমেরিকার নিউইয়র্কের কেইপ ভিনসেন্ট এর মধ্যখানে লেইক অনট্যারিওর বহি:প্রবাহ থেকে। তারপর গ্যানানোক, ব্রকবিল, ম্যাসেনা, কর্ণওয়েল, ট্রয়স-বিভেরেস এবং কুইবেক শহর হয়ে পতিত হয়েছে আটলান্টিক মহাসাগরে। স্যাইন্ট লোরেন্চ নদী কেন বিখ্যাত? - তার অনেক কারণের মধ্যে দুইটি প্রধান কারণ - এই নদী উত্তর আমেরিকার সর্ববৃহৎ পাঁচটি লেইক - লেইক সুপিরিয়র, মিশিগান, হিউরন, ইরি ও অন্টারিওকে আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত করে এবং  মূলত এই নদীপথ ধরেই উত্তর আমেরিকার অভ্যন্তরভাগের আবিষ্কারের অগ্রদূত বিখ্যাত ফরাসী অনুসন্ধানকারী ও আবিষ্কারক স্যামুয়েল ডি চ্যাম্পলেইন সহ অন্যান্য ইউরোপিয়ান অনুসন্ধানকারীরা এখানে আগমন করেন। 
 

এর মধ্যে সকাল সাড়ে নয়টা বাজলো - "হাজার দ্বীপ " ভ্রমণের নিমিত্তে গ্যানানোক বোট লাইনের টিকিট সংগ্রহ করে অপেক্ষা করছি।
 আমরা যাচ্ছি পাঁচ-ঘন্টার ট্রিপে - দেড় ঘন্টা ধরে হাজার দ্বীপপুঞ্জের অনেক দ্বীপের মাঝখানদিয়ে এঁকে বেঁকে চলতে চলতে আমরা পৌঁছব আমেরিকার জলসীমানায় একটি বিখ্যাত দ্বীপ "হৃদয় দ্বীপ"-এ।  সেখানে থাকব দুইঘন্টা, তারপর আবার ফিরে আসবো আরো অনেক দ্বীপ দেখতে দেখতে বাকী দেড়ঘন্টা ধরে।  সকাল পৌনে দশটায় বোটখানা এসে পাড়ে ভিড়লো। যেহেতু হৃদয় দ্বীপ আমেরিকার জল সীমানার মধ্যে আমরা যার যার পাসপোর্ট হাতে নিয়ে ক্যানাডার ইমিগ্রেশন আর কাস্টম পার হয়ে  উঠলাম গিয়ে বোটে। 
   
সকাল ঠিক দশটায় তিনতলা সাদা রঙের বোটখানা ছাড়ল "হাজার দ্বীপ" ভ্রমণের উদ্দেশ্যে।  আমরা গিয়ে বসলাম চারিদিকে কাঁচের জানালা দিয়ে ঘেরা বোটের দোতলায়। কিন্তু আমার আর অম্বরের মন ভরলো না, আমরা দুইজন চলে গেলাম চারিদিকে খোলা তিনতলায়। সকালের সোনারোদের আলো পড়ে নদীর ঘন নীল জলে সোনার ঝলখানি - প্রকৃতি যদিও খুবই শান্ত তবুও অনুভূত হচ্ছে শরীর আর মন প্রসন্ন করা ঝিরঝিরে মৃদু মন্দ হাওয়া - এরই মধ্যে অনেক যাত্রী নিয়ে বোটখানা এগিয়ে চলে  নি:শব্দে - আর দূরে দৃশ্যমান সবুজে সবুজে ছাওয়া অসংখ্য দ্বীপমালা - ভূস্বর্গ আর কাকে বলে! অম্বর আনন্দে আত্মহারা - আমিও আনন্দিত বটে - তবে আমার মন ততক্ষণে চলে গেছে আমার ফেলে আসা সোনালী শৈশবে। এই পৃথিবী ছেড়ে আমার বাবা চলে গেছেন আজ থেকে ৩০ বছর আগে  - বাবার কথা হঠাৎ খুব মনে পড়ল, মুহুর্তেই আমার মন বেদনায় ভরে উঠলো।


