অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
ফেরা (১ম পর্ব) - শাহীনুর ইসলাম

-বীরু! কবে নিয়ে যাবি আমাকে‌‌? 

আমার দরজা খোলার আওয়াজ পেয়েই প্রতি রাতের মতো আজকেও আমাকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে মারেন বাবা। তার ছুঁড়ে মারার ভঙ্গি ও সুরে বোঝা যায় প্রশ্নটা সারাদিন ধরে তাকে যেন পর্বতপ্রমাণ ভারগ্রস্ত করে রেখেছিল। এতটাই ভারগ্রস্ত, এতটাই নূব্জ্য করে রেখেছিল যে এর ভার আর কিছুতেই বহন করতে পারছিলেন না তিনি। আমার আসার আরেকটু দেরি হলেই যেন দেবে যেতেন। এখন আমাকে ছুঁড়ে মেরে তবেই কিছুটা হালকা হলেন মনে হয়।  

এত রাতে চারদিকটা শান্ত, নিঝুম থাকায় তার প্রশ্নটা আমার মনের মধ্যে নির্ঝঞ্ঝাটভাবে ঢুকে পড়ে। ঢুকে আমার মাথার মধ্যে বিরাজমান অন্য সব ভাবনাকে নিমিষেই খারিজ করে দেয়। সান্ধ্যকালীন কাজ থাকায় এবং কর্মস্থল বেশ দূরে হওয়ায় প্রায় প্রতি রাতে দেরি করে বাসায় ফিরতে হয় আমাকে। ডাইনিং টেবিলে আমার খাবার সাজিয়ে রেখে মাও বেশিরভাগ রাতে সারাদিনের কর্ম ক্লান্তি মুছতে আগেই ঘুমিয়ে পড়েন। বাসার অন্য কাউকেও এ সময় সাধারণত জেগে থাকতে দেখি না। শুধু বাবা তখনো জেগে থাকেন। হয়ত বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে আজকাল খুব একটা ঘুমাতে পারেন না। তবে প্রশ্নটা আমাকে বার বার জিজ্ঞেস করার বড় কারণ হয়ত এই যে, তিনি ধরেই নিয়েছেন আমি ছাড়া তাকে নিয়ে যাওয়ার আর কেউ-ই নেই। 

বাবার এমন মনে করার অবশ্য যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আছে। তিনি সম্ভবত মন থেকে আমাকে খুবই পছন্দ করেন। সম্ভবত তার নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হিসেবে আমাকে ভাবেন, আবার আমার নিঃসঙ্গতারও সঙ্গী হতে চান। তিনি সম্ভবত তার অন্য ছেলেদের বিরক্ত করতে চান না। কারণ তাদের নিজেদের সংসার, ছেলে-মেয়ে আছে যা আমার নেই। 

আমার আপাত এই সুবিধাটুকুর বদৌলতে বিগত সময়গুলোতে বেশ কয়েকবার বাবাকে যখন হাসপাতালে কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকতে হয়েছিল, তখন আমিই রাত জেগে তার পাশে ছিলাম। এসব কিছুই মনে হয় তার ভেতর ধীরে ধীরে এক ধরণের বিশ্বাস জন্মিয়েছে যে, তাকে নিয়ে যাওয়ার মতো আমারই কেবল বেকার সময় আছে। শুধু গরজটুকু জাগালেই হয়। 

প্রতি মধ্য রাতে বাবার প্রশ্নের উত্তরে এটা-সেটা বলে তাকে ক্ষান্ত করে রাখি। এজন্য এহেক দিন এহেক অছিলা হাজির করি। গ্রীষ্মের সময়ে বলি—যেখানে যেতে চাও সেখানে এখন অসহ্য গরম। এক মুহূর্ত সুস্থ থাকতে পারবে না। শীত পড়লেই আমরা যাব। শীতকাল এলে বলি—এখন অফিসে কাজের খুব চাপ যাচ্ছে, বাবা। চাপ কমলেই যাব। আর আজকের মতো উত্তর করি—বাবা, আমি তো ছুটি পাই নাই। ছুটি পেলেই ব্যবস্থা করব। তুমি চিন্তা করো না।

