অটোয়া, সোমবার ১৯ আগস্ট, ২০১৯
সবুজ_মলাট - শুভেন্দু_খান

মেঘার সাথে দেখা টা নেহাত বরাতজোরে। কোনোদিন দেখা হবে ভাবিনি। কিন্তু হয়ে গেলো। পৃথিবী টা বোধহয় খুব ছোট। আমরা সবাই এক একটা ছোটছোট বৃত্তে নিজস্ব কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। জীবনে চলার পথে কখন যে কার সাথে কোথায় কিভাবে দেখা হয়ে যাবে, কেউ বলতে পারে না। নইলে মেঘা, যাকে সুদূর কল্পনাতেও কোনোদিন ভাবিনি আবারও দেখা হতে পারে, তাকে কোলকাতার রাস্তায় এভাবে দেখতে পাবো, এ ছিলো স্বপ্নেরও অতীত।

শনিবার। হাফ ডে। অফিস থেকে বেরিয়ে কি করবো তাই ভাবছি। ঘড়ি তে সবে দুটো বেজে দশ। বাড়িতে কেউ নেই। ফাঁকা। বউ দুদিন হোলো বাপের বাড়ি গেছে মেয়ে কে নিয়ে। মেয়ের পরীক্ষা শেষ। সেই সুত্রে যাওয়া। কয়েকটা দিন তবু তো রয়ে বসে থাকতে পারবে। নইলে বাড়িতে থাকলে তো শুধু কাজ আর কাজ। নিত্যদিনের রোজনামচা থেকে হাজার হলেও কয়েকটা দিন তো ছুটি। 

বাড়ি ফিরে একা একা কি করবো তাই ভাবছি। ভাবলাম একবার গড়িয়াহাট ঘুরে আসি। পকেটে হাত দিয়ে দেখি সিগারেটে নেই। বালিগঞ্জ ফাঁড়ির মোড়ের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে একটা ধরিয়ে হাঁটতে থাকি গড়িয়াহাটের দিকে। ইদানীং বউ'এর খচখচানি তে সিগারেট খাওয়া টা কমে গেছে। একা থাকলে বা বাইরে বেরোলে যত সমস্যা। একটা দুটো না ধরালে চলে না। 

হাঁটতে হাঁটতে কখন প্যান্টালুনসের কাছে চলে এসেছি, খেয়াল করিনি। প্যান্টালুনসের সামনে যাকে দেখলাম, তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। সন্দেহ হলো, ঠিক দেখছি তো! মেঘা ই তো?  না অন্য কেউ? সেই ফর্সা ছিপছিপে চেহারা। কাঁধের ওপর এলিয়ে পড়া চুলের হিল্লোল। মুখের মধ্যে একটা সপ্রতিভ ভাব। নীল চোখদুটির মধ্যে নদীর স্নিগ্ধতা। এ মেয়ে কে তো চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয় আমার। 

হাতে একটা বিগ শপার। কাঁধে সাইড ব্যাগ। পায়ে হাই ফ্যশান চটি। নীল জিন্সের সাথে হালকা পিঙ্ক টপে বেশ মানিয়েছে। রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক কিছু একটা খুঁজছে। খুব সম্ভবত ট্যাক্সি বোধহয়। 

রাস্তা পেরিয়ে কাছে গিয়ে মেঘা কে ডাকিঃ 
- কি ব্যাপার! তুমি! এখানে? চিনতে পারছো? 

হাসিতে মেঘার সারা মুখে যেন মুক্ত ঝরে পড়ে। 
- আরে! তুমি! দীপ! এখানে? 
-আমার অফিস তো এখানেই। বালিগঞ্জে। হাঁটতে হাঁটতে গড়িয়াহাটের দিকে যাচ্ছিলাম। হটাৎ তোমাকে দেখি। তা তুমি এখানে কি করে? আমি তো শুনেছিলাম বিয়ের পর তুমি গুজরাটে চলে গিয়েছিলে। 
- হ্যাঁ, ঠিক ই শুনেছিলে। একদম রিসেন্টলি এসেছি কোলকাতায়। মাস তিন হলো। বর ট্রান্সফার নিয়ে এসেছে।
- আচ্ছা, তাই বলো। আমি তো রীতিমত চমকে গিয়েছিলাম। কি জানি, দিন দুপুরে ভূত দেখছি না তো।

