অটোয়া, বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৯
বিলীন হতে চলছে কৃষিজমি -মো.ওসমান গনি

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশে। এদেশের মোট জনসংখ্যার বেশীর ভাগ লোকের প্রধান পেশাই হলো কৃষিকাজ। কৃষি হলো আমাদের দেশের প্রাণ। কৃষি নির্ভর দেশ বাংলাদেশ। বিপুল জনসংখ্যার এ দেশটির প্রায় ৮০ ভাগ লোকই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। তা সত্ত্বেও নদী ভাঙনের পাশাপাশি নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে প্রতিবছর হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় এক লাখ হেক্টর কৃষি জমি। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের মোট ভূমির অর্ধেকই চলে যাবে শুধু বসতি স্থাপনের জন্য। তাছাড়া  হারিয়ে যাওয়া এ আবাদি জমির বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে অনুপস্থিত মালিকদের হাতে। এতে করে একদিকে জমি না থাকায় কৃষক ফসল উৎপাদন করতে পারবে না অন্যদিকে টাকা বা ডলার হাতে থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত খাদ্য পাওয়া যাবেনা বলে আংশকা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইক্যুইটিবিডি’র এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং নদী ভাঙনের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর ৮৯ হাজার হেক্টর কৃষি জমি হারিয়ে ফেলছে। এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের মোট ভূমির ৫০ শতাংশই চলে যাবে শুধু বসতি স্থাপনের জন্য। পরিসংখ্যানে আরো দেখা যায়, আবাদি জমি হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এগুলো চলে যাচ্ছে অনুপস্থিত মালিকদের হাতে। ১৯৬০ সালে শতকরা মাত্র ১০ ভাগ পরিবার দেশের ৩৭ শতাংশ ভূমির মালিক ছিল, বর্তমানে ৭০ শতাংশ পরিবার মাত্র ১৫ শতাংশ কৃষি জমির মালিক। ১৯৬০ সালে দেশে ১৯ শতাংশ মানুষ ভূমিহীন ছিল, ১৯৯৬ সালে ভূমিহীনের হার হয়ে যায় ৫৬ শতাংশ।

উন্নয়ন প্রকল্প বা আবাসন শিল্পের নামে আমাদের দেশে অনেক কৃষি জমি দখল হয়ে যাচ্ছে। ফলে এক সময় আবাদি জমি খুঁজে পাওয়া ভার হয়ে যাবে। নীতি নির্ধারকরা উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশ সয়ংসম্পূর্ণ দাবি করলেও বর্তমানে দেশের ২৬ শতাংশ মানুষ নিয়মিতভাবে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার, অর্থাৎ এরা সবসময়ই ক্ষুধার্ত থাকে। যদি চলমান গতিতে জমির পরিমাণ কমতে থাকে তাহলে এক সময় আমাদের সকলকেই অভুক্ত থাকতে হবে বলে ধারনা করছেন দেশের বিজ্ঞমহল। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি জমি রক্ষা করতে হবে পাশাপাশি কৃষকদের হাতে জমি পৌঁছে দিতে ভূমি সংস্কার করতে হবে। এতে খাদ্য উৎপাদন বাড়াবে।

আবাদি জমি নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা না গেলে দেশ এক সময়ে চরম খাদ্য সংকটে পড়ে যাবে। তখন আমাদের সহায়তা করার জন্য কেউ এগিয়েও আসবে না।  ২০০৮ সালের খাদ্য সংকটের সময় বিদেশ থেকে খাদ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় ডলার থাকা সত্ত্বেও আমরা সেসময় ন্যায্যমূল্যে খাদ্য কিনতে পারিনি। ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের চাল ও গমের দাম ১০০ থেকে ৩০০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছিল। ভবিষ্যতে ডলার থাকলেও আমরা বিশ্ব বাজার থেকে খাদ্য কিনতে পারব না। কারণ বিক্রি করার মতো উদ্বৃত্ত খাদ্যই হয়তো পাওয়া যাবে না। 

