অটোয়া, রবিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
মানুষ খেকো মানুষ - আবুল হোসেন

দিন কেটে যায় অস্তগামী সূর্যের
 ইশারায় প্রতিদিনের মতো,
কে যেন পথ  চেয়ে আছে অজানা 
প্রতীক্ষায় দু-নয়ন মেলে অবিরত।
দেখতে দেখতে যামিনী কেটে, আসে ভোরবেলা 
সোনা ছড়ানো নয়ন দুটি হাসে 
নীল আকাশের মত যার হৃদয় খোলা।
খেয়া ঘাটের বিজন মাঝি দাড় টেনে যায়
 এপার ওপার মিলনের সেতু বন্ধনে,
 প্রতিদিন মানুষে মানুষের বন্ধুত্ব প্রগাঢ় হয় হেথা
মাঝির নৌকায় মহামিলনে।
গায়ের ভিখারী ফেধু শেখ চলছে ভিক্ষার অন্নেসনে ,
 মোটা কাঁচে ভাঙ্গা চশমার হাতল দুটি 
বেধেঁছে কানের সাথে কালো সুতার কাইতানে।
 নাক চোখ কুজকে পুরু কাঁচের চশমাটা কপালের দিকে উঠায়ে,
 বার বার উঁকি মারে রাজহাসের মত গলা সামনে এগিয়ে।
চোখ বড় করে এদিক ওদিক বার বার তাকায় ,
 কেউ যেন হাত দুটি ধরে খালের ঢালু বেয়ে তাকে উঠায় চৌরাস্তায়। 
হেন কালে আমি হলাম ভিক্ষুক ফেধু শেখের হাতের লাঠি ,
 আমার কাঁধে হাত রেখে ফেধু শেখ চৌরাস্তায় এল উঠি। 
মাথায় হাত রেখে ফেধু শেখ আপ্লূত বদনে,
 মানুষ হও বাবা, মানুষ হও বাবা, দোয়া করি মনে প্রাণে। 
রথের মেলায় সেদিন বলেছিল গেরুয়া পোশাক পরা
 চন্দনের ফোঁটা কপালে তিলক আঁকা গায়ের বোষ্টমী আর বৈরাগী,
দুই টাকা বকশিস দানে মানুষ হও ,মানুষ হও বাবা
 ভগবানের কাছে এই কৃপাই রাখি।
মানুষ হয়েই তো জন্ম নিয়েছি আবার মানুষ হতে হবে ক্যান?
উত্তর আমি খুঁজে চলেছি নিশিদিন, জানিনা কখন হবে অবসান।
যে দিন আমি জন্মাইছিলাম, সেদিন ছিল
 শুক্ল দশমী অর্থাৎ ‘অসুর’ বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার দিন।
আশ্বিনের নীল আকাশ ভরা ছিল চাঁদ-তারা জোঁসনার খেলায়,
 শরতের আগমনী গান শুনিয়ে ছিল কার্তিকের নবান্ন উত্সবের বার্তায়।
আমারে দেখে নাকি সকলেই বলছে দুধে ধোয়া রাজ পুত্র,
 মাথায় ভরা খাড়া খাড়া চুলে আমি দেখতে ছিলাম
 নাকি কদম ফুলের মতন ফুর ফুরা সূচিশুভ্র – 
জন্ম্মের পর প্রথম চিত্কারে মা আমারে বুকে জড়াইয়া,
প্রসব বেদনা ভুলে আদর করছে মাথায় হাত বুলাইয়া।
সেই দিন আমি মানুষ হইয়াই জন্মাইছিলাম, 
নাইলে মা আতুর ঘরে নিজের ব্যথা ভুইল্যা
 আমারে চোখ মুছতে মুছতে মৃদু হেসে
 ক্যান দুধ খাওয়াইছে আদর কইরা?
মানুষ তো ছিলাম জন্ম থাইক্যা তবুও কেন
 মানুষ হওয়ার এত অবিরল প্রস্তুতি প্রতিনিয়ত?
 স্বপ্নাতুর সীমাহীন-দুঃখবোধের মানুষগুলি
 মানুষ হওয়ার মিছিলে শুধু স্লোগান দিচ্ছে অবিরত।
বাবা একদিন আদর্শ লিপি আর ধারাপাত শিক্ষা কিনে বলে,
 কাল থেকে যেতে হবে তোকে স্কুলে।
নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর পৃষ্ঠা উল্টায়ে ছবি দেখতে দেখতে 
সেদিন রাতে ঘুমিয়ে পরার কথা গিয়েছিলাম ভুলে।
মা সকালে সাজাইয়া দিল সরিষার তেল মাথায় 
আর চিরুনিতে চুল আচরাইল কিনারে সিঁথি দিয়া, 
বাবার হাতে সপে দিল আর বললো আদাব দিবি
 মাস্টার মহাশয়কে স্কুলে গিয়া।
বাড়ির ঢালু বেয়ে খেতের আইল ধরে হাটছি 
পিছু ফিরে দেখছি মা দাড়িয়ে আছে উচু ভিটায়,
 আমার পানে দু-চোখে চেয়ে আছে যতদুর দেখা যায়।
দেখতে দেখতে ধু ধু গায়ের কলাপাতার আড়ালে মা গেল হারিয়ে
 বাবার হাতধরে হাটছি আর নানা কল্পনার আনন্দ ডানা উড়ায়ে।
মাথার উপর সূর্য্যের আলো যেন আতশবাজির খেলা 
কানের দুপাশে গড়িয়ে পরা সরিষার তৈল
 সুর্য্যের আলোতে সখ্যতা গড়ে তুলেছে যেন ঝিকিমিকি মুক্তার মেলা।
রাস্তায় দেখা রহিম চাচা বলে কৌতুকের ছলে,
 তোমার মা কি সরিষা তেলের শিশি পুরাটাই মাথায় দিয়েছে ঢেলে?