খিলখিল করে হেসে ওঠে মেঘা। দমকে দমকে হাসি। থামতেই চায় না। সেই আগের মত। যে হাসি কালবৈশাখী ঝড়ের মত, সব দুঃখ কষ্ট কে খড়কুটোর মত উড়িয়ে নিয়ে যায়। 
- ভূত নয়, ভূত্নী। হলে বেশ হত। ভূত্নী হয়ে আবার তোমার ঘাড়ে চেপে বসতাম। 
হাসতে থাকে আবার। হাসি জিনিসটা বড় সংক্রামক। সংক্রামিত হয় আমার মুখেও। 
- তা ঘাড়ে চেপে বসে করতে কি? ঘাড় মটকাতে? 
-মটকাতাম ই তো! রোজ মটকাতাম, জোড়া লাগাতাম। আবার মটকাতাম। আবার জোড়া। যা খুশি তাই করতাম। 

হাসিটা সন্ধ্যার বিষন্ন রাগের মত আস্তে আস্তে কেমন যেন মিলিয়ে যায়। জিজ্ঞেস করিঃ
- হাতে সময় আছে? কিছু খাবে কি?
- আমার আগাধ সময়। বর আসবে সেই রাত্রে। কিন্তু আমি তো খেয়ে বেড়িয়েছি? তুমি কিছু খাবে? 
-না, আমিও অফিস থেকে খেয়ে বেড়িয়েছি। কফি চলতে পারে।
-কোথায় যাবে? কাছাকাছি কিছু আছে? 
-কফি কর্ণার চলতে পারে? কাছেই।
-চলো, যাওয়া যাক। কফি খেতে খেতে তোমার সাথে দুদন্ড গল্প করা যাবে।

দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কফি কর্ণারের দিকে এগোই। কাছেই কফি কর্ণার। পাঁচ সাত মিনিটের হাঁটা পথ। মেঘার হাত থেকে বিগ শপার টা নিতে নিতে বলিঃ
-আমাকে দাও। আমার হাত তো খালি। শুধুশুধু তুমি বইবে কেন? 
-আরে না না! তুমি শুধুশুধু কষ্ট করবে কেন? আর তেমন ভারী নয়। আমার অসুবিধে হচ্ছে না।
-না হয় আজ একটু কষ্ট ই করলাম তোমার জন্য। দাও আমাকে।

মেঘা কোনো কথা বলে না। কেমন যেন চুপ হয়ে যায়। শপার ব্যাগটা এগিয়ে দেয় আমার দিকে। 

চুপচাপ হাঁটতে থাকি। হাজারো স্মৃতির ভীড়ে  হারিয়ে যেতে থাকি ফেলে আসা দিনগুলোয়। অনেক প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা যেন থমকে আছে এক নীরব মুহূর্তের খামে। 

*******************

মেঘার সাথে পরিচয় কলেজে। সত্যি কথা বলতে কি কলেজ ক্যান্টিনে। আমি ছিলাম এক বছরের সিনিয়র। কলেজ ক্যান্টিন টা ছিলো আমার বড় প্রিয়। ক্লাসের ফাঁকেই চলে আসতাম ক্যান্টিনে। বন্ধুদের সাথে দেদার আড্ডা। দিনে তিনচার বার ক্যান্টিনে না এলে আমার অন্নপ্রাশনের ভাত হজম হত না। আমরা চারজন বন্ধু ছিলাম। একটা গ্রুপের মত। চায়ের কাপে তুফান তুলে এক এক করে চলে আসতো রাজনীতি, ছায়াছবি, খেলাধূলা, দর্শন, সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপিয়ার, ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, সুভাষ বোস, মাদার টেরিজা কেউ বাদ থাকতো না। ক্যান্টিন টাই ছিলো আমার প্রাণ।

সেদিনও আমরা চারবন্ধু মিলে দুপুরে ক্যান্টিনে বসে চায়ের কাপে তুফান তুলছি, বাঙালীরা কাঁকড়ার জাত বলে মুন্ডুপাত করছি, একেএকে সমস্ত রাজনীতিবিদ দের শিরচ্ছেদ চলছে পুরো দমে, হটাৎ দেখি একদল ছেলেমেয়ে হৈচৈ করতে করতে করতে ক্যান্টিনে ঢোকে। এদের মধ্যে   একজন ছিলো দেবেশ, আমদের পাড়ার ছেলে। আমার চেয়ে ছোট, আমাকে দাদা বলে ডাকে। আমাকে দেখতে পেয়েই হাত নাড়েঃ 
- কি খবর দাদা? সব ভালো তো
-এই চলছে। তোমার খবর কি? 

