অটোয়া, মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯
লাশের বুকে স্বপ্ন - তাসনোভা জাহান

ই সময়টা আমার বেশ ভাল লাগে, দুপুর পেরিয়ে বিকাল হবার সময়টা। ঠোটের উপড়ে আর নাকের নিচে জমা নোনাজলের কণাগুলোর, বাতাসে শুঁকানোর সময়। ঘামে ভেজা শরীর রোদ-বাতাসে শুঁকায় যায়, কিন্তু মন? মন কীভাবে শুকায়? প্রতিটা দিন যেন, মনের স্যাঁতস্যাঁতে শ্যাওলার স্তর আরো পুরু করে দিয়ে যায়। মনটাকে শুঁকাতে দেয়ার জায়গা খুঁজছি, হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে দুই ফিতার স্যান্ডেলে জড়ানো আমার এক জোড়া পা বালিতে কিচকিচ করছে, শহরটা যে ধুলোর তাই। নিজের সাথে বিড়বিড় করতে করতে তোমার গলির সামনে কখন চলে এলাম টেরও পেলাম না। বরাবরের মতই এক নিমেষে প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম তোমার সাথে দেখা হয়ে গেলে কি করবো? কথা বলবো? না থাক; না দেখার ভান করবো? না থাক; তাকালে একটা দাঁত ছাড়া, জোর করা হাসি দিবো? না থাক; ধুর! এত কিছুর প্রয়োজন আছে নাকি, ব্যাগ থেকে আমার কুচকুচে কালো সানগ্লাসটা বের করে চট করে পড়ে নিলাম। এবার আমাকে চেনার কোন প্রশ্নই আসে না। উফফ! আরেকটা গলি। না, না এটা না, ওটাই তোমার বাসার গলি। গত ছয় বছর যাবত আমার এই বেহুদা গবেষণা। বাবার সামাজিকতা রক্ষার্থে এখনো এই গবেষণায় আমার সাফল্য আসেনি,আসবেওনা। শুধু তাই না, আমি আমার সামাজিক বাবার,সামাজিক মেয়ে। মানে, সামাজিক হবার চেষ্টা করি আর কি। তাই হয়তো গবেষণায় তোমাকে সার্থক করতে পারিনি। এই যে, সানগ্লাসের ভাব মেরেই পার হয়ে গেলাম তোমার এলাকা। এজন্যেই মনটা এত স্যাঁতস্যাঁতে আমার। সাইকেলে করে একটা মেয়ে গেল মনে হচ্ছে, হ্যা তাইতো। আমারো খুব ইচ্ছা ছিল সাইকেল চালানোর, বাবার কাছে চেয়েছিলামও। মেয়ে মানুষ সাইকেল চালানো নাকি ভাল দেখায় না, আমাদের স্ট্যটাসের সাথে নাকি যায় না। দুঃখ করিনা আমি, দুঃখ আমায় সাজে না, সামান্য একটা সাইকেলের জন্যে দুঃখ করা দুদিনের দুনিয়ায় সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই না। বিকেলটা শেষের দিকে এগোচ্ছে, আমিও এগোচ্ছি নিজ বাসার দিকে। বিকেলের সাথে আমার অমিল নগণ্য। চোখে পড়ার মত অমিল একটাই আমি মানুষ আর বিকেল একটা বেলা। আমাদের জন্ম হয় সূর্যকে বিদায় দিতে। 
