অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
হুমায়ূন আহমেদ প্রয়াণ দিবসে - শওকত আহসান ফারুক

নন্দিত নরকে 
কজন কথা সাহিত্যিকের প্রথম বই হাতে এলো, 'নন্দিত নরকে'। বেশ মনে আছে কুমিল্লা কলেজ রোডে প্যানোরমা লাইব্রেরী থেকে কেনা, সাড়ে তিন টাকায়। 
বাসায় ফিরে এক বসাতেই পড়ে ফেল্লাম, ঘোর লেগে গেলো। নতুন লেখকের বইয়ের প্রতি আমাদের আগ্রহ বরাবর, একটু বেশী, প্রথম লেখা মনছুঁয়ে গেলো। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী, হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, মাহমুদুল হক প্রমুখ লেখকদের গল্প উপন্যাস পড়ছি নিয়মিত। হুমায়ুন আহমেদ' নামের সাথে পরিচয় হয়নি, তবে নন্দিত নরক পড়ে, চেনা হয়ে গেলো সেদিনই, এতো আপন করে কিভাবে লেখে। 

লেখক পরিচিতি দেখলাম ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র, মহসিন হলে থাকেন।
ডঃ আহমদ শরীফ ভূমিকা লিখেছেন, ১৯৭০ লিখিত হলেও মুক্তি যুদ্ধের পরে ১৯৭২ সালে কথা সাহিত্যিক আহমেদ ছফা উদ্যোগী হয়ে খান ব্রাদার্স থেকে বইটি প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে দেন, কাইয়ুম চৌধুরী করে দিলেন প্রচ্ছদ।
নন্দিত উপস্থাপন।
একটি স্বল্প দৈর্ঘ উপন্যাস, পরিসর ছিল মাত্র ৭০ পৃষ্ঠা। অনেক ক্ষেত্রে ছোট গল্পের দৈর্ঘও এর চেয়ে বেশী হয়, এই স্বল্প পরিসরে হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসে এমন আবহ তৈরি করেছেন আমারা মুগ্ধ। প্রথম উপন্যাসেই হুমায়ূন আহমেদ ব্যাপক পাঠকের মুগ্ধ মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম ও সার্থক।  

প্রথম পরিচয় 

রসায়ন বিষয়ে ভর্তি হলাম, কার্জন হলে  আমাদের ডিপার্টমেন্টই একটা ক্যান্টিন আছে, আমি যখন ভর্তি হই, সম্ভবতঃ হুমায়ুন আহমেদের পড়া শেষ করে এমফিল করছেন। সিগ্রেট আর চায়ের সাথে আড্ডা, ভীষণ নিভৃত চারী, কথা কম বলেন তবে শেনেন বেশী, মিতভাষী। 
-- আপনার 'নন্দিত নরকে' পড়েছি এক নিশ্বাসে, সেদিন থেকেই ইচ্ছা আপনার সাথে পরিচিত হবার, দেখবো আপনাকে। সোনালি ফ্রেমের গোল চশমা এনটিক টাইপের হাতে সিগ্রেট টেবিলে চায়ের কাপ, চুমুক দিয়ে বললেন, 
-- আপনি কি রসায়নেই পড়েন?
-- জী, এবার ভর্তি হয়েছি, গল্পের বর্ণনায়িত বাড়িটা, আপনি যখন কুমিল্লায় ছিলেন সেই বাড়িটার সাথে মিল খুজে পাই। 
-- আপনি কুমিল্লার ছেলে, আমার বাবা কিছুদিন কুমিল্লায় ছিলেন, বাড়িটা চেনেন নাকি।
-- বাড়িটা চিনি, ঠাকুর পাড়ায় যেতে 'মধ্যমনির' পাশে, জাফর ইকবাল আমার ব্যাচমেট, আপনার ছোটবোন শিখুর সাথে ভালো পরিচয় আছে।
-- ও তাই, চা নিন, সিগ্রেট এগিয়ে দিলেন, গল্পটা লেখার সময় কিছুদিন কুমিল্লা ছিলাম, তাই মিলে গেছে, আপনাদের কুমিল্লার খুব সুন্দর জায়গা, আমার বেশ লেগেছে, জাহাঙ্গীর আমার রুমমেট চিনেন নাকি?
-- রেসকোর্সের জাহাঙ্গীর, রশিদ মঞ্জিলের।
-- হুম।,  মার্চের শেষে  রাতে ডিনামাইট দিয়ে যেই বাড়িটা গুড়িয়ে দিয়েছিলো। 
-- জী, ভালো ভাবেই চিনি, আমার নিকট আত্মীয়, মামা হয়, ছোট ভাই খোকন আমার বন্ধু।
-- নতুন বই ধরছি ‘শঙ্খনীল কারাগার' সহসাই পাবেন, আপনি এখন আরো কাছের লোক। 

এভাবেই পরিচয়, নিয়মিত পাবলিক লাইব্রেরীর চত্তরে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে, বিকালের আড্ডায় দেখা হয়, কথা হয়। ততোদিনে, 'শংখনীল কারাগার' বেরিয়েছ, বাংলা গদ্য সাহিত্যে একজন একটি নতুন প্রাঞ্জল নক্ষত্র, জয় করবে নিশ্চিত। 
এখন রসায়ন বিভাগে শিক্ষক, ২য় বর্ষে ভৌত রসায়ন পড়াবেন। আমার প্রথম ক্লাশ, কথা সাহিত্যিকের অপেক্ষায় আছি কিভাবে পড়াবেন রসায়ন, সেই প্রতীক্ষা, প্রথম ক্লাশেই দিলেন দিলেন চমক!

এককাপ চা

সবাইকে আপনি করেই বলেন। আজ আমি আপনাদের এককাপ চা বানানো শিখাবো বলে, বুনসেন বার্ণার  জ্বালালেন, একটি বিকারে পানি নিয়ে চাপিয়ে দিলেন। পানি ফু্ঁটে উঠলো। থার্মোমিটার দিয়ে মেপে দেখলেন ১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, এবার একচামচ চিনি ও  এক চামচ চাপাতা দিয়ে ৩০ সেকেন্ড ফুটিয়ে, বার্ণার বন্ধ করে দিয়ে ঢাকনি দিয়ে ঢেকে দিলেন, ১ মিনিট আপেক্ষা করুন। হয়ে গেলো সুবাসিত এককাপ চা।
আপনাদের বিকেলে, তিন ঘন্টার ব্যবহারিক ক্লাশ থাকে প্রতিদিন, ড্রয়ারে চা পাতা ও চিনি রাখবেন, ক্লাশে চা পান করবেন, মন প্রফুল্ল থাকে।
# সুবাসিত চায়ের রেসিপিটা, আমার হুমায়ুন ভাইয়ের কাছেই শেখা।

শওকত আহসান ফারুক
বাংলাদেশ।