অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
উপমহাদেশে দ্বিজাতিতত্ত্বের পুনরুত্থান - রবি শঙ্কর সেন নিশান

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পার্লামেন্টে অতি সম্প্রতি বহুল বিতর্কিত নাগরিকত্ব বিল - ২০১৬ পাশ হয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ বিলটি প্রস্তাব করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের ভিত্তিতে বিলটি পাস হয়। এই নতুন আইন অনুসারে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের নির্যাতিত অমুসলিম নাগরিককেরা ভারতের এই আইন অনুযায়ী ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ করতে পারবে। অমুসলিম শব্দটির ব্যখ্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রীস্টান, ইহুদী ধর্মাবলম্বী। সাম্প্রদায়িকতায় উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে বলে বিবেচনায় নিয়ে এই বিলটির সর্বাত্মক বিরোধিতা করেছে কংগ্রেস, বাম দলসহ সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গ। এই বিলটির প্রেক্ষিতে ভারতের আশপাশের দেশে সাম্প্রদায়ীক সংঘাত আরো বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশও এর আওতার বাইরে নয়। বিলটি পাশ হওয়াতে ক্ষোভে ফুসছে সারা ভারত। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই বিলের প্রতিবাদে আসামের তিন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছে।

নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার সময় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সহ সামাজিক, সামরিক সকল খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। নতুন প্রজন্মকে দেখিয়েছিলেন সুপার ইন্ডিয়ার স্বপ্ন। আবার নিজের দল সহ ভারতের মনুবাদী-ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ ও তাদের বিশাল ভোটব্যাংকে শুনিয়েছিলেন প্রাচীন ভারতের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পুনস্থাপিত করার বানী। কর্পোরেটদের দেখিয়েছিলেন বিশাল মুনাফার্জনের স্বপ্ন। নিজের চা বিক্রেতা থেকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার গল্প শুনিয়ে নিজের দিকে আকর্ষণ করেছিলেন ভারতের নিম্মবিত্ত পরিবার ও গরীব-দুঃস্থ পরিবারের ভোটারদের। অর্থাৎ যে দেবতা যে ফুলে তুষ্ট হয় তিনি সেই ফুল দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ভোটারদের কাছে টেনেছেন। এমনকি কালোটাকা ফিরিয়ে এনে প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের ব্যাংক একাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে লোন দেয়ার অবাস্তব ঘোষণাও দিয়েছিলেন। আর কঠিন সত্য হলো বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনগণ এসব অবাস্তব বক্তব্য গ্রহণ করেছেন। এভাবেই মোদী নিজের দিকে শক্তিশালী জোয়ার সৃষ্টি করেছেন। কংগ্রেসের শক্ত কোন নেতৃত্ব না থাকায় এবং প্রগতিশীল মহলে বিভাজনের সুযোগ নিয়ে বিজেপি জনপ্রিয়তা নিয়ে  পার্লামেন্টে জায়গা করে নেয়। 

জয়ী হওয়ার সাথে সাথেই খোদ বিজেপিতেই  মোদীর বিরোধিতা তুঙ্গে ওঠে। গুজরাটে মোদী বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি ও বিরোধী দলের ভয়াবহ অন্তর্কোন্দলের জোরে মুখ্যমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন। সেই সাথে অটল বিহারী বাজপেয়ীর জনপ্রিয়তাও একটি বড় কারণ ছিল। তবে গুজরাটে ক্ষমতায় গিয়েই ভয়াবহ দাঙ্গা লাগিয়ে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে এবং কর্পোরেটদের একচেটিয়া লুটপাটের সুযোগ করে দেয়। আবার নির্বাচনের সময় সেই লুট করা অর্থের অংশ ছিটিয়ে ভোট টেনে এনে  মোদী বারংবার জিতে আসেন। গুজরাটকে বেসরকারীকরণের শীর্ষে নিয়ে যান। কিন্তু এসব করে গুজরাট চালাতে পারলেও সুবিশাল ভারত রাষ্ট্র চালানো যায় না। শাইনিং ইন্ডিয়ার নামে সুপার পাওয়ার হিসেবে ভারত প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি আবার ভারতের সুপ্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নামে মনুবাদ-ব্রাহ্মণ্যবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার প্রকৃতপক্ষে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য। একটি যুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আরেকটি প্রথা ও কুসংস্কার। দুইটি একসাথে কখনোই সম্ভব নয়। মোদী নিজ প্রচারে দুইটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। সবক্ষেত্রেই পরস্পর বিরোধী প্রতিশ্রুতি দিয়ে, স্ট্যান্ডবাজি করে গেছেন। এতেই বিজেপি'র পোড়খাওয়া নেতৃবৃন্দ মোদীর উপর ক্ষেপেছিলেন। অর্থাৎ যে দেবতা যে ফুলে তুষ্ট সেই পলিসি ভারতের সাধারণ জনগণ খেলেও, নিজ দলের সকলে খায়নি। মোদীর প্রতি দলীয় প্রবীণ নেতাদের এই অনাস্থার কারনে প্রথমেই মোদী সরকার হোঁচট খায়। তাই দলের অভ্যন্তরে লালকৃষ্ঞ আদভানীর মতো নেতাদের বিজেপিতে কোনঠাসা করে ফেলা হয়।