"আমি আর সামানে যাইতে পারুম না এইহানেই নামেন", ডান দিকে ঘাড় ঘুড়াতেই দেখি রিকশাওয়ালা লোকটা রিকশায় বসে থাকা মহিলার দিকে খুব মেজাজ দেখাচ্ছেন। দেখলাম রিকশাটিতে মহিলার কোলে একটি বাচ্চা,পাশে ৪\৫ বছরের কাজের মেয়ে বসা সাথে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩টা ব্যাগ। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মহিলাটি বোধ করি মিমাংসা পাওয়ার আশায় বললেন, "আপা দেখেন আমাকে আরো সামনে নামায় দেয়ার কথা অথচ তিনি আমাকে এখানেই নামায় দিচ্ছেন"। খুব জোরে একটা ঝাড়ির প্রিপারেশন নিয়ে মুখ খুললাম আর বেড়োলো, "মামা, দেখছেন তো দুইটা বাচ্চা সাথে, মানবতার খাতিরে আরেকটু সামনে নামান"।  আমার কথা শুনে দুজনই বেশ চমকেছেন, কারণ আমার মুখের expression আর কথা এক ছিলনা তাই। কথা হলো, ভিতর থেকে আমি ধমকের প্রিপারেশন নিলেও হঠাৎ করেই মাথায় বাবার কথাটা মাথায় আসলো,"মেয়ে মানুষের বেশি জোরে কথা বলতে নেই"।  
দুনিয়ার বেহুদা হেপা পোহিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমতির কাজ। মানুষকে চমকে দেয়ার মাঝে নিজের মধ্যে একটা অন্যরকম আনন্দ কাজ করে। হাঁটতে হাঁটতে ডানে মোড় নিলাম। বাসার খুব কাছেই চলে এসেছি। সামনের বামের গেইট দিয়ে ঢুকলেই ৩ নম্বর বিল্ডিং। এটা হল মেইন গেইট, ৮টি বিল্ডিং এর মেইন গেইট এটি। গেইট দিয়ে ঢুকতেই প্রথম বিল্ডিং এর দোতলায় চোখ পড়লো। বারান্দায় মতিন আংকেল তার গর্ভবতী বউকে পাশে নিয়ে বসে আছেন। তিনি শুধু বসে নেই, বসে নিজে প্রাকৃতিক বাতাস আর নিকোটিন খাচ্ছেন আর গর্ভবতী বউকে নিকোটিনযুক্ত প্রাকৃতিক বাতাস খাওয়াচ্ছেন। দেখে মনে মনে ভদ্রলোককে একহাজার একটা বি-ওয়ার্ড বলা শেষ করে ভ্রু কুচকিয়ে, গলা উচিয়ে মনে মনে "অই মতিন" বলে একটা নিঃশ্বাস নিলাম তারপর মুখে জান্নাতি হাসি নিয়ে ,"আসসালামুয়ালাইকুম আংকেল, ভাল আছেন?"। লোকটা কে আমি মোটেই পছন্দ করিনা, তারপরো শুধু বাবা বলেছেন তিনি মুরুব্বী তাই তাকে সম্মান করতে হবে। উত্তরে তিনি তার ঘাড়টা ডান দিকে হালকা বাকিয়ে হাসলেন। 
অবশেষে জগতের নাট্যমঞ্চ ত্যাগ করে ব্যাক স্টেজে যাওয়ার পালা। সিড়ি দিয়ে ৩ তলা উঠতে আজ বেশি সময় লাগলো না, বুঝলাম না,নিমিষেই শেষ হল সিড়ি। উঠেই কলিং বেল বাজাচ্ছি। 
"টিং টং, টিং টং" 
বাবা দরজা খুলতেই, "কীরে মা আজ এত সময় লাগলো যে? ইস মেয়েটার চেহারাটা কালো হয়ে গেছে, রোদে ঘুরতে ঘুরতে, আয় বোস তোর জন্যে লেবুর শরবত করে রেখেছি"
আমি অবাকের উপড়েরও উপড়ে যদি কিছু থাকে, তবে তারও উপড়ে। বাবা বানিয়েছে লেবুর শরবত! কি করে সম্ভব? যেখানে তিনি ঘরে ঢুকে আমাকে লেবুর শরবত বানিয়ে দেয়ার জন্যে আদেশ করেন, আজ কিনা তিনি নিজে আমার জন্যে! আচ্ছা লেবুর শরবতের কেসটা মেনে নিলাম,এত আদুরে ব্যবহার! কিভাবে? আচ্ছা দুটোই নাহয় মেনে নিলাম। কারণ, মানুষের বদলে যেতে ইচ্ছা করতেই পারে। কিন্তু সাদা ফতুয়া! বাবার এই সাদা ফতুয়াটি ৮ বছর আগে মা কিনে দিয়েছিলেন কিন্তু বাবা সাদা রংটা পছন্দ করেন না, তাই এই ফতুয়াটি এতদিন যাবৎ মা'র কাঠের আলমারিতেই পড়েছিল। সাদাতে বাবাকে এত সুন্দর মানায় যে বাবার উপড় থেকে আমার মোহ সরাতেই পারছি না। 