   আমাদের বাড়িটা ছিল বাংলাদেশের বিখ্যাত নদীগুলোর অন্যতম মেঘনা নদীর একেবারে কূল ঘেঁষে - এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় আমাদের আসা যাওয়া ছিল মেঘনা নদী দিয়ে লঞ্চে করে - সেই লঞ্চগুলো আকারে ছোট হলেও আকৃতিতে ছিল অনেকটা এই দেশের এই বোটেরই মত।
 ছোট বেলায় বাবার সাথে যখন লঞ্চে করে বিভিন্ন জায়গায় যেতাম - লঞ্চের দোতলায় বাবার সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নদীর দুই পাশের ছোট ছোট নিভৃত গ্রামগুলির দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম - আর আজ কত বছর পরে আমি বাবা হয়ে আমার ছেলের সাথে বোটের ছাঁদে দাঁড়িয়ে চোখের বাহিরে ক্যানাডার হাজারোদ্বীপের দিকে তাকিয়ে আছি আর মানস চক্ষে দেখছি আমার বাবাকে, আমার কত আপন সেই মেঘনা নদীকে আর তার তীর ঘেঁষে মায়াময় ছোট ছোট নিবিড় গ্রামগুলিকে। 
 

বোট খানা ক্রমেই এগিয়ে চলছে - বোটের সারেং বোট চালাতে চালাতে স্পিকারে হাজার দ্বীপের ইতিহাস সহ বিভিন্ন দ্বীপের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে চলছে। ক্যানাডার অনট্যারিওর কিংস্টন শহর থেকে শুরু হয়ে অনট্যারিও আর আমেরিকার নিউইয়র্ক স্টেটের মধ্য দিয়ে যে স্যান্ট লোরেন্চ নদী বহে চলছে তারই মধ্যে দীর্ঘ ৫০ মাইল এলাকা জুড়ে এই হাজার দ্বীপ গঠিত। ছোট-বড় বিভিন্ন আয়তনের দ্বীপের সংখ্যা ১৮৬৪, তাদের কিছু ক্যানাডার অনট্যারিওর আর কিছু আমারিকার নিউইয়র্কের জল সীমানায় অবস্হিত।  "হাজর দ্বীপে"-র সাথে বেশী সম্পৃক্ত নিউইয়র্কের আলেকজেন্দ্রিয়া উপসাগর আর অনট্যারিওর গ্যানানোক শহর ।
 সবচেয়ে ছোট দ্বীপগুলোর কোনটাতে কেবল একটা ঘর - কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তির গ্রীষ্মাবকাশের নিমিত্তে গ্রীষ্ম-কুঠির আবার কোনটাতে কেবল কিছু পাথর আর কয়েকটা গাছ - যেখানে কেবল অতিথি পাখিদের  আবাসস্হল।  হাজার দ্বীপের সবচেয়ে বড় দ্বীপ উলফ (Wolfe ) দ্বীপ ক্যানাডায় অবস্হিত - এর আয়তন ৪৮ বর্গ মাইল এবং সেখানে  স্কুল - হাসপাতাল সহ প্রায় সব কিছুই বিদ্যমান।


১৮৭০ দশকের দিকে উত্তর আমেরিকা আবিষ্কারের জন্যে  যে সকল ফরাসী অনুসন্ধানকারী এখানে আগমন করেন তাঁরাই এই দ্বীপমালা আবিষ্কার করেন এবং এর নামকরণ করেন হাজার দ্বীপ। তারপর ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ক্রমে ক্রমে ছোট ছোট দ্বীপ কিনে সেখানে তাদের গ্রীষ্মাবকাশের জন্যে গ্রীষ্ম কুঠির তৈরী করা শুরু করেন।
 

আমাদের বোটখানা এগিয়ে চলে কখনো বড় দ্বীপের পাশ দিয়ে আবার কখনো ছোট ছোট অনেক দ্বীপের মাঝখান দিয়ে। পাইন, মেপল আরো কত বিচিত্র গাছ-পালায় ভরা সেই দ্বীপগুলি।  প্রত্যেকটা দ্বীপেরই যেন আছে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য - কোনটায় গ্রানাইট পাথরের খাড়া উঁচু পাড়  আবার কোনটায় বালুকাময় সৈকত।  এই দ্বীপগুলোর অনেকগুলো সরকারী মালিকানায় আবার কতকগুলো ব্যক্তিমালিকানায়।  ব্যক্তি মালিকাধীন দ্বীপগুলিতে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের গ্রীষ্মাবকাশের জন্যে গ্রীষ্ম কটেজ" - আর সরকারী মালিকাধীন আমারিকার অনেকগুলো বড় দ্বীপই জনসাধারণের বিনোদনের নিমিত্ত পার্ক। যতই নতুন নতুন দ্বীপ দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি - কতই না বিচিত্র রঙের আর নকশার এই সকল গ্রীষ্মকটেজ - কোনটায় আবার মনোরম সেতু যেখানে গ্রানাইট পাথরের বিচিত্র কারুকার্য্য।
 