ভারত বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির দেশ। সুপ্রাচীন আর্য-অনার্য সংঘর্ষ ও এরপরে আজ পর্যন্ত ভারতীয় সমাজব্যবস্থা দেখলে উপরিকাঠামোতে একে উদার-সহনশীল, সম্প্রীতির রাষ্ট্র বলে মনে হলেও এর অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত কট্টরতা অত্যন্ত বেশি। আজো ভারতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব গভীর শিকড় গেড়ে আছে। দেশের বড় একটি অংশ, বলা যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মাতৃত্বকালীন সেবা, টিকা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবা এবং সেনিটেশন সুবিধার আওতার বাইরে। কয়েকটি প্রদেশে  আজো পিতা বা পরিবারের অবাধ্য হলে “সম্মান রক্ষার্থে হত্যা” বা “অনার কিলিং” বহুল প্রচলিত। পরিবারের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত বা পড়ালেখার চাপ সইতে না পেরে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার তালিকায় ভারত বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কৃষক আত্মহত্যার পিছনেও অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি জাতভেদে সেচের পানি বন্টন প্রথা অন্যতম কারণ। শাইনিং ইন্ডিয়ার উন্নয়নের আলো সারা ভারতের সব প্রদেশের এক গুচ্ছ শহরেই জ্বলে। বাকি অংশ সামন্তবাদী ধারণা, কুসংস্কার আর অজ্ঞানতার গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। কংগ্রেস বা বিজেপি যে সরকারই পূর্বে ক্ষমতায় এসেছে তারা কেউই এসব সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। তাই মোদীর প্রতিশ্রুতি ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে। সবাই মোদীতেই সমাধান দেখেছে।     

মোদী ক্ষমতায় এসে ভারতীয় জনগণের এসব সমস্যা সমাধানে ব্রতী না হয়ে প্রথমে অবৈধ অর্থ ও জাল নোট খুঁজে বের করার জন্য ১০০০/৫০০ টাকার নোট বাতিলের প্রকল্প হাতে নেয়। এই পদক্ষেপ ভারতীয় অর্থনীতিতে বড় আঘাত করেছে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল সেটিও পূরণ হয়নি। মোদী সরকার বছরে এক কোটি যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারও কোন সমাধান হয়নি। বরং ভারতের বেকারত্বের হার আরো বেড়েছে। জ্বালানী তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি মোটেও। বিদেশী বিনিয়োগ কমেছে, সেই সাথে দেশে থাকা অতীতের বিনিয়োগ বর্তমানে অন্যত্র স্থানান্তর হচ্ছে। একের পর এক ট্যাক্স আরোপে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। বিদ্যুৎ খাতে বিপ্লব আনার ঘোষণা দিলেও কার্যত কিছুই করেননি। কালোটাকা উদ্ধার করে ব্যাংক হিসাব প্রতি ১৫ লক্ষ টাকা লোন দিতে তো পারেনই নাই। উল্টো ক্ষমতায় আসার সময় মাথাপিছু ৫৬ হাজার টাকার বিদেশী ঋণের পরিমাণ  অনেকটাই বেড়েছে। বাণিজ্য খাতে মোদী ও তাঁর সরকারের একের পর এক ব্যর্থতা দেখে প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সবাইকে একজোট হয়ে মোদীকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিদায় করার আহবান জানিয়েছেন। তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে, উদ্ভূত পরিস্থিতি অনুযায়ী বিজেপি বিরোধীরা একজোট হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি প্রাদেশিক নির্বাচনে বিজেপি পরাজিত হয়েছে। অবস্থা বেগতিক দেখে পদত্যাগ করেছেন সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর উরিজিৎ প্যাটেল।  

