অটোয়া, শনিবার ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯
আশ্রম সঙ্গীতানুষ্ঠান - কবির চৌধুরী

                টোয়া হইতে প্রকাশিত বাংলা ম্যাগাজিন ‘আশ্রম’ আয়োজিত সঙ্গীতানুষ্ঠানটি শেষ হয়েছে প্রায় দেড় মাস হয়। এই সময়ের ভেতর বহুবছরের প্রিন্ট আকারে প্রকাশিত ‘আশ্রম’ ম্যাগাজিন এখন পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বৃহত্তম মাধ্যম অনলাইনে তার যাত্রা শুরু করেছে। তাও প্রায় এক সপ্তাহ ধরে। ২১শে মে, ২০১৭ রবিবার “আশ্রম সঙ্গীতানুষ্ঠান”টি শেষ হওয়ার পর থেকেই অনুষ্ঠানের সংবাদ লেখার চেষ্টা করছি। কারণ খুব তাড়াতাড়িই অটোয়ার একমাত্র বাংলা পত্রিকা ‘আশ্রম’ অনলাইনে প্রকাশিত হবে। ‘আশ্রম সঙ্গীতানুষ্ঠান’ আশ্রমের নিজস্ব অনুষ্ঠান। সংবাদটি পত্রিকা অনলাইনে প্রকাশের দিনই দিতে হবে। নিজের অনুষ্ঠান বলে কথা। কিন্তু আমি সংবাদ লিখতে পারছিনা। বারবার হোঁচট খাচ্ছি। অথচ এই লিখতে চাওয়াটা আগে এত কঠিন ছিল না। মনে যা কিছু চাইত তা ই লিখে দিতাম। হইল কি হইল না, কে কী মনে করল তা ভাবতাম না। অথচ এবার! একবার মনে হয় অনুষ্ঠানের সংবাদ লিখি, পত্রিকায় দেই, আবার পরক্ষণেই চিন্তা করি লিখব না। কী লিখব? 

উপস্থাপিকা শিউলি হক

অনুষ্ঠান সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে, শিল্পীরা মন উজাড় করে গান পরিবেশন করেছেন, উপস্থিত দর্শকরা মন ভরে তা উপভোগ করেছেন। সবই হয়েছে। এতটুকু পর্যন্ত লিখতে চাইলে সংবাদ অনেক আগেই লিখা হয়ে যেত। কিন্তু আমি তো তা চাই না। আমি লিখতে চাই এত সুন্দর একটি অনুষ্ঠানে দর্শকদের সতঃস্ফুর্ত উপস্থিতি নাই কেন? দর্শকদের মতে অটোয়ায় “এ মাসের ৫টি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে সেরা অনুষ্ঠানে দর্শকদের উপস্থিতি সবচেয়ে কম!” কিন্তু কেন? সেই উত্তর জানতে হলে আমাদেরকে চলে যেতে হবে অনেক পিছনে সেই ২০০৯ সালে।


 কন্ঠশিল্পী মণিকা মুনা            

আজ থেকে আট বছর আগে, ‘আশ্রম’ প্রকাশের সময় অটোয়ার সাধারণ বাংলাদেশি আর পাঠকদের কাছে ওয়াদা করেছিলাম আমরা অটোয়াতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চার জন্যে সাংস্কৃতিক সংগঠন করতে চাই। আমরা সুস্থ সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশীদার হতে চাই। কারণ, সেই সময়ে অটোয়াতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের বড় অভাব ছিল। অথচ কয়েক দশক আগেও অটোয়া সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ভরপুর ছিল। গত শতকের শেষ আর এই শতকের শুরুতে বৈশ্বিক পরিবর্তনের ছোয়া অটোয়ার ছোট বাংলাদেশি কমিউনিটিকেও আচ্ছন্ন করে ফেলে। হারিয়ে যায় আমাদের বাঙালিপনা। আমরা আস্তে আস্তে অন্যের কৃষ্টি- কালচারের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করি। ঠিক সেই সময়েই ‘আশ্রম’ প্রকাশিত হয় ভিন্ন ধারার পত্রিকা হিসেবে। আমরা বলি শুধু পত্রিকা প্রকাশেই আমরা সীমাবদ্ধ থাকবো না, কারণ কানাডাতে প্রকাশিত পত্রিকার অভাব নাই, টরোণ্ট-মন্ট্রিয়ল থেকে অসংখ্য সাপ্তাহিক প্রকাশিত হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত অনেক পত্রিকাই তখন অনলাইনে পড়া যাচ্ছে। পত্রিকা প্রকাশ হল একটি উছিলা মাত্র, আমাদের আসল এবং প্রধান কাজ হবে পত্রিকাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে লেখক এবং পাঠক বলয় তৈরি করা, যেখানে চর্চা হবে সুস্থ সাহিত্য-সংস্কৃতি। 

