অটোয়া, মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯
অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারে সচেতন হতে হবে - মো.ওসমান গনি

ছরের প্রতিদিনই দেশের কোন না কোন স্থানে প্রতি নিয়ত আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। এতে করে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে।অনেক সময় সম্পদের সাথে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের তরতাজা প্রাণ। আগুন লাগার কারনে একদিকে যেমন ব্যবসায়ী ক্ষতি হচ্ছে অপরদিকে কর্মজীবি লোকেরা হারাচ্ছে তাদের কর্ম। ফলে না খেয়ে  না পড়ে অতি কষ্টে জীবন ধারন করছে ঐ পরিবারের লোকজন।সাধারনত আমাদের অসর্তকতার কারনে প্রতিদিন এই অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে। বর্তমান সময়ে এসব অগ্নিকান্ডগুলো বেশির ভাগই ঘটছে নিন্মমানের গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে। 

রাজধানীসহ সারাদেশে আরেক আতঙ্কের নাম গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহত হচ্ছে বহু মানুষ। বিস্ফোরিত হচ্ছে চলন্ত গাড়ি, রান্না করার সময় বিস্ফোরিত হচ্ছে গ্যাসের সিলিন্ডার। কোনো প্রকার নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই বিক্রি হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার। গত ২০ ফেব্রুয়ারি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে পুরান ঢাকার চকবাজারে হয়ে উঠেছে মৃত্যুপুরি। নিহত হয়েছেন ৬৭ জন। এলাকাবাসী, ফায়ার সার্ভিসসহ উদ্ধার তৎপরতায় যারা কাজ করেছেন তাদের তথ্যমতে, গাড়ি এবং রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এই দুর্ঘটনার কারণ। খাগড়াছড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৭ জন দগ্ধ হয়েছেন। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে গ্যাস দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। এ বছর গ্যাস অগ্নিকান্ড ৪০টি বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৬-এ। এরমধ্যে রাজধানীতে দুর্ঘটনা ঘটে ৪০টি আর বাইরে ১৫৬টি। এসবের মধ্যে গ্যাস লাইনে অগ্নিকান্ড হয়েছে ৬৫টি আর সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ১৩১টি। অগ্নিকান্ডে আহত হয়েছে ৪১ জন। আর মারা গেছে চারজন। ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত গ্যাস লাইনে অগ্নিকান্ড হয়েছে ৫৮টি, সিলিন্ডরে অগ্নিকান্ড হয়েছে ৭৯টি। এতে আটজন আহত হলেও মারা যান একজন। এদিকে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে চুলা থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনার সংখ্যা ২৩৮টি, আর গ্যাস লিকেজের জন্য ঘটেছে ৬৫০টি দুর্ঘটনা। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে গ্যাস দুর্ঘটনায় ১০৬টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গ্যাসলাইন লিকেজে ৫৫টি ও এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে ৫৩টি। এসব ঘটনায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে অর্ধশত।  

রাজধানীতে গ্যাস সংকট নিত্য সমস্যা হওয়ায় রান্নার ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বাড়ছে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার। এ সুযোগে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে মানহীন এলপিজি সিলিন্ডার। তবে মানহীনতার কারণে বাড়ছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। তাই রাজধানীসহ সারাদেশে নতুন আতঙ্কের নাম সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। তবে এটির মান যাচাই বা নিয়ন্ত্রণে নেই কোনো সংস্থা। হ-য-ব-র-ল-ভাবে চলছে এলপিজি সিলিন্ডার উৎপাদন, সরবরাহ, বিক্রি ও ব্যবস্থাপনা। এলপিজি সিলিন্ডার শুধু বাসা বাড়ি কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁয় রান্নার কাজে নয়, বর্তমানে যানবাহনেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে বর্তমানে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার সংখ্যা প্রায় দেড় কোটিতে পৌঁছেছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার ও নানা ত্রুটির কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনা। তবে মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যবহারকারীদের সচেতনতা কমাতে পারে প্রাণহানি ও দুর্ঘটনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বিস্ফোরণ তাজা বোমার মতই ভয়ঙ্কর। আইন করে সিলিন্ডার রিটেস্ট বাধ্যতামূলক করা হলে অনেকাংশেই এ ঝুঁকি কমবে। সরকারের উচিত খুব শিগগিরই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া। সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করার অনুমোদন রয়েছে ৬০টি কোম্পানির। এরমধ্যে ১৫টির বেশি প্রতিষ্ঠান এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করছে না। বসুন্ধরা, ওমেরাসহ কয়েকটি কোম্পানি নিজেরাই সিলিন্ডার তৈরি করে। শুধু ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এলপিজি সিলিন্ডার আমদানি হয়েছে ৩৯ লাখ ৬৪ হাজার ৭২৮টি। আর দেশে তৈরি হয়েছে ১১ লাখ চার হাজার ৩৩৫ সিলিন্ডার। 

