অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
আমাদের কয়েকবার দেখাও হয়েছিলো - রাজিউল হোদা দীপ্ত

হুমায়ূন আহমেদ এর সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ২০০৮ সালে। রাজশাহীর নগর ভবনে একটা বইমেলার আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ১৬ জন সদস্য সম্পন্ন কমিটিতে আমাকে রাখা হয়েছে। আমার পোস্টের নাম আহবায়ক। সেই সূত্রানুসারে, ঢাকা আসতে হয়েছে আমাকে। উদ্দেশ্য, কয়েকজন বিশিষ্ট লেখককে আমন্ত্রণ জানানো সেই বইমেলায়। এই আমন্ত্রণ মানে “আসবেন, ধন্যবাদ” বলে চলে আসা নয়। এই আমন্ত্রণ হচ্ছে, টেনে হিঁচড়ে উনাদেরকে রাজশাহী নিয়ে আসা। কমিটির সভাপতি সাহেব আমাকে এমন করেই ব্যাপারটা বুঝালেন।

আমি ঢাকার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালাম। অস্থায়ী পাড়ি। না আমার কোনো গল্পের বই বের হয়েছিলো তখন, না আমি সুপরিচিত ছিলাম আর না উইকিপিডিয়ায় আমার নাম ছিলো। আমাকে এমন সৌভাগ্যময় অথচ কঠিনতর কাজ দেওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত যাওয়ার একটা সুযোগ আমার ছিলো। উনার বাসা দখিন হাওয়ার সেই সময়ে কেয়ারটেকার ছিলেন জামশেদ সাহেব। জামশেদ সাহেব, আমার এক প্রকারে দুলাভাই ছিলেন/আছেন। দুলাভাইতো বিভিন্ন প্রকারের হয়। উনি ছিলেন regional জামাই। আমাদের দেশে হয় না, বিভাগীয় দুলাভাই? উনি তাই ছিলেন। উনার ওয়াইফ উম্মে হাফসার পাশে বসে আমি HSC পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সেই থেকে, তার পরিবারের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। ২০০৬ সালে জামশেদ ভাই হুমায়ূন স্যারের বাসার কেয়ারটেকার হন, আর এই বছরেই তাদের প্রেমের সম্পর্ক বাসায় মেনে নেয়। কুমিল্লা আর রাজশাহী, বিয়ের আনন্দে মেতে উঠে। তবে, এমন সম্পর্ক মেনে নেওয়ার পেছনে যে জামশেদ ভাইয়ের এক বিশেষ ব্যক্তির বাড়িতে কর্মরত হওয়ার বিষয়টা কার্যকরী ছিলো তাতে আমার সন্দেহ বিন্দুমাত্র নেই।

আমি জামশেদ ভাইকে ঢাকা যাবার আগে ফোন দিলাম। উনি বললেন, ২৮ তারিখ সন্ধ্যা ৭টা। আরো বললেন, যাবার সময় যেনো পেট খালি করে যাই। তারপর, ফোন কেটে দিলেন। আমি একটু ভড়কে গেলাম। জামশেদ ভাই স্বল্পভাষী কিন্তু ভালো হিউমার সম্পন্ন। উনি কি মজা করলেন? নাকি, সেদিন স্যারের বাসায় কোনো অনুষ্ঠান? যদি, সেটা হয়ে থাকে উনি কেনো সেদিন এক আউটসাইডারের সাথে দেখা করবেন?