"ফ্রেশ হয়ে আয়, আজ তোর পছন্দের হাসের মাংস রান্না করেছি। সেই ছোট থাকতে তোর মায়ের কাছে হাসের মাংস খাওয়ার জন্যে আবদার করতি, কিন্তু তোর মা চলে যাওয়ার পর আমার কাছে একবারও আবদার করিসনি, তাই আজ রান্না করেছি", বলতে বলতে বাবা আমাদের ছোট গোল ডাইনিং টেবিলে খাবার বাড়তে শুরু করলেন। 
নিজের চোখকে আমি কি করে বিশ্বাস করি, যেই চোখ আমায় এই পৃথিবীর সবচাইতে দুর্লভ মুহূর্ত দেখাচ্ছে। এ কি সত্যিই আমার বাবা! পলক ফেলতেও মনে হচ্ছে কি যেন মিস হয়ে গেল। আমি রান্নাঘরের কল থেকে কোনরকমে মুখে পানির ঝাঁপটা,হাতটা ধুয়ে নিয়েই টেবিলে গিয়ে বসলাম। হাত-মুখ মোছার সময়, আমার হাতে নেই,কারণ এই প্রথম বাবা খাবার বেড়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। তার উপর হাসের মাংসের স্মেইল দিয়ে ঘর মো মো করছে। আমি চেয়ার টেনে বসতেই বাবা টিয়া রঙের ছোট গোল মেলামাইনের বোল থেকে আমায় হাসের মাংস বেড়ে দিলেন। বাবা এত সুন্দর করে খাবার বাড়েন যে আমার মনে হলো কোন এক মানুষরূপী ফেরেশতা আমায় আদরের চাদরে তুলে নিয়ে খাবার বেড়ে দিলেন। চট করেই আমি খাবার শেষ করে ফেললাম। কি অদ্ভুত! আমার খাওয়ার সময়ের সবচাইতে lowest record আছে ২২ মিনিট। অথচ আজ আমার ২ সেকেন্ডও লাগলো না। খুব প্রিয় খাবার পেলে মানুষ খুব তাড়াতাড়ি খায় জানি, তাই বলে এত তাড়াতাড়ি! আজ কি আমি আমার বিস্ময়ের কোন ঠিকানা দিতে পারবো? মনে হয় না। খাওয়া শেষে করে বাবার রুমে বিছানায় গিয়ে বসলাম, এখানে কেন বসলাম আমি জানি না। সাধারনত বাবা বাসায় থাকলে আমি এখানে বসি না। বাবা ব্ল্যাক কফি বানিয়ে আনলেন। এও কি আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? মানে, বাবা আর ব্ল্যাক কফি! আচ্ছা এটা কি আমার বাবা? নাকি অন্য কেউ এসে...... নাতো বাবার পায়ের ছোট সবগুলো আংগুল সমানই তো আছে, দেড় ফিট চওড়া সোল্ডার তাও ঠিক আছে, তাহলে? কি হলো এই লোকটার। কফি মগটা হাতে নিলাম, এক চুমুক দিতেই মনে হল যেন, না এই কফির কোন ঊপমা আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব না। কেবল এইটুকু বলতে পারি, বাবার ভয়ে আমি এতদিন চুরি করে যেই কফি বানিয়ে খেতাম, সেটা কফি না, কফির বীজ ভিজানো পানি ছিল। কিন্তু তিনি এত অসাধারণ কফি বানাতে পারেন কবে থেকে! এটা কী সত্যি আমার বাবা! 