নদীর মাঝখানে কত ছোট ছোট দ্বীপ আর তাতে মাত্র একখানা করে গৃহ - কল্পনা করছি যারা গ্রীষ্মাবকাশের জন্যে এখানে আসেন  - ভরা পূর্নিমার রাতে চারিদিকে জ্যোৎস্নালোকিত জলরাশির মাঝে শহুরে যান্ত্রিক কোলাহল থেকে বহুদূরে এই মনোরম স্নিগ্ধ পরিবেশে এই কুঠিরে রাত্রি যাপন কি না রোমান্টিক পরিবেশের সৃষ্টি করে!

বোটখানা এগিয়ে চলছে আর আমি আমার ক্যামেরায় ধারণ করছি অসংখ্য ছবি। আমার ছেলে অম্বরও ছবি উঠাতে পছন্দ করে। সেও আমার কাছ থেকে ক্যামেরা নিয়ে একটার পর একটা ছবি উঠাচ্ছে। এত ছবি তুলেও আমাদের মন যেন ভরছে না - আমরা আনন্দে এতটাই অভিভূত। 

ছবি: চিত্তাকর্ষক এই দ্বীপে রঙিন একখানা গৃহ


 কথিত আছে ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টের ভাই নাকি এই হাজার দ্বীপের কোনো এক দ্বীপে নির্বাসিত হয়ে অনেকদিন ছিলেন আর তিনি নাকি এই হাজার দ্বীপের শান্ত নিবিড় পরিবেশে মাছ ধরে ধরে সময় কাটাতেন। 
 

তখন সকাল প্রায় ১১ টা - আমরা ক্যানাডার দক্ষিন-পূর্ব অনট্যারিও এবং আমেরিকার নিউইয়র্ক স্টেট এর মধ্যে সংযোগকারী হাজার দ্বীপের মাঝখান দিয়ে বহে যাওয়া স্যাইন্ট লোরেন্চ নদীর উপরে একটি আন্তর্জাতিক সেতু  "হাজার দ্বীপ ব্রীজে"-র কাছাকাছি। এই ব্রীজটি তৈরী হয় ১৯৩৭ সালে এবং ১৯৫৯ সালে এটিকে আরো কিছুটা বর্ধিত করা হয়। ৮.৫ মাইল দীর্ঘ এই সেতু ক্যানাডার অংশে যুক্ত হাইওয়ে ১৩৭ হয়ে হাইওয়ে  ৪০১ এর সাথে এবং আমেরিকার অংশে ইন্টারস্টেট ৮১ এর সাথে। তখন ৩০ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার খরচ করে ১৯ মাসে এই ব্রীজটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।  বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ২০ লক্ষ যানবাহন এর উপর দিয়ে  যাতায়াত করে। হাজার দ্বীপ কর্তৃপক্ষ এর রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে নিয়োজিত।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে আর বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে অনেক বিখ্যাত ভ্রমন বিলাসীরা এই হাজার দ্বীপে আসতে শুরু করেন, সেই সব দ্বীপে পর্যটকদের  জন্যে তৈরী হতে থাকে বড় বড় সব হোটেল । ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ছোট ছোট দ্বীপ কিনে গ্রীষ্মাবকাশের জন্যে নির্মান করতে শুরু করেন  গ্রীষ্ম-কটেজ আর অতি ধনাঢ্য ব্যক্তিরা তৈরী করেন  সুরম্য প্রাসাদ।  এমন দুটি বিখ্যাত প্রাসাদের একটি হলো অন্ধকার দ্বীপের (Dark Island) সিঙ্গার প্রাসাদ(Singer Castle) আর অন্যটি হলো হৃদয় দ্বীপের বোল্ট প্রাসাদ (Boldt Castle)।  সিঙ্গার ক্যাসেলের প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত সিঙ্গার সেলাই মেশিন এর প্রস্তুতকারক কোম্পানি "সিঙ্গার কর্পোরেশনের" এককালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রেডেরিক গিলবার্ট বোর্ন আর বোল্ট ক্যাসেলের প্রতিষ্ঠাতা মি: জর্জ বোল্ট (George C. Boldt)।