পুরো দলটা আমাদের সাথে যোগ দেয়। পরিচয় পর্ব মেটে। দেবেশ ই পরিচয় করিয়ে দেয় মেঘার সাথে।
গল্পগুজবে কেটে যায় বেশ কিছুটা সময়। একটা ক্লাস অফ্ যায়। সেদিন মেঘা আমাদের সাথে রীতিমত গল্পে, আলোচনায় যোগ দেয়। রাজনীতি থেকে শুরু করে খেলাধূলা, সাহিত্য, দর্শন, সিনেমা, সবকিছুতেই তার অনায়াস যাতায়াত দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। যুক্তি তক্কে যেন বারবার হেরে যাচ্ছিলাম। আর কথার ফাঁকেফাঁকে তার উচ্ছল  ভূবন ভোলানো হাসি, দমকে দমকে - মুগ্ধ হয়েছিলাম। পদ্মের পাপড়ির মতো গভীর নীল চোখ দুটোয় হারিয়ে যাচ্ছিলাম বারবার। যুক্তি তক্কে হারতে ভালো লাগছিল। সেদিন প্রথম অনুধাবন করেছিলাম হেরেও এত অনাবিল আনন্দ আছে। এত তৃপ্তি আছে। কয়েক কাপ চা আর কয়েকগুচ্ছ টোস্ট ধ্বংস করে সেদিনের মত উঠি। যে যার বাড়ির পথ ধরি। 

বাড়ি ফিরে সেদিন ঠিকমত ঘুমোতে পারিনি। মেঘার মুখ টা আধোঘুমে তন্দ্রাচ্ছন্নে মনের মুকুরে বারবার ভেসে উঠেছিল। একটা আবছায়া অবয়ব কানা মাছি ভোঁ ভোঁ এর মত মনের অলিগলিতে ইচ্ছেমত খেলে বেড়িয়েছিলো সারা রাত। 

ক্যান্টিন টা হয়ে উঠেছিল আমাদের আড্ডাখানা।খুব অল্প সময়ে আমরা ঘনিষ্ট হয়ে উঠেছিলাম। একে অপরকে ছেড়ে একটা দিনও থাকতে পারতাম না। একটা দিন দেখা না হলে মনে হত, দিনটা বৃথা গেলো। পরের দিনটার জন্য অনন্ত অপেক্ষা। এক একটি প্রহর যেন এক একটি বছর। 

অনেকদিন ধরেই কথাটা বলবো বলবো করেও বলা হয়ে উঠছিলো না। দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে পারছিলাম না। যখনই ভাবতাম, কথাটা বলে ফেলি, নাম না জানা একটা ভয় অমাবস্যার অন্ধকারের মত আমাকে গ্রাস করে ফেলতো। জিহ্বার রাশ টেনে ধরত। মুখে এসেও আটকে যেত কথাটা, তারপর কাঠবেড়ালির মত সুড়ুৎ করে সেঁধিয়ে যেত কোনো এক অজানা গহ্বরে।

একদিন সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে কয়েক প্যাকেট সিগারেট ধ্বংস করে যা হবার হবে মনোভাবে বলেই ফেলি কথাটা। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে একবুক সাহস সঞ্চয় করে কথাটা পাড়িঃ 
- একটা কথা ছিলো। বলা টা ঠিক হবে কিনা ভাবছি।
-  আমি জানি, তুমি  কি বলবে? 
-জানো? 
-হ্যাঁ, জানি তো!
- তা কি জানো, শুনি। 
- বলবো কেন? আগে তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই। 

আমি আমতা আমতা করে থাকি। আবার সেই ভয়টা উড়ে এসে জুড়ে বসার মত জাঁকিয়ে বসে মনের মধ্যে, কণ্ঠনালী চেপে ধরে। আমার অবস্থা দেখে মেঘা হটাৎ খিলখিল করে হেসে ওঠে। সেই হাসি, দমকে দমকে। অবাক হয়ে শুধু চেয়ে থাকতে হয়, দেখতে হয় সেই হাসি। হাসতে হাসতেই বলেঃ 
- পেটে কথা চেপে রাখলে পেট ফুলবে। বদহজম হবে। রাতে ঘুম হবে না। তারচেয়ে কথা টা বলেই ফেলো। প্রত্যাখ্যাত হতে হবে না। 

