অটোয়া, শনিবার ১৭ আগস্ট, ২০১৯
অটোয়ায় সাইফুল ওয়াদুদ হেলালের ‘ঝলমলিয়া’ – কবির চৌধুরী


স্বচ্ছ পরিষ্কার নীলাভ পানির উপরে ভেসে থাকা অসংখ্য শাপলা ফুল, পানির নীচে চিংড়ি মাছ, খইয়া মাছ, পুটি মাছের নির্ভয় চলাফেরা, গ্রামের সহজ সরল মহিলা-ছোট ছোট ছেলেমেয়ে-পানিবিক্রেতাসহ সকলের এলোমোনিয়ামের কলসী, প্লাস্টিকের বোতল ভরে পানি নেয়া, বিকেল হলে গ্রামের মহিলাদের দিঘীর পাড়ে এক হয়ে সুখ-দুঃখের কথা বলা হল হুড়কার আশ-পাশের অসংখ্য মানুষের সুপেয় পানির একমাত্র ভরসা ‘মা ঝলমলেশ্বরী’র স্বাভাবিক রূপ। আমাদের কাছে স্বাভাবিক এই রূপটিকেই অসাধারণভাবে ক্যামেরাবন্দী করে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল নির্মাণ করেছেন প্রামাণ্যচিত্র ‘ঝলমলিয়া’। গত ১০ সেপ্টেম্বর অটোয়ার প্রেস্টিজিয়াস ‘মে ফেয়ার’ থিয়েটারে দেশ-বিদেশে আলোচিত এবং প্রশংসিত হেলালের এই পুরস্কার বিজয়ী প্রামাণ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হয়। ছয় বছরে ধারণকৃত বাস্তব জীবনের খণ্ড খণ্ড ঘটনার কিছু ভিডিও চিত্রের মধ্যে এমন কি ছিল যে, অনেকের মত আমিও অধীর আগ্রহে ছিলাম – প্রামাণ্যচিত্রটি দেখবো বলে।        

বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার হুড়কা গ্রামের ঝলমলিয়া দিঘী এবং তার আশ-পাশের সাধারণ মানুষের জীবন যাপনই ‘ঝলমলিয়া’ প্রামাণ্যচিত্রের কাহিনী। ২০০৯ সালে বন্ধু সনাতন বিশ্বাসের মৃত্যুবাষিকী উপলক্ষে আয়োজিত মেলাতে গিয়ে নির্মাতা সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল এলাকাটির প্রেমে পড়ে যান। সদ্য ঘূর্ণীঝড় ‘আইলা’ আক্রান্ত উপকুলীয় অঞ্চলটির মানুষের জীবন-যাপন তাঁকে প্রচণ্ডভাবে আকৃষ্ট করে। আমার সাথে এক আলাপে হেলাল বলেন – ‘এলাকাটিতে যাওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, আমি আমার হারানো ঠিকানায় ফিরে এসেছি। আমি স্বন্দীপের মানুষ। আমিও এদের মত ভিটা ছাড়া- বাস্তু ছাড়া। তাইতো সেখানে আমি বারে বারে ফিরে গিয়েছি’। সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল প্রায় ছয় বছর সময় নিয়েছেন এই প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরিতে। আমরা যদি ‘ঝলমলিয়া’কে খুব ভালভাবে দেখি তাহলে দেখতো পাবো- সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল কত ঘনিষ্ঠ এবং নিবিড়ভাবে আইলা পরবর্তী ছয় বছর হুড়কা গ্রামের মানুষ, মানুষের জীবন-যাপন পর্যবেক্ষণ করেছেন। বাংলাদেশে ‘ঝলমলিয়া’ নিয়ে জুরিবোর্ডের নিম্নের মন্তব্যটিই তার যথার্থতা প্রমাণ করে।     

Jury Citation - ISIFF'16

'Jholmolia - The Sacred Water by Saiful Wadud Helal is a unique visual journey depicting the vigor of folkways of life and its day to day negotiations. Its history evolves from the myths while its reality has got a spectrum of epic formality.

Jholmolia - The Sacred Water opens up the opportunity of viewing the film in multiple layers. Saiful Wadud Helal's metropolitan mind falls fatally in love with the beauty of the village Hurka and the miracle pond Jholmolia. His camera creates visual totems of marginalized people of this village in Bangladesh and evolves an engaging and thought provoking narrative. In another layer, his narrative deals with his personal rootlessness and looks for solace in the timeless tranquility of Hurka. Alienation, struggle for survival against heavy odds, commodification and man-made tragedies are becoming part of Hurka the people survive using the strength derived from their closeness with nature and tradition.

Saiful Helal immerses into the life of Hurka with compassion and concern. His camera posits itself as a dedicated observer, as if an extension of the everyday rituals of Hurka. The vivacity of the characters and rough edges of realities make all these harmonized.

The jury of the International Competition (Documentary) is happy to announce Saiful Wadud Helal's film Jholmolia - The Sacred Water as the Best Documentary Film.'       

সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল এমন এক সময় এই প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন যখন পুজিবাদী বিশ্বের আধিপত্য বিস্তারের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চুড়ান্ত পর্যায়ে। মানুষের মধ্যে জাতিগত হিংসা-বিদ্বেষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে খুন করতে বিন্দুমাত্র চিন্তা করে না। কিন্তু সাইফুল ওয়াদুদ হেলালের ‘ঝলমলিয়া’ দেখলে আপনার সেই অনুভূতি হারিয়ে যাবে। হেলাল খুব সাহসিকতার সাথে প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের খুব বাস্তব কিছু বিষয়কে আমাদের সামনে তুলে এনেছেন। যেমন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যার অন্যতম কারণ নদী ভরাট। সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল গ্রামের অর্ধশিক্ষিত মানুষগুলোর মুখ থেকে বের করেছেন- নদী ড্রেজিং এর নামে সরকারী পরিকল্পনায় অর্থহীন অপচয়ের তথ্য, ফারাক্কা বাধের কারণে একটি জনপদের দুঃখ-দুর্দশার কথা এবং মাছের চাষের জন্যে তৈরি ঘের। যেমন একটি নারী চরিত্রের উক্তি-‘নদীর গভীরতার জন্যে খননের দরকার নেই, ঘেরগুলো ভেঙ্গে দিলেই হলো।’  

মারাত্মক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন বর্তমানে ভূলুন্টিত অসাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে - ‘ঐ দিকে নদীর কোনায় আমরা ছয় ঘর হিন্দু, আর এক ঘর মুসলমান ছিলাম’ ‘এই ঝলমলিয়া দিঘীটি আমাদের সবার কাছেই পবিত্র’ ‘আল্লাহ আর ভগবান একই’ ‘অনেকেই আমাকে বলে তুমি মন্দিরে যাও কেন’ ‘আমি বলি মন্দির আর মসজিদ একই তো’ অর্ধশিক্ষিত গ্রামের এই মানুষগুলোর কি দার্শনিক কথাবার্তা।           

এক ঘণ্টার এই প্রামাণ্যচিত্রটিতে সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল গ্রাম-গঞ্জের সহজ-সরল-সাধারণ মানুষের সবিকছুই অত্যন্ত সার্থকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের বিশ্বাস, তাদের আস্তা, বিশেষ করে ‘মা ঝলমলেশ্বরীর’ অলোকিকতায়। ‘যেকোন বিপদে আপদে আমরা ‘মা ঝলমলেশ্বরীর’ কাছে যাই।’ আবহ বাংলার মানুষ যে খুব অতিথিপরায়ণ আর আবেগ প্রবণ তাও হেলাল দক্ষতার সাথে দেখাতে পেরেছেন- ‘দুই দিদি আসলে পরে  মোরগটি জবাই করার কথা ছিল, দিদিরা এসেছিলেনও কিন্তু ঝগড়া করে একজন চলে যান। সেই জন্যে আর মোরগটি জবাই করা হয় নি।’ এছাড়া বৃষ্টি বাদলা দিনে কৈ মাছের উজান বেয়ে ডাঙ্গায় উঠে যাওয়া এবং পরে তার আসল গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা,  হাওড়, বা নদীতে দেয়া বাধ ভেঙ্গে যাওয়ার পর সেখানে জাল পেতে মাছ ধরার সেই চিরাচরিত নিয়ম। এমনিভাবে বাংলার গ্রাম-গঞ্জের বিয়ে বাড়ির মন্ডপ থেকে শুরু করে গ্রামের চায়ের দোকান, গ্রামের নিষ্পাপ মহিলার সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর কিছু শান্তির আশায় ঝলমলিয়া দিঘীর পাড়ে যাওয়ার জন্যে উন্মুখ হয়ে থাকা শতেক রকম কাহিনী ক্যামেরাবন্দী করেছেন হেলাল। তার ক্যামেরায় বন্দি হয়েছে ছোট ছেলেমেয়েদের সারল্য ও জানার ব্যাকুলতা। সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল যখন পুরাতন কিছু ছবি দেখাতে হাতে থাকা স্মার্ট ফোনটি ওপেন করেন তখন সেই ছোট মেয়েটির চোখমুখে কি নির্মল আনন্দ আর অভিব্যক্তি- ‘এই দেখ আমার বড় বু’। সাইফুল ওয়াদুদ হেলালের এই প্রামাণ্যচিত্রের প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ এবং প্রতিটি ভিডিও ক্লিপ দ্বারা একেকটা গল্প লেখা যায়। শহুরে মানুষের কাছে প্রামাণ্যচিত্রের অনেক কিছু দুর্বোধ্য ঠেকলেও সুনামগঞ্জের হাওড় পাড়ের মানুষ হিসেবে নির্দ্বিধায় লিখতে এবং বলতে পারি সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল যে উদ্দেশ্য নিয়ে ঝলমলিয়া তৈরিতে হাত দিয়েছিলেন সেই উদ্দেশ্য হাসিল হয়েছে। তিনি তাঁর শেকড়ের সন্ধান পেয়েছেন এবং আমার মত অনেক শেকড়হীন মানুষের কাছে তা সফলভাবে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন। ঝলমলিয়া গ্রামে ছয় বছরে সংগৃহিত বাস্তব জীবনের খণ্ড খণ্ড গল্পগুলো দেখতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, আমি নিজেই নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখছি। সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আমাকে তাঁর স্বপ্নপুরী ঝলমলিয়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এখানেই ঝলমলিয়ার সার্থকতা।  

জয় মা ঝলমলেশ্বরী।             
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৭
অটোয়া, কানাডা