অটোয়া, শনিবার ২১ মে, ২০২২
জোনাকির পাহাড় - রফিকুল নাজিম

বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে বাসটি। আর আমি বাসের জানালা দিয়ে দ্যাখছি মধ্যরাতের ঘুমিয়ে থাকা দূরের গ্রামগুলোকে। গ্রামের বিজলিবাতিগুলো পদ্মার নদীতে মাছ ধরার ডিঙির ল্যাম্পের মতোই ভাসা-ডোবার খেলা খেলছে গ্রামগুলো। চোখের পলকে আমাদের পেছনে সটকে পড়ছে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো সারি সারি গাছপালা, বৈদ্যুতিক খাম্বা ও অল্প দমের গাড়িগুলো। আমার বাঁ কাঁধে মাথা রেখে গভীর ঘুমে ডুব দিয়ে আছে জারিন। অথচ কিছুক্ষণ আগেও তার সে কি উচ্ছ্বাস! তার বকবকানিতে তো আমার কানে তালা পড়ার যোগার। ভীষণ রকম পুলকিত সে। ক্যাম্পাসে প্রথম যার প্রেমে পড়েছিলো-সেই হাসানকে এতোগুলো বছর পর দ্যাখবে সে। তার জোনাকির পাহাড় দেখবে, হাসানকে দেখবে। সারাটা দিন শুধু কানের কাছে ঘ্যানরঘ্যানর করেছে। এই প্রশ্ন সেই প্রশ্ন! ছোট্ট শিশুর মতই জারিন। বলে রাখা ভালো- বিয়ের পর এটাই আমাদের প্রথম ট্যুর। গত চার বছরে আমরা চরম মাত্রায় ব্যস্ত ছিলাম দুজন। ক্যারিয়ার ক্যারিয়ার জপতে জপতে কখন যে এতোগুলো দিন কেটে গেছে আমরা টেরও পাইনি। নিশ্চিত ও নিরাপদ ভবিষ্যতের বিন্যস্ত ছকে বন্দী ছিলাম আমরা। হঠাৎ গতকাল একটি পত্রিকায় 'জোনাকির পাহাড় স্কুল' নিয়ে একটা ফিচার জারিনের চোখে পড়তেই ইয়াহু বলে সে চিৎকার করে ওঠলো। হাসানকে খোঁজে পাওয়ার আনন্দে সে মাতোয়ারা। গত ছয় বছর ধরে আমরা হাসানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। কোনো বন্ধুর কাছেই হাসানের খোঁজ নেই। না মোবাইল, না স্যোশাল মিডিয়াতে; কোথাও নেই সে। হয়তো নিজেকেই গুম করে রেখেছে পাগলাটা। আচ্ছা, হাসানের জোনাকির পাহাড়টা এদ্দিনে কতটুকু আকাশ ছুঁতে পেরেছে, কতটুকু লাল রঙে সেজেছে হাসানের প্রিয় রক্তজবা ফুলগুলো। তার নিজের স্বপ্নে কতটুকু পালক জুড়ে দিতে পেরেছে? এসব প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই  আমরা যাচ্ছি খাগড়াছড়ি।

হাসানকে আমি প্রথম দেখেছিলাম সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে। ক্যাম্পাসে সে ভূতের মতো হাঁটতো খুব। যখন যেখানে ইচ্ছে হতো সেখানেই ধপাস করে বসে যেতো। আরামসে বসে নাক ডুবিয়ে বই পড়তো। হাসানকে আমাদের কেউ কেউ বইপোকা নাম দিয়েছিলো। প্রথম দেখাতেই তাকে আমার এক জনমের পরিচিত মনে হয়েছিল। গায়ের তামাটে রঙ, মাঝারি ধরনের উচ্চতা, বাবরি দোলানো চুল ও মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি-বেশ মানিয়ে যেতো তাকে। ফেড জিন্স, খাদি কাপড়ে শর্ট পাঞ্জাবি ও পায়ে হাওয়াই চপ্পল-এই পোস্টমর্ডান ক্যাম্পাসে তাকে আশির দশকের আগুন্তুক বলেই মনে হতো! হাসানের একটা বিশেষত্ব হলো সে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে আসতো একটা লাল টুকটুকে রক্তজবা তার ডান কানে গুঁজে। বিড়ি ফুঁকতো খুব। রাজসিক স্টাইলে বিড়িতে একখানা দীর্ঘ টান দিয়ে আসমানের দিকে ধোঁয়া ছুঁড়তো। আর সেই ধোঁয়া বাতাসে কুন্ডলী পাকিয়ে উড়ে যেত আকাশে; বহুদূরে।

