অটোয়া, সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯
২৪/৭ কাস্টমস সেবা : প্রেক্ষিত- বাস্তবতা - শিহাব চৌধুরী বিপ্লব

ব্যবসার সহজীকরণ বা Ease of doing business নিয়ে অনেক কথা চলছে। বস্তুত এটা এখন সময়ের দাবী। মধ্য আয়ের বাংলাদেশকে এ নিয়ে ভাবতেই হবে। এরই প্রেক্ষিতে ভাবনার সূত্রপাত। অনেকেই জানেন, সাড়ম্বরে ২৪/৭ Mode এ কাস্টমস কার্যক্রম চলবে ঘোষণা দিয়েছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক সচল বন্দর এর পাশাপাশি কাস্টমস চান, দেশের শিল্প বাণিজ্যে গতি আনয়নের জন্য। অনেক বছর ধরেই চট্টগ্রাম বন্দর ২৪/৭ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। Holiday permission ও Night permission মনে হয় যেন কোন সুদূরের। কতিপয় দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যতীত চট্টগ্রাম বন্দর এর এই ২৪/৭ অপারেশনাল কার্যক্রম এর সুফল বন্দর ব্যবহারকারীরা সকলেই লাভ করছেন। কাস্টম হাউজের এই সেবা প্রদানের সংবাদে ব্যবসায়ী মহল ব্যাপকভাবে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন।

চট্টগ্রাম বন্দর এর অপারেশনাল কার্যক্রম ২৪ ঘন্টা সচল থাকলেও, তার দাপ্তরিক কার্যক্রম যেমন ওয়ান স্টপ সার্ভিস ( যেখানে পণ্য চালান ডেলিভারী সংক্রান্ত ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, কন্টেইনার ডেলিভারী প্রদানের জন্য চাহিদা প্রদান করা হয় ), বন্দর ভবনের কার্যক্রমের অধিকাংশ, টার্মিনাল ভবনের কার্যক্রমের অধিকাংশ, ডিটিএম অফিসের কার্যক্রমের অধিকাংশ একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর বন্ধ হয়ে যায়। বলাই বাহুল্য এসকল কাজের জন্য বন্দরের সামগ্রিক অপারেশনাল কার্যক্রম তেমন একটা প্রভাবান্বিত হয়না। সুতরাং, কাস্টমস এর কার্যক্রমের ও একটা অংশ ২৪/৭ ভিত্তিতে সচল থাকা না থাকা এর উপর, তার সামগ্রিক সচল থাকা না থাকার কার্যক্রমের যে স্পিরিট তা নির্ভর করে না।

কিন্তু সাধারণভাবে মোটা দাগে ২৪/৭ কাস্টমস সচল থাকা ও রাখা বাস্তবে কতদূর হচ্ছে , হবে কিংবা প্রয়োজন তা একটি গভীর পর্যালোচনার দাবী রাখে। আলোচ্য সিরিজ লেখার দায় অত্র লেখকের ২৫ বছর ধরে কাস্টমস ব্যবহারকারীর বাস্তব অভিজ্ঞতাজাত ও সীমাবদ্ধতাজাত। এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

কখন বন্দরে রক্ষিত পণ্য হাঁটে? কাস্টমস থেকে শুল্ক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদন হলে বন্দরের পণ্য ডেলিভারীর জন্য ট্রাকে / বার্জে/ লাইটারে ওঠে। অথবা, শুল্কায়ন কার্য সম্পাদনের নিমিত্তে পণ্যের কায়িক পরীক্ষা সম্পাদনের জন্য বন্দরে রক্ষিত পণ্য নড়ে চড়ে। কিংবা বহুকাল পড়ে থাকা পণ্য নিলামে তোলার জন্য বন্দরে রক্ষিত পণ্য গতি পায় ক্ষণকালের জন্য।

