অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
বাঙালির পরম বন্ধু ফাদার মারিনো রিগন - ইরানী বিশ্বাস

 

হুমুখী কাজের সফল ব্যক্তিত্ব। যিনি শিক্ষকের শিক্ষক। অভিভাবকের অভিভাবক। কর্মমুখরতায় উদ্ভাসিত যার প্রতিটি মূহুর্ত। বিপুল কর্মগুণের ভান্ডারসমৃদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি আমাদের পরম বন্ধু ফাদার মারিনো রিগন।
১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রয়ারি ইতালির ভেনিসের অদুরে ভিল্লাভের্লা গ্রামে জন্মেছিলেন রিগন। বাবা রিকার্ডো (রিচার্ড) একজন কৃষক ও মা ইতলিযা মানিকা ছিলেন একজন শিক্ষিকা। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সকলের বড়। মায়ের কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের পর ১৯৩১ সালে স্কুলজীবন শুরু হয়। ৬ষ্ঠ শ্রেনী পর্যন্ত নিজ গ্রামের অদুরে একটি শিক্ষা নিকেতনে পড়ালেখা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে মিশনারি সংস্থায় যোগদান করেন। এবং সংস্থা পরিচাতি বিভিন্ন বিদ্যা-প্রতিষ্ঠানে ধর্মতত্ত্বসহ স্নাতক ও স্নতকোত্তর শিক্ষা অর্জন করেন। কৃষক পরিবারে জন্ম হলেও তিনি বেড়ে ওঠেন সংস্কৃতি পরিমন্ডলে। মারিনোর বাবা মঞ্চ নাটক করতেন। মাঝে মাঝেই তিনি বাবার সাথে যেতেন। একবার তিনি বাবার সাথে গিয়েছিলেন নাটক দেখতে। সেখানে প্রভু যিশুর জীবনী নিয়ে নাটক মঞ্চায়িত হয়েছিল। আর প্রভু যিশুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মারিনোর বাবা। নাটকে প্রভুর কর্মকান্ড দেখে তিন অভিভূত হয়েছিলেন। তখন থেকে তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, বড় হয়ে ধর্ম যাজক হবেন।
ধর্ম যাজক হলেও তারা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না কে কোথায় কি কাজ করবেন। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন ধর্মগুরুজনরা। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মারিনোকে বাংলাদেশে আসতে হয়েছিল। বাংলাদেশে এসে তিনি ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি জনকল্যানমুলক কাজে অংশ নেন। এরই ধারাবাহিকতায় খুলনার শেলাবুনিয়ায় সেন্ট পলস হাসপাতাল সম্পন্ন করেন। ফাদার রিগান শেলাবুনিয়ায় আসার আগে, এ হাসপাতালটি নির্মান কাজ শুরু করেন রেভা.ফাদার ফ্রান্সিস তোমাজেল্লি। কিন্তু সম্পন্ন হওয়ার আগেই তিনি এখান থেকে বদলি হয়ে যান। এবং রিগান বাকি কাজ সম্পন্ন করেন। এ হাসপাতালে তিনি নিজের উদ্যোগে অপারেশন থিয়েটার ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করেন। হাসপাতালের বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। হাসপাতালে দিবা-রাত্র চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে ডাক্তারদের আবাসন ব্যবস্থাও তিনি করেন। ফাদার মারিনো রিগন বাংলাদেশে এসে শুধু মাত্র ধর্ম প্রচার করেননি। তিনি বাংলা সাহিত্যকে পৌছে দিয়েছেন ইতালি, স্পেন ও আরো অনেক দেশে। রিগনের এই বর্নময় কর্ম নিয়ে আলাপচারিতার কিছু অংশ তুলে ধরা হল।