হাসান দর্শনের ছাত্র। কালেভদ্রে ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় সে পা রাখতো। প্রকৃত মেধাবীরা নাকি একটু পাগলাটে হয় শুনেছি। কিন্তু হাসানের ক্ষেত্রে এই মহাবাণী পুরোপুরি মিথ্যে ছিলো। সে একটু না -পুরোপুরিই পাগল ছিল! কীসব উদ্ভট স্বপ্ন দেখতো সে! আমাদের কাছে প্রতিটি কোর্সের প্রতিটি কনসেপ্ট ছিলো আমাদের ওপর আচমকা ওহি নাযিল হওয়ার মতোই ভয়ংকর! আর সেগুলোই নাকি তার কাছে ছিলো সেকেলে গালগপ্পো! দুধভাত। এজন্য ডিপার্টমেন্টের দু'তিনজন তরুণ লেকচারার তাকে 'স্কলার' বলে সম্বোধন করতো। কার্ল মার্ক্স, এমিল ডুর্খেইম, ফ্রয়েডকে দারুণভাবে কাটাছেঁড়া করতে পারতো হাসান। অবশ্য আরেকটা আড়াল গুণ ছিলো হাসানের। দুর্দান্ত কবিতা লিখতে পারতো সে। হাতের কাছে কাগজ না পেলে সিগারেটের রাঙতা কাগজে লিখে ফেলতো আস্ত একটা কবিতা। লিখে শেষ হলেই পড়ে শোনাতো আমাদেরকে। আমরাও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুধু শুনেই যেতাম। প্রেম ও দ্রোহ সমানুপাতিক বিন্যাসে সে আঁকতো মানুষের বুকের গহীনের কান্নার ছাপচিত্র।

পথে হোটেল বিরতির পর আবার শাঁই শাঁই করে বাসটি চলতে শুরু করেছে। জারিন আমার বাঁ হাতটা তার বুকে শক্ত করে চেপে ধরে আছে। সিটের উপরে নীলাভ বাতিগুলোর আলোয় দ্যাখছি জারিনের মায়ার মুখটা। সেও তাকিয়ে আছে আমার দিকে। একদম চোখে চোখ রেখে আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেই ক্যাম্পাস জীবনে প্রথম প্রথম আমরা চোখাচোখি খেলতাম। অথচ বিয়ের গত চার বছরে একবারও আমরা এভাবে একজন আরেকজনের চোখের মনিতে নিজেদেরকে দ্যাখিনি বা খুঁজিনি! ভুলে গিয়েছিলাম সম্পর্কেরও সুষম খাবার লাগে। তেল নুন লাকড়ি লাগে। অপুষ্টিতে ভোগা সম্পর্ক একদম ভেঙে না পড়লেও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পথ হাঁটে। অথচ ক্যাম্পাসের সবাই ডাকতো না। সবাই ডাকতো টম এন্ড জেরি। শুধু হাসানটা আমাদেরকে ডাকতো- লাভ বার্ড নামে। একান্ত বসা মিষ্টি সন্ধ্যায় কোত্থেকে সে এসে পেছন থেকে আমাদের দুজনের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোকে ভড়কে দিত। আমাদের প্রেমলীলার মধ্যে সে ভয়ংকর অবিবেচকের মত আমাদের গল্পে ঢুকিয়ে দিতো সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের রগরগে সব গালগপ্পো। মাঝে মাঝে তাকে খুব মারতে আমাদের ইচ্ছে হতো। ভেতরে ভেতরে রাগে ফুসলেও তাকে বুঝতে দিতাম না।