অর্থনীতিতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে সংকট হতে জনগনের চোখ সরানোর জন্য এমন কোন পদ্ধতি বাকি নেই যা মোদী সরকার করেনি। ইসলামী জঙ্গী গোষ্ঠী দ্বারা উরি হামলার পর ভ্রান্ত কাশ্মীর নীতিতে দেশ উত্তপ্ত করার চেষ্টাতেও সফল হতে পারেনি। কাশ্মীর ইস্যুতে দিল্লীর জওহরলাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি বামপন্থী ও জনপ্রিয় ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমার বনাম মোদী সরকারের দ্বৈরথে নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর সহযোগী মন্ত্রীগণ পরাজিত হয়েছেন৷ তাদের নানামুখী দমন-নিপীড়ন পদ্ধতি বামদের সৃজনশীলতার কাছে পরাজিত হয়েছে। মেধাবী ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমার একাই দেয়াল হয়ে মোদীর সরকারকে নানাভাবে পর্যুদস্ত করে। কাশ্মীর ইস্যু ব্যর্থ হলে বিজেপির মাঠ কর্মী এবং অনলাইন এক্টিভিস্টরা একের পর এক ইস্যু যেমন "টিপু সুলতান বিতর্ক", "তাজমহল বিতর্ক", "গোরক্ষক সমিতি", "রাম মন্দির", "মুসলিম জনসংখ্যা বিস্ফোরণ", "কল্পিত লাভ জিহাদ" ইস্যুসহ নানা উপায়ে উস্কানি তুলে গুজরাট মডেলে ভারতজুড়ে নানা কায়দায়, নানা ছুতোয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা করে গেছে। এখনো করে যাচ্ছে। 

মোদী সরকার নিজের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন ছেড়েছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চল যেখানে আজ পর্যন্ত স্বাস্থ্য কর্মী যেতে পারেনি সেখানেও মোদীর নামে বিলবোর্ড তোলা হয়েছে। হাজার কোটি টাকার বিজ্ঞাপনের লোভে মিডিয়াগুলো নির্লজ্জ ভাবে মোদী স্তুতিতে ব্যস্ত। এরপরেও মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থান সহ কয়েকটি রাজ্যে শেষ রক্ষা হয়নি। গত বছরই শেষদিকে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা উঁচু মুর্তি হিসেবে বল্লভ ভাই প্যাটেলের মুর্তি উদ্বোধন করে জনগণের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন।এতে তিনি সফল হয়েছেন কিনা তা সময় বলবে। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট অভিযোগ করেছে যে এই প্রকল্পে ভারতের দারিদ্র্য তহবিলে তাদের দেয়া অনুদানের ৩০০০ কোটি  টাকা খরচ করে ফেলেছে মোদী সরকার। তারা ভারতের দারিদ্র্য তহবিলে আর অনুদান দেয়ার প্রয়োজন নেই বলে মত প্রকাশ করেন।     

ব্যর্থতা যে শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ তা নয়। বিশ্বব্যাপী চৌকস পররাষ্ট্র কর্মকর্তাদের আতুঁরঘর হিসেবে পরিচিত ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই মেয়াদে যথেষ্ট অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। চীনের সাথে "ডোকলাম উপত্যকা বিবাদ", বাংলাদেশ-বার্মার "রোহিঙ্গা ইস্যু" একটি বড় উদাহরণ। দুইটি ক্ষেত্রেই চীন নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করে। মোদীর আমলে পার্শ্ববর্তী সকল দেশগুলোতেই ভারত বিরোধিতা বেড়েছে।সর্বশেষে আফগানিস্তানে ভারত দায়িত্বশীল আচরণ করছেনা বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরব।   

মোদী সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও কম নয়। অমিত শাহ - এর পুত্র আঙুল ফুলে কলাগাছের আকার ধারণ করেছে। বিজয় মাল্য, নীরব মোদীর মতো জনগণের অর্থ লুটপাটকারীদের নীরবে দেশত্যাগ এবং তাদের সকল ব্যাপারেই সরকার নিষ্ক্রিয়তার দোষে অভিযুক্ত। কংগ্রেস আমলে শিকড় গেড়ে বসা প্রশাসনিক দুর্নীতি আরো শক্তিশালী হয়েছে। মোদীর ঘনিষ্ঠ "পতঞ্জলী হারবাল"-কে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সহায়তায় আসাম রাজ্যে বিশাল জায়গা দখলের সুযোগ করে দেয়ার অভিযোগ তো রয়েছেই। মরার উপর খাড়ার ঘা এর মতো সৃষ্টি হয়েছে "রাফাল বিতর্ক"।             