অবসরে যেদিন ঘরের কম্পিউটারে নিজের টুকিটাকি লেখার কাজ করি, সেদিন বাবা আমার পাশে এসে বসেন। বসে চুপ করে আমার কাজ দেখেন। চা খান। মাঝে মধ্যে বিস্কুটের দু’একটা টুকরোও চিবোন। পাশে বসে তিনি আসলে হারানো অতীতের স্বাদ, গন্ধ, স্পর্শ নিতে চান, তার ধারণায় যেখানে আমি তার সেই অতীতের ঘুলঘুলি হিসেবে কাজ করি। অথবা পাশে বসে নিতান্তই আমার সাথে তার কিংবা তার সাথে আমার আত্মার স্পর্শ বিনিময় করতে চান।  

তার যে দু’একজন বন্ধু-বান্ধব এখনো বেঁচে আছেন তাদেরকে তো সেই পনের বছর আগেই ছেড়ে এসেছেন। মাঝখানে দু’বার গিয়ে একটুখানি দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। কিন্তু এখানে পরিবারের বাইরে নিজভাষী অন্য মানুষজনের সাথে তেমন কথা-বার্তা হয় না। আর পরিবারের সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত থাকেন, যদিও সেবা-শুশ্রুষার কোনো কমতি থাকে না। সব মিলিয়ে বেশিরভাগ সময়টাই তার একা কাটে। এ অবস্থায় তিনি সঙ্গত কারণেই আমার সঙ্গ উপভোগ করেন একটু বেশি।

আমার কাজ দেখে বাবা ভেতরে ভেতরে একটু উচ্ছ্বসিত বোধ করেন। সেটা বুঝি যখন তিনি আমার কাজের প্রশংসা করেন, অনুপ্রেরণা প্রদান করেন। আমার অনুভবের গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়ে, বাবা আমাকে অনেক ভালবাসেন। কখনো কখনো আমার সাথে দু’একটা কথা বলেন। যেটুকু বলেন তাতে গত রাতে তিনি স্বপ্নে যা দেখেছেন তা আমার কাছে বর্ণনা করতে চেষ্টা করেন, যেভাবে একটা শিশু প্রথম নতুন যা কিছু দেখে তার সবটাই বাবা-মাকে না বলা পর্যন্ত ক্ষান্ত হয় না। 

তবে স্মৃতি শক্তি কমে যাওয়ায় বাবা পুরোটা বলতে পারেন না। মাঝখানে আটকে যান। বিচ্ছিন্ন, ভাঙ্গা-ভাঙ্গা, খাপছাড়া বর্ণনা দেন। আবার গ্রামে কাটানো বিগত ষাট বছরের তিক্তমধুর শক্তিশালী স্মৃতিগুলো প্রায়শই তার স্বপ্নের বর্ণনায় দক্ষ সিঁধেল চোরের মতো এসে অনুপ্রবেশ করে। তবে বেশিরভাগ সময়ই তিনি নির্বাক বক্তা থাকেন। অন্য সময়ে থাকেন মুখর নিঃসঙ্গজীবি।

প্রিয় মানুষেরা পাশে থাকলেও যেন স্বস্তি। সব সময় কথা না বললেও চলে। মনের যোগাযোগটা তখনো কথার সংযোগ ছাড়াই পুরোদমে চলে। কিছু না বলেই অনেক কিছু বলে যায়। বলা ও না-বলা কথাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে। বলা কথাগুলোর ঘোলা ভাবকে থিতু করে নিচে ফেলে অর্থকে স্বচ্ছ করে।

অন্যান্য দিন গভীর রাতে বাবা সাধারণত আমার রুমে আসেন না। তার ঘর থেকেই হাঁক ছেড়ে সারাদিনের চেপে রাখা আকুলতাকে প্রশ্নের আকারে আমাকে ছুঁড়ে মারেন। তবে তার আগে ব্যাকুলতা ভরে ছোট্ট দুটো শব্দ যোগ করেন—‘তুই এসেছিস?’ আজ রাতে তা না বলেই সরাসরি আকুতিভরা প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেন। 