সাত-পাঁচ ভেবে, আমি বাসায় উপস্থিত হলাম। না, মেহমান আগমনের কোনো চিহ্ন নেই। দারোয়ানকে বললাম, জামশেদ ভাইয়ের কাছে এসেছি। হুমায়ূন স্যারের কাছে এসেছি বললে, উনি পাক্কা বলতেন স্যার তো বাসায় নেই। বিখ্যাত বা সুপিরিয়র ব্যক্তিদের employeer দের এই এক সমস্যা। বাসায় গেলে বলে, বাসায় নেই। অফিসে গেলে বলে, উনি মিটিংয়ে।

জামশেদ ভাই বেরিয়ে এসে, আমাকে ভেতরে ঢুকিয়ে নিলেন। বললেন, “স্যার মাটিতে বসে আছেন। ঢেঁড়স সিদ্ধ আর চা খাচ্ছেন। তুমি মাটিতে গিয়ে বসবে। তারপর, বাকিটা তোমার হাতে।” উনি আমাকে যতটা সহজভাবে এইসব বলছিলেন, এতো সহজভাবে সেইসব আমার কানে ঢুকছিলোনা। দৌড়ে পালাতে চাইছিলাম আমি। যাই হোক, এখন তো আর পালাতে পারি না।

দোতলায় গেলাম। দেখলাম, চকচকে মোজাইকের উপর হাত কাটা ফতুয়া পরিহিত স্যার বসে আছেন। চোখে সোনালী চশমা, আর পাশে চা। একটা স্টেইনলেসের বাটিতে কিছু একটা রাখা। সত্যি বলতে, আমি ঢুকেই এমন কিছু একটা দেখবো বিশ্বাস করিনি। ভেবেছিলাম, এক কাজের লোক এসে আমাকে বসতে বলবে। স্যার হয়তো ডাইনিং টেবিলের কাছে বসে এইসব খাবেন। কিন্তু, না। আমি জামশেদ ভাইয়ের কথামত নিচে বসলাম। জামশেদ ভাই, আমার সাথে এখন নাই। উনি দুনিয়া উদ্ধার করার কাজে নিয়োজিত। স্যার মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছেন। হয়তোবা, খেয়ালী মানুষ আমাকে লক্ষ্য করেন নিই। উনি হাতে একটা মেন্যুস্ক্রিপ্ট চেক করছেন। আমি বসতেই বললেন, “তুমি আসেছো? আবার বসেও গেছো? স্যান্ডেলটা পড়েই ঢুকতে।” উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন। আমি সালাম দিয়ে বললাম, “না, স্যার। এইটা ভদ্রতা।” উনি স্টেইনলেসের বাটিটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “নাও ঢেঁড়স খাও, সিদ্ধ।” আমি কি করবো বুঝতে পারছিলামনা। বাটি নিলাম আমার হাতে। উনি একটা ছেলেকে ডেকে বললেন, “এক বাটি লবণ দাও।” আমি খাচ্ছিনা, বাটি নিয়ে বসে আছি। হুমায়ূন স্যার মেনুস্ক্রিপ্ট চেক করাতে মনোযোগী হলেন।

ছেলেটা লবণের বাটিটা আমার দিকে এগিয়ে দিলো। স্যার বললেন, “সিদ্ধ জিনিস সবাই লবণ ছাড়া খেতে পারে না। এবার খাও। আর বলো, কি কাজ?” আমি একটা ঢেঁড়স হাতে নিয়ে বললাম, “স্যার, আসলে রাজশাহীতে একটা বই মেলা হতে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন বিশিষ্ট লেখকদের আমরা আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। তাই, আপনার কাছে আসা।” হুমায়ূন স্যার বললেন, “আর কারা যাচ্ছেন?” আমি বললাম, “শামসুর রাহমান আছেন, হেলাল হাফিজ আছেন, ইমদাদুল স্যার আছেন। তবে, আমি আপনার কাছেই আগে এসেছি স্যার।” স্যার উপরে তাকিয়ে বললেন, “হুম, বুঝলাম।”