কেন দেরী, কার জন্য, ক্ষতিগ্রস্ত কে ? ক) শুল্ক মূল্যায়ন বিধিমালা বলে একটি বিধি রয়েছে। কিভাবে পণ্য চালান শুল্কায়িত হবে তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে তাতে । যার প্রথম ধারাটিই হচ্ছে ক্রেতা ও বিক্রেতা ( পরষ্পর সম্পর্করহিত) স্বাধীনভাবে সিদ্বান্ত নেবেন একটি পণ্যের মূল্য কি হবে? অভিজ্ঞতা বলে , কাস্টমস অফিসার তার শুল্কায়ন প্রক্রিয়া শুরুই করছেন, আমদানীকারক ও রপ্তানীকারক পরষ্পর সম্পর্কিত ধরেই। অতএব, তারা বিনা বিলম্বে চলে যাচ্ছেন পরবর্তী ধাপে, বিগত ৩ মাসে একই পণ্য কোন মূল্যে শুল্কায়িত হয়েছে। পণ্যের দাম বাড়ে কমে প্রতিদিন, এমনকি প্রতি মূহূর্তে। কিছুই যায় আসেনা তাতে। সারা দুনিয়া জানে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দাম কমেছে। শুধু জানেনা Alibaba বা অন্য কোন সাইট। জানেনা internet. যদি তারা জানেও, কাস্টমস এর ডাটা বেইসে শুল্কায়িত মূল্য তার প্রতিনিধিত্ব করেনা। অতএব, তিনি নিরুপায়। ডাটা বেইস তার কাছে অনড় অচল স্থির গন্তব্য।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন কি এ জাতীয় রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে গন্তব্য হারাবে? এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা, কাস্টম হাউজে প্রতিদিন ফাইল ঘোরায় কার অর্জন কি হয় বলতে চাইনা, কিন্তু আমদানীকারক প্রতিটা দিন শেষে বন্দর ও শিপিং এজেন্টের মাশুল গোণে। কে দেয় এ টাকা শেষ অবধি ? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আম জনতা। যে দেরীর জন্য, যে ( আমদানীকারক) দায়ী নয়, তাকে কেন এ মাশুল গুণতে হবে? কে দেবে এর উত্তর? একটি ফাইল এর পাতা দেখে মূহুর্তে বলে দেয়া সম্ভব কোন ফাইল কার কাছে কতদিন আটকে ছিল? কেন যদিওবা বলা না যায়?

খ) শুল্ক মূল্যায়ন বিধি : একটি যথেচ্ছ ব্যাখ্যা ও যথেচ্ছ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র যা স্বব্যাখ্যাত আমদানীকারক ও রপ্তানীকারক স্বাধীনভাবে পণ্য মূল্য নির্ধারণ করে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন। একটি পণ্য আমদানীর জন্য। ধরেই নেয়া হচ্ছে, তারা মূল্য লুকিয়েছেন। কি প্রমাণ? প্রমাণ হল, একই পণ্য ইতিপূর্বে অধিক মূল্যে আমদানী হয়েছে অথবা শুল্কায়িত হয়েছে। পণ্যমূল্য কি স্থির ও অনড় বিষয়?  প্রতিটি চালানে চড়াও আরোপ (value impose) করে তাকেই কি প্রকৃত মূল্য বলা যায়?  প্রতিটি পণ্য কি তবে অবমূল্যায়িত( under value) ঘোষণা দেয়া হয়েছে ? পণ্য মূল্য কোন একদিন সকালে যা ছিল , তা কি স্থির ও অনড় ? জনাব, বাজারে যে মাছ গতকাল যে দামে কিনেছেন, প্রতিদিন কি একই দামে তা কিনেন? আপনার নিজের বাজার অভিজ্ঞতা কি আপনাকে পণ্য মূল্য স্থির করায় সাহায্য করেনা? দুর্মুখেরা অবশ্য বলেন, রাজস্ব আহরণের টার্গেট অর্জন করার জন্য বাস্তব বিবেচনা বিসর্জন দেয়াই ভাল। কিংবা তথাকথিত অডিট আপত্তি কিংবা অন্য কোন আপত্তির মুখোমুখি কেইবা হতে চায়? কিংবা দূদক!

