অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
ভাঙনে বাঁধ - আরিফা আশরাফ তামান্না

সাড়ে এগারোটা বাজে। হাবিব পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে টেবিলে রাখা ক্যালেন্ডারটি হাতে নিলো। আজ ০৪ আগস্ট, ২০শে শ্রাবণ। আঙ্গুলে হিসাব করে দেখলো মাকে ছেড়ে আসার দু’মাস ষোল দিন হলো আজ। চেয়ারে বসে পড়লো সে, নিজের অজান্তেই তন্ময় হয়ে পড়লো অতীতের আলোকে বর্তমানকে তুলনায়। ঘরে মন টিকলোনা, দরজা খুলে বাইরে বের হলো। বারান্দায় পায়চারি করছে, আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে দেখে হাবিবের মন সাময়িকভাবে অতীতের অলক্ষ্যে চলে গেলো। ভাবলো, এই মুহুর্তে যদি বৃষ্টি আসতো, ঝুম ঝুম শব্দ করতো তাহলে গ্রীল ধরে দাঁড়াতো আর বৃষ্টির ঝাপটা এসে মুখে পড়তো; হয়তো অনুভূতিটা অন্যরকম হতো। তন্নিষ্ঠ চোখগুলো আকাশে রেখে হাতগুলো বারান্দার গ্রীলে রেখে দাঁড়িয়ে থাকার মাঝে তার প্রকৃতিপ্রেম বিভাসিত হলো, অন্ধকার বিভূষণ রাতকে যেন মেঘের ডাক, বিদ্যুতের ঝলকানি অলংকৃত করে তুলছে। হঠাৎ কিসের স্পর্শে তাঁর তপোভঙ্গ ঘটলো। তনিমা হাবিবের পিঠে হাত দিতেই প্রকৃতিও ছন্দ পরিবর্তন করলো। বৃষ্টি শুরু হলো ঝুম ঝুম শব্দে।
- কিরে, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস যে, ঘুমোবি না?
- জানিস আপু, আজ বাড়ির কথা ভীষণ মনে পড়ছে, বিশেষতঃ মাকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব। এতক্ষণ মায়ের কথা, বাড়ির কথা চিন্তা করেও চোখের জল আসেনি, কিন্তু বোনকে কথাগুলো বলার সাথে সাথেই লুকানো জলফোটাগুলো টপাটপ পড়ে গেলো, সাথেই বুকটা কিছু চাপমুক্ত হলো।
- ধূর পাগল, লক্ষ্মী ভাইটা আমার কাঁদিস না, এইতো আগামী সপ্তাহে পরীক্ষাটা দিয়ে মাকে একবার দেখে আসবি। তোকে ছাড়া মা’তো তোর চেয়েও বেশি কষ্ট পাচ্ছেন, তাই বলে কী তিনি তোর মতো পাগলামী করছেন? কথাগুলো বলে ঘুমন্ত মেয়েকে দেখার ছলে ঘরে এসে চোখ মুছে পানি খেয়ে আবার হাবিবের কাছে গেলো। হাবিব তনিমার পূেের্বর কথা স্মরণ করে বললো, 'আপু, তোর কথা আমি মোটেও মানতে পারছিনা। আমি জানি আমাকে ছেড়ে মা পাগলপ্রায়! উনার ফোনে বলা কথাগুলো যাই হোক জোর করে হাসি এনে কথা বলার কন্ঠটা আমি ঠিকই বুঝতে পারি। তোমরা মেয়েরা পারোও বটে! ' তনিমা কথা টেনে আনতে পারছেনা, সে নিজেই মায়ের জন্য ভীষণ দুশ্চিন্তায় ভূগছে। চারদিক নিস্তব্ধ, নীরব। ভাই, বোন দু’টিতেও তাই বিরাজ করছে। বিদ্যুতের ঝলকানি যখন তনিমার মুখে রেখাপাত করলো তখন তাঁর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলের দৃশ্য হাবিবের চোখকে ফাঁকি দিতে পারলো না। সে একটু শব্দ করে হা-হা করে হেসে উঠলো। তনিমা চমকে উঠলো, তাকিয়ে রইলো হাবিবের দিকে!