চলন্ত বাসের জানালা গলে সকালের শুদ্ধ আলো জারিনের গালে চুমো খেয়ে যাচ্ছে। অথচ কতদিন আমরা এমন স্নিগ্ধ আলোয় গা মাখিনি। তুলতুলে বিছানায় আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে কেটে যায় আমাদের অজ্ঞাতনামা দিনগুলো। আবিষ্কারবিহীন থাকে আরো কয়েকটা বছর।
- জানো শ্রাবণ, আমি হাসানকে মনে করার চেষ্টা করলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে  হাসানের মিছিলের ছবি। শ্লোগানরত হাসানে উদ্যম শরীরের ঢেউ দ্যাখি। তার মুখের উন্মাতাল শ্লোগান আজও আমি কান পাতলে আনমনে শুনি। তার মুষ্টিবদ্ধ যখন হাত বাতাসের গায়ে ধাক্কা দিত, মিছিলের শরীরের সাথে হাসানের শরীরও যখন ঢেউ তুলতো রাজপথে; যখন হাসান মানুষের অধিকারের কথা বলতো, সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখার কথা বলতো, অসহায় মানুষের কথা বলতো, ছিন্নমূল শিশুদের কথা বলতো- সে হাসান হয়ে ওঠতো অন্য হাসান। সে আমাদের বন্ধু হাসান থাকতো না আর। স্বপ্নবাজ বিপ্লবী, একটা টকটকে রক্তজবা ফুল বা তুবড়ি কথার রাঙা পোস্টারের মত হয়ে যেত আমাদের বন্ধু-হাসান।
- হুম। এই 'জোনাকির পাহাড় স্কুল'টা নিয়ে হাসানের কত স্বপ্নের কথা বলেছিলো আমাদেরকে? মাসজুড়ে ঢাকা শহর ঘুরে ঘুরে টিউশন করতো। আর মাস শেষে টাকাগুলো স্কুলের জন্য পাঠিয়ে দিত। কত স্বপ্ন দেখতো স্কুলটাকে নিয়ে। পাহাড়টাকে নিয়ে। পাহাড়ের সহজ মানুষগুলোকে নিয়ে।
- জানো ক্যাম্পাসের শেষ দিকে মনে হয়েছিল আমার তিতুল নামের মেয়েটি কিছুটা হলেও হাসানকে তার বশে আনতে পেরেছিল। দ্বিতীয় বর্ষের মেয়েটা কী চমৎকার ভাবে হ্যান্ডেল করতো মাস্টার্সের ক্ষ্যাপাটাকে! শ্রাবণ, মেয়েটার কথা তোমার মনে আছে ?
- ‎হুম। তিতুল ভারী মিষ্টি মেয়ে ছিলো। দারুণভাবে নিজেকে সবার সাথে মানিয়ে নিতে পারতো।

