অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন যেন এক অসমাপ্ত অধ্যায়? - অপূর্ব শর্মা

সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনির কথা মনে আছে? ২০১২ সালের ১১ ফেব্র“য়ারি নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাদের। দেখতে দেখতেই কেটে গেছে প্রায় ছয় বছর! পদ্মা মেঘনা যুমনায় গড়িয়েছে অনেক জল। কিন্তু নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করাতো দূরের কথা ঘৃণ্য এই অপরাধের সঙ্গে কারা জড়িত সেটিই আজ পর্যন্ত রয়ে গেছে রহস্যাবৃত্ত। তদন্তকারী সংস্থা বদল হলেও এই মামলায় দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি হয়নি আজো! অথচ ঘটনার পরপরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর সেই ঘোষণা ঘোষণাই রয়ে গেছে। তিনি নিজেও আর স্বপদে নেই। শুধু সাহারা খাতুনই নন, সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে দ্রুত বিচারের ব্যাপারে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেই আশ্বাসও বাস্তবতার মুখ দেখেনি। এভাবে শুধু প্রতিশ্র“তি আর আশ্বাসই শুনেছি জাতি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি? এই ঘটনার কোনও কূল কিনারা করতে না পারায় সাংবাদিক সমাজ যেমন হতাশ, তেমনি সাগর-রুনির পরিবারও আজ বেদনাহত। তাদের শঙ্কা তাহলে কি প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়বে না কোনদিন? 
কেন উদঘাটন করা যাচ্ছে না রহস্য? তাহলে কি একটি অসামাপ্ত অধ্যায় হয়েই থাকবে আলোচিত এই ঘটনাটি? তখন স্বভাবতই প্রশ্নটি এসে যায়, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কি আন্তরিক নয় এই ঘটনার রহস্য উন্মোচনে? যদিও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বারবার বলেছেন, এনিয়ে তাদের আন্তরিকতার কোন কমতি নেই। তারপরও কেন আলোচিত এই মামলাটির কোনও অগ্রগতি হচ্ছেনা? ভাবলে বিস্ময় জাগে!  
একটি অপরাধ আরেকটি অপরাধের জন্ম দেয়। তেমনি বিচারের মুখোমুখি না হওয়া অপরাধীরাও হয়ে উঠে ভংঙ্কর। যার প্রভাব পড়ে সমাজে। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে সেটিই প্রতক্ষ্য করছি আমরা। বিগত গত দেড় যুগে দেশে ৩৯ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। দু’টি বাদে আর কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনারই সঠিক বিচার হয়নি। তাই এটা দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায় দেশে ‘বিচারহীনতার একটি সংস্কৃতি’ চালু হয়েছে সাংবাদিকদের বেলায়। যেহেতু অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর দায়িত্ব আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বভাবতভাবে ব্যর্থতার দায় বর্তায় তাদের উপর। তারা অনেক ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে পারেন না বলে তাদের সদিচ্ছার বিষয়টি আপনাআপনি এসে যায়। 
রহস্য উন্মোচনই যেখানে সাংবাদিকদের কাজ তাদের ঘটনাই থেকে যায় রহস্যাবৃত্ত-ভাবলেই বিস্ময় জাগে। এমনকি খোদ সাংবাদিকরাও ব্যর্থ হন ঘটনার প্রকৃত রহস্য আবিস্কারে! কেন ব্যর্থ হচ্ছেন সংবাদকর্মীরা। কেনইবা ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন? এর পেছনে রয়েছে নানা কারন, জটিল সমীকরণ। তবে আমি যেটা মনে করি সেটা হচ্ছে, বিভেদ আর বিভাজনই ক্ষতি করছে সাংবাদিকদের। সেই বিভেদ আর বিভাজন রাজধানী থেকে শুরু করে পৌছে গেছে প্রান্থে, একেবারে উপজেলা পর্যায়ে। সর্বত্রই এখন বিভক্তি আর গ্র“পিং। তবে, সেটা যতোটানা আদর্শিক তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি স্বার্থগত, পদ-পদবীগত, ক্ষমতাজনিত। পেশাদারিত্বকে সমুন্নত করার বদলে সাংবাদিকরা জড়িয়ে পড়ছেন রাজনীতিতে। সেই রাজনীতি অনৈক্য তৈরি করছে, আর সেই বিভক্তি আমাদের শক্তিকে করছে খর্ব। যার সুবিধা নিচ্ছে নানা শ্রেণীর অপরাধী, প্রশাসনিক দূর্নীতিবাজ এবং তথতাকথিত সমাজপতিরা। স্বার্থের কারনে তারা ‘নির্বিঘেœ’ শিকারে পরিণত করছে সাংবাদিকদের। ফলে সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন, গুম, খুনের ঘটনাগুলো প্রথমে আলোচিত হলেও একসময় সেটা গতি হারাচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিচার শুরু হলেও সাক্ষ্য প্রমানের অভাবসহ নানা কারনে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়ে তা এক সময় থেমে যায়! তখন বিচারের বানী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। 
ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারীবাহিনীর চৌকস কর্মকতারা অনেক ক্ষেত্রে এই একটি জায়গায় এসে কেন যেন থেমে যান? জঙ্গি নির্মূলের মতো জীবন বাজি রেখে চালানো যুদ্ধে যেখানে আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্য ঈর্ষনীয় সেখানে সাংবাদিকদের ঘটনায় তারা কেন কূল কিনারা করতে পারেন না? সেটা শুধু ভাবায়ই না অবাকও করে আমাদের। তখন মনে পড়ে যায় বহুল চর্চিত সেই কথাটি। সাংবাকিদের কোন বন্ধু নেই? সত্যিই কি তাই? দুই দশকের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সেটাই সত্যি। শতভাগ পেশাদার সাংবাদিকদের সেই অর্থে কোনও বন্ধু নেই! তাদের ‘শত্র“র’ সংখ্যাই বেশি, এর কারন একটাই সত্যের পথে চলা, সত্য কথা বলা। আমরা যে বা যারাই অপ্রিয় সত্যটা তুলে ধরি, প্রকাশ করি তখন যাদের সম্পর্কে তা উত্থাপিত হয় তাদের চক্ষুশূলে পরিণত হই আমরা। অপরাধী ব্যক্তিটি ‘ধোয়া তুলসিপাতা’ সেজে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে শায়েস্তা করতে উঠে পড়ে লাগেন। অপরাপর অপরাধীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চালান কালির আচর স্তব্ধ করার প্রক্রিয়া। আমার সাংবাদিকতা জীবনে এমন একজন দূর্নীতিবাজও পাইনি যিনি মুখোশ উন্মোচিত হওয়ার পর বদলে গেছেন কিংবা বদলে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন, অনুতপ্ত হয়েছেন। অপকর্ম করে অর্থ কামাই-ই যেনো তাদের চলার পথের পাথেয়। আপনি সেটা আবিস্কার করলেনতো, ঝুকিতে ফেললেন জীবন। 
বিচার না পাওয়ার সংস্কৃতি কিন্তু একদিনে চালু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এটা। অনেকে এজন্য সরকারকে দায়ি করে থাকেন। বলে থাকেন সরকারের সদিচ্ছার অভাবেই প্রলম্বিত হয় বিচার প্রক্রিয়া। রাষ্ট পরিচালনার দায়িত্ব যেহেতু সরকারের তাই প্রথমত দায়টা তাদেরই। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে কি সেটা প্রযোজ্য? আমি কিন্তু সেটা মনে করিনা। এর কারন আমরা যতটা না রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে লিখি তার চেয়ে অনেক বেশি লেখি প্রশাসনিক দূর্নীতির বিরুদ্ধে। সেই দুর্নীতিবাজরা কখনোই চায়না সংবাদকর্মী হত্যার বিচার হোক। 
কমিটি টু  প্রোটেক্ট জার্নালিস্টের (সিপিজে) প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৭ সালে বিশ্বে সাংবাদিক নির্যাতনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। এটা উদ্বেগজনক একটা খবর। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদপত্রকে যেখানে অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে যদি স্তম্ভ মজবুতকারীদের এই অবস্থা হয় তাহলে সেটা দেশের ভাবমূর্তির জন্য যেমন ক্ষতিকারক তেমনই সুস্থ সমাজ বিনির্মানের পথেও অন্তরায়।
শুধু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নয়, দেশে সংগঠিত সকল অপরাধের দ্রুত বিচার করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাহলে যেমন অপরাধ প্রবনতা হ্রাস পাবে তেমনই সুস্থ সুন্দর সমাজ বিনির্মানের পথে এগিয়ে যাবো আমরা। কারন জাতি হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে মাথা উচু করে দাঁড়াতে হলে, অপরাধমুক্ত সমাজ বিনিমানের কোনও বিকল্প নেই। 

অপূর্ব শর্মা 
সিলেট, বাংলাদেশ