হাতটা চেপে ধরি মেঘার- সারাজীবন তোমাকে ঠিক এইভাবেই পাশে পেতে চাই। থাকবে তো? 
-এই সামান্য কথাটা বলতে এত দেরী করলে। তোমরা ছেলেরা এত ডাকাবুকো, মারপিটে ওস্তাদ, অথচ প্রেমে পড়লে সবকটা এক একটা ভীতুরাম। আর আমি কবে থেকে তোমার মুখে শুধু এই কথাটা শোনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছি। 

আমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অভয় দিয়েছিল মেঘাঃ 
- থাকবো। আমাকেও সবসময় তোমার পাশে রেখো, কখনো দূরে সরিয়ে দিও না। 

এর পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। কলেজের পর আমরা দুজনেই উচ্চশিক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তবে যোগাযোগ ছিলো ভালোমতো। সপ্তাহে অন্তত একবার আমরা কোথাও না কোথাও দেখা করতাম। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ছিলো বড় প্রিয়। কখনো বা বাবুঘাটে। কিছক্ষণ সময় একসাথে কাটানো। 

গোল বাঁধলো যখন মেঘার জন্য পাত্র দেখা শুরু হয়। প্রথম প্রথম নানান অজুহাতে বিয়ে করতে রাজি হয়না মেঘা। আস্তে আস্তে চাপ বাড়তে থাকলে মেঘা বাবা- মা কে একদিন জানিয়ে দেয়, তার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব নয়। আর একান্তই যদি বিয়ে করতে হয়, তো সে দীপ কে করবে। 

আমার বাড়ি থেকে কোনো অমত না থাকলেও আমার মত চালচুলোহীন ছেলেকে মেঘার বাবা-মা কোনোদিন মেনে নেন নি। মেঘারা ছিলো উচ্চশিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবার। বাড়ির আত্মীয় স্বজন সবাই উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত। তুলোনায় আমি নিতান্তই সাধারণ। বংশ পরিচয় তেমন গৌরবের নয়। চাকরি নেই। চাকরির চেষ্টা চলছে। এহেন ছেলেকে মেঘার বাড়ির লোকজন জামাই হিসাবে মেনে নেবে না এটাই স্বাভাবিক। 

মেঘা খুব অশান্তি করেছিলো বাড়িতে। রাগারাগি করতো, নাওয়া খাওয়া বন্ধ করেছিলো, তবু কোনো কিছুতে কোনো লাভ হয়নি। মেঘার মুখে শুনেছিলাম, ওর মা জানিয়েছিলেনঃ 
-যদি ওই ছেলেকে বিয়ে করিস, তাহলে আমার মরা মুখ দেখবি। একটা চালচুলোহীন ছেলে, তার জন্য তোর কিসের এত দরদ? তোমার বিয়ে আমরা যেখানে ঠিক করেছি, সেখানেই করবে। 