গত পাঁচ বছরে বোতলজাতকরণ হয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ সিলিন্ডার। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব সিলিন্ডার অনুমোদন ও ব্যবহার বিধি প্রচার করে বিস্ফোরক পরিদফতর। অথচ হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার। মুদি দোকান, মুরগির দোকান, এমনকি ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকান,কাপড়ের দোকানেও মিলছে রান্নার সিলিন্ডর গ্যাস। কোনো নিয়মনীতি না মেনেই চলছে এসব গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসা। সেই সঙ্গে প্রচন্ড বিস্ফোরণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই দাহ্য পদার্থের বোতল বাজারজাত করতে এখন লাগছে না বিস্ফোরক লাইসেন্স। যে যেভাবে পারছে সেভাবেই লাভের জন্য এ বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ বিক্রি করে চলছে। গ্যাস সিলিন্ডার থেকে দুর্ঘটনা এড়াতে কয়েকটি জরুরি বিষয় ব্যবহারকারীদের মাথায় রাখতে হবে। যেমন, গ্যাসের নব বন্ধ হয়েছে কিনা, গ্যাস সিলিন্ডারের পাইপে কোথাও ফাটা বা ছিদ্র আছে কিনা ইত্যাদি, গ্যাস বন্ধ করে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে দেখে নিতে হবে গ্যাসের পাইপ যেন কোনোভাবে গরম বার্নারের গায়ে লেগে না থাকে। সিলিন্ডার গরম হতে পারে এমন কাজ হতে বিরত থাকতে হবে। অনেকেই গ্যাসের লাইটার বা দেশলাই ব্যবহারের পর তা রেখে দেন সিলিন্ডারের উপরেই। এমনটা করা একেবারেই উচিত নয়। এই দুটি জিনিসের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। পাইপ পরিষ্কার রাখতে অনেকেই গ্যাসের পাইপের গায়ে কোনো কাপড় বা প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে রাখেন। এমনটা করা একেবারেই উচিত নয়। কারণ এতে পাইপ থেকে গ্যাস লিক হলেও তা ধরা পড়বে না। একই পাইপ বছরের পর বছর ব্যবহার না করে প্রতি দুই থেকে তিন বছর অন্তর তা বদলানো জরুরি। 

অনেকেই পাইপ পরিষ্কার করতে সাবান ব্যবহার করেন। এটা মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। গ্যাসের পাইপ পরিষ্কার করতে শুকনো কাপড় ব্যবহার করুন। খুব নোংরা হলে কাপড় হালকা করে পানিতে ভিজিয়ে নিন। সেই কাপড়েই পরিষ্কার করুন গ্যাসের পাইপ। সেফটি ক্যাপ ব্যবহার করুন। রান্নাঘর থেকে বের হওয়ার পরেই সিলিন্ডারের মুখ ঢেকে রাখুন সেফটি ক্যাপে।  রান্নাঘরে ঢুকেই গ্যাসের গন্ধ পেলে তখনই বেড়িয়ে আসুন রান্নাঘর থেকে। ওই অবস্থায় কোনো সুইচ বোর্ড বা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালু করা যাবে না। রান্নার গ্যাস বাতাসের চেয়ে ভারী। ফলে গ্যাস লিক করলেও তা মেঝের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে। তাই কাপড়, তোয়ালে বা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে গ্যাস রান্নাঘরের বাইরে বের করে দেয়ার চেষ্টা করতে করতে হবে। রান্নাঘর কখনোই পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। মানসম্মত সিলিন্ডারগুলোতে সেফটি ভাল্ব বা শাট অফ ভাল্ব থাকে। সিলিন্ডারে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে এই ভাল্বটি সিলিন্ডারের গ্যাসকে বাইরে বেরোতে দেয় না। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে না। একজন গাড়ির মালিক যেখানেই তার গাড়িকে সিএনজিতে রূপান্তর করান না কেন, এর আগে অবশ্যই সিলিন্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেই সিলিন্ডার সংক্রান্ত ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে হবে। এ ছাড়া রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠান সিলিন্ডারের ওপর আরও একটি ছাড়পত্র প্রদান করতে হবে। এই ছাড়পত্রগুলো থাকলে গ্রাহক সিলিন্ডারের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারবে। সিলিন্ডারের সঙ্গে থাকা যন্ত্রাংশগুলো উন্নত মানের কি না তা পরীক্ষা করে নিতে হবে। ইন্টারনেটের যুগে সহজেই সিএনজি রূপান্তরের যন্ত্রাংশগুলো সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যায়। গাড়ীতে সিলিন্ডার ব্যবহারের পূর্বে সিলিন্ডার মানসম্পূর্ণ কিনা তা দেখে ব্যবহার করতে হবে। আন্তর্জাতিক গ্যাস সিলিন্ডার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সিলিন্ডারের মান নির্ধারণ করতে ৫-৬ ক্যাটাগরির মানদন্ডের কথা উল্লেখ করেন। এই মানদন্ডের পরীক্ষায় যে গ্যাস সিলিন্ডারগুলো উত্তীর্ণ হয়, সেগুলো নির্দ্বিধায় ১৫ থেকে ২০ বছর ব্যবহার করা যায়। গাড়িতে সিলিন্ডার বসানোর পর বাড়তি কোনো যত্ন নিতে হয় না। তবে দাহ্য পদার্থ বা স্ফুলিঙ্গ তৈরি করতে পারে, এমন পদার্থ থেকে গাড়ি বা সিলিন্ডারের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা উচিত। শতভাগ নিরাপদ ব্যবহারের জন্য প্রতি পাঁচ বছর পর পর সিলিন্ডারের পুনঃনিরীক্ষণ (রি-টেস্টিং) করা জরুরি। এতে গাড়ির সিএনজি পরিচালন প্রক্রিয়ার ত্রুটি, সিলিন্ডার গ্যাসের অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। 

মো.ওসমান গনি
লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট
কুমিল্লা, বাংলাদেশ।