আমাদের দেশে নগরায়ন শিল্পায়ন ও নদী ভাঙন মূলত এ তিনটি উপায়ে আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। নদী ভাঙন প্রাকৃতিক হলেও বাকি দুটোর জন্য সম্পূর্ণ রূপে আমরাই দায়ী। তাছাড়া আবাদি জমির বড় একটি অংশ পয়সা ওয়ালাদের হাতে চলে যাচ্ছে। অথচ তারা সেখানে বসবাস করছেন না। কৃষি জমি রক্ষা করতে পরিকল্পিতভাবে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন করতে হবে। পাশাপাশি জমি দখল বন্ধ করতে হবে। অত্যান্ত পরিতাপের বিষয় হলো বর্তমানে আমাদের দেশের সব অঞ্চলে এখন যেভাবে কৃষি জমির মাটি কাটা শুরু হয়েছে তা যদি আমরা এখন প্রতিরোধ করতে না পারি তাহলে একদিন আমরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হতে পারে। দেশে চরম আকারে দেখা দিবে খাদ্যের অভাব। বিশেষ করে কৃষি জমির উপরি ভাগের পলিমাটি সরিয়ে নেয়ার কারনে এখন জমিতে আগের মতো ফসল ফলানো যাচ্ছে না। দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অতিমাত্রায় ইটের ভাটা গড়ে ওঠার কারনে কৃষি জমির মাটি সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হচ্ছে।প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায় গণহারে কৃষি জমির মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে ইটের ভাটায়।দেশের এক শ্রেনীর লোভী মানুষ ইট ভাটার মালিকদের কাছে সামান্য কিছু নগদ টাকা পেয়ে তাদের সোনা ফলানো জমির মাটি বিক্রি করছে।যে জমি হতে ইট ভাটার জন্য মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে সে জমিতে কোনভাবেই ফসল ফলানো যাচ্ছে না। অপর দিকে দেশের আরেক শ্রেনীর লোক মৎস্য প্রকল্পের জন্য কৃষি জমি নষ্ট করে মৎস্য প্রজেক্ট তৈরি করছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গণহারে মাছের প্রজেক্ট তৈরি করছে এক শ্রেনীর মানুষ। তারা নিজের কৃষি জমিতো কেটে মাছের প্রজেক্ট তৈরি করছে সাথে সাথে অন্যান্য লোকজনদের কে ভুল বুঝিয়ে তাদের কৃষি জমিও ২-৫বছরের জন্য চুক্তি করে ।জমির মালিকের সাথে বলা থাকে জমি মাটি ৩-৪ফুট বা তার ও বেশী করে গর্ত করে দিতে হবে। এখানে জমির মালিক কে দেয়া হয় নামমাত্র টাকা। আবার অনেক সময় মাছের প্রজেক্টের মালিকরা জমির মাটিসহ ৩-৫বছরের জন্য লিজ নিয়ে নেয়। পরে তারা তাদের ইচ্ছামতো মাটি কেটে গর্ত করে। এ খাতেও লাখ লাখ একর ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 
আবার অনেক জায়গায় দেখা গেছে সামন্য টাকার লোভে মাটি বিক্রি করে পরে এখানে বসত বাড়ি নির্মান করার জন্য যে পরিমান টাকায় মাটি বিক্রি করছিল তার দশগুন বেশী টাকা লাগে সেটা ভরট করে বসত বাড়ি নির্মান করতে। বর্তমানে দেশে যে হারে ফসলি জমি নষ্ট করে ইটভাটা ও মাছের প্রজেক্ট তৈরি করা হচ্ছে তা যদি প্রতিরোধ করা না যায় তাহলে এটা নিশ্চিত যে আমাদের দেশে আবার একদিন খাদ্যের ঘাটতি দেখা দিবে। তখন হয়ত আমরা আর আমাদের পূর্বের অবস্থানে ফিরে যেতে পারব না। তাই বর্তমানে দেশের খাদ্যের স্বয়সম্পুর্ণতা ধরে রাখার জন্য এখনই আমাদের দেশের কৃষিজমি রক্ষার জন্য সরকারি ভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। দেশের কৃষিজমি রক্ষা করার জন্য সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আইন প্রণয়ন করা বর্তমান  সময়ের প্রেক্ষাপটে জরুরি হয়ে পড়েছে। কৃষিজমিতে গড়ে উঠছে বিভিন্ন স্থাপনা। কৃষি জমিতে স্থাপন করা হচ্ছে নানা ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা। কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে ইটের ভাটায়, ইট তৈরিতে ব্যবহার করার জন্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঘরবাড়ি ও কৃষিজমির অনেক মালিক-বাসিন্দা ভিন্ন দেশে অভিবাসী হয়ে এদেশে তার বাস গুটিয়ে নিচ্ছে। তারা ভিটেমাটি বিক্রি করে দিচ্ছে এমন সব লোকের কাছে তারা ধানি জমির কোনো মর্ম বুঝে না। আর, সেগুলো অনায়াসে অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়ে আমাদের কৃষিজ উৎপাদন ব্যবস্থার বর্তমান স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে চলেছে। তাই, এখনই দরকার ধানি জমি ও অন্যান্য কৃষিজ পণ্য উৎপাদনকারী জমিগুলোকে রক্ষার জন্য আইন করে তার বাস্তবায়ন ঘটানো। নতুবা এদেশ যে খাদ্যের উৎপাদনে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন করেছে তা বিনষ্ট হয়ে যাবে। 