০২.
জারিন সারাদিনের জার্নিতে বেশ কাহিল। তার শরীরে ক্লান্তি ভর করলেও তার চোখেমুখে হাসানকে দ্যাখা ও তার স্কুলকে দ্যাখা। পাহাড়ী সংসার দেখার উচ্ছ্বাসটা জারিনের মনে বেশ প্রকট। তাই ফিচারে উল্লিখিত ঠিকানাটা হাতে নিয়েই ছুটেছিলাম জোনাকির পাহাড়ের দিকে। পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠতে উঠতে আমরা শুনতে পাচ্ছি শিশুদের মুখে বর্ণমালার গান। সেই অ আ ক খ বর্ণের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে এ পাহাড় থেকে ঐ দূরের পাহাড়ে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠতেই চোখে পড়লো টকটকে রক্তজবা ফুলের অনেকগুলো গাছ। ফুলগুলো সূর্যের শেষ আলোটুকু শুষে নিয়ে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে মাটিতে। আমরা বিড়াল পায়ে গিয়ে দাঁড়ালাম জোনাকির পাহাড় স্কুলের দরোজায়। ততক্ষণে ঐ দূরের উঁচু পাহাড়ের ঢালে নেমে গেলো সূর্য। হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় ত্রিশ চল্লিশ জন শিশুকে একটা তরুণী আপনমনে পড়াচ্ছেন। দরোজায় আমাদেরকে দাঁড়ানো দ্যাখে শিশুরা আমাদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। চারদিকে নৈশব্দের আসর বসেছে। শিক্ষার্থীদের হঠাৎ চুপসে যাওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে মেয়েটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো আমাদের দিকে। বা হাতে হ্যারিকেন নিয়ে দরোজার দিকে এগিয়ে আসে সে। আবছায়া আলোয় আমরা পরস্পর পরস্পরকে দ্যাখি। থেমে বুনো হাওয়া। নির্বাক হয়ে যায় প্রকৃতি। পাটভাঙা নীল শাড়ি পরা তিতুলকে দ্যাখে আমরা যতটা না বিস্মিত হয়েছি, তারচে বেশি হতবুদ্ধ হয়েছি তিতুলের ডানকানে গোঁজা রক্তজবা দ্যাখে। জারিনের গলা ধরে গুমরে গুমরে কাঁদছে তিতুল। স্কুল ঘরটার দক্ষিণ পাশে একটা কবর দ্যাখায় সে। এখানেই হাসান ঘুমাচ্ছে। স্বপ্নের প্রাঙ্গনে। সারি সারি রক্তজবা ফুল গাছের পাশে। তিতুল নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে জানায় -২০১৩ সালের কোনো একভোরে কাওরানবাজারের রেললাইনের পাশে হাসানের মৃতদেহ পাওয়া যায়। তারপর তিতুলই এই জোনাকির পাহাড়ের হাল ধরেছে।

আজকের রাতের আকাশটা বেশ কালো। হাতে গোনা কয়েকটা তারা মিটিমিটি জ্বলছে। সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটার দিকে ইশারা করেছে তিতুল। ওটাই নাকি হাসান। এখানে দাঁড়িয়ে প্রায়ই নাকি কথা হয় তাদের। জোনাকির পাহাড় নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা করে তারা। আমরা তিনজনই সেই উজ্জ্বল তারাটির দিকে তাকিয়ে আছি অপলক। যতই নিবিড় হচ্ছে চোখ আর মন ততোই মনে হচ্ছে তারাটি আরো উজ্জ্বল হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমাদেরকে দ্যাখে পাগলাটা হাসছে। আমাদের তিনজোড়া চোখ ভিজে আসে। ঝাপসা হয়ে আসে হাসান। আর এদিকে উজ্জ্বলতর হতে থাকে ঘরেফেরা শিশুদের পথগুলো। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পথ বেয়ে শিশুগুলো ফিরে যাচ্ছে আপনালয়ে। তাদের হাতে হ্যারিকেনের বিন্দু বিন্দু আলোকে দূর থেকে জোনাকি পোকার মতো লাগছে। মনে হচ্ছে জোনাকি পোকাগুলো এই পাহাড় থেকে ঐ দূরের পাহাড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আলোর উৎসবে জেগে উঠেছে জোনাকির পাহাড়! আর সুদূরে বসে হাসান আমাদেরকে দ্যাখছে আর নিজে প্রাণ খুলে হাসছে.....!

রফিকুল নাজিম  
পলাশ, নরসিংদী। 
১২ জুন,২০২০ খ্রি.