কন্ঠশিল্পী এম এইচ রহমান লিটন

এই শতকের শুরুতে বাংলাদেশ থেকে কানাডায় অভিবাসন নেওয়া একঝাক শিল্পমনা তরুণদের আবির্ভাব হয় অটোয়াতে। তাদের সহযোগিতায় আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সেমিনার-আলোচনার ব্যবস্থা করতে থাকি। অটোয়ার অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সংগঠকরা আস্তে আস্তে শুরু করতে থাকেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, উদযাপন করতে থাকেন “বার মাসে তের পার্বন”। মানুষ বাড়ছে, সংগঠন বাড়ছে, অনুষ্ঠান বাড়ছে। স্থানীয় শিল্পী-দর্শকদের গানের প্রতি ভালবাসা আর আগ্রহ দেখে মনে হলো স্থানীয় শিল্পী নিয়ে একক গানের অনুষ্ঠান করলে কেমন হয়। যেই ভাবা সেই কাজ। আমরা স্থানীয় শিল্পী আশেক বিশ্বাসকে নিয়ে ২০১৪ সালে আমাদের প্রথম “আশ্রম একক সঙ্গীতানুষ্ঠান” এর আয়োজন করি। ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত আশ্রমের সঙ্গীতানুষ্ঠানে গান করেছেন- নাসরিন শশী, অপূর্ব দাশ, অর্পিতা দাশ, রেজওয়ানা আরিফ এবং জয়ন্ত ভৌমিক।    

কন্ঠশিল্পী নন্দিতা ঘোষ 

কন্ঠশিল্পী হাদিউল হিরো

আর এবছর ২১মে, ২০১৭ সালে সঙ্গীত পরিবেশন করেন, অটোয়া থেকে- সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঊষা মিউজিক স্কুলের শিক্ষিকা নন্দিতা ঘোষ, এম এইচ রহমান লিটন, মন্ট্রিয়ল থেকে- সুরকার, গীতিকার মণিকা মুনা এবং টরোণ্ট থেকে- হাদিউল হিরো। যন্ত্রী হিসেবে তাদের সাথে ছিলেন টরোণ্টো থেকে আগত- জয় সরকার, রণি পালমার, সৌরভ ধ্রুব এবং মেহেদী ফারুক।    

‘আশ্রম’ আয়োজিত সব অনুষ্ঠানেই- সেটি গানের অনুষ্ঠান বলেন আর প্রতিবাদ সভা বলেন—দর্শকদের উপস্থিতি ছিল উৎসাহজনক। কিন্তু এবার ঠিক উল্টো। অনেকভাবেই আমরা এর কারণ খোজার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনভাবেই হিসেব মেলাতে পারিনি। দর্শকদের কথা শুনেই আমরা একক সঙ্গীত সন্ধ্যাটিকে, বহু শিল্পীর সমন্বয়ে করার চেষ্টা করেছি। হয়তো এই জায়গাটাতেই আমাদের ভুল হয়েছে। কোন অবস্থাতেই দুই জনের অধিক শিল্পী নেওয়া ঠিক হয়নি। এছাড়া অনেকেই বলেছেন, অন্যান্য বছর সামারের শুরুতে মাত্র দুটি গানের অনুষ্ঠান হতো—এবার হয়েছে পাঁচটি। তিনটি বৈশাখি মেলার কথা তো বাদ দেওয়া হল!! বছরের শুরুতে একই মাসে পাঁচটি গানের অনুষ্ঠান! একটি তো দুদিন আগে শুক্রবারে!(বাংলাদেশ থেকে আগত সেই শিল্পী দুই সপ্তাহ আগেও অটোয়ায় একটি রেস্টুরেন্টে গান পরিবেশন করেন।) অনুষ্ঠিত হয়। আর সে কারণেই বরাবরের মত সাত মাস পূর্বে সবার আগে ঘোষিত (অনুষ্ঠানের তারিখ) “আশ্রম সঙ্গীতানুষ্ঠান” মাসের শেষ অনুষ্ঠানে পরিণত হওয়ার কারণে দর্শকদের উপস্থিতি কমে যায়। হয়তো বা তাই…….    

অটোয়া, কানাডা