ঠিক সাড়ে এগারটায় আমরা পৌঁছলাম "হৃদয় দ্বীপে", সেখানে ডকইয়ার্ডে আমেরিকার ইমিগ্রেশন আর কাস্টম পার হয়ে বোল্ট ক্যাসেল দর্শনের জন্যে টিকিট কেটে উঠলাম হৃদয় দ্বীপে।  হৃদয়দ্বীপের কাহিনী এমন একটি কাহিনী যা শুনে একদিকে মন আনন্দিত হয় আবার অন্যদিকে মন বেদনায়ও ভরে উঠে।

ছবি: অন্ধকার দ্বীপের "সিঙ্গার ক্যাসেল"

এই দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দর্শনে আমরা সবাই অভিভূত। এই দ্বীপে আছে বোল্ট ক্যাসেল আর তার সাথে এলস্টার টাওযার এবং এই দ্বীপে বিদ্যুৎ সবরাহের জন্যে একটি পাওযার হাউস।  এই হৃদয় দ্বীপে ছড়িয়ে আছে প্রেমের অমর গাঁথা। হৃৎপিন্ড আকৃতির আর দুইজন মানব-মানবীর গভীর ভালবাসায় হৃদ্ধ এই দ্বীপের সার্থক নামকরণ "হৃদয় দ্বীপ"।

ছবি: জর্জ আর লুইসের প্রেমের কাহিনী খ্যাত "হৃদয় দ্বীপ"

ছবি: হৃদয় দ্বীপে লেখকের স্ত্রী আর দুই ছেলে

ভারত-সম্রাট শাহজাহান তাঁর হৃদয়-সম্রাজ্ঞী প্রয়াত স্ত্রী মমতাজ মহলের  স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিলেন জগৎ বিখ্যাত তাজমহল আর জর্জ  বোল্ট তার  হৃদয়-ঈশ্বরী জীবিত স্ত্রী লুইসের  জন্যে নির্মাণ করতে শুরু করেছিলেন "বোল্ট ক্যাসেল"। হৃদয় দ্বীপের "বোল্ট ক্যাসেল"-এর  কাহিনী জর্জ চার্লস বোল্ট আর লুইস কেরের বোল্টের এক হৃদয় বিদারক প্রেমের উপখ্যান। কাহিনীটি এইরূপ : দরিদ্র পিতামাতার সন্তান জর্জ ১৮৬৪ সালে ভাগ্যের অন্বেষণে মাত্র তের বৎসর বয়সে তৎকালীন জার্মানীর একটি রাজ্য প্রুশিয়া থেকে অভিবাসী হয়ে আমেরিকার নিউইয়র্কে আগমন করেন।
সেখানে এসে একটি হোটেলের রান্না ঘরে কাজ নেন - ২৫ বৎসর বয়সের সময় ফিলাডেলফিয়ার বিখ্যাত "ফিলাডেলফিয়া ক্লাব" এর ভোজনশালার  ব্যবস্হাপক হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন।  তারপর নিজের অসাধারণ বুদ্ধি আর কঠোর পরিশ্রমের ফলে ক্রমে ক্রমে নিজেই নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে থাকেন - তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার ফলে হোটেল ব্যবস্হাপনার জগতে ক্রমে ক্রমে তিনি বিশেষ খ্যাতি আর সাফল্য অর্জন করেন - হোটেল ব্যবসার জগতে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন এবং পরবর্তীকালে আমেরিকার দুটি বিখ্যাত হোটেল "নিউ ইয়র্কের ওয়ালদর্ফ-এস্টোরিয়া" ও ফিলাডেলফিয়ার বেলভ্যু-স্ট্রেটফোর্ড" হোটেলের মালিক হন এবং এক সময়ে আমেরিকার সেরা ধনীদের একজনে (মাল্টি-মিলিয়নেয়ার)পরিণত হন ।
 