*বাংলাদেশের কোন দিক গুলি আপনার ভালোলাগে। এবং কোন দিকগুলি ভাল লাগেনা।
বাংলাদেশের মানুষ অনেক অতিথিপরায়ণ। আর এখানে অনেক শিল্প আছে। মানুষের মনে কষ্ট থাকলেও তারা আনন্দ করতে ভালোবাসে। তারা গান গায়, নাচে এটা আমাকে খুব আনন্দ দেয়। আর মানুষ একে অন্যকে নাম ধরে ডাকে না। তারা সম্পর্ককে অনেক প্রাধান্য দেয়। যেমন দাদা, দিদি, কাকা, কাকি এসব বলে পরিচয় করায়। এটা খুবই ভাল লাগে। তবে যখন দেকি পুরুষরা অন্যায় করেও নিজের ওপর দোষ নিতে চায় না। স্ত্রীর ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়, এটা আমাকে খুবই কষ্ট দেয়। এছাড়া এদেশের অধিকাংশ মেয়েরা জীবনের সাথে অভিনয় করে। তারা সংসারের সত্যিটা স্পষ্ট করে তুলে ধরতে পারে না। বাংলাদেশর দারিদ্রতা আমাকে ভীষন কষ্ট দেয়। আমি যখন প্রথম এদেশে আসি তখন এখানে তেমন রাস্তাঘাট ছিল না। একবার আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। তখন মংলায় ভাল ডাক্তার ছিল না। আমাকে খুলনা নেয়া হয়েছিল। চিকিৎসার এই দৈন্যতা আমাকে পীড়া দিয়েছিল।

*বাংলা সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হলেন কি করে?
ছোটবেলা থেকে আমার সাহিত্যের প্রতি ঝোক ছিল। বাংলাদেশে বসবাস করার কারনে আমাকে বাংলাভাষা শিখতে হয়েছে। তাই কাজের ফাকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম। রবীন্দ্রনাথের পন্ডিত মশাই আমার প্রথম বাংলা বই পড়া। তখনো ভাল বাংলা বুঝতাম না। তবুও এ বইিিট পড়ে আমার খুব ভাল লেগেছিল। বলা যায়, এ বইটি আমাকে বাংলা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের জন্ম দিয়েছে। তারপর একে একে রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ বই পড়ে ফেলি। যতই তার বই পগিড় ততই যেন তার প্রতি আমার অনুরাগ বেড়ে যায়। এই অনুরাগের সূত্র ধরে আমি ১৯৬৪ সালে ইতালিয়ান ভাষায় গীতাঞ্জলী অনুবাদ করি। আর এটাই কোন বাংলা কাব্যগ্রন্থ যা ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে। বইটি বেশ প্রশংসিত হয়। এর পর একে এসে রবীন্দ্রনাথের ৪০ বই ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করা হয়। আমি রবীন্দ্রনাথের নৈবেদ্য গ্রন্থ স্প্যনিশ ভাষায় ও চিত্রা গ্রন্থটি পতুগীজ ভাষায় অনুবাদ করি।

*বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে আপনার নিজস্ব ধারণা কি?
বাংলাদেশে এসে আমি যতটা দিয়েছি তারচেয়ে পেয়েছি অনেক বেশি। এই পাওয়ার মধ্যে বড় পাওয়া হলো বাংলা সাহিত্য। এ সাহিত্যের গভীরে প্রবেশ কওে মেধা ও মননে পুষ্ট হয়েছি। তবে সবচেয়ে বেশি তুষ্ট হয়েছি রবীন্দ্র সহিত্যে। এর কারণ দুটো, একটা আত্মিক, অন্যটি বাহ্যিক। তার সাহিত্য পড়ে আমার মনে হয়েছে তিনি যা কিছু লিখেছেন তা কোন না কোন ভাবে প্রেম সম্পর্কিত।
এ প্রেম কখনো মানবিকম কখনো ঐশ্বরিক। যদি কেউ মনে কওে সাধারণ নর-নারীর প্রেমের কথা রবিন্দ্রনাথ লিখেছেন তবে তাই। আবার কেউ যদি মনে কওে এটি কেবলই ঈশ্বরকে বন্দনা করেছেন তবে তাই। রবিন্দ্র রচনাতে আমি এতটাই মগ্ন যে, এ যাবত ৪০ টি গ্রন্থ ইতালিয় ভাষায় অনুবাদ করেছি। এছাড়া জসীম উদ্দিন, শরৎ চন্দ্র, লালনের গ্রন্থ অনুবাদ করেছি।