পণ্য আটকে রেখে, ডেমারেজ বাড়িয়ে কোন সুবিচার? মূল্য নিয়ে বিরোধ? শ্রেণীবিন্যাস নিয়ে বিরোধ? কোন পলিসি নিয়ে বিরোধ?  সবক্ষেত্রেই ফায়সালার পূর্ব পর্যন্ত পণ্য আটকে থাকবে। ডেমারেজ বাড়বে। গুদাম ভাড়া ( wharfrent ) বাড়বে। কে দেবে? আমদানীকারক গৌরীসেন! আমদানীকারক কতৃপক্ষের সিদ্ধান্তের সাথে একমত হলেন না। আরো বড় অপরাধ। তিনি আদালতে গেলেন, ট্রাইবুনালে গেলেন। ওরেব্বাস। যতদিন নিষ্পত্তি হলোনা, ততদিন ডেমারেজ তাকেই গুণতে হবে। হাত পা বেঁধে বলা হল, সাঁতার কাট। না হয় মর। তো মরবেই আমদানীর অপরাধে। পাতা জালে, বাঁধা খেলায় সঁপে দাও। ফাঁকে ফাঁকে ফাঁকি দাও। তোমার সাত খুন মাফ না হলেও, তুমি অন্তত বেকসুর।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গতি চান ব্যবসায়। কিন্তু এ অনন্তজাল কাটবে কে? এ জাল না কেটে কি গতি আসবে?

কাস্টমস এসেসমেন্ট কমিটি : যেখানে কাস্টমসের চিন্তা ও মহানুভবতাই চূড়ান্ত ওয়ার্ল্ড কাস্টম অর্গাইনাইজেশন ( WCO )  প্রণীত হারমোনাইজড সিস্টেম কোড ( H S Code ) নিয়ে আমদানীকারক ও শুল্ক কতৃপক্ষের বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কাস্টম কতৃপক্ষ গঠন করেন Assessment Committee। সংখ্যায় ব্যাপক গরিষ্ট কাস্টমস। একজন করে আমদানীকারক, সিএন্ডএফ এসোসিয়েশন ও চেম্বার প্রতিনিধি সত্বেও কাস্টমস থাকে এ কমিটিতে ব্রুট মেজরিটি। আধুনিক জ্ঞানের বিকাশের এযুগে, নানা বিষয়ে আধুনিক জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ মতামত পর্যন্ত উপেক্ষা করে, একতরফা ভাবে কাস্টমস যেখানে সংখ্যাগরিষ্ট, এবং সে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এই কমিটির সিদ্ধান্ত ও স্বাভাবিকভাবেই পূর্বানুমিত। অপরাপর প্রতিনিধিদের মতামত শোনা না শোনা কেবলই কাস্টমস কতৃপক্ষের একান্ত ইচ্ছা অনিচ্ছা। সুতরাং, এ জাতীয় কমিটি রাবার স্ট্যাম্প বৈ ভিন্ন কিছু কি? একক বা দুএকজনের ভাবনাকে গোটা হাউজের সম্মিলিত মতামত হিসেবে স্থাপিত করার বডি হিসেবে কাজ করা ছাড়া আর কোন ভূমিকা কি এর রয়েছে? অবশ্য ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই।