 আমি বাবার হাত ছেড়ে কানের দুদিকে গড়িয়ে পরা তৈলে হাত দিয়া 
ইলাস্টিকের হাফ পেন্টে মুছছি আর
 পিছিয়ে পরা দূরত্ব সমান করছি, বাবার পিছু পিছু দৌড়াইয়া।
 বাবার হাত ধরে এলাম পাঠশালায়, 
যেন আনন্দের পূর্ণভূমি আজ লুটিয়ে পরেছে মাটির এই ধরায়।
সামনে এগুতেই দেখি আমার গ্রামের অনেক ছেলে মেয়ে 
আনন্দে টকবক করছি খেলার সাথীদের পাঠশালায় পেয়ে।
এই যে আপনের ছাত্র মাষ্টার মহাশয় -একদম বান্দুলা,
পড়া শুনায় মন নাই খালি শুধু সারাদিন খেলা আর খেলা।
একবারেই কথা শুনে না “মানুষ করবেন সবিনয় অনুরোধ আমার,
 হাড্ডি ফিরত চাই আর মাংশ সব আপনার”।
বাবার কথা শুনে সকল আনন্দ ধুলায় লুটায়ে গেল মিশে
-সেদিনের স্বার্থহীন নিবিড় আদিগন্ত বিস্তৃত
 মানুষ হওয়ার খুশি জর্জরিত হল অজানা বিষে।
 যেন উচু গাছে অতি পাকা বরই ফলের মত
 এক ঝাকিতে সব মাটিতে পরে ফেটে চৌচির। 
এই প্রথম বাবাকে মনে হল বাঘ আর আমি তার হরিন শাবক,
 চোখ কান থাকতেও আমি এখন পাঠশালায় বধির।
মানুষ হওয়া চাই , মানুষ হওয়া চাই ,
 ক্যান? আরে মানুষ হয়েই তো জন্মাইছি ,
তবে কেন আবার মানুষ হওযার অবিরাম এত ব্যতিব্যস্ততা
 প্রতিষ্ঠানিক আধুনিক শিক্ষায় মানুষ হওয়ার
 নামে চলছে নিষ্ঠুর বিলাসিতা। 
মানুষ হওয়ার প্রতিযোগীতায় দৌড়াচ্ছি তো দৌড়াচ্ছি ,
আমি স্কুল পেরিয়ে, কলেজ ডিংগাতে গিয়ে হোচট খেয়ে
 মাঝ পথে পরে গেছি।
বাবার অকাল মৃত্যুতে আর মায়ের অজানা অসুখ,
 সেয়ানা বোন ঘরে রেখে মানুষ হওয়ার নামই
 অমানুষতা, বলছে চারদিকে নিন্দুক।
বন্ধুরা কলেজ,ইউনিভার্সিটি ডিংগায়ে বি এ, এম এ,ডাক্তার ,ইঞ্জিনিয়ার
 দেশ থেকে বিদেশ বড় বড় ডিগ্রী নিয়ে
 আজ দেশের বিজ্ঞজন ওরা আমাকে ছাড়িয়ে।
জানতে, জানতে, শিখতে, শিখতে তো 
মানুষ মহামানব হওয়ার কথা,
 কিন্তু এ যে দেখছি সম্পুর্ন বিপরীত
 মানুষ নামের অমানুষরাই আজ তদারকি করছে সর্বদা।
মানুষ খেকো মানুষও হয় চলছে
 তার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আমাদের আসে-পাশে আজব্ধি ,
হিন্স্রপ্রানি খায় পুরা দেহ, আর এই মানুষ রুপী
 মানুষ খেকোরা খায় শুধু আত্মমর্যাদা, মান সম্মান,
ইজ্জত, বিবেক আর অত্বোপলোব্ধি।
ওদের আত্মকেন্দ্রিকতা, বিপথগামীতা, পরশ্রীকাতরতা, 
আর চাটুকারিতার কদর্যতায়,
 মানুষ হওয়ার স্বপ্ন আজ রোদনাবেগ সংবরণে 
বুকের ভিতর চাপা পরে গুঞ্জরিত হয় বোবা কান্নায়।
মানুষ হয়েই তো জন্মেছি তয় ক্যান
 বারবার শুনতে হয়, মানুষ হওয়ার এত মধুর বচন।
মানুষ হওয়ার ছবক শুনছি কখনো ধর্মের রঙ্গে,
 সৎ রাজনীতিবিদের ঢঙে, আদর্শের পুথি পাঠের ছড়ার মতন।
মানুষ হওয়ার নামে মানুষ হ’তে হ’তে ওরা আজ হয়েছে হিংস্র দানব,
