অটোয়া, শনিবার ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯
অটোয়াতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস পালন



আশ্রম রিপোর্টঃ  আজ ১৫ আগস্ট, কানাডার রাজধানী অটোয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে, বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ৪২ তম শাহাদৎ বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করা হয়। সকাল ১০.০০ ঘটিকায় রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমানের বাসভবন ‘বাংলাদেশ হাউসে’ পতাকা অর্ধনমিতকরণের মাধ্যমে দিনটির সূচনা করা হয়। এরপর সন্ধ্যা ৭.০০ ঘটিকায় মাননীয় রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং অর্পণা রানী পালের উপস্থাপনায় স্থানীয় রিচলিউ-ভেনিয়ার কমিউনিটি সেন্টারে জাতীয় শোক দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা অনুষ্ঠানের শুরু হয়। শুরুতেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছাসহ ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে নির্মমভাবে শাহাদৎবরণকারী সকল সদস্যের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বাণী পাঠ করে শোনান যথাক্রমে দূতাবাসের কর্মচারী নাইমুদ্দিন আহমেদ, শাখাওয়াত হোসেন, দেওয়ান মাহমুদ এবং আলাউদ্দীন ভূঁইয়া। আলোচনা শুরুর পূর্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের উপর তৈরি ‘সোনালী দিনগুলো’ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এরপর শুরু হয় ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের উপর আলোচনা। অটোয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য ও প্রাক্তন সচিব উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত, কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ সংসদের সংসদ সদস্য জনাব আলী আশরাফ এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, কানাডা শাখার সভাপতি জনাব গোলাম মোহাম্মদ মাহমুদ মিয়াসহ প্রায় ২৩ জন আওয়ামী লীগ কর্মী ও নেতৃবৃন্দ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। সকল বক্তাই নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করার দাবী জানান। বক্তৃতার পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি করেন যথাক্রমে দেওয়ান মাহমুদ (প্রথম সচিব বাণিজ্য), রাজ্জাক হাওলাদার।

পতাকা অর্ধনমিত করছেন রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমান

 

অনুষ্ঠানের সভাপতি মিজানুর রহমান উপস্থিত সুধীজনের উদ্দেশ্যে যে লিখিত বক্তব্য প্রদান করেন এখানে তার হুবুহু তুলে দেওয়া হল।    

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস, ২০১৭ উপলক্ষে অটোয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমানের লিখিত বক্তব্য

উপস্থিত সুধীবৃন্দ, 
বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ, সম্মানিত নেতৃবৃন্দ
এবং আমার সহকর্মীবৃন্দ -
আসসালামু আলাইকুম।   

বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতির ইতিহাসে সবচাইতে শোক ও দুর্ভাগ্যের দিন ১৫ই আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে আমাদের জাতির পিতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর নয় বছরের শিশুপুত্র রাসেলসহ পরিবারের উপস্থিত সকলকে নির্মমভাব হত্যা করে ঘাতকের দল। তাই বক্তব্যের শুরুতেই আমি ’৭৫-এর সেই কালরাতে শাহাদাৎ বরণকারী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ তাঁর পরিবারের সকল সদস্যের বিদেহী আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। সেই সাথে আমি সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছি ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের এবং ৩রা নভেম্বরে শহীদদের আত্মার প্রতিও, যাঁরা বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী নেতৃত্বে আমাদের জন্য রেখে গেছেন প্রিয় মাতৃভূমি, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কেবল একজন ব্যক্তি বা একজন রাজনৈতিক নেতাই নন, শেখ মুজিব এক মহান আদর্শের নাম। বিশ্বপরিমন্ডলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এক মহান রাষ্ট্রনায়ক এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী। দীর্ঘ প্রায় দু’শ বছরের বৃটিশ শাসন-শোষন এবং ২৪ বছরের পাকিস্তানী দু:শাসনের জাঁতাকল থেকে বাঙালীর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তির দিশারী ছিলেন তিনি। তাঁরই সুমহান আদর্শ - বাঙালী জাতীয়তাবাদের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের মৌলিক কাঠামো, আমাদের পবিত্র সংবিধান। ১৯৭১ সালের নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগ-তিতীক্ষা নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গঠনে মনোনিবেশ করেন। নানাবিধ দেশী এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাঝেও তিনি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবিচল থেকে রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগকে গঠন এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে বিনির্মাণ করেন। “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি শত্রুতা নয়” – এই নীতির আলোকে সকল রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আসামান্য অবদান রাখেন। জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ প্রদানের মাধ্যেম তিনি নিজ দেশ ও ভাষা এবং বাঙালী জাতির মর্যাদা বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেন। দেশের পররাষ্ট্র বিভাগ, বেসামরিক প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশনসহ সকল প্রতিষ্ঠানকে তিনি গড়ে তোলেন নিজ হাতে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যেম একটি স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলা গড়ে তোলা ছিলো তাঁর আজন্মলালিত স্বপ্ন। কিন্ত ১৫ই আগস্টের ঘাতকের বুলেট তাঁর সেই স্বপ্নকে মাঝপথে স্তব্ধ করে দেয় . . .

তবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও তাঁর চেতনাকে নি:শেষ করতে পারেনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকচক্র এবং তাদের দোসররা। দীর্ঘ ক্রান্তিকাল পেরিয়ে তাঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ’৭৫-এর ঘাতকদের বিচার সুনিশ্চিত করেছে। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিচারের রায় কার্যকর করার মাধ্যমে হত্যাকারীদের রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তির যে অভিশাপ ও কলঙ্কের কালিমা  ছিল আমাদের  জাতির মুখে, তা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার।

তবে এ বিচারের রায় পূর্ণাঙ্গরূপে কার্যকর করার লক্ষ্যে কানাডার এবং কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশীদের একটি বিশেষ ভূমিকার কথা আমি বলতে চাই। আপনারা সকলেই জানেন, বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনী নূর চৌধুরী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালাতের রায়ের ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত হলেও কানাডায় পালিয়ে এদেশের  আইনী কাঠামোর সুবিধা নিয়ে অবাধে বিচরণ করছে। আমাদের জন্য, কানাডাপ্রবাসীদের জন এ অতি মর্মপীড়াদায়ক এটি। একে বিচারের মুখোমুখী করতেই হবে। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। সরকারী কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাকে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে এবং বাংলাদেশ দূতাবাস সে লক্ষ্যে কানাডা সরকারের সাথে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বিভিন্ন শহর ও প্রদেশে বসবাসরত কানাডা প্রবাসী বাঙালীরা তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবীতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে কানাডার সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে প্রেরণ করছেন। ইতোমধ্যেই অটোয়া, মন্ট্রিয়েল, কুইবেক সিটি, রেজাইনা, টরন্টো, সাস্কাকটুন, ক্যালগেরি এবং ভ্যাঙ্কুভার শহরের বাঙলাদেশেী কমিউনিটি সংগঠনগুলো এ লক্ষ্যে “Movement for Deportation of Killer Nur Chowdhury” শীর্ষক আন্দোলন শুরু করেছেন। আমি এজন্য তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আশা করবো অচিরেই কানাডার বাঙালী অধ্যুষিত সবগুলো শহরে এ উদ্যোগ গৃহীত হবে এবং জনমতের ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কানাডার কর্তৃপক্ষ তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে বিচারের রায় কার্যকর করতে সহযোগিতা করবেন। এলক্ষ্যে স্থানীয় ফেডারেল ও প্রাদেশিক মন্ত্রী, এমপি বা সিটি কাউন্সিলরদের প্রতি আপনাদের চাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান নাজাচ্ছি। বাংলাদেশ দূতাবাস এক্ষেত্রে সর্বপ্রকার সহযোগিতা প্রদান অব্যাহত রাখবে।

ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ আজ মর্যাদার সাথে বিশ্ব-দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে আমরা দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ।  তাই ১৫ই আগস্টের শোককে শক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক সূচিত উন্নয়ন কর্মকান্ডকে বেগবান করতে হবে। আসুন আমরা সকলে মিলে একসাথে একটি সমৃদ্ধ, শক্তিশালী এবং অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর বাংলাদেশ গঠনে মনোনিবেশ করি। সেটিই হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পবিত্র আত্মার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন এবং জাতীয় শোক দিবস পালনের সার্থকতা।

জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে আগত অটোয়া ও কানাডার সম্মানিত প্রবাসী ভাই-বোনদের, বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দকে এবং সম্মানিত নেতৃবৃন্দকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আপনাদের সকলের সহযোগিতা নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সূচিত উন্নয়ন কর্মকান্ডকে বেগবান করতে এবং বাংলাদেশের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি।

পরিশেষে আবারো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবাবের শহীদ সদস্যবর্গের সকলের জন্য মহান স্রষ্টার দরবারে প্রার্থনা জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।

ধন্যবাদ।
অটোয়া, কানাডা 





সভাপতির বক্তব্য রাখছেন রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমান

পতাকা অর্ধনমিত করার পর দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ

সুধীজনের একাংশ 

আলোচনা করছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের মাননীয় সদস্য আলী আশরাফ

আলোচনা করছেন বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য বাবু উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত

উপস্থিত সুধীজনের একাংশ

বক্তব্য রাখছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, কানাডা শাখার সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ মাহমুদ মিয়া

উপস্থিত সুধীবৃন্দের একাংশ

বক্তব্য রাখছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, কানাডা শাখার সহসভাপতি তোফাজ্জল আলী 

উপস্থিত সুধীজনের একাংশ