- মনে আছে আপু, তুই যখন পড়ার টেবিলে ঘুমিয়ে পড়তি তখন তোর কয়েক গাছা চুল তোর কানে ঢুকিয়ে তোকে কীভাবে জ্বালাতাম! তোকে না লাগতোও সেইরকম! তনিমার দৃষ্টির পরিবর্তন ঘটলো না, সে দাঁড়িয়ে রইলো হাবিবের মুখপানে চেয়ে। হাবিব আবার বলে উঠলো, 'আচ্ছা আপু, তুই কখনো কী এমন নিস্তব্ধতায় বৃষ্টিকে বুঝতে চেয়েছিস?' আরেকটু বিরতি নিয়ে বললো, 'এই আপু, বলতো এই মুহুর্তে যদি বৃষ্টির ঝাপটা এসে তোর মুখে পড়ে তখন তোর অনুভূতিটা কেমন হবে?' তনিমা তাকিয়ে রইলো অপলক দৃষ্টিতে, যেনো সে নতুন কোনো হাবিবকে দেখতে পাচ্ছে, অঝোর ধারার বৃষ্টি যেমন ঝুম ঝুম শব্দে বইছে তার চোখগুলোতেও যেন তদ্রুপ শব্দে জলধারা প্রবাহিত হতে চাচ্ছে! বলে উঠলো - তুই ও তো পারিস রে! তনিমা হাবিবকে নতুনরুপে আবিষ্কার করলো, যে ছেলেটা মা-বাবার স্নেহ-ভালোবাসা, বড় বোনের আদরের কাঙাল ছিল, এর বাইরে কিছুই সে বুঝতো না, আজ সে বোনকে সান্তনা দেয়ার নিমিত্তে অনেক বড় অভিনেতার পার্ট নিলো!
বিছানায় গিয়ে তনিমার ঘুম আসছেনা, এপিঠ ওপিঠ করছে দেখে স্বামী তোফায়েল সাহেব বুঝতে পারলেন যে তনিমার মন ভালো নেই, তাও জানেন যে তার মন খারাপের এই একটাই কারণ থাকে। এরপরও তিনি জিজ্ঞেস করে বিষয়টা জানতে চাইলেন । তনিমার খুব ইচ্ছা হলো আজ সে বাঁধনহারা শোকপাখির মতো তার মনকে মুক্ত করে দিয়ে শোকের গান গাইবে তার স্বামীর সামনে ।
এক কথায় তখন সেটাকে সুখের সাম্রাজ্যই বলা যেতো, যেটা ছিল মা-বাবা, ভাই-বোনের সরব উপস্থিতিতে গড়ে ওঠা তাদের পরিবার। দুই বোন আর একটিমাত্র ভাই নিয়েই মা-বাবার রাজ্য । বাবা ছিলেন একজন নামকরা ব্যবসায়ী, টাকা-পয়সা যা ই পেতেন সন্তানদের সুখের স্বার্থে খরচ করতেন । তাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কেবল কিছু জমি কিনে রেখেছিলেন; নগদ টাকা তেমন ছিলনা। আপাদমস্তক একজন আদর্শবান ব্যক্তি হিসেবে যাকে চিহ্নিত না করাটা অনুচিত বৈ কিছু নয়। কিন্তু হঠাৎ একটা মারাত্মক দূর্ঘটনা গ্রাস করে নিলো পরিবারের সমস্ত সুখ! উল্লেখ্য যে, বাবা বেঁচে থাকাকালীন ই তনিমার বিয়ে হয়। ছোটবোন অনিমা এবং বয়সে অনিমার তুলনায় দু'বছরের বড় হাবিবকে নিয়ে মা লতিফা বানু তমসাচ্ছন্ন গহ্বরে নিমজ্জিত হলেন, যা থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে গিয়ে বিপরীতে চোখে অন্ধকার দেখলেন! এভাবে কেটে গেলো একটি বছর, এই এক বছর শিক্ষাজীবন থেকে অব্যাহতি নিতে হলো হাবিবকে, লেখাপড়ার বদলে পরিবারের হাল ধরলো; বোনটা সবেমাত্র নবম শ্রেণিতে পড়ছে, অন্ততঃপক্ষে মেট্রিকটা পাশ করুক এটাই ভাইয়ের ভাবনা। পরিবারের এই দুর্দশা তনিমার জীবনে পুরোপুরি প্রভাব ফেললো, সে এমন হাল দেখতে চায়না, পরিত্রাণের লক্ষ্যে ভাইকে পড়ার জন্য উৎসাহ যোগায়, টিউশনির পরামর্শ দেয়, সাথে স্বামীর সহযোগিতায় নিজেও ভাইয়ের খরচের সহায়ক হয়। এভাবে