কথা গুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল মেঘা। বেশ কিছুদিন পর আবার আমরা দেখা করেছিলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে। অনেকখানি সময় আমরা একসাথে কাটিয়ে ছিলাম। কাঁদতে দিয়েছিলাম মেঘা কে। হাল্কা হতে দিয়েছিলাম। চুপ করে ছিলাম অনেকক্ষণ। আমার আঙুল গুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে খেলতে খেলতে জিজ্ঞেস করেছিলঃ
-কি ভাবছো? কিছু বলছো না যে? 
-আর বছর দুই কি অপেক্ষা করা সম্ভব হবে? কোনোভাবে? অন্যকোনো উপায় আছে? 
-আর তো কোনোভাবে সম্ভব নয়। সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। 
-মেঘা, আজ একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তুমি চাইলে বা রাজি থাকলে আজই তোমাকে বিয়ে করে আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু তা কি সুখের হবে? বাবা মা আত্বীয় পরিজন পরিত্যাগ করে এভাবে তুমি কি সুখী হতে পারবে? আমার বাবা নেই। মা'র স্কুলের যৎসামান্য আয়ে আমাদের দিন গুজরান। আমি এখনও পড়াশোনা করছি। চাকরি পেতে হয়ত আরও বছর দুই। যে বৈভবে তুমি বড় হয়েছো, এই দুটি বছর তোমাকে যন্ত্রনার জাঁতাকলে পিশে মারবে। পাশে হয়ত কাউকে পাবে না। আজ যে আবেগের তাড়নায় তুমি আস্তে চাইছো, তার রেশ হয়ত অল্প কিছুদিন থাকবে, তারপর তা শুকিয়ে আসবে নিত্যদিনের রোদ বৃষ্টির ঘামে। তোমাকে আমার কাছ থেকে তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আজও যেমন আছো, সারাজীবন তাই থাকবে। কি দরকার আমাদের এই ভালোবাসা কে রোদে পুড়িয়ে যন্ত্রণার শুকনো চচ্চড়ি বানিয়ে। তার চেয়ে থাকনা যত্নে রঙিন মলাটের ভাঁজে। তবে সিদ্ধান্ত তোমার, তোমাকেই নিতে হবে এ সিদ্ধান্ত, কারণ বাবা-মা, আত্মীয় পরিজন, বৈভব ছেড়ে তুমি এক অজানার বুকে পাড়ি দিতে চলেছো। বিশেষ করে তোমার বিয়ে যখন ঠিক হয়ে গিয়েছে, এবং তোমাদের একটি পারিবারিক সম্মান জড়িয়ে আছে এই সিদ্ধান্তের সাথে। 

কান্নায় ভেঙে পড়েছিল মেঘা। আমার কাঁধে মাথা রেখে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাসাও খুঁজে পাইনি। শুধু একে অপর কে অনুভব করেছিলাম, অনুভব করেছিলাম সেই মূহুর্তের যন্ত্রণা কে, তার অনাস্বাদিত স্বাদ কে। 

**************

ফেলে আসা দিনগুলোর সাথে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে কফি কর্ণারে পৌঁছে গেছি, নিজেই খেয়াল করিনি। চমক ভাঙ্গে মেঘার কথায়ঃ
-কি ভাবছো তখন থেকে? একেবারে চুপচাপ? 
-না! কিছু না।
-বিয়ে করেছো? ছেলে মেয়ে ক'টি? 
-এক মেয়ে। ক্লাস ফোর। তোমার? 
- আমার ও এক মেয়ে। ক্লাস সেভেন।
কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞেস করিঃ 
- কেমন আছো? তুমি সুখী তো? 

একটু চুপ করে থেকে মেঘা বলেঃ
-হয়তো ভালো আছি। আসলে ভালো থাকা ব্যাপার টা বোধহয় অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। থাকতে থাকতে অভ্যেস হয়ে যায়। বর ভালো। আমাকে ভরিয়ে রেখেছে। তবু এরই মাঝে একটা কিছু না পাওয়ার যন্ত্রনা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। ছায়ার মত একটা কিছু, আধো অন্ধকারে একটা আবছায়া অবয়ব স্পষ্ট থেকে ক্রমশ স্পষ্টতর হতে থাকে, একটা চেহারার আকার নেয়, হাসায়, কাঁদায়, রাগায় আবার মিলিয়ে যায় নিত্যদিনের ভীড়ে। তুমি ছিলে সমুদ্রের মত, আছড়ে পড়া ঢেউয়ে ভিজিয়ে দিতে সর্বাঙ্গ। উচ্ছ্বাস ছিল, আজ সেই উচ্ছ্বাস টা নেই, উদ্বেল হাওয়ায় ভেসে যাওয়া নেই, যেটা আছে তা দীঘির নিস্তরঙ্গ এক জীবন। পাড় ভাঙ্গার ভয় নেই, হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই, ইচ্ছেমত ডুব দিয়ে স্নান করা যায়, কিন্তু তরঙ্গে তরঙ্গে ভেসে যাওয়া নেই। সমুদ্র স্নানের সেই আনন্দ নেই, যা পরতে পরতে এক অজানা আহ্বানে শিহরণ জাগায়।

একটু থামে দিয়া। মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিলাম মেঘার কথা গুলো। কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে মেঘা আবার শুরু করেঃ 
-প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো, জানো। আমার সব কিছু জুড়ে থাকতে তুমি। সারাটা দিন একটা শাড়ির মত জড়িয়ে থাকতে আমার সর্বাঙ্গে। খুব মনমরা হয়ে থাকতাম। তারপর আস্তে আস্তে কিছুটা গা সওয়া হয়ে গেলো। মেয়ে এলো। সংসারের হাজার কাজের ভীড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তবু কোনো একলা দুপুরে, অলস বিকালে কিংবা কোনো মনখারাপের রাতে স্মৃতি গুলো ফিরে ফিরে আসে। একটা আবছায়া অবয়ব ঘুরেফিরে বেড়ায়। তার নূপুর ধ্বনি শুনতে পাই।