এখন কেন জানি আমার ঘরে ঢুকে পড়েছেন। এতক্ষণে আমি খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘরটার মধ্যে অবস্থান করছি। গ্লাস, প্লেট নাড়াচাড়া থেকে শুরু করে আমার হাঁটা ও দরজা টানার আওয়াজ বাবা পড়তে পারেন মনে হয়। আওয়াজ পড়ে পড়ে তিনি ঠিকই মানচিত্র এঁকে ফেলেন বাসার ভেতর আমি কখন কোথায় আছি। এই যে এখন আমি ঘরের ভেতরে আছি সেটাও তিনি ঠিক ঠিক এঁকে আমাকে অনুসরণ করে এসেছেন। তাকে দেখেই জিজ্ঞেস করি,
-বাবা, কিছু বলবে?
এটা জিজ্ঞেস করে আমি যেন তার মনের আকাশে জমে থাকা ব্যাকুলতার মেঘদলকে অঝর ধারায় ঝরতে উস্কে দেই। অথবা আমার জিজ্ঞাসাটির উত্তাপ তার অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশরূপী মনের সমস্ত জমাট বরফকে নিমিষেই গলে ফেলে। তাই মুষলধারে বৃষ্টির মতোই গড় গড় করে অথবা বরফ গলা পানির আকস্মিক ঢলের মতো করে এক নাগাড়ে বলে যান,

-আমার আর ভাল লাগে না রে, বাবা। আমাকে একটি বার নিয়ে যা না। বাবা-মায়ের কবরটাও কতদিন জিয়ারত করা হয় না। বুড়ো পাকুড় গাছটা এখনো আমাকে ডাকে। দুপুরের খাঁ খাঁ রোদে ওর পাতাগুলো বাতাসে কেমন শো শো করে বাজে। কতদিন সবুজ সবুজ ধানক্ষেত দেখি না! আইল দিয়ে হাঁটি না! গ্রামের মানুষগুলোর সাথে কথা হয় না! কে জানে দীঘিটা এখন কী অবস্থায় আছে? 

চেয়ারে হেলান দিয়ে এবং চোখ বন্ধ করে আমি বাবার কথা শুনে যাই। আমারও কল্পনায় ভেসে ওঠে শব্দচিত্র। হাজার হলেও আমারও তো অনেকটা সময় কেটে গেছে এমন পরিবেশে—রোদ-বৃষ্টিতে ফসল কাটা মাঠে ফুটবল খেলেছি, কখনো বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীতে কখনো-বা দীঘিটাতেই সাঁতার কেটেছি, ডুবেছি-ভেসেছি, বড়শি বা জালে মাছ ধরেছি, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে বন্ধুরা মিলে ছুটে বেড়িয়েছি, হৈ-চৈ করেছি, দুষ্টামি করেছি, চুরি-চামারিও করেছি। আরো কত কী যে! তার ইয়ত্তা নেই।

ভেতরকার আর্জিগুলো বলে ফেলার পর খানিক নীরব থেকে বাবা একটু হাঁপিয়ে ওঠেন। তখন আমি চোখ খুলি। বাবা আবার শুরু করেন,
-আজকেও শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। তাই সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে গেছিলাম। তোরা কেন যে আমাকে দুনিয়ার অর্ধেক দূরত্বে এনে এখানে ফেলে রেখেছিস? 