কোনোরকমে হাবিব এইচ এস সি পাশ করলো। হাবিবের পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে তনিমার স্বামীর চাকরি বদলজনিত কারণে তার পরিবার ঢাকা চলে যায় । মা, ভাই-বোন থেকে দূরে সরে এসে তনিমার মন মোটেই ভালো থাকে না । এদিকে ভাইটা পাশ করার পর থেকে তার পড়াশোনা বিষয়ক নতুন চিন্তাও তাকে ঘন্টার পর ঘন্টা পীড়া দিচ্ছে । ইচ্ছা থাকলেও পুরো তিনজন মানুষকে তার নিজের কাছে আনছেনা তার সীমিত আয়ের স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে; যদিও তোফায়েল স্ত্রীর সকল চাওয়াকে পাওয়ায় পরিণত করার পক্ষে। শেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তনিমা তার মায়ের কাছে পনেরো বছর বয়সী একটা মামাতো ভাইকে রেখে হাবিবকে নিজের কাছে নিয়ে আসলো ঢাবি'র (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) সুযোগ সন্ধানে। হাবিবের অনুরোধে তোফায়েল সাহেব একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে জবও দেখে দিলেন, যেখানে বেতন আপাতত ১০,০০০ টাকা। এই যোগ্যতায় এর চেয়ে বেশি বেতনের চাকরি পাওয়ার কথা চিন্তা করা যায় না । আজ ভাইটির চোখের জল তার নিজের চোখে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে বার বার । তনিমার ভাবনার শেষ হয় না, যে সন্তানকে মা-বাবা একটা দিনের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেন নি, কেবল স্কুল-কলেজের প্রাঙ্গণ, খেলার মাঠ আর ঘরই ছিল যার দুনিয়া সে অবোধ বালকটি আজ অনেক বড় দায়িত্বের বোঝা বইছে! ঢাবি ভর্তিযুদ্ধে জিতে গেল হাবিব। সকলের খুশির পরিমাণ বুঝানোর চেষ্টা করা আমার জন্য বোকামি ই হবে। শুধু এটাই বলা যেতে পারে এই ক'বছরের অপার কষ্ট যেমন তাদের চোখের পানির ধারা বইয়েছিলো, সেই ধারাটি আজ তাদের খুশির প্রতীক! হাবিব যত শিগগিরই পারে মায়ের সাথে একবার দেখা করে আসতে চায়। শোকের মাঝেও একটা অবর্ণনীয় সুখ খেলা করছে হাবিবের মনে। অনেক টাকা হাতে পেয়েছে, জীবনের প্রথম উপার্জন; যদিও পূর্বে টিউশনি করে কিছু টাকা উপার্জন করেছিল। বড় অংকের টাকা আজ সে কামিয়েছে, বাড়িতে গিয়ে বোনকে দিয়ে খরচা পাতির লিস্ট তৈরি করবে, বাবা থাকাকালে যেমনভাবে গাড়িভর্তি খরচ আসতো তেমনিভাবে কাল ই সে করবে। সিলেট পৌঁছালো পরদিন সকালে। মাকে দেখে বিমূঢ় হাবিব! হঠাৎ এক অভাবনীয় বিপদের মুখোমুখি পড়ে পরিবারকে নিয়ে যে দুশ্চিন্তামগ্ন ছিল তার অনুভূতি সে ছাড়া দ্বিতীয় কেউ বুঝবে না, অবশ্য পরিবারের সকলেই দুশ্চিন্তাটা পৃথকভাবে অনুভব করে আসছে যার যার মতো। ঢাবি ভর্তির লড়াইয়ে সে নিজের মেধাকে হাতিয়ার করে লড়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে চেয়েছে। কিন্তু মা যে এতটা অসুস্থ, জ্বরে শরীরটাকে শোষতে বসেছে, চোখের নিচে কালি পড়ে মাকে অপরিচিত করে তুলছে। বোনের কাছ থেকে তাও জানতে