আমদানীকারক কি আসামী? বন্দর কি কারাগার? বিচারাধীন খুনের আসামীরও জামিন হয় কিন্তু বিচারাধীন আমদানীকারকের নয়। আজ দেশে হেন কোন অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নেই, যাতে অংশ নিতে জাতীয় পরিচয় পত্র প্রয়োজন হয় না। ব্যাংক হিসাব, লাইসেন্স, জমি ফ্লাট গাড়ি ক্রয়- বিক্রয়- ব্যবসা সবটাতেই প্রয়োজন জাতীয় পরিচয় পত্র। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত প্রতিটি নাগরিক এর একটি পরিচয় ও ঠিকানা রয়েছে। অথচ, একটি পণ্য মূল্য নির্ধারণ পর্যন্ত যেটুকু সময় লাগবে, একটি পণ্যের বিএসটিআই মানসম্মত কিনা তা পরীক্ষণ অবধি, একটি পণ্যের শ্রেণীবিন্যাস অবধি কিংবা বিশেষ কোন পরীক্ষণে উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত, পণ্যের আবাস থাকবে বন্দরের গুদাম। যদি কোন বিরোধ ঘটে আমদানীকারক ও কাস্টমস এর, তাহলেও কথাই নেই, মাল পড়ে থাক বন্দরে, ডেমারেজ গুণতে হবে শিপিং কোম্পানীর। ভাড়া গুণতে হবে বন্দরের। আমদানীকারকের গুদামে পণ্য নিয়ে গেলে, কাস্টমস এর শুল্ক সুরক্ষা হয় না। অতএব, চলতেই থাকুক ঐ খেলা। আটকাও পণ্য কারণ আমদানীকারক এমন এক পাপী, শুধু পালানোর অপেক্ষায় মাত্র। অথচ কত অনায়াসে, আমদানীকারক থেকে মুচলেকা নিয়েই তার গুদামে মালগুলো চূড়ান্ত শুল্কায়ন অবধি আটকে রাখা যায়। কে শুনবে কার কথা, সকলে যে হীরক রাজা!

