অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
বিষাক্ত সম্পর্ক - রহমতুজ্জামান রানা

আমাদের সম্পর্কের আজ প্রায় দশ বছর হতে চলল। প্রথম দেখার দিনক্ষণ নাকি মনে রাখতে হয় কিন্তু কি অদ্ভুত! আমার সেভাবে ঠিক কিছুই মনে নেই। অবশ্য প্রথম দেখা হয়েছিল ২০০০ সালে স্কুল পালিয়ে এবং সেই অভিজ্ঞতা খুবই ভয়াবহ। এরপর আর স্কুল পালানোর সাহস হয়নি এমনকি কলেজে উঠার পরেও কোনদিন দেখা করার কথা মনে হয়নি। কলেজ শেষে গেটের পাশেই বাকিরা যখন দিব্যি করে যাচ্ছে, আমার কাছে মনে হতে, ধুর! বখাটে সব, এইসবের বয়স নাকি এখন। মনের ভিতর পুষে রেখেছিলাম আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠি তারপর ঠিক দেখা হবে। ২০০৬ সাল বাসা ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের একা রুমে থাকতে শুরু করলাম, সে যেন এক অন্য জগত তৈরি হতে থাকলো। ইচ্ছে করেই রাত জাগি, রাত জেগে ইঞ্জিনিয়ারিং এর কি সব আবোল-তাবোল ড্রয়িং করি, নিজেকে হঠাৎ করেই খুব বড় মনে হতে লাগলো। রাত-গভীরে জানালা খুলে দিয়ে পা ঝুলিয়ে বসে থাকি, সামনে গাছগুলো পেরিয়ে জমাট অন্ধকার, শীতল বাতাস শরীরে এসে খেলা করে, পিছনে মৃদু সুরে গান বাজতে থাকে আর হাতে ধূমায়িত চায়ের মগ ঠিক এই সময়টায় যেন বেশি মিস করতে থাকলাম। নাহ, আমাদের তবে শুরু করাই উচিৎ। মনে কতশত ভয় বন্ধুরা জানলে নিশ্চিত হাসি-তামাশা করবে, হলের সিনিয়ররা দেখলে খারাপ চোখে দেখবে। এতো শত শঙ্কা নিয়ে রাত গভীরে সবাই ঘুমিয়ে গেলে, ফ্লোরের সব লাইট বন্ধ হয়ে গেলে, মোবাইলটা নিয়ে পা টিপে টিপে ঠিকই ছাদে পৌঁছে যেতাম। আহ! সে এক অন্যরকম অনুভূতি। দিনে দিনে সেই অনুভূতিগুলো যেন পূর্ণতা পেতে থাকলো। বৃষ্টি হলে তোমাকে চাই, পূর্ণিমার আলোয় তোমাকে চাই, রাত জাগা হতে ভোর অব্দি তোমাকে চাই। বয়স বাড়ার সাথে সাথে একটা সময় বন্ধুদের, সিনিয়রদের সেই হাসি-তামাশা’র ভয় উপেক্ষা করা শুরু হল, ধুর! দেখে দেখুক কি আসে যায় তাতে! অন্য সব বন্ধুরা নাকি এইসব ব্যাপারে উৎসাহ দেয়, খানিকটা প্রলুব্ধ করে কিন্তু আমার ক্ষেত্রে হল উল্টো। কাছের বন্ধুটি শুধু বলল এই তাহলে অবস্থা, ঠিক না মোটেই ঠিক না। আমার ভিতরেও জেদ চেপে বসলো, কেন ঠিক না অবশ্যই পারবো, চাইলেই ছেড়ে চলে আসতে পারবো। অনেকটা চ্যালেঞ্জ নিয়েই টানা একবছর পরিমিত দেখা হতে লাগলো। এরপর আর আর কোন দ্বিধা কাজ করেনি। এমনকি এতোটাই নিয়মিত হতে থাকল যে, একদিন পরীক্ষার হলে লেখা শেষ হয়ে যাবার পরেও বসে আছি দেখে এক স্যার বলেই বসলেন, শুধুশুধু বসে না থেকে বাইরে যাও, দেখা কর। অনেক বছর হতে চলল তবু সম্পর্কের কথা অনেকেই জানে না বাসার মানুষগুলো হয়তো এতোদিনে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে কিংবা পারেনি। ইচ্ছে হয়নি জানানোর কি দরকার থাকুক না গোপন। আর এইসব তো লোক দেখানোর ব্যাপার না। সময় গড়াচ্ছে আর সম্পর্কটাও দিনে দিনে বিষাক্ততায় ভরে উঠছে। আর তাছাড়া ভালোবাসায় অভ্যস্ত হতে নেই এতে অনেক সময় তিক্ততা বেড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। জানি, একসময় আর দেখা হবে না, সময়ের সাথে সাথে দূরত্ব ঠিকই তৈরি করে নিতে হবে। যৌবনের সেই ভালোলাগা অনভুতিগুলোই শিরায় শিরায় বিষ হয়ে প্রবাহিত হবে। ক্রমেই নীল হয়ে উঠা শরীরে সেই ভালোলাগা ক্ষণগুলোর সাক্ষী হয়ে কেউ একজন না হোক অন্তত কিছু একটা তো থাকুক।

 

রহমতুজ্জামান রানা

সহকারী অধ্যাপক, শাবিপ্রবি ।