একটু থেমে মেঘা জিজ্ঞেস করেঃ
- আমার কথা ছাড়ো, তোমার কথা বল? মনে পড়ে আমাকে? 
-তোমার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আমি খুব ভেঙ্গে পড়েছিলাম। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। সামলে উঠতে সময় লেগেছিল। তারপর মা অসুস্থ হয়ে পড়ে। একটা দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলাম সেই সময়। প্রচন্ড এক হতাশা গ্রাস করে ফেলেছিল আমাকে। জীবনের প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে ফেলেছিলাম। পাশে তেমন ভাবে কাউকে পাইনি, ভরসা দেবার, সাহস যোগাবার, উঠে দাঁড়াবার।  বরাতজোরে একটা ছোটখাটো চাকরি জুটে যায়। জীবনের চাকা ঘুরতে থাকে। মা'র শেষ ইচ্ছে তে একদিন বিয়ে করে সংসারী হই। দিয়া বউ হয়ে ঘরে আসে। একটি মেয়ে হয়। সময়ের স্রোতে ভাসতে থাকি। তবু সেদিনের সেই ফেলে আসা দিন গুলো আমিও ভুলতে পারিনা। যখন একলা থাকি, কোনো অলস দুপুরে, কিংবা  নির্জন রাতে হুইসেল বাজিয়ে চলে যাওয়া শেষ ট্রেনের মত দিনগুলো ফিরে আসে। রঙিন মলাটের ভাঁজে আটকে থাকা মুহূর্ত গুলো হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে আসে। খুলি, দেখি। আবার যত্নে ভাঁজ করে তুলে রাখি। হয়তো বা পরের দিনের জন্য। এই ভাবেই কেটে গেলো এত গুলো বছর। 

মেঘা তার হাত রাখে আমার হাতে। 
- তোমার কি মনে হয়? সেদিনের আমাদের সেই সিদ্ধান্ত কি সঠিক ছিলো? 
-ঠিক কি ভুল তার বিশ্লেষণে আজ তো আর কোনো লাভ নেই। শুধু এটুকু জানি, আমাদের সেদিনের কয়েক ঘন্টার মধ্যে নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত, তা সে ঠিক বা ভুল, যাই হোক না কেন, তা যে সঠিক ছিলো তার প্রমাণ দিতে হবে সারাজীবন ধরে। কারণ তা ছিলো আমাদের যৌথ সিদ্ধান্ত, তার অবমাননা করি কি করে। আর তাই আজও সেই দিনগুলো এতদিন পরেও সবুজের গন্ধে বেঁচে আছে তোমার আমার মধ্যে। 

হাতের তালুর মধ্যে আমার আঙুলগুলো নিয়ে খেলা করতে থাকে মেঘা। কেটে যায় বেশ কিছুটা সময়, একটা অনুভবের মধ্যে। 

বিল মিটিয়ে বাইরে আসি। মেঘা জিজ্ঞেস করেঃ
-আবার কি কোনোদিন দেখা হবে?
- আমরা তো ঘুরছি ছোটছোট কক্ষপথে, এক একটি বৃত্তে। এমনি ঘুরতে ঘুরতেই দেখা হয়ে যাওয়া, কাছে আসা, দুদন্ড গল্প করা। আবার হারিয়ে যাওয়া জীবনের ছায়াপথে। এমনি ভাবেই আবারও দেখা হবে, তার সুর আর রেশ টুকু সম্বল করে পথ চলা বাকি জীবন।

একটা ওলা ডেকে দিই। শেষ বারের মত হাত মিলিয়ে গাড়িতে ওঠে মেঘা। গাড়ি স্টার্ট দেয়। হাত নাড়তে থাকে মেঘা। চেয়ে থাকি অপলক দৃষ্টিতে। গাড়িটা ছোট হতে হতে ক্রমশ বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যায়। যায় কি!
( সমাপ্ত)

শুভেন্দু_খান
কোলকাতা, ভারত।