আমি বললাম, “স্যার, ২২ নভেম্বর হবে উদ্বোধনী।” স্যার বললেন, “আমি শেষের দিনে আসি। শেষের দিনে মানুষ বেশী আসে।” আমি বললাম, “তাহলে স্যার শেষের দিনেই ফিক্স করি ২৯ নভেম্বর।” “বসো, আসছি,” বলে তিনি উঠে গেলেন। আমি রুমটার দিকে তাকানো শুরু করলাম। একটু গা ছাড়লো আমার। একটা ঢেঁড়স মুখে ঢুকালাম। বই আর বই। এক পাশে সিডির র‍্যাক। একটা টেবিল। বারান্দা আছে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে, ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখতে চাইলাম। আনন্দিতও যে কতটা হয়েছিলাম, সেটা বলার উপায় নেই। কিন্তু, পাশে পরিচিত কেউ ছিলোনা তাই আনন্দ প্রকাশ করতে পারছিলামনা। আমার আনন্দঘন মূহুর্ত প্রকাশ করতে পাশে একজন পরিচিত মানুষ থাকা লাগে। স্যার ঢুকলেন।

আমি এইবার একটু ইতস্তত। কাঁচুমাচু হয়ে উনাকে বললাম, “স্যার, একটা আবদার আছে। শামসুর রাহমান স্যার তো সবসময় সব জায়গায় যেতে চাননা। আপনি যদি উনাকে একটু বলতেন, তাহলে ভালো হতো।” স্যার একটু চিন্তা করে বললেন, তুমি বই মেলা কমিটির কোন দায়িত্বে আছো?“ আমি বললাম, "স্যার, আমি আহবায়ক হিসেবে আছি।” স্যার বললেন, “আহবায়কের কাজ, আহ্বান করা। তুমি দেখি, রিকুয়েস্ট করছো। আচ্ছা, আমি বলবো উনাকে।” আমি ভেতরে ভেতরে একটু শান্তি আর কষ্ট উভয়ই পেলাম। শান্তি, কারণ আমার কান গরম। ভয়টা চলে গেছে এবং আলোচনা শেষ। কষ্ট, কারণ আলোচনা শেষ এইবার উঠার পালা। আমি হুমায়ূন আহমেদের সামনে এতোক্ষণ ছিলাম আর খুব সহজে উনাকে রাজী করাতে পেরেছি এফোর্ট ছাড়া। এইবার সভাপতি পদ নিশ্চিত।

উনি হাতের লিখাটা রাখলেন, তারপর বললেন, “রাজশাহী এখন কেমন আছে?” আমি বললাম, “ভালো, স্যার।” উনি বললেন, “আমি কিন্তু রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের আন্ডারে পরীক্ষা দিয়েছিলাম।” আমি বললাম, “জানি, স্যার। আপনি মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন।” স্যার বললেন, “ব্যাপারটা ঠিক হয় নিই।” আমি বললাম, “মানে, স্যার?” “মানে, হচ্ছে দ্বিতীয় হওয়ার ফলে আমাকে সবাই দুই নাম্বার বলা শুরু করলো। মনে আছে, সবার বাসায় যখন এই খুশিতে মিষ্টি দিতে যাবো আম্মা বললেন, "ছেলে দুই নাম্বার হয়েছে, মিষ্টির প্যাকেট একটা হবে কেনো?” তারপর, দুইটা করে মিষ্টির প্যাকেট দেওয়া হলো। আমি এখন চিন্তা করি, যে দশম হয়েছিলো তার কি অবস্থা ছিলো?“, উনি বললেন। আমি একটা হাসি দিলাম তারপর বললাম, "স্যার, শেষবার কবে রাজশাহী গিয়েছিলেন। স্যার বললেন, "মনে নাই। তবে, এই বয়সে উপলক্ষ ছাড়া রাজশাহী যাওয়া ঠিক না। মানুষ তো রিটায়ার্ড করার পর, শান্তি খুঁজতে রাজশাহী গিয়ে বসবাস করে। আমার তো রিয়ার্টডনেস নাই।” আমি হাসলাম তারপর বললাম, “নতুন কি লিখছেন?” হুমায়ূন স্যার বললেন, “নতুন বই। নাম কি ঠিক করেছি শুনবা? How to make a cup of শান্তি।” আমি বললাম, “পড়বো, স্যার।” স্যার বললেন, “বসো, আসছি।” বলে উনি আবার উঠে গেলেন। আমি ঢেঁড়স খাওয়া ইতোমধ্যে শেষ করেছি। উনি আসলেন।