*আপনি শুধু সাহিত্যই নয়, সমাজ সেবায় নিয়জিত প্রান। সে সম্পর্কে একটু বলবেন? 
সব অঞ্চলেই কিছু লোক থাকে যারা বাস্তুহারা। তাদের সহায় সম্বল এমনকি বাস্তুভিটা পর্যন্ত থাকে না। এসব মানুষদের জন্য আবাসন প্রকল্পের আওতায় জায়গা কিনে পরিবার প্রতি ৫/১০ কাঠা করে বরাদ্দ করা হয়েছে। অনেক পরিবারকে ঘর তুলে দেয়া হয়েছে। বিধাব  ও স্বামী পরিত্যক্তাদের জন্য বিশেষ আবাসন প্রকল্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব মহিলাদের জন্য আরসিসি পিলার দিয়ে টিনের ঘর তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও পুরষের পাশাপাশি মহিরাদের উপর্জনক্ষম করার জন্য সেলাই কেন্দ্র চালু করা হযেছে। 

*আপনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলবেন?
১৯৭১ সালে আমি গোপলগঞ্জের বানিয়ারচরে ছিলাম। আমি দেখেছি এ সময় বাংলাদশেল মানুষের ওপর পাকিস্তানি হানাদারবাদের অমানুষিক নির্যতনের স্মৃতি। ৩ এপ্রিলের কথা । খুলনা থেকৈ লঞ্চযেগে প্রানভয়ে শরনার্থীরা এদিকে আসছিল। কিনউ এ লঞে।চ কোন পতাকা ছিলনা। এ করনে ছাত্র-জনতা চিৎকার করে ভর্ৎসনা দিচ্ছিল। তখন আমরা সউথনিয যোগেশের দোকান থেকে একটি পতাকা কিনে লঞ্চে পাঠাই। পরের দিন আমাদের জাভেরিয়ান ফাদার মারিও ভেরনেসি যশোহরে দুজন পাকসেনাদের হাতে নিহত হন।
এভাবে অনেকদিন কেটে গেল। নানা সমস্যা, ভয়, অস্থিরতা কাটিয়ে অবশেষে এল ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখ। বিকালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করার মাধ্যমে বিজয় ঘোষিত হয়। ১৭ তারিখ সকালে মুক্তিবাহিনীর একটি লঞ্চ নদীপথে টেকেরহাট থেকৈ গোপালগঞ্জে যাচ্ছিল। লঞ্চে পত পত করে উড়ছিল স্বাধীনতদেশের পতাকা। আমাদের নদীঘাটে বাঁধা লঞ্চের গুটানো পতাকা মেলে দিলাম মুক্ত আকাশে। আর লঞ্চটির নাম দিলাম মুক্তবাংলা। বিকালে ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল আমাদের মাঠে মিলিত হল। তারা সারিবদ্ধ হয়ে কুচকাওয়াজ, ফাঁকা গুলি করে বিজয়ের অনন্দ প্রকাশ করল। মাঠে সেদিন শত শত লোক সমাবেত হলে। তারা আমাকে কিছু বলতে বলল। আমি সেদিন কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার সেই লাইন আবৃত্তি করলাম- ‘বল বীর বল উন্নত মম শির।’ সেদিন থেকে সার্বভৌম রাষ্ট্রে বানিয়ারচর ধর্মপল্লীতে নতুন ভঅবে যাত্রা শুরু করলাম। 