আমাকে কফি দিয়ে তিনি আমার রুমে গিয়ে আমার বুক শেলফ থেকে পুরোনো এলবাম বের করে আনলেন। যেটা নিয়েই আমি বাঁচি। এলবামটি নিয়ে আমার ঠিক সামনে এসে বসলেন। আমি তাকিয়ে আছি, কারণ আমি বুঝতে পেরেছি যে আজ আমি আমার কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। তাই বুদ্ধিমতির মত দেখে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে বাবার নতুন কোন জন্ম দেখছি আমি। এই জন্মে তিনি তাই করছেন যা তিনি সেই জন্মে করেননি। 'সেই জন্ম' কোন জন্ম? আমি কি উল্টা-পাল্টা বকছি আমি জানি না শুধু জানি এখন মনে মনে কথা বললেও সময় নষ্ট করা হবে, তাই নিজের মধ্যে মোহটাকে খুব আদরে আদরে তুলে রাখার চেষ্টা করছি। এতক্ষণে আমি বুঝলাম আমার ঠোট দুটো একবারের জন্যেও এক হয়নি, মানে মুখ একরকমের হা হয়ে আছে বলা যায়। তাই হয়তো গালটা ব্যাথা করছে। এখন ব্যাথাকে সময় দেয়ারও সময় নেই। 
বাবা এলবাম খুললেন, একে একে তিনি মা আর উনার বিয়ের সময়ের ছোট ছোট হাসির ঘটনা হাসতে হাসতে বলতে শুরু করলেন। তাকে সত্যিই খুব সুন্দর লাগছে। কিন্ত, কিন্তু আমি মনযোগ রাখতে পারছিনা। গাল ব্যাথাটা দিচ্ছেনা। আমি মুহূর্তগুলো নষ্ট করতে চাচ্ছিনা, কিন্তু পারছিনা। ব্যাথাটা বাড়ছে ক্রমশই। বাবা এলবামের ছবি নিয়ে গল্প বলেই যাচ্ছেন। ব্যাথার তোড়ে গালে হাত দিলাম। আর হাত দিতেই একটা দাঁত এসে আমার হাতে পড়লো। আমি তাকিয়ে আছি দাঁতটির দিকে, অবাক হয়ে। কি হচ্ছে এসব? দরজায় বেল বাঝছে, বেজেই চলছে। বাবার ঘর থেকে কোরিডর দিয়ে মেইন দরজা দেখা যাচ্ছে। আমি দরজায় তাকিয়ে আছি উঠছিনা। কেন উঠছিনা? বেলটা বেজেই চলছে,     
"টিং টং, টিং টং,টিং টং, টিং টং" 
কলিংবেলের শব্দে ঘুম ভাঙলো আমার। মুখ থেকে লালা পড়ে বাবার সাদা ফতুয়াটার বুকের দিকের অল্প জায়গা ভিজে গেছে । তড়িঘড়ি করে উঠে বসলাম। উঠে বসেই তাকিয়ে আছি আমার সামনে গভীর ঘুমে থাকা মানুষটির দিকে। পলক পড়ছে না। কলিংবেলটা বেজেই চলছে। সব কিছু কেমন যেনো গোলমেলে হয়ে আছে। আমি ঘোরে ছিলাম নাকি স্বপ্নে? সবকিছু বুঝে চলে এসেছে আমার, কীভাবে সম্ভব? আমার সাথেই কেন? কি হবে এখন? শক্ত হয়ে বসে বাবার দিকে তাকিয়ে আছি আমি। বেলটা বাজছে। অনুভূতিহীন শরীর নিয়ে রোবটের মত উঠে দাড়ালাম। হাটার শক্তি এখন কে দেবে আমাকে? 
দরজাটা খুলতেই দারোয়ান চাচা বিলের কাগজ দেখিয়ে, "স্যার কই? উনার এখন শরীর কেমন? আজকা লাস্ট ডেইট বিলের টাকা দেওনের"। 
আমি চুপ, ঠিক কোনদিকে তাকিয়ে আছি আমিও নিজেও বোধহয় জানিনা। 
"আম্মা, স্যার কই?", দারোয়ান চাচা আবারো বললেন।
ঠিক এমন সময়ই পাশের বাসার দরজা খুলে খোকন আংকেল তার স্কুল ড্রেস পড়া মেয়েটির হাত ধরে সিড়ি দিয়ে নেমে গেলেন। আমি দরজা ধরে এক নজরে তাদের আড়াল হওয়া অবদি তাকিয়ে রইলাম। দারোয়ান চাচা অপেক্ষা করতে আর না পেড়ে ঢুকে গেলেন ঘরের ভেতর এবং সোজা বাবার ঘরে। আমি দরজা ধরে দাড়িয়ে। দারোয়ান চাচা বের হয়ে এসে চোখ মুছতে মুছতে নেমে গেলেন। 
   বাবার ঘরের উত্তরের দেয়ালটিতে মার সাদা-কালো ছবিটার পাশে যুক্ত হল আরেকটি ছবি।

  তাসনোভা জাহান     
  ঢাকা, বাংলাদেশ।