 ওরা শহর খাচ্ছে, নগর খাচ্ছে,ব্যাংক খাচ্ছে,
 শেয়ার মার্কেট খাচ্ছে, খাচ্ছে তো খাচ্ছে 
খাইতে খাইতে আজ শহর থেকে গেরামে আসছে,
বনে লাগা আগুন মুখে ড্রাগনের গতিতে ধেয়ে ছুটছে।
মানুষ হওয়ার লেবাসে অমানুষ গুলিই আজ বেশি হা-ভাতে
 ওদের সত্যানুসন্ধান ও জ্ঞানচর্চার বিবেক ঘুমিয়েছে দুঃখ রাতে।
লুটে নিচ্ছে ভিটে মাটি, ভাংছে নারীর হাতের শঙ্খশাখা
কেড়ে নিচ্ছে শেষ সম্বল, ধনীর পেটের ক্ষুদার আগুন
 চারদিকে যেন আজ হাবিয়া দোজকের লেলিহান শিখা।
মানুষ নামের অমানুষদের লোভ আর পাপের
 আগুনে জ্বলতে জ্বলতে গায়ের সব রক্ত আজ হয়েছে চোখের পানি।
মনে হচ্ছে অপশিক্ষা আমাদের অধিকতর 
মানুষ বানানের নামে বানাইছে লম্ফট, সম্প্রদায়িক, লুটেরা খুনি!
 কেউ কি কইতে পারব কোন ব্যাংক দেউলিয়া হয়েছে কৃষকের,
শ্রমিকের অথবা কোন মাস্টারের লোনের কারণে।
সারা দেশটা আজ লুটের মাল বানাইছে কারা ? 
কারা পরিনত করছে আমাদের চোখের অশ্রু, অরণ্যর রোধনে?
যারা আমায় পিছনে ফেলে পড়তে গেছে সামনে, 
সেদিন আমার না পারার দুঃখ ভুলে ছিলাম
ওদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার কারণে।
ওরা ফিরে আসছে আবার গায়ে তবে মানুষ হয়ে নয়, মানুষ খেকো হয়ে।
শিক্ষার প্রসার হাজার বছরের সার্বজনীন সাংস্কৃতিক 
উত্তরাধিকার সততা ও অসাম্প্রদায়িকতা দলিত করে পায়ে।
চেতনার ঐশ্বর্যকে ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করে দিচ্ছে
 অন্যায় নামক কুঠারের আঘাতে,
 অসাম্প্রদায়িক বলে জাহির করা শিক্ষিত
 তথা কথিত সুজনেরা ধর্মনিরপেক্ষতার বদৌলতে।
আড়ালে অচেতন মনোজগতে সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি
 লালন করে, কারা করছে প্রতিনিয়ত আত্মপ্রতারণা?
জেনে রাখ বন্ধু ইতিহাস তোমাদের ক্ষমা করবেনা।
যে শিক্ষককে গুরু বলে প্রনাম করতাম
 তাকেই সন্ত্রাসীদের অপঘাতেই মৃত্যু মেনে নিতে হচ্ছে অবশেষে
 কানেধরে উঠবস করতে হয় শিক্ষকে আজ,
ছাত্র নামের প্রেতাত্মার তর্জনীর নির্দেশে। 
তাহলে মানুষ বানাবে কে? আজ বড় দুঃখ হয়,
 গেন্না ধরে ফেদু শেখ! তোমার মানুষ হও,
 মানুষ হও ধ্রুপদী বাক্য স্বরণ করে,
যারা মানুষ খেকো মানুষ নামে পরিচিত ওরা কি
 অস্ট্রিক,আর্য্য, দ্রাবির, অথবা চর্যাপদ যুগের মানুষের চেয়ে উপরে?
আমায় ক্ষমা কর তুমি পিতা, পারছিনা তোমার আদেশ মানতে!
ক্ষমা কর আমার শিক্ষক মহান জ্ঞান দাতা,
তুমি শুধু একা নও আমারা আজ সবাই গরাদের আড়ালে বন্দী!
 অন্যায় নামক বিষাক্ত বিষ আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকতে ঢুকতে 
আমরাও হয়ে গেছি আজ বিষমানব,
 অন্যায়কে ন্যায় বলে ইতিহাসের খাতায় আজ প্রতিবন্দী।

আবুল হোসেন  সাস্কাতুন, কানাডা ,জুন ০১ -২০১৭