অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
রোহিঙ্গা সঙ্কটঃ বাংলাদেশের ভূমিকা কি সুচিন্তিত - হাসান গোর্কি

 

 

ত ২৪ আগস্ট মায়ানমারে জাতিগত সহিংসতা শুরু হবার পর থেকে পত্র-পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলগুলোতে যে ধরণের মতামত দেওয়া হচ্ছে তার বেশিরভাগ আবেগ থেকে উৎসারিত। এক পক্ষ বলছেন এই অসহায় মানুষদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক। অন্য পক্ষের মত বাংলাদেশ একা কেন এই দায়িত্ব নিতে যাবে! প্রথমে দ্বিতীয় পক্ষের জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়া যাক। কোন দেশ তার প্রতিবেশী বদলাতে পারে না। আমরাও আমাদের প্রতিবেশীর সাথে প্রাকৃতিক- সাংস্কৃতিক- রাজনৈতিক বৈরিতা ও বন্ধুত্বে আবদ্ধ- ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউএনএইচসিআর কর্তৃক পৃথিবীতে সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত রোহিঙ্গাদের বাস মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে যার সীমান্ত আছে আমাদের কক্সবাজার এবং বান্দরবান জেলার সাথে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৯০% বাস করে বাংলাদেশ- মায়ানমার সীমান্তের অদূরে আকিয়াব, রেথেডাং, বুথিডাং, মংডু, কিয়কতাও, মাম্ব্রা, পাত্তরকিল্লা, কাইউকপাইউ, পুন্যাগুন ও পাউকতাউ এলাকায়। আক্রান্ত হলে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ছাড়া তাদের সামনে কোন পথ খোলা থাকে না। একারণে গত ২৫ বছরের বিভিন্ন সময় জাতিগত সহিংসতা থেকে বাঁচার জন্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে থেকে গেছে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী। 

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দায়িত্ব যে বাংলাদেশ একা বহন করছে না কোন অজ্ঞাত কারণে সে কথাটি গণমাধ্যমে আলোচনায় আসছে না। নিরাপদ জীবনের আশায় ভিটেমাটি ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা। শীর্ষ আশ্রয়দাতা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও আছে সৌদি আরব (৪০০০০০), পাকিস্তান (২০০০০০), থাইল্যান্ড (১০০০০০), মালয়েশিয়া (৪০০০০), ভারত (৪০০০০), ও ইন্দোনেশিয়া ( ১২০০০)।  বর্তমানে রাখাইনে বাস করছে ১০ লক্ষ রোহিঙ্গা। এর মধ্যে সরকারি ভাষায় আভ্যন্তরীনভাবে বাস্তুচ্যূত (ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড) এক লক্ষ মানুষ বাস করে সরকারি ক্যাম্পে, যারা ন্যূনতম সুবিধা বঞ্চিত অবস্থায় কার্যত বন্দী দশায় আছে। ইউএনএইচসিআর –এর কক্সবাজার অফিসের হিসেব অনুযায়ী গত কয়েক দিনে ১৮ হাজার শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দেড় হাজারের বেশি শরণার্থীকে আটক করে মায়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অতএব যতটুকু দায়িত্ব বাংলাদেশ নিয়েছে এবং নিচ্ছে তার পুরোটাই প্রান্তিক মানবিক কারণে। যে কোন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উচিত এই মানবিক দায়িত্বটুকু পালন করে যাওয়া এবং অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পুশব্যাক করা থেকে বিরত থাকা।   

সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবিটিও যৌক্তিক নয় সেটা বুঝতে গেলে বৈশ্বিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। মানবিক কারণে বাস্তুহারা অসহায় প্যালেস্টাইনীদের আশ্রয় দিয়েছিল জর্ডান। সেই প্যালেস্টাইনীদের সাথেই বিরোধে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল দেশটিকে। ১৯৭০ সালের ৬ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪ টি বিমান ছিনতাই করে জর্ডানের মরুভূমিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালে পরিত্যক্ত একটা রানওয়েতে অবতরণ করিয়েছিল পিএলও। যাত্রীদের মুক্ত করতে জর্ডান কয়েকটি আরব দেশ এবং পাকিস্তানের সহায়তা নিয়ে যে অভিযানে নামে তা তিন সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে শেষ হয় এবং প্যালেস্টাইনীরা জর্ডান থেকে বিতাড়িত হয়। এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে পিএল-র অঙ্গ সংগঠন “ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর” ১৯৭১-র ২৮ নভেম্বর জর্ডানি প্রধানমন্ত্রী ওয়াসফি আল তাল কে কায়রোতে হত্যা করে। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে তামিলদের বিরুদ্ধে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোয় ক্ষিপ্ত হয়ে ভারতের তামিলনাড়ুতে ’৯১-র মে মাসে আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রাজিব গান্ধিকে হত্যা করে এক তামিল তরুনী যার পিতামাতা শরণার্থী হিসেবে ভারতে এসেছিল। আফগান শরণার্থী্রা পাকিস্তানে গিয়ে তালেবান এবং আইএসআইএস- এর শক্তিশালী শাখা গড়ে তুলেছে এবং বেশ কিছু রক্তক্ষয়ী আক্রমন করেছে। ২০১৪-র ১৬ ডিসেম্বর পেশোয়ারে স্কুলে হামলা করে তেহরিক-ই-তালেবান নামের সংগঠন ১৪৪ জন ছাত্রকে হত্যা করে। ছয় হামলাকারীর একজন ছিল চেচেন, তিনজন আরব এবং দুইজন আফগান শরণার্থী। 

শরণার্থীরা  ছোট বড় কিছু আক্রমন করেছে লন্ডন, বার্লিন, প্যারিস, আঙ্কারা, আর্মসটারডাম সহ বেশ কটি শহরে। বাংলাদেশও এ তালিকার বাইরে নয়। গত বছর ১৩ মে টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতরে শালবন আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে আনসার কমান্ডারকে হত্যা করে ১১ টি রাইফেল এবং প্রচুর পরিমান গুলি লুট করে নিয়ে যায় রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের সদস্যরা। তাদের পাঁচজন পরে র‍্যাবের অভিযানে ধরা পরে। রোহিঙ্গাদের সমস্যা যে দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে সেটা মনে হয় না। ইন্দো-পাক অ্যাগ্রিমেন্ট ১৯৭৩ ও জেস ট্রাইপার্টাইট অ্যাগ্রিমেন্ট অব বাংলাদেশ-পাকিস্তান-ইন্ডিয়া, ১৯৭৪ অনুযায়ী আটকে পড়া পাকিস্তানীদের ফেরত নেওয়ার কথা পাকিস্তানের। কিন্তু চুক্তির এই শর্ত বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ৮১ টি ক্যাম্পে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। পাশাপাশি আমাদের জন্য আর্থিক ও সাংস্কৃতিক বোঝা হিসেবে দীর্ঘদিন টিকে আছে। রোহিঙ্গারাও একই সমস্যা তৈরি করেছে এবং তাদের সংখ্যা বাড়লে তা আরও প্রকট হবে।   

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। “মানবিক আচরন” কূটনৈতিক ভাষা। এখানে যার অর্থ সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টাকারীদের ঠেকাতে বা ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ না করা। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ওআইসি-র সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যোগাযোগ করে পক্ষগুলোর ভূমিকা কামনা করা হয়েছে। মায়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু এর ঠিক এক দিন পর ২৮ আগস্ট রাষ্ট্রদূতকে আবার ডেকে নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে “জঙ্গি বা সন্ত্রাসী”দের বিরুদ্ধে মায়ানমার বাংলাদেশ যৌথ অভিযান চালানোর প্রস্তাব দেয়া হয়। ইয়াঙ্গুনে কর্তব্যরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতও মায়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ে দেখা করে একই প্রস্তাব দিয়েছেন বলে বিবিসি-র বাংলা বিভাগের খবরে বলা হয়েছে। গত বছরও বাংলাদেশ এ ধরনের যৌথ অভিযানের প্রস্তাব দিয়েছিল। এবার স্পষ্ট করে ইসলামী জঙ্গি, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) বা যে কোন সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের বিরুদ্ধে  দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে একটা স্পষ্ট জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে মায়ানমার যেভাবে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন হিসেবে প্রচার করতে চাচ্ছে, আমরা আগ বাড়িয়ে তাতে সমর্থন দিলাম। 