পারলো যে পাড়া-প্রতিবেশী তেমন একটা খবর নেয়না, তাদের হাঁস-মোরগ গুলো পাশের জমিতে চলে যায় বলে মালিক মজিদ মিয়া একটা মোরগ মেরে ফেলেছে, অন্যটিকে ঠেঙিয়ে আধমরা করে রেখেছে। পাড়ার বখাটে ছেলেগুলো অভিভাবকহীন অনিমাকে যেন তাদের লোভাতুর অভিশপ্ত দৃষ্টি দিয়ে গলাধঃকরণ করতে চায়। অকাল স্বামী বিরহ, ছেলের অভাব, মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তা সবদিক সামলাতে লতিফা বানু যেন হাবিবের চেয়েও বেশি অক্ষম হয়ে পড়লেন। চোখের সামনে বর্তমান এসব ঘটনার ঘনঘটা এইটুকুন হাবিবের জন্য মাত্রাতিরিক্ত নয় কি? অবশ্য তার সহ্যশক্তির ক্ষমতার বাইরের। কিন্তু পেছনে তনিমার পরামর্শমূলক সহযোগিতা তার ভারকে অনেকাংশে লাঘব করেছে। আজ যখন বোনকে ফোনালাপে বাড়ির, মায়ের অবস্থা জানালো তখন তনিমা নিশ্চুপ ছিলো, শুধু শুনছিলো কথাগুলো। কথাগুলো তার অজানা ছিলোনা। কেবল হাবিবের পরীক্ষাটার অপেক্ষায় ছিল । ভার্সিটির পড়া শুরু হবে । তনিমা শুধু চিন্তা করছে আর করছে, সমাধান খুঁজে পাচ্ছেনা। অনেক ভেবে ফোন দিল হাবিবকে, হাবিব এক কথায় ঢাকায় যাওয়ার কথা না করে দিল। সে জানে বোনটিও তার পড়েছে উভয় সংকটে! কিন্তু তার নিজেরও তো কিছু করার নেই। সংকটাপন্ন পরিবারকে এভাবে ফেলে রেখে যেতে তাঁর বিবেকে বাধলো। তনিমা কোনো কথা বলল না। হাবিব বোনকে এমনভাবে সান্ত¡না দিতে লাগলো যেন সে নিজে কিছুই টের পাচ্ছেনা, মা'র উপরও ঠিক সেই ক্ষমতাটা প্রয়োগ করছে। সে সবাইকে বলা কথাগুলোর একটি হলো, 'মা কে এভাবে ফেলে রেখে চলে গেলে আল্লাহ ছাড় দিবেন না।' ছোট বোনটা শুধু নীরব দর্শক হয়ে থাকে, তার মনেওতো অনেক লুকানো চাপা কষ্ট, হয়তো প্রকাশের ক্ষমতা তার অন্যরকম!

হাবিব যেখানে মাকে তার ইহকাল-পরকালের সম্বল ভেবে নিয়েছে, পরিবারকে বিপদের মুখে ফেলে রেখে আসতে চাচ্ছে না সেখানে তনিমা ভাইকে জোর করে আনার যুক্তি খুঁজে পেলোনা। কিন্তু চাপা কষ্টে ভুগছে সে। একদিকে মায়ের অসুস্থতা,বোনের দুর্দশা আর অন্যদিকে ভাইয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নাগাল পেয়েও ছেড়ে দেয়া! খাওয়া-পরা কিছুই তার ভালো লাগেনা, হয়তোবা যতক্ষণ সম্ভব না খেয়েই থাকতো, কেবল স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়েই সে ভালো থাকার অভিনয় করে। তার বিবেকে বাধে, কেন মানুষটাকে মিছেমিছি কষ্ট দেবে; যেখানে তনিমা ছাড়া তোফায়েলের আপন বলতে কেউ নেই, তনিমার সুখ-ই তোফায়েলের সুখ। আর এটা যে সত্য তার প্রমাণ আবারও পাওয়া গেল। রাতে তনিমা ঘুমাতে গিয়ে ওপাশ ফিরে কাঁদছে যে সেটা তোফায়েলের বুঝার বাকী রইলো না। সে প্রতিদিন স্ত্রীর এমন মলিন মুখ সহ্য করতে পারবেনা না, তাছাড়া নিজেও এভাবে চোখের সামনে একটা মেধাবী ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে সহ্য করতে পারছিলোনা। সব মিলিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো যা আরেকটি গল্পের জন্ম দিলো।