*আপনিতো জসিম উদ্দিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার সঙ্গে কাটানো গুরুত্বপূর্ণ কোন মুহুর্তেও কথা বলুন।
আমি জসিম উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে প্রায়ই তার বাড়িতে যেতাম। তিনি ছিলেন অনেকটা খামখেয়ালি মানুষ। একদিন হঠাৎ তিনি আমাকে বলণেন, ফাদার আপনি কামাল হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন? কামাল হোসেন ছিলেন তৎকালিন সরকারের ফরেন মিনিস্টার। তার সঙ্গে দেখা করলাম। আবার আরেক দিন তিনি বললেন, চলেন শেখ মুজিবরের সঙ্গে দেখা করে আসি। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। যেতে যেতে জসিম উদ্দিন বললেন, পাঁচ মিনিটের বেশি সময় দেবেন না শেখ মুজিব। আমি বললাম এতেই হবে। আমরা গণভবনে গেলাম।

  জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সাথে ফাদার মারিনো রিগন

সেদিন শেখ মুজিব সবাইকে বিদায় দিয়ে আমাদেও ভিতরে ডাকলেন। গিযে দেখি পুলিশ নেই, কোন পাহারা নেই, শুধু আমরা তিনজন। আমি শেখ মুজিবকে বললাম, আপনি এখানে আছেন কিন্তু কোন পাহারা নেই। যেকোন সময় বিপদ আসতে পারে। আপনাকে কে রক্ষা করবে?  উত্তরে তিনি বললেন,  আমি প্রস্ত্তুত। যদি আমাকে মারতে চায় বুক পেতে দেব। আমি বাংলা স্বাধীন করেছি ব্যস। আমার কোন আপসোস নেই। মরলে মরব। সেদিন আমারা প্রায় এক ঘন্টা শেখ মুজিবরের সাথে গল্প করেছিলাম।

*জীবনের অধিক সময় বাংলাদেশে কাটিয়ে গেলেন। বাকি সময়টা কোথায় কাটাতে চান?
আমার জীবনের প্রায় অধিকাংশ সময় বাংলাদেশে কাটিয়েছি। এ দেশের সঙ্গে আমার প্রানের সম্পর্ক রয়েছে। একবার আমার হার্ট অপারেশন হয়েছিল। তখন চিকিৎসার জন্য আমাকে ইতালিতে নেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ছেড়ে যখন আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমার আত্মীয়-স্বজন ও ডাক্তারকে বলেছিলাম, আমার কোন দুর্ঘটনা হলে আপনারা আমার লাশ বাংলাদশে পাঠাবেন। বাংলাদেশের মাটিতেই যেন আমার শেষ ঠিকানা হয়। তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়ে তবে আমি বাংলাদেশ ছেড়ে ইতালি গিয়েছিলাম।

জীবনের সবটুকুই তিনি ব্যয় করেছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কল্যানে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত। একজন ধর্মযাজক হলেও তিনি শুধু ধর্ম বিস্তারে সীমাবদ্ধ নেই। তিনি অসংখ্য ভাল কাজ করেছেন। তাই তিনি এ পর্যন্ত অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। কবি জসীম উদ্দিন একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’৮২,  ভেনিসের লায়ন্স ক্লাব পুরস্কার-৮৪, ড. রবার্ট ডব্লিউ পিয়াসের ম্যান অব দ্যা ইয়ার-৯৫, ইতালির অলিম্পিক একাডেমি পুরস্কার-৯৯, ভেচেন্স নাগরিক সম্মাননা-৯৭, ইতালির মারিয়েলে ভেস্ত্রে পুরস্কার-২০০২, খ্রিস্টীয় যোগাযোগ কেন্দ্র সম্মাননা পদক ২০০৩ ও বাংলাদেশে নাগরিক সম্মাননা-২০০৯
ফাদার মারিনো রিগন গত ২০ অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ইতালিতে।

ইরানী বিশ্বাস
ঢাকা, বাংলাদেশ


লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন
প্রবন্ধঃ অগ্নিবীনায় বাজে নজরুলের সুর - ইরানী বিশ্বাস