যুক্তি এবং ও নৈতিকতার বিচারে এটা অন্যায়। ইতিহাস থেকে আমরা জানি রোহিঙ্গারাই রাখাইনের ভুমিপুত্রঃ সবচেয়ে পুরাতন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ শতকে কুরুখ নৃগোষ্ঠী এ অঞ্চলে প্রথম বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীতে বাঙালি হিন্দু, ধর্মান্তরিত মুসলমান, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরব ও পাঠানদের সাথে মিলে যে মিশ্র জাতি বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করে বসবাস শুরু করে তারাই রোহিঙ্গা। ১৪৩০ থেকে পরবর্তী সাড়ে তিনশ বছর ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহাঙ্গা একটা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করে ১৭৮৪ সালে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসন পেরিয়ে ১৯৪৮ সালে বার্মার স্বাধীনতার সময় দেশটির অঙ্গরাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী মুজাহিদ পার্টি আরাকানকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে চেষ্টা করে ব্যর্থ হবার পর ১৯৪৮ থেকে ’৬২ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে। জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখল করার পর রোহিঙ্গাদের ওপর যে দমন অভিযান শুরু করেন তা বিভিন্ন মোড়কে এখনও অব্যাহত আছে। 

রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত নয়, সরকারি চাকরি ও পাসপোর্ট পাবার অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। তাদের ভ্রমন, সম্পত্তি ক্রয় ও আন্ত ধর্মীয় বিবাহের অধিকার নাই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে তাদের জন্য বরাদ্দ পৃথিবীতে সর্বনিম্ন। এই বঞ্ছনার বিরুদ্ধে হারাকাহ আল-ইয়াকিন (ইংরেজিতে অর্থ ফেইথ মুভমেন্ট।)আন্দোলন শুরু করে। পরবর্তীতে যা নাম পরিবর্তন করে আরসা হয়। গত ২৯ মার্চ  আরসা’র সর্বাধিনায়ক আতা উল্লাহ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “...এটা দুর্ভাগ্যজনক যে রোহিঙ্গারা এখনো আরাকানের ভেতরে বিভিন্ন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী হয়ে আছে, মানুষ হিসেবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পর্যাপ্ত রসদ ছাড়াই, এবং অন্তহীন ধবংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে তাঁদের পিতৃপুরুষের গ্রাম, প্রার্থনালয়, জনগুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তি, ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর, এর সাথে চলছে নিপীড়ণও। তাই, আমরা (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) এগিয়ে এসেছি আকারানস্থ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে, আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়েঃ আত্মরক্ষার নীতি অনুসারে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যে-লড়াইয়ের অধিকার আমাদের আছে।” প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তাদের আন্দোলনের ন্যায়ানুগতা, কারণ, প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য বর্ণনা করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের উদ্যোগ কামনা করা হয়েছে। 

এই ইতিহাস বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো এটা প্রমান করতে চেষ্টা করা যে ’৭১ সালে আমাদের পরিস্থিতি থেকে বর্তমান রোহিঙ্গাদের অবস্থা ভিন্ন নয় এবং এটা কোন রেডিক্যাল মুভমেন্ট বা সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন নয়। সেসময় ভারত আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্য বা ইচ্ছা বাংলাদেশের না থাকতে পারে। কিন্তু নিকটতম প্রতেবেশী হিসেবে নৈতিক সমর্থন দিতে অসুবিধা ছিল না। যেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে মিয়ানমার সরকারকে পরিচয় যাচাইয়ে একটি সমন্বিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে কফি আনান কমিশন সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সন্ত্রাস দমনের প্রস্তাব দেওয়ার অর্থ কী ? যতদূর আন্দাজ করা যায় এর কারণ আরসা’র পাকিস্তান সংশ্লিষ্টতা। সরকারের ধারণা আরসা শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তার কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং জামায়াত সহ মৌলবাদী সংগঠনগুলো তাতে জড়িয়ে পড়বে। এ আন্দোলন আমাদের জাতীয় রাজনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ভারত ও চীন যথাক্রমে কাশ্মীর ও উইঘুর ইস্যুকে ইসলামী মিলিটেন্সি হিসেবে প্রচার করে থাকে। তারাও রোহিঙ্গাদের আন্দোলনকে “জাতীয়তাবাদী” বলতে রাজী থাকবে না বলেই অনুমান করা যায়। বাংলাদেশের ভুমিকায় এই দুই প্রভাবশালী প্রতেবেশী খুশি থাকার কথা। 

