অটোয়া, শনিবার ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯
অটোয়ার সিটিহলে বহুজাতিক অংশগ্রহণে বর্ণিল মাতৃভাষা দিবস – সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

১৬ই ফেব্রুয়ারী ২০১৯ শনিবার বাঙালির আবেগরঙ্গিন একুশে ফেব্রুয়ারীকে সামনে রেখে কানাডার রাজধানী শহর অটোয়ায় সিটিহলে অনুষ্ঠিত হল বহুবর্ণিল ও বহুজাতিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে টানা ৪ঘন্টাব্যাপি একটি উৎসবমুখর অনুষ্ঠান।আয়োজনে ছিল অটোয়ার ‘ বাংলা ক্যারাভান’ ও ‘ পিস ‘ নামের সংগঠনদুটি। অনুষ্ঠানটিতে আপন আপন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র নিয়ে অংশগ্রহন করে অটোয়ায় অভিবাসী হরেক জনগোষ্ঠী। নানা অঙ্গের পরিবেশনায় তারা প্রদর্শন করে গান, নৃত্য ইত্যাদি।উৎসবের আমেজ নিয়ে নানা দেশের দর্শকশ্রোতার আনাগোনায় অনুষ্ঠানস্থল সিটিহল মুখরিত থাকে সারাদিন। উদ্যোক্তা সংগঠনদুটি আয়োজিত অনুষ্ঠানটিকে বিজ্ঞাপিত করে আমন্ত্রণপত্রে যে কথাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করে তা হচ্ছে,  মানব সমাজের দশ হাজার বছরের ঘামেশ্রমে গড়া এই প্রিয় বসুন্ধরার দর্পনে আমাদের বাসভূমি ও ধাত্রিভূমি কানাডা এক অনন্য ভূখন্ড। বহুজাতিক ও বহুসংস্কৃতির প্রাণভ্রমরার নাম  কানাডা। আপনারা নিশ্চয় অবগত আছেন যে, রাজধানী শহর অটোয়ায়  ‘বাংলা ক্যারাভান’ ও ‘পিস’ নামের সংগঠন দ’টি বিগত কয়েক বছর ধরে বিশেষ করে বাঙালি ও ছোট বড় সকল অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বহুবর্ণিল সংস্কৃতি ও মধুর মাতৃভাষাকে সংরক্ষণ ও মূলধারায় মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা ও বিকশিত করার জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছে। আপনাদের সকলের ঐকান্তিক সমর্থন আমাদের চালিকাশক্তির যোগান দিয়ে যাচ্ছে বলেই আমরা বিপুল উদ্যোমে আগামী ১৬ই ফেব্রুয়ারী অটোয়া সিটিহলে আয়োজন করেছি বর্ণময় ও বহুসংস্কৃতির মেলবন্ধনে বর্ণিল অনুষ্ঠানমালা  যা ২০১৯ সালটিকে জাতিপুঞ্জ ঘোষিত বিশ্ব আদিবাসীবর্ষ ও ২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কাঙ্খিত ঘোষণাটিকে শহর অটোয়ায় সকল জনগোষ্ঠী ও ভাষাগোষ্ঠীর গোচরে নিয়ে আসা।উল্লেখ্য যে, বাংলা ক্যারাভান ও পিস –এর নিরলস প্ররোচনায় ’২১শে ফেব্রুয়ারীকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে ও যথাযোগ্য ভাবমর্যাদায় পালনের ঘোষণা দেন অটোয়ার সন্মানিত মেয়র মিঃ জিম ওয়াটসন। বাঙালির আবেগরঙ্গিন ‘একুশ’ বিশ্বায়নে অটোয়া-মেয়রের এই ঘোষণাটি একটি মাইলফলক হিসেবে থাকবে। এই গৌরব বাংলা ক্যারাবানের নয় কেবল, তা অটোয়ায় অভিবাসী সকল বাঙালির।‘

 

 

 