আমি বলতে যাবো, “স্যার উঠি।” উনি বললেন, “আসো, খাবে।” এইটা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। হুমায়ূন আহমেদ আমাকে তার বাসায় ডাইনিং টেবিলে ডিনার করতে ডাকছেন। না, সত্যি এতোটা সহজ ছিলোনা বিষয়টা। আমি উঠে বললাম, “স্যার, থাক। আমি বরং যাই।” স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি তোমার কোনো এফোর্ট ছাড়া বই মেলায় যেতে রাজি হয়েছি। তাহলে আমাকে এফোর্ট দিতে বলছো কেনো?” বুঝলাম, আমার বিভাগীয় দুলাভাই জামশেদ কেনো পেট খালি করে আসতে বলেছিলো।

স্যার ডেস্কে অনেক ঘাটাঘাটির পর, একটা কাগজ বের করে আমাকে দিলেন। তারপর বললেন, “পড়ো।” আমি পড়তে শুরু করলাম। হেডলাইনে লেখা, ‘দখিন হাওয়া, নিয়মসমূহ।’ নিচে অনেক পয়েন্টসে কিছু নিয়ম লেখা কিন্তু চ্যাপ্টার অনুসারে। যেমন, 'বসার ঘর চ্যাপ্টার, বাথরুম চ্যাপ্টার, নাস্তা চ্যাপ্টার।’ এইসব চ্যাপ্টার অনুযায়ী কিছু নিয়ম লেখা আছে। যেমন, 'সিগারেট খেলে এসট্রেতে ছাই ফেলতে হবে, এই বাড়ির বাদশাহ হুমায়ূন এর কথা মনোযোগ সহকারে শোনা লাগবে এবং কথার তালে মাথা নাড়া আবশ্যকীয়। দুই বাক্যে কমপক্ষে একবার মাথা নাড়া মেন্ডেটরি, বই নিলে ফেরত দিয়ে যেতে হবে, অপ্রকাশিত লেখা পড়তে চাওয়া যাবে না, সন্ধ্যা সাতটার পর ঢুকলে, পেট ফেটে গেলেও ডিনার করতে হবে।’ এমন আরো কিছু নিয়ম এতে লেখা। আমি সিউর, এই সময়ে উনি বেঁচে থাকলে এড করতেন 'বাড়িতে ঢুকে ইনিয়ে বিনিয়ে ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড চাওয়া যাবে না।’

স্যার বললেন, “আসো রাজিউল। তোমাকে নোনতা শুটকি খাওয়াই। নোনতা ইলিশের বাপ এইটা।” আমি 'খাওয়া চ্যাপ্টার’ পড়তে পড়তে টেবিলের দিকে আগালাম আর চিন্তা করলাম স্যার আসলে আমার নামটা জানেন কিভাবে?

এরপর, ২০১০ এ বই মেলায় ঢাকাতে ভীড় ঠেলে উনার সাথে দেখা হয়েছিলো। উনি উনার 'How to make a cup of শান্তি’ বইটা উপহার দিলেন। তারপর, উনি শেষবার ঢাকায় আসার পর ফোনে কথা হলো। নোনতা শুটকির বিস্বাদ এক্সপেরিয়েন্সের পর, আমাকে নিমতা রুই খাওয়াতে নুহাশ পল্লীতে ডাকলেন। আমি ২০১৩ সালে নুহাশ পল্লীতে গিয়েছিলাম, তবে কেউ ছিলো না। সব ফাঁকা পড়েছিলো একদম। বড্ড, দেরী করে ফেলেছিলাম হয়তোবা।

হুমায়ূন আহমেদ সব জানতেন, সবাইকে জানতেন। তা না হলে, আমাকে এতো জোর দিয়ে লেখাতেন না। 
ধন্যবাদ, স্যার।

এই গল্পের সকল প্রেক্ষাপট পুরোপুরি কাল্পনিক।

রাজিউল হোদা দীপ্ত
ঢাকা, বাংলাদেশ

rdipto2@gmail.com