সামরিক খাতেও ভারত এই সরকারের আমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বারংবার সীমান্ত অতিক্রম করে সেনা ছাউনিতে প্রবেশ করে সেনা হত্যার ঘটনা ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করছে। ডোকলাম উপত্যকা শেষপর্যন্ত চীন দখলে নিয়েছে। উরি হামলা'র পর ভারত সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ হিসেবে সার্জিক্যাল স্ট্রাইককে দেখানো হলেও অপারেশনের সাথে যুক্ত সদ্য অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডি. এস. হুদা একে রুটিন অভিযান বলে স্বীকার করে নেন। নিম্নমানের বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, অপর্যাপ্ত রেশন সাপ্লাই সহ নানা অভিযোগে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ আছে। ভারতীয় সাবেক সেনাপ্রধান প্রায় প্রকাশ্যেই চীন ও পাকিস্তানের সম্মিলিত সম্ভাব্য আক্রমণে নিজেদের সামরিক অসমর্থতার কথা বলে ফেলেছেন। এ সরকারের আমলেই ভারতের তৈরি সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রসমূহ। 

ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্তারে সময় নষ্ট করে নূন্যতম অবকাঠামো উন্নয়নও ঘটানো হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাত সহ সকল খাতই সংকটে পড়েছে। ৪ টি প্রদেশ বাদে সকল প্রদেশেই স্বাস্থ্য সেবার অবনতি ঘটেছে। গবেষণা খাতে যোগ্য গবেষকদের বাদ দিয়ে প্রবল স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ করা হয়েছে। এর প্রভাবে ভারতের আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মঞ্চ থেকে নিতান্ত ছেলেমানুষী ও হাস্যকর সব আবিষ্কারের ঘোষণা আসছে। সংকট এতই প্রকট যে কেন্দ্রীয় সরকারের সামাজিক সুরক্ষা তহবিলের অধীনে বিগত ৫ বছরে ভারতে একটিও স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল হয়ে থাকলে তার খোঁজদাতাকে ১৫ লক্ষ টাকা পুরষ্কার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রখ্যাত অভিনেতা নানা পাটেকর। 

১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়। কথিত আছে যে কায়েদে আজম জিন্নাহ এবং জওহরলাল নেহেরুর প্রধানমন্ত্রীত্বের দ্বন্দ্বই বিভক্তির প্রধান কারণ। এই ভ্রান্ত দ্বিজাতিতত্ত্বের তত্ত্বের যে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই সেটা আজ বহুলভাবে প্রমাণিত। দ্বিজাতিতত্ত্বের অশুভ পরিণতিকে অতিক্রম করে বাংলাদেশ - ভারত - পাকিস্তানের জনগণ অনেক এগিয়ে গেলেও আজো কমবেশি এর দ্বারা প্রভাবিত। নরেন্দ্র মোদীর সরকার ট্রাম কার্ড হিসেবে এই দ্বিজাতিতত্ত্বকেই পুনরায় তুলে আনলেন। সংকটে পড়ে দিশেহারা মোদী-অমিত শাহ গং শেষ মরণ কামড় হিসেবে "নাগরিকত্ব আইন - ২০১৬" পাশ করালেন। বিলটি পাশ করানোর মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে ভারতকে অমুসলিম রাষ্ট্র ঘোষণা করলেন। সামনে লোকসভা নির্বাচনে মোদী তথা বিজেপি পরাজিত হলেও এই বিল-এর কারণে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যে পুনরায় ক্ষতিগ্রস্ত হল তা আর বলার অবকাশ রাখেনা। ব্রিটিশ কর্তৃক "বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা" - র মতো দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর প্রভাবের মতো এই নাগরিকত্ব বিল - ২০১৬ যে ভূমিকা রাখবে তা নিশ্চিত রূপে বলা যায়। অপরিণামদর্শী নরেন্দ্র মোদী স্রেফ প্রধানমন্ত্রীত্বের লোভে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশকে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতার একটি অসীম খাদে ফেলে দিয়ে গেলেন। এতসবের পরেও প্রধানমন্ত্রীত্ব রক্ষা হবে কিনা তা দেখার জন্য আগামী লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ভারতীয় জনগণের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে বিশ্ব সহ গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ।

রবি শঙ্কর সেন নিশান
সংস্কৃতি কর্মী, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