১৮৭৭ সালে জর্জের বয়স যখন ২৬ বৎসর তখন তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ১৫ বৎসর বয়স্কা ফিলাডেলফিয়ার লুইস এর  সাথে।  যেমন পারিবারিক জীবনে লুইস ছিল তার নিত্যসঙ্গিনী তেমনি কর্ম জীবনে সে ছিল জর্জের অনুপ্রেরণাদায়িনী।  কর্মক্ষেত্রে জর্জের উত্তরোত্তর উন্নতিতে তাঁর জীবন-সঙ্গিনী হিসাবে লুইসের ছিল বিশেষ অবদান।  ক্রমে দুজনের মধ্যে ভালবাসার বন্ধন হয়ে উঠে সুদৃঢ় -  একসময় লুইস হয়ে উঠেন জর্জের প্রাণের প্রতিমা - তাকে ঘিরে তৈরী হয় তার অসংখ্য স্বপ্ন।
 প্রাকৃতিক নিবিড় সুন্দর পরিবেশে লুইসকে নিয়ে গ্রীষ্মাবকাশ কাটানোর জন্যে জর্জ ১৮৯৫ সালে হাজার দ্বীপে ক্রয় করেন একটি দ্বীপ - যার নাম ছিল হার্ট  দ্বীপ (Hart Island) - তিনি তাঁর নতুন নামকরণ করেন হৃদয় দ্বীপ (Heart Island)।তিনি যখন সেই দ্বীপ কিনেন তখন সেখানে ছিল কাঠের কটেজ, তারপর জর্জ সেখানে তৈরী করেন পাথরের দালান - সেটিই এখন এলস্টার  টাওযার।  প্রতিবছর তারা সেখানে আসেন গ্রীষ্ম কাটাতে প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে।

 
স্ত্রী লুইসের প্রাণ উজার করা ভালবাসায় হৃদ্ধ জর্জ এক সময় স্বপ্ন দেখেন তাঁর স্ত্রীর জন্যে একটি মহিমাময় প্রাসাদ নির্মাণের  - যে প্রাসাদ হবে উত্তর আমেরিকার ব্যক্তি মালিকাধীন সবচেয়ে জাঁকজমকশালী প্রাসাদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি প্রাসাদ  - যেটি হবে ছয়তলা বিশিষ্ট - যাতে থাকবে ১২০ খানা কক্ষ - আর এর চারিদিকে ৩৬৫ খানা জানালা - এই জানালা দিয়ে জর্জ আর লুইস দেখবে ভূ-স্বর্গ হাজার দ্বীপের নয়নাভিরাম জাঁকালো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
 এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত হয় একটি ইতালিয়ান বাগান যার নির্মাণের জন্যে ইতালি থেকে আনা হবে পৃথিবী-খ্যাত মার্বেল পাথর।
 পৃথিবী বিখ্যাত রাইনল্যান্ড ক্যাসেলের আদলে এই ক্যাসেল  নির্মাণের জন্যে নিয়োগ করা হয় পৃথিবীর ৩০০ জন সেরা শিল্পী আর সব-সেরা কারিগর।  ১৯০০ সালে শুরু হয় এর নির্মাণ - কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলে - এর মধ্যে প্রতি বছর তারা এসে এই দ্বীপের এলস্টার  টাওযারে গ্রীষ্ম যাপন করেন।  ইতিমধ্যেই এই দ্বীপে তৈরী হয়েছে একটি পাওযার হাউস যেখানে স্হাপিত হয়েছে হাজার দ্বীপে বিদ্যুৎসরবরাহের জন্যে একটি বাষ্প চালিত জেনারেটর আর হৃদয় দ্বীপের অদূরে ওয়েলেসলী দ্বীপে (Wellesley Island) ) বোল্ট পরিবারের ইয়ট (Yacht) হাউজ যেখানে থাকবে তাদের প্রমোদতরণী সকল । 
 

দ্রুত গতিতে এর নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে - বোল্ট ক্যাসেল সম্পন্ন হতে আর মাত্র বছরখানেক বাকী - জর্জ সিদ্ধান্ত করেছেন - ১৯০৫ সালের ফেব্রুয়ারী  মাসের ১৪ তারিখে "ভালবাসা দিবস" (Valentine’s Day)-এ স্ত্রীকে উপহার দিবেন তার প্রেমের উপহার এই জমকালো প্রাসাদ।
 কিন্তু হায়! অনেক সময়েই মানুষ ভাবে এক আর হয়ে যায় আর এক! - এই বোল্ট প্রাসাদ নির্মাণের চার বৎসরের মাথায় ১৯০৪ সালের জানুয়ারী মাসে অকস্মাৎ মাত্র ৪২ বৎসর বয়সে লুইস তাঁর হৃদর ঈশ্বর জর্জের হৃদয়  ভঙ্গ করে আর তাঁর সব স্বপ্নের সমাধি ঘটিয়ে  এই মর জগৎথেকে অন্তর্হিত হলেন। ভগ্ন হৃদয় জর্জ তৎক্ষণাৎ টেলিগ্রাম করে বন্ধ করে দিলেন এই বোল্ট ক্যাসেলে নির্মাণের বাকি সব কাজ। এর পর পত্নী-বিয়োগ বেদনায় কাতর জর্জ  আর কোনো দিন ফিরে আসেননি লুইস বিহীন তাঁর এই প্রাণ প্রিয় হৃদয় দ্বীপে। তার পর দীর্ঘ ৭৩ বৎসর এই অসমাপ্ত বোল্ট ক্যাসেল পরে থাকে পরিত্যক্ত অবস্হায় প্রকৃতির নির্দয় কৃপায়।
 