ফলনশীল কৃষিজমি বিনষ্ট করে তাতে বাড়ি কিংবা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে বর্তমান গতিময় উন্নয়নশীলতার ধারায় আমাদের দরকার পরিকল্পিত গ্রাম। পুরোনো সেই প্রবাদ ‘গ্রাম বাঁচলেই শহর বাঁচবে’- এ বার্তাটি সর্বাংশেই সত্য। গ্রামীণ পরিবেশ হলো মানুষের অক্সিজেন কারখানা। আসলে একটি দেশের শ্বাস নেবার ফুসফুস স্বরূপ। অপরিকল্পিত নগরায়নের থাবায় যদি এই ফুসফুসে ক্ষত তৈরি হয় তা হলে স্বাস্থ্য সমৃদ্ধ সুস্থ জাতি গড়ে তোলাই দূরূহ হয়ে পড়বে। মহেঞ্জোদারো-হরপ্পার মতো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে কেবল এর চতুষ্পার্শ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের স্বাভাবিকতাকে বিনষ্ট করে ফেলার কারণে। এমন আরও অনেক সভ্যতাই মানুষের হটকারিতার শিকার হয়ে ধরণীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ইতিহাসের এইসব উদাহরণ থেকে আমাদের শিক্ষা নেবার চেতনা না জাগলে একই পরিণতি আমাদেরকেও বরণ করতে হবে। সে ধ্বংস আমরা ডেকে আনতে পারিনা। বলা হয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও আবাসন চাহিদার কারণে কৃষি জমি লোপাট হচ্ছে। আমরা মনে করি আবাসন চাহিদা মিটাতে বহুতল ভবন নির্মাণ করে কৃষিজমির উপর চাপ কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাই, বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পরিকল্পিত গ্রাম-নগরায়ণ ও গৃহায়ণ-প্রযুক্তির সাহায্যে কৃষিজমিকে রক্ষা করা যায়। তাতে, কৃষিজমি যেমন রক্ষা পাবে, তেমনই আমাদের বর্তমান খাদ্য নিরাপত্তাও সংরক্ষিত থাকবে। দেশের কৃষিজমি রক্ষার জন্য আমাদের নিজেদের কে উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।যা খেয়ে আমরা জীবন ধারন করি তার ব্যবস্থা আমাদের সর্বাগ্রে করতে হবে।বাংলায় একটি প্রবাদ আছে,মাছে ভাতে বাঙালী একথাটি আমাদের সকলের মনে রাখতে হবে। 

মো.ওসমান গনি
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
কুমিল্লা, বাংলাদেশ। 
 Email-ganipress@yahoo.com