কী-বা সান্ত্বনা দেওয়ার আছে বাবাকে? একটু কষ্ট স্বীকার করলেই তাকে নিয়ে যাওয়া যায় সত্যি। কিন্তু ওখানে তাকে দেখবে কে? তার পরিবারের প্রায় সবাই তো এখানে। নিয়ে গেলে ক’দিন পর আবার আনতে হবে। এলে আবার একই আকুতি শুরু হবে। আধুনিক অভিবাসী জীবনের নিত্য প্রয়োজন মেটাতেই তো আমাদের সবটুকু সময় চলে যায়। তার উপর নতুন পরিবেশ, অচেনা মানুষ। সেখানে অতীতের মায়াময় চাহিদা যখন তখন পূরণ করা আদৌ সম্ভব নয়। প্রবাসের আর সবার মতো আমিও এসব জানি। 

তবুও কিছু করার থাকে। অন্ততপক্ষে কিছু তো বলার থাকে। প্রতিটা মানুষ নিজস্ব কিছু খোরাককে আশ্রয় করে বেঁচে থাকতে চায় কিংবা বাঁচার স্বপ্ন দেখে। তার বেঁচে থাকার সেই কাজে সরাসরি সাহায্য় করতে না পারলেও তার জন্য আশা জাগিয়ে রাখা আশপাশের মানুষগুলোর পবিত্র দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। বরাবরের মতো তাই বাবাকে আশার আলো দেখিয়ে বলি,
-সব ঠিক হয়ে যাবে, বাবা। আর কটা দিন সবুর করো।

-আর কবে ঠিক হবে? কতই-বা সবুর করব? জানিস? ঘুমের মধ্যে আজকেও সেই স্বপ্নটা দেখলাম।

-ঘুমালে মানুষ স্বপ্ন দেখে, বাবা। ওটা ঘুমেরই একটা প্রক্রিয়া।  
কথাটা বলে আমি প্রসঙ্গটার মোড় অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করি। বাবা চুপ করে তখনো আমার পাশেই বসে থাকেন। তার ঘুমের সেই স্বপ্ন অনেকের জীবনে দেখা কাঙ্খিত স্বপ্নের মতো। অর্থাৎ বার বার তিনি একই স্বপ্ন দেখেন। তাকে একটু উসখুস করতে দেখি। স্বপ্নটা আমাকে আবার বর্ণনা করতে ইচ্ছুক মনে হয়। আমি তাকে বলার কোনো সুযোগ দেই না। তবু তিনি ওঠেন না। তিনি জানেন আমি এতে বিরক্তি দেখাই না। তাই বাবা অন্যদের চেয়ে আমার কাছে তার ইচ্ছের কথাটা স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন। 

আমি সাধারণত তার কথা শুনি। কিন্তু একই কথা শুনতে আজকে আমারও আর ভাল লাগছে না। তাছাড়া বেশ ক্লান্তও লাগছে। কাল যদিও ছুটিবার। ভাবছিলাম ভোর রাত পর্যন্ত লেখার কাজটা চালিয়ে যাব। কিন্তু ক্লান্ত লাগছে। বড্ড ক্লান্ত! একটা অজানা, অদ্ভূত ক্লান্তি জেঁকে বসেছে আমার মধ্যে।

আমার মুখ দেখে বাবা আমার ক্লান্তি বুঝতে পেরেছেন বোধ হয়। তাই নিজের শোওয়ার ঘরে যাওয়ার আগে আমাকে বলেন,
-এখন ঘুমিয়ে পড়। আজকে রাত জাগিস না।

হাতদুটো প্রসারিত করে একটা হাই তুলতে তুলতে আমি বলি,
-তুমিও ঘুমিয়ে পড়ো, বাবা। রাত অনেক হয়েছে। দুটো বেজে গেছে প্রায়।

-আমি তো ঘুমিয়েছি সন্ধ্যাবেলায়। মানুষ আর কত ঘুমায়? আমার ঘুম খুব পাতলা হয়ে গেছে, বুঝলি? ঘুমালেই স্বপ্নটা আমাকে জাগিয়ে দিয়ে যায়। যদি গভীর একটা ঘুম দিতে পারতাম…! চলবে। 

শাহীনুর ইসলাম
সম্পাদক, প্রকাশক 
মিউজিট্রেচার ম্যাগাজিন (Musitrature Magazine)
অটোয়া, কানাডা।