তারপর সরকারের সাথে এক চুক্তির মধ্য দিয়ে ১৯৭৭ সালে হাজার দ্বীপ ব্রীজ কর্তৃপক্ষ এই দ্বীপ ও বোল্ট ক্যাসেল অধিগ্রহণ করে এক ডলারের বিনিময়ে।
 চুক্তিটি হল এই - ব্রীজ কর্তৃপক্ষ এই প্রাসাদ মেরামত ও উন্নতি সাধন করে এটি দর্শনীর বিনিময়ে জনসাধারণের জন্যে উন্মুক্ত করে দিবে এবং এর থেকে যা আয় হবে তার সমুদয় অর্থ এই ক্যাসেলের উন্নয়নে ব্যয় হবে।  ১৯৭৭ সাল থেকে প্রায় ২৪ বৎসর ধরে ব্রীজ কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করে এর সংস্কার ও উন্নতি সাধন করে। এই বোল্ট ক্যাসেল এখন পর্যটকদের জন্যে একটি আকর্ষনীয় দর্শনীয় স্হানে পরিণত হয়েছে।


এখন প্রতি বৎসর হাজার হাজার ভ্রমনবিলাসী মানুষ জর্জ আর লুইসের অমর প্রেমের অসমাপ্ত স্মৃতিস্তম্ভ বোল্ট ক্যাসেল পরিদর্শন করতে এই হৃদয় দ্বীপে পদার্পণ করে।  বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের যে কয়টি ঐতিহাসিক প্রাসাদ পরিদর্শনের নিমিত্তে সর্বাধিক সংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন ঘটে এমন ২৫ টি প্রাসাদের একটি হলো হৃদয় দ্বীপের এই বোল্ট ক্যাসেল।


হাজার দ্বীপের এই বোল্ট ক্যাসেল, এলস্টার টাওযার আর পাওযার হাউস সহ দ্বীপটি ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কখন দুই ঘন্টা কেটে গেল - মনে হলো ভালো করে কিছুই দেখা হলো না - মন যেন কিছুতেই ভরলো না - তবু যে আমাদের চলে যেতে হবে - কোনো আনন্দ-উপভোগেই সময় তো কখনোই যথেষ্ট নয়।


 ডকইয়ার্ডে ফিরে এলাম - পাসপোর্ট দেখিয়ে আমেরিকান ইমিগ্রেশন পার হয়ে আবার বোটে উঠলাম। বোটখানা  ছাড়ল বেলা দেড়টায় - আমরা সবাই তখন কিছুটা ক্লান্ত। তবুও আমার ছোট ছেলে আরো অনেক দ্বীপ দেখার জন্যে উদগ্রীব। আবারও দেড় ঘন্টা ধরে আরো অসংখ্য সুন্দর সুন্দর দ্বীপমালা দেখতে দেখতে গ্যানানোকে ফিরে এলাম।
 তখন বেলা তিনটা।  আমরা সবাই ভীষণ ক্ষুধার্ত।   স্হানীয় একটা পিজ্জার দোকানে দুপুরের খাবার খেয়ে রওয়ানা দিলাম গুয়েল্ফের উদ্দেশ্যে।
 গুয়েল্ফে যখন প্রত্যাবর্তন করলাম তখন সন্ধ্যে প্রায় আটটা। যদিও ভ্রমণটি ছিল সংক্ষিপ্ত তবুও ফোর্ট হেনরী, হাজার দ্বীপ আর সেই হাজার দ্বীপের একটি অনন্য দ্বীপ "হৃদয় দ্বীপ" পরিদর্শন করে আমাদের ভাগ্যে জুটেছিল নিবিড় আনন্দ।
 
গুয়েলফ, ক্যানাডা


লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন :

প্রবন্ধ : আজি প্রণমি তোমারে-অমল কৃষ্ণ রায়