টাইম রিলিজ স্টাডি : প্রস্তাবনা সমূহের বাস্তবায়ন কই? প্রতিদিনই নিত্য নতুন পণ্য চালান আমদানী হচ্ছে। জমা পড়ছে বিল অব এন্ট্রি। ৪ দিন ফ্রি টাইম ডেমারেজ মুক্ত পণ্য খালাসের। ২৪/৭ কাস্টমস সেবার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো দ্রুত শুল্কায়ন,  দ্রুত পণ্য খালাস। পণ্য চালান শুল্কায়ন দ্রুততর করার ক্ষেত্রে মাত্র কয়েকটি প্রতিবন্ধকতার উল্লেখ করা হয়েছে পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদগুলোতে। মূল স্পিরিট হিসেবে যে বিষয়টি তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে,  তা হলো পণ্য চালান শুল্কায়ন এর ক্ষেত্রে সামগ্রিক দৃষ্টিভংগীর পরিবর্তন আবশ্যক। প্রতিদিন দাখিলকৃত পণ্য চালান শুল্কায়ন, শুল্ক পরিশোধ ও ডেলিভারীর যথাদ্রুত ব্যবস্থার কার্যকর পন্থা নিরুপণ ও বাস্তবায়নই প্রধান এজেন্ডা হিসেবে চিহ্নিত হওয়া প্রয়োজন। সে লক্ষের একটি ধাপ হল ২৪/৭ সেবা। এটাই বোধ করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন এর স্পিরিট। কত ঘন্টা, রাত কিংবা দিন অথবা রাত দিন জেগে থাকার মধ্যেই লুকিয়ে নেই স্থিরিকৃত লক্ষ্যের প্রাণ ভোমরা। দৃষ্টিভংগীর আমুল পরিবর্তন ও তার সাথে সাযুজ্যপূর্ণ পদক্ষেপ এর মধ্যেই একটি আধুনিক ও দ্রুত সেবাধর্মী কাস্টমস আমরা পেতে পারি। যার সাথে জড়িয়ে আছে প্রধানমন্ত্রীর সাহসী পদক্ষেপ এর অন্তর্নিহিত স্বপ্ন সাধ। জড়িয়ে আছে ভোক্তা তথা দেশের সাধারণ মানুষের লাভ। ব্যাপক ও সাড়ম্বরে এনবিআর এর উদ্যোগে টাইম রিলিজ স্টাডি হয়েছিল বছর কয়েক আগে। স্টাডিতে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা হয়েছে। সুপারিশও প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন প্রকৃতপক্ষে কতদূর হয়েছে? টাইম রিলিজ স্টাডির মূল কথাটিই ছিল, পণ্য চালান শুল্কায়ন ও খালাসে গতি। সে গতি কি ঈপ্সিত লক্ষ্য অর্জন করেছে? সনাতন চোখের আলোয়, চোখ ধাঁধানো রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কি কাংখিত গতি দিয়েছে ব্যবসা বাণিজ্য ও বিনিয়োগে?  বাণিজ্যের ক্রমাগত সম্প্রসারণ ও অধিকতর বিনিয়োগ যা মাইক্রো লেভেলে অধিকতর কর্মসংস্থান, টেকসই অর্থনৈতিক স্হিতি ও বিকাশ নিশ্চিত করে, সাফল্যের জয়যাত্রা কি তা স্পর্শ করেছে? তৈরী পোষাক শিল্প ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স এর উপর যে স্ফীতি ও সাফল্য দাঁড়িয়ে আছে,  তাকে অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্প্রসারণে কতদূর অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে?  নানা কারণে, নানা ভাবেই, একটি গতিশীল, কার্যক্ষম ও দ্রুত সেবা দানে সক্ষম কাস্টমস ও বন্দরের সাথে অর্থনীতির অপরাপর ক্ষেত্রগুলোর স্ফীতি অত্যন্ত ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার আপাত লক্ষ্য কি কেবল বর্তমান আমদানীর উপর অধিকতর বোঝা চাপিয়ে অর্জন করা হবে? নাকি, বাণিজ্যের ক্ষেত্রসমূহকে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বিবিধ সম্প্রসারণের মধ্যে যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে বিকশিত করা হবে? মানুষের যে বিপুল সৃজনশীলতা, উদ্যোগ ও স্বপ্নের অভাবনীয় ক্ষমতা রয়েছে, যে ক্ষমতার সাফল্য ' তলাবিহীন ঝুঁড়ি'র তকমা ছুড়ে ফেলে বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখায়, সে সৃজনশীলতার প্রকাশ ও স্ফূরণের পথে বাধাগুলোকে সরিয়ে দেয়া প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের স্পিরিট সেদিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে বোধ করি। যা উপহার দেবে স্মার্ট, স্মাইলী, স্পিডি একটি প্রবেশদ্বার। চট্টগ্রাম কাস্টমস ও বন্দর তো বাংলাদেশের সিংহ প্রবেশদ্বার। বিজলী বাতির রোশনাইয়ে নয়, ব্যবহারকারীদের মনের স্বস্তির আলোয় তা ভরে উঠুক এই প্রত্যাশা সকলের।

ইঁদুরটাকে চিহ্নিত করুন, তবেই তো বিড়াল পাবে সাফল্য একটি নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত সঞ্চালন লাইনের উপর নির্ভর করছে জাতীয় অর্থনীতির প্রাণভোমরা। একটি দ্রুত কার্যকর সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাস্টমস এর ভূমিকার উপর দাঁড়ায় জাহাজজট, পণ্য জট মুক্ত বন্দর। এই নিরবচ্ছিন্ন সঞ্চালন লাইনে নিয়মিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা হলো আমদানীকারক বনাম কাস্টমস বিরোধ। বহুবিধ বিরোধ এর প্রধান দুটি ক্ষেত্র হলো পণ্যমূল্য নির্ধারণ ও পণ্যের শ্রেণীবিন্যাস। উভয়ক্ষেত্রেই ক্ষেপন হয় সময়। এডিআর ( ADR),  প্রাক শ্রেণীবিন্যাসকরণ সহ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু উভয় প্রক্রিয়াই সময় ক্ষেপন মুক্ত, একথা বলার সুযোগ আসেনি। সে কারণে এখন অবধি তা জনপ্রিয় ও হয়নি। কিছু সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবা যেতে পারে।