মা, ভাই, বোনসহ মেয়ে আর স্বামীকে নিয়ে তনিমার দিন বেশ ভালোই যাচ্ছে। ঢাকায় আছে সবাই। হাবিব অনিমার পড়া বন্ধ হতে দেয়নি। বহু কষ্টে বোন-দুলাভাইয়ের সহযোগিতা, নিজের প্রচেষ্টা আর মায়ের দোয়া নিয়ে এগিয়ে এসেছে বহুদূর। অনিমা স্নাতক(সম্মান), গণিত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী আর হাবিব ৪র্থ বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে রসায়নে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছে। সেদিন তনিমার চেয়ে বেশি কেউ খুশি হয়েছিলো কি না তা বুঝা যায় নি।
হাবিব প্রথমবারের মতো বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে টিকতে পারলো না। কেউ ই মন খারাপ করতে চাইলো না, কারণ আল্লাহ তাদের সকল চাওয়াকেই পাওয়ায় পরিণত করেছেন। সামনের বার হয়তো আল্লাহ তাদেরকে রীতিমতো খুশি করবেন। সেই ভাবা মতোই পরের বার হাবিব মাস্টার্স পরীক্ষা দেয়ার পর যখন বিসিএস পরীক্ষা দিলো সত্যিই টিকে গেলো। পরিবারের সকলের খুশিটা অনুভব করে আমারও ইচ্ছে হচ্ছে তার ভাগটা নেই। যাক, কপালে থাকলে জুটবেই, ইনশা-আল্লাহ।
রাতে সকলে একসাথে খেতে বসে তনিমা মাকে বলল, 'মা, আমি তো পড়াটা শেষ করতে পারিনি(মেয়ের জন্মের পর ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ায় স্নাতক ২য় বর্ষে থাকাকালেই তার লেখাপড়ার ইতি ঘটে), তোমার ছেলেতো একেবারে ফাটিয়ে দিলো।' মা উত্তরে বললেন,'মা রে,সব ই তো তোদের মাধ্যমে,আলহামদুলিল্লাহ।'
তনিমা মুচকি হসলো। ক্রমে সবার দিকে চোখ ফেলে বলল,'মাঝে মাঝে বেশি সুখও সহ্য হয় না, আতংকের সৃষ্টি করে। জানি না কেন যেন বার বার মনে হয় এত সুখ কী চিরদিন থাকবে? কভু যদি শেষ হতো না! '
হাবিব সায় দিয়ে বলল, 'আমারও তাই মনে হয় আপু।'
অনিমা 'হুম 'বলে অংশ নিলো।
তোফায়েল বলল ‘আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।'
মা বললেন, ‘হ্যা রে মা।’
তনিমার আশংকা সত্যিই ছিলো। পাঁচ মাস পরেই একটি ছেলে সন্তান জন্ম কালে রক্তস্বল্পতার কারণে অপারে পাড়ি দিয়ে তাঁর ভাবনাকে সত্য প্রমাণ করলো। তখনকার শোকের পরিমাণটা মাপার জন্য যে বাটখারার প্রয়োজন সেটা আমার কাছে আদৌ নেই।
কেটে গেলো পাঁচটি বছর। হাবিব অধ্যাপনায় আছে, অনিমা বোনের দুটি সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়ে করছেনা দেখে তোফায়েল সাহেব বিয়ে করে নিলেন তাকে। আর সালেহা বানু, তিনি বার বার ভিন্নধর্মী পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে দাঁড়াতে পাক্কা অভিনেত্রী বনে গেছেন।
প্রথমবার ভাঙনের বাধ ছিলো তনিমা, দ্বিতীয়বার তোফায়েল, তৃতীয়বার অনিমা। শেষ পর্যন্ত এ পার্টে আছেন সালেহা বানু, ভবিষ্যতে হয়তো হাবিবকে এ পার্ট নিতে হবে!
সিলেট, বাংলাদেশ