১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৯-শনিবার বেলা ২ঘটিকায় কানাডার জাতীয়সঙ্গীত দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায় কাটায়কাটায় পূর্বঘোষিত সময়ে। আকুল কন্ঠে ন্যাশনেল এন্থেম পরিবেশন করে ১১ বছরের এক ভারতীয় কিশোরী আনিশা। প্রথমেই কানাডার আদিবাসীদের একটি ভাবগম্ভির প্রার্থনাসঙ্গীত যা ইনুয়িট ভাষায় প্রথাগত মৃদঙ্গ সহযোগে পরিবেশন করেন আদিবাসী আলগনকুইন প্রতিনিধি ম্যাডাম ডরেন স্টীভেন্স ও আনি সিনাভ। হলভর্তি দর্শকশ্রোতা পিনপতন নিরবতায় দাঁড়িয়ে আদিবাসী প্রথার এই মেঘমন্দ্র প্রার্থনাসঙ্গীত পরিবেশনাকে সন্মান জানান। দুপুর ২ঘটিকা থেকে অপরাহ্ন ৬ঘটিকা পর্যন্ত অটোয়া সিটিহলে টানা ৪ঘন্টার অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে থাকে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অংশগ্রহণে প্যানেল ডিস্কাশন বা বৈঠকি আলোচনা। অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক, ভাষাগবেষক ও অর্ডার অব কানাডা মেডেলিস্ট মিস শানা পপলাক, আবরার হাইস্কুলের প্রিন্সিপ্যাল ড.আলি এবং আন্তর্জাতিক ভাষাশিক্ষা এ্যাসোসিয়েশনের  ডিরেক্টর মিঃ কন্সটারটিন  ইয়ানিউ, আবরার স্কুলের প্রিন্সিপাল নিমাও আলী প্রমুখ অংশগ্রহন করেন। প্যানেল ডিস্কাশন পর্বটি সঞ্চালনা করেন অটোয়া সিবিসি নিউজের কো- হোস্ট মিঃ অ্যাড্রিয়ান হেয়ারউড।আলোচনা অনুষ্ঠানে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ বিষয়ে ‘মাতৃভাষা অমৃতসমান’ মর্মবানীর আলোকে ও জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত আদিবাসীবর্ষ ২০১৯ ছাড়াও ‘২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’এর স্বীকৃতি প্রস্তাবনা নিয়ে কানাডার সিনেটে আনীত এস -২৪৭ বিলটির  তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বিলটির অকুন্ঠ সমর্থনে বিশেষ আলোচনায় অংশগ্রহন করেন কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশ সরকারের  মাননীয় রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমান, কানাডার ফেডারেল সংসদ সদস্য মিঃ চান্দ্রা আরিয়া, ফেডারেল সংসদ  সদস্য মিঃ এন্ড্রো লিজলি, অটোয়া মহানগরের মেয়র মিঃ জিম ওয়াটসন, অটোয়া সেন্টারের প্রাদেশিক সাংসদ জুয়েল হার্বার, এমপিপি নাতালি দেরুজে ও কানাডিয়ান কাউন্সিল ফর ইউনেসকোর সেক্রেটারী জেনারেল সিবাস্তিন গোপেল প্রমুখ। বাংলা ক্যারাবান ও পিসের পক্ষ থেকে শ্বাগত বক্তব্য দেন ডঃ মনজুর চৌধুরী, সকল অংশগ্রহণকারী ও অতিথীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা  প্রকাশ করে বক্তব্য দেন বাংলা ক্যারাভানের মমতা দত্ত ও হারুন ম রশীদ। এই পর্ব সঞ্চালনা করেন অটোয়া কার্ল্টন ডিস্টিক্ট স্কুলবোর্ডের শিক্ষক নীরা ডোকিরান ও কার্ল্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পি এইচ ডি স্টুডেন্ট আকসানা। এছাড়া চুম্বক আকর্ষন হিসেবে সামগ্রিক বিষয়ের আলোকে আলোচনায় অংশ নেন কানাডায় অভিবাসী বাঙালির গর্বের প্রতীক কানাডার হৃদকেন্দ্র অন্টারিও প্রদেশের নবনির্বাচিত সাংসদ মিস ডলি বেগম। কানাডার ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র বাঙালি প্রাদেশিক সাংসদ ডলি বেগমের বক্তৃতা কানাডার মাল্টিকালচার সমাজের রংধনু হিসেবেই প্রতিফলিত হয় বহুজাতিক ও বহুভাষী দর্শকশ্রোতার কাছে। অটোয়ায় অভিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীসহ বিশ্বভুগোলের নানা দেশ থেকে অভিবাসী অনেকগুলো ভাষাগোষ্ঠীর কচিকাচা নবীনের অংশগ্রহণে দারুন উপভোগ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি দর্শকশ্রোতার করতালি ও হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়। সাংস্কৃতিক পর্বের শেষ গানটি ছিল ইংরেজী ভাষা যা পরিবেশন করেন ব্রায়ান লেড্রিগান ও তাঁর সহধর্মীনি। এই পর্বটি সঞ্চালনা করেন অদিব বখত ও উজমা খান। শিশুদের চিত্রাঙ্কন, হরেক ভাষার পুথিপুস্তক ও ভাষাবৃক্ষ প্রদর্শন ছিল অনুষ্ঠানটিকে বৈচিত্রময় করে তুলে। নানা ভাষার পুথিপুস্তক প্রদর্শন করা হয়। দর্শকদের বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সিলেটি নাগরী বা ফুলনাগরী হরফের বাংলার মধ্যযুগের পুথি। উপস্থিত নানা দেশের নানাভাষী দর্শকশ্রোতা বটেই অনেক বাঙালি দর্শকও জানেননা যে বাংলাভাষার আরেকটা রহস্যময় বর্ণমালার চল ছিল মধ্যযুগে বৃহৎ শ্রীহট্টমন্ডলে। এই নাগরী হরফের ১৪০খানা পুথি রয়েছে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক প্রাচীন বিশ্ববিদ্যাপীঠগুলোতে যা ভাষা গবেষকদের নজর কেড়েছে। পুথিপুস্তক প্রদর্শনীর দায়িত্বে থাকা লেখক মহসীন বখত দর্শকদের জানান যে, গোটা বিশ্বে দুটিমাত্র ভাষা রয়েছে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারে, একটি বাংলা ও অপরটি আইরিশ যার লেখ্য পদ্ধতির একাধিক বর্ণমালার সন্ধান মেলে। সিলেটি নাগরী বাঙালি ও বাংলা ভাষার গৌরবের আরেকটি দিক। হলঘরের একদিকে নির্মাণ করা হয় হরেক ভাষার বর্ণপত্রে সজ্জিত নয়নশোভন অতিকায় ভাষাবৃক্ষ যার শাখায় শাখায় পল্লবে ঝুলে থাকে নানাভাষার বাহারী বর্ণ।মূল মঞ্চের একপাশে বসানো ছিল বাঙালির আবেগ উথলে দেওয়া শহীদ বেদী যা নানা দেশাগত অভিবাসীদের নজর কাড়ে।

