অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
প্রস্থানের পূর্বক্ষণ- রাসেল আহমেদ

সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। পিনপতন নিরবতা। এখানে ঘাঁটি পেতে থাকা মানুষগুলোর কোন কিছুতে মাথা ব্যথা নেই। ঘুম থেকে উঠে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার তাড়া নেই কারো। নেই অফিস, শপিং মল বা কোথাও বেড়াতে যাওয়ারও প্রস্তুতি। ইতিহাস হয়ে আছে হাসি-কান্না, ঝগড়া-বিবাদ, নাচ-গান, গল্প-গুজব। সন্তানদের নিয়ে অযথা চিন্তা করেন না এখানে অবস্থানরত বাবা-মায়েরা।
আমি হাঁটছি। গন্তব্যে পৌছার সাথে সাথে মামার আওয়াজ কানে আসলো।
- রাসেল আসছো?
মামা সহজে আমাকে চিনে ফেলায় খুশি লাগল।
-জী মামা। - এতো দিন পর বুঝি আমার কথা মনে পড়ল?
- সরি মামা। প্রত্যেক দিনই মনে হয়। কিন্তু .......
কথার মাঝখানে আমাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন,
-থাক রাসেল! আর বলার প্রয়োজন নেই। তুমি এসেছো এতেই আমি খুশি। তারপর বল কেমন আছো তুমি?
- আলহামদুলিল্লাহ। আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন মামা?
আমার প্রশ্নে মামা নিরব হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর উত্তর দিলেন,
- একা একা কি ভালো থাকা যায়? তবুও ভালো আছি। ভালো যে থাকতে হয়।
উত্তর শুনে আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। সত্যি তো একা একা ভালো থাকা যায় না। কয়েক সেকেন্ড পর মামাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম,
- আপনার একাকিকত্ব কি আশেপাশের মানুষ দ্বারা দূর করা সম্ভব নয়?
- না রাসেল। এখানের সবাই যার যার মতো করে একা। তোমাকেও একা থাকতে হবে তোমার মতো করে।
মামার কথায় অল্প ভয় পেলাম। সাহস সঞ্চয় করে মামার দিকে তাকালাম। মামাকে বললাম,
- সময় কাটে কীভাবে?
জবাবে মামা জানালেন,
- এখানের দিন রাতের বর্ণ একই। অতিবাহিত করতে হয় না, অতিবাহিত হয়ে যায়।
মামা যোগ করলেন,
-আচ্ছা আমাদের বাসায় যাওয়া হয়?
-জী মামা। মাঝে মাঝে যাই।
মাঝে মাঝে কথাটা মামাকে অবাক করল। নিজেকে অপরাধী মনে হল। কেননা শহরে আসার পর আমি প্রতি সপ্তাহে ২-৩ বার মামাদের বাসায় যেতাম এখন আর সেরকম যাওয়া হয় না। ঢোক গিলে মামার দিকে তাকালাম।
-বাসার সবাই কেমন আছে রাসেল?
আমি জানি কেউ ভালো নেই তার পরও বললাম,
-সবাই ভালো আছেন মামা।
-আমাকে কি সবাই ভুলে গেছে?
মামার এই রকম প্রশ্নে আমি হতভম্ব না হয়ে পারলাম না।
আমি বললাম,
-মামা, যেখানে আপনি ছিলেন মধ্যমণি সেই আপনাকে কিভাবে সবাই ভুলে? আমি তো আপনাকে প্রতিটা মুহূর্ত স্মরণ করি। আপনার সাথে বসে গল্প করা, খবরের কাগজ পড়া, একসাথে বসে দুপুরের খাবার খাওয়া। এসব কি ভুলা যায় মামা? খেতে খেতে আপনি যখন আপনার ছেলেবেলা নিয়ে স্মৃতিচারণ করতেন সেগুলো শুনতে কতই না রোমাঞ্চকর মনে হত আমার কাছে।
এতক্ষনে মুচকি হাসির রেখা ফুটে উঠতে দেখলাম মামার মুখে।
-জীবনটা এই রকমই রাসেল। কিছু চিহ্ন ফেলে আসা হয় তা আঁকড়ে রাখার জন্যে।
-আচ্ছা মামা এমনটা কেনো হল? আপনাকে তো সেদিনও ভালো দেখে এলাম। আপনি কষ্টটাকে আড়াল রেখে চিরচেনা হাসিতে আমার কুশল জানতে চাইলেন। আপনার শেষ সময়টুকু আমাকে এখনো পীড়া দেয়। নিজেকে দোষী মনে হয়। আপনার জন্যে কিছুই করতে পারলাম না।
-তুমি দোষী হবে কেন? সবকিছু ভালোর জন্যই হয়।
-তা তো বুঝলাম মামা। তারপরও তো কিন্তু থেকে যায়। সেই কিন্তুর উত্তর যে আমি এখনও খুঁজে বেড়াই মামা।
-রাসেল?
-জ্বি মামা।
-এখন তো আমার চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
-অল্প কিছু সময় থাকা যায় না মামা?
-না।
-ঠিক আছে মামা। আবার দেখা হবে।
-হ্যা, আবার দেখা দিবো। বাসার সবাইকে আমার কথা বল। তুমি ভাল থেকো । 
মামার বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে মনে হল সকল কবরবাসী আমাকে সামনে দৃশ্যমান। সবার সাথে মামাকে মিশে যেতে দেখলাম। একই রঙ্গের পোষাক পরিহিত হওয়ায় মামাকে আর আলাদা করা গেল না।

সিলেট , বাংলাদেশ।