সম্ভাব্য ভাবনাগুলোর ভিত্তি : বর্তমান এনবিআর আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি সজ্জিত। তার তিন অংগ শুল্ক, কর, মূসক এখন পরষ্পর সম্পৃক্ত আন্তর্জালে ( internet ) । সুতরাং, আমদানী রপ্তানীকারকগণ ও তার সাথে সম্পর্কিত এবং আবদ্ধ এনবিআর এর বিভিন্ন পাখার মাধ্যমে। কাস্টমস এর রয়েছে পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট, ভ্যালুয়েশন বিভাগ, শুল্ক মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা বিভাগ, শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। সুতরাং পণ্য চালান বন্দরের নিরাপদ বেষ্টনী থেকে অব্যাহতি লাভ করাই শেষ কথা নয়। আমদানীকারকের সাথে সোনালী করমর্দনের ও মোলাকাতের জন্য এনবিআর এর নিজস্ব উইংস তো রয়েছেই। অতএব, বন্দরে কন্টেইনার মাথায় কন্টেইনার চাপিয়ে, পণ্যের উপর আরো পণ্য স্তুপীকৃত করেই সব মীমাংসা করার সনাতন পদ্ধতি ও মাইন্ড সেট থেকে বেরোনো তার জন্য কোন ঝুঁকি তৈরী করেনা। কারণ এনবিআর এর পকেটে থাকা বিড়াল ইঁদুর খুঁজতে সক্ষম এবং সেরুপ কিছু কাজের জন্যই এসকল উইংসগুলো রাখা হয়েছে।

প্রায়োরিটি হোক পণ্য খালাসে, আপত্তি মীমাংসা হোক খালাসোত্তর মূল্য কিংবা শ্রেণীবিন্যাস সংক্রান্ত আপত্তি গুলো মীমাংসায় যদি মাথায় ক্রিয়াশীল থাকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, তাহলে কন্টেইনার এর মাথায় কন্টেইনার এর স্তুপ সহজে নড়বে না। যদি থাকে বিবেচনা, টেবিলের অপর পার্শ্বকে উপলব্ধির, তবে যে কোন অবস্থানে প্রায়োরিটি পাবে দ্রুত পণ্য ছাড়প্রদান। সুনির্দিষ্ট ছঁকে বাঁধা যায় আপত্তি মীমাংসার পদ্ধতিগুলো। রাজস্ব যোগানদাতা আমদানীকারকের রাতের ঘুম হারাম করে, রাজস্ব বান্ধব সংস্কৃতি কি হয়? নির্দিষ্ট টাইম ফ্রেমে বিরোধ মীমাংসার পদ্ধতি কি অবাস্তব না অসম্ভব? শত কারণ থাকতে পারে আত্মপক্ষ সমর্থনের। আত্মপক্ষ সমর্থনে বিরোধ উত্থাপন করা হলে, যদি তাকে দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়ায় পড়ে মাশুল গুণতে হয়, তাহলে আইনী প্রক্রিয়াকে পাশ কাটানোর প্রবণতা তো বাড়তেই পারে। যে বিরোধ দ্রুত ও সহজে মীমাংসাযোগ্য নয়, সে বিরোধকে ডেফার্ড করে, হস্তান্তর করে কি দ্রুত পণ্য ছাড়ের নীতিমালা সমুন্নত রাখা যায়না? তাছাড়াও, পণ্য চালান শুল্কায়নে যে কোনরুপ অবমূল্যায়ন কিংবা শ্রেণীবিন্যাসজনিত ভুলগুলো তদারকির জন্য এনবিআর এর অন্য বাহুগুলো তো রয়েছেই। তদ্রুপ, তদারকির জন্য ও রয়েছে দেশজুড়ে বিস্তৃত মূসক ও কর বিভাগ। তাহলে ভয় শংকা কিসের?