 

 

 

ছিল মুখরোচক জলখাবার আয়োজন। ভাষাবৃক্ষের তলায় ঢালাই বিছানায় ধুম লাগে বাচ্চাদের কিচিরমিচির ও চিত্রাঙ্কনের  উতসব। অটোয়ায় বিশেষ করে বাংলাদেশী অভিবাসীসহ অনেক ক্ষুদ্রক্ষুদ্র ভাষাজনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে মুখরিত এই অনুষ্ঠানটি কানাডার হৃদস্পন্দনে বহুজাতিক বহুভাষিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে প্রস্ফুটিত বিকশিত করতে সহায়তা করবে বলে অনেক বিজ্ঞজন অভিমত ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে অটোয়ার বাঙালি বা বাংলাদেশী সকলের মন কাড়ে কানাডায় বাঙ্গালির প্রানপ্রদীপ এমপিপি ডলি বেগমের প্রনোদনাজাগানিয়া কথামালা। বাংলা ক্যারাভান ও পিস নামের সংগঠনের পুরোহিতবর্গ যথাক্রমে হারুন এ রশীদ, ড. মনজুর চৌধুরী, স্থপতি আনওয়ার খান, মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হোসাইন, ড. প্রণত বড়ূয়া, মুক্তিযোদ্ধা শাহেদ বখত ময়নু, অধ্যাপক অমিতাভ স্যানাল, লেখক মহসীন বখত, শাহেদা চৌধুরী, সৌরভ বড়ুয়া, গুলজাহান রুমী, মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরুল হক, মমতা দত্ত, রিয়াজ জামান, আব্দুল্লাহ আল মামুন, অং সোং থোয়াই, ইয়ানিক কনরাড মুলার ও মুহম্মদ নিজাম উদ্দিন প্রমুখের অক্লান্ত ঘামেশ্রমে অটোয়ায় এই প্রথম বাঙালির আবেগরঙ্গিন একুশ বিশ্বায়নে বহুভাষী ও বহুজাতিক অংশগ্রহণে একটি সফল অনুষ্ঠান হয়ে গেল। গোটা অনুষ্ঠানের টেকনিক্যাল সাপোর্টে ছিলেন কারিনা কর্মকার।

প্রেরক-
বাংলা ক্যারাবান 
অটোয়া, কানাডা।