মায়ানমারের কাছে সন্ত্রাস দমনের প্রস্তাব দেওয়ার সময় বাংলাদেশ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে সম্ভবত এ বার্তাটিও পৌঁছে দিতে চেয়েছে যে ইসলামী মিলিটেন্সির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের (অন্য অর্থে বর্তমান সরকারের) অবস্থান জিরো টলারেন্স নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। 

আমরা যেভাবেই চেষ্টা করি রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার সুযোগ নাই। আমাদের নীতি নির্ধারকরা নিশ্চয়ই সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো নিয়ে ভেবেছেন এবং কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন। রোহিঙ্গারা তাদের নিজ দেশে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের অধিকার ফিরে পেলে তা আমাদের জন্য অনেক বড় স্বস্তি বয়ে আনবে। মায়ানমার যে নিকট ভবিষ্যতে আভ্যন্তরীনভাবে এ সমস্যার সমাধান করে ফেলবে সেটা আশা করা যায় না; অন্তত লক্ষণটা সেরকম নয়। তাই সমস্যাটা যখন আমাদের কাঁধে পড়েছে তখন তা সমাধানের বড় উদ্যোগ আমাদেরই নিতে হবে। তবে আবেগ তাড়িত হয়ে এমন কোন ভুল করা যাবে না যার জন্য পরে সমস্যায় পড়তে হয়। উলফা বিদ্রোহীদের জন্য অভয়ারণ্য তৈরি করে আমরা ভারতের সাথে যে বৈরিতা তৈরি করেছিলাম তার খেশারত এখনও আমাদের দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সিদ্ধান্ত ভারত তখনই নিয়ে ফেলেছিল। তারা নিশ্চিত থাকতে চায় যে এমন কোন সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসবে না যারা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী কোন দলকে সমর্থন দেবে। গোপনে তালেবানদের আশ্রয় ও যুদ্ধের রসদ যোগাতে গিয়ে আমেরিকার রোষানলে পড়েছে পাকিস্তান। সন্ত্রাসী নির্মূলের নামে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ইউএসএ এখনও ড্রোন হামলা চালায়। তাই রোহিঙ্গা সংকটে সরাসরি অংশগ্রহন করা বিপদ ডেকে আনতে পারে। সবচেয়ে বড় ভুল হবে মায়ানমারের সাথে যোগ দিয়ে সন্ত্রাস দমন করতে যাওয়া। রোহিঙ্গারা যাতে সশস্ত্র কোন তৎপরতা, মাদক ব্যবসা বা চুরি ডাকাতিতে লিপ্ত হতে না পারে শিবিরগুলোতে কড়া নজরদারির মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা সম্ভব। আপাতত প্রচারনা যুদ্ধ চালানো ছাড়া আমাদের সামনে ভাল কোন উপায় নাই। ’৭১-র সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ইস্যু নিয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনার জন্য ইন্দিরা গান্ধী এক মাসের লম্বা সফরে বের হয়েছিলেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও এরকম একটা মিশন নিয়ে বের হতে পারেন যাতে করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ মায়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে এবং বিশ্বের সবচেয়ে অসহায় জনগোষ্ঠী সম্ভাব্য বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচতে পারে।  

রয়্যাল রোডস ইউনিভার্সিটি, ব্রিটিশ কলম্বিয়া 
hassangorkii@royalroads.ca

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন
গল্পঃ সাম্রাজ্য - হাসান গোর্কি
গল্পঃ দ্ব্যর্থক - হাসান গোর্কি
প্রবন্ধঃ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি সম্পদ ব্যব্যস্থাপনা - হাসান গোর্কি
প্রবন্ধঃ চিরায়ত বলবিদ্যা থেকে অপেক্ষবাদ - হাসান গোর্কি