রেড চ্যানেল, গ্রীন চ্যানেল কি শুধু বিদেশ প্রত্যাগত যাত্রীর জন্য?  আমদানি রপ্তানীকারকের জন্য নয় কেন? বিশ্বজুড়ে কাস্টমসের স্বীকৃত পন্থা হল, স্ব আরোপিত, স্ব উপলব্ধিজাত শুল্ক বান্ধব সংস্কৃতিতে নাগরিক সহায়তা গ্রহণ। তারই অংশ হল, রেড চ্যানেল / গ্রীন চ্যানেল কিংবা আরো বিস্তৃত স্ব শুল্কায়ন ( Self-assessment )। মানুষের শুভবোধের উপর ও স্ব নিয়ন্ত্রিত শৃংখলার উপর দাঁড়িয়ে থাকে আইন ও আইনের পরিকাঠামো। লক্ষ লক্ষ চালান বছরজুড়ে আসছে। শতাংশের বিচারে তার কত শতাংশেই বা অপঘোষণা থাকে? তাহলে এই বিপুল আমদানী রপ্তানী চালানের একটা নির্দিষ্ট অংশকে তো সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে রুটিন প্রক্রিয়ার বাইরে নিয়ে সামগ্রিক লোড ম্যানেজমেন্ট কে লঘু কিংবা আংশিক ভার মুক্ত করা যায় । যা গতিশীলতা আনতে আরো ফলপ্রসু হতে পারে।

লোম নয়, কম্বল বাছা দরকার কথা হোল কম্বল বাছতে হবে। সত্যিই কম্বল কিনা? কাপড়টা কি? কি তার পরিমাণ? যদি প্রতিটি কম্বলের প্রতিটা লোম বাছার প্রক্রিয়ায় শুল্কায়ন সম্পন্ন হয়, তবে বোধ করি সেই পুরনো প্রবাদই বাস্তবায়িত হবে। প্রবাদটা ছিল " লোম বাছতে কম্বল উজাড়"। শিশুটার গা ধুতে হবে, আছাড় দিয়ে কাপড় ধোয়া যায়, শিশুকে আছাড় দিলে আস্ত শিশুটাই মারা পড়ে। ভুলে গেলে কি চলে?

শেষ কথা :
কাস্টমস হাউজে ২৪/৭ সেবা দিতে আরো ৩ গুণ জনবল দরকার। এটা খুব সত্যি। কিন্তু 'পুরনো ঘর, পুরনো দিন, পুরনো বোলচাল' দিয়ে কি যে লক্ষ্য পূরণের নিমিত্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক সেবা দিতে চান তা কি পূরণ হবে। দরকার যেমন সাহসী পদক্ষেপ, গতিশীল চিন্তা ও কাজ তেমনি ততোধিক পুরনো আবদ্ধ চিন্তার দৃষ্টিভংগীর খোলনলচে পাল্টানো। একদা কথিত "তলাবিহীন ঝুড়ি" র দেশ যখন মধ্য আয়ের দেশ হবার স্বপ্ন দেখছে, একদা আপাত অসম্ভবকে সম্ভব করে, ঠিক তেমনি আজকের দিনে নয়া চিন্তার, নয়া বিশ্বের উপযোগী কাস্টমস ও অসম্ভব কিছু নয়। দরকার অংগীকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২৪/৭ সচল কাস্টমস সেবা প্রদানের আকাংখার পেছনে সেই অভিব্যক্তি নিহিত বলে বিশ্বাস করি। কথা হলো, বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার জন্য আমরা কি সত্যই প্রস্তুত।

শিহাব চৌধুরী বিপ্লব
নির্বাহী পরিচালক, সমাজ সমীক্ষা সংঘ ও সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী 
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।