অটোয়া, সোমবার ২৩ মে, ২০২২
সাঁতারুর সমাধি হাঁটু জলে - সজল কুমার পোদ্দার

     রুদ্র পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া সূর্যের রশ্মিকে কাদাবুকে ঠেলে সাইকেলে চড়ে বাড়ি ফিরছিল। ঘরের পিছনে পাকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেয়াল করল বাড়ির ছাদের আকাশে কাকেদের ডানায় ও ঠোঁটে শিকারির ধূর্ততা এবং কন্ঠে উদর পূরণের কর্কশ উচ্ছাস। রুদ্র স্পষ্ট দেখতে পেল ঘরের কোণে নারকেল গাছের পাতায় বসে একটা কাক চড়ুইয়ের মতো কোন এক ছোট্ট পাখিকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। বাঁ দিকে কিঞ্চিত চোখ ফেরাতেই দেখতে পেল আর একটা ধেড়ে কাক শিকারি লালবাজের মত ছোঁ মেরে আকাশপথে লুফে নিল একটা সাদা-হলুদে পাখিকে। রুদ্র আর বিলম্ব না করে মেন রাস্তা থেকে সামান্য উতরাই পথে নেমে এলো এবং উঠোনে সাইকেলটা রেখেই দৌড়ে সিঁড়িপথ ভেঙে সোজা ছাদের উপরে গেল।সে দেখতে পেলো চিলেকোঠার গা ঘেঁষে দশ ফুট বাই ছ'ফুট লোহার নেট বেষ্টিত পাখির খাঁচার মধ্যে খেলা করছে তার একমাত্র মেয়ে লতা। এডবেস্টারের ছাউনির নিচে ঘরের মতো খাঁচার এক কোনে আলাদা খাঁচায় আবদ্ধ তার আদরের ময়না পাখিটি।রুদ্রকে দেখেই সোহাগে, নাকি বিষাদে,ঠিক বোঝা গেল না, তবে বেসুরে ডাকছিল লতা লতা বলে।রুদ্র মেয়ের দিকে একবার তাকিয়ে তারপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আকাশের বুকে। তখনো গোটা চারেক বঞ্চিত কাক পিছু নিয়েছে একটা বদ্রীর। ক্ষণিকের মধ্যেই ধরা পড়ে গেল ছোট্ট পাখিটা। কাকেদের মধ্যে মহাশূন্যে শুরু হল  রুদ্রের সোহাগের বদ্রীপাখির মাংস খাবলে খাওয়ার বায়ুযুদ্ধ। এদিকে ওদিকে যেদিকে চায় রুদ্র দেখতে পায় রংবেরঙের পাখিদের দেহ ছিঁড়ে খাওয়ার মহোৎসব! শোকার্ত রুদ্র মাথা নিচু করে খাঁচার মধ্যে ঢুকে লতার হাত ধরে বসে পড়ল। সে খাঁচার ফাঁক দিয়ে পাশের  কদম গাছের ডালে  দেখতে পেল তার আদরের কালচে-সাদা বদ্রীটা খাদকের মুখে খাদ্যরূপে। শূন্য খাঁচাঘরে আর একবার চেয়ে সজল চোখে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে এল। নিচে নেমে এসে দেখল তার স্ত্রী কামিনী ঘুমিয়ে আছে। রুদ্রনাথ স্ত্রীর নাম ধরে ডাকতেই সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। যার একটা ভুলে প্রায় শ'খানেক পাখি প্রাণ হারালো তাকে কিন্তু রুদ্র একটা কটু কথাও বলতে পারল না। কারণ সে-যে কামিনীকে বড়ো ভালোবাসে। শুধু একবার তার দিকে তাকিয়ে বলল- 
-তোমার লতা কি করেছে জানো?
     অপূর্ণ ঘুমের ক্লেশকে দূর করার জন্য কামিনী শরীর কসরত করে হাই তুলে মেয়েকে জিজ্ঞাসা করল- 
-কি করেছিস? কখন আমার কোল থেকে উঠে গেছিস?
     ভারী মিষ্টি মেয়ে লতা। বছর চারেক বয়স হবে। সামনের দুটো দাঁত পোকায় কেটে ফোকলা করেছে, তারি ফাঁক দিয়ে অপরাধী সুরে মুখ দুলিয়ে বলল, "আমি তো পাখিদের সঙ্গে খেলা করতে গেছিলাম, আর পাখিরা সবাই উড়ে আকাশে চলে গেল!" কোন কথা না বলে রুদ্র ঘর থেকে বেরিয়ে গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে সোজা চলে গেল স্নান ঘাটের দিকে। কামিনীর মুখটা মলিন হয়ে গেল। তার স্বামী যে পাখিদের ভীষণ ভালোবাসে। একটা পাখি খোয়া  গেলে আর একটা পাখি জোগাড় করে তার শোককে ভোলার চেষ্টা করে। গত আগস্ট মাসে তার সোহাগের লাভ বার্ডটি মরে গেলে   খুব দুঃখ পেয়েছিল রুদ্র। কিন্তু পয়সার অভাবে আজও তার শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি। লাভবার্ডটির শূন্য খাঁচা চোখে পড়লেই হৃদয়টা কেঁদে ওঠে রুদ্রের। তাই তার শোককে প্রশমিত করতে খাঁচাটি নিচে নামিয়ে দৃষ্টির অগোচরে রেখেছে। মাঝেমধ্যে তাদের  মেয়ে লতা চিলেকোঠা অতিক্রম করে পাখিদের কাছে যায়। পাখিদের সঙ্গে খেলা করে কিন্তু খাঁচার দরজা তালা দেওয়া থাকায় ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু আজ কামিনী পাখির খাঁচা ঝাঁট দিয়ে এবং খাবার দিয়ে বেরিয়ে চলে এসেছে, ভুলে গেছে পাখির খাঁচায় তালা দিতে। রুদ্রের স্ত্রী উপরে গিয়ে দেখল শূন্য খাঁচা। একাকী নি:সঙ্গ ময়না তাকে দেখতেই গলা খেকে ঘনঘন অভিযোগের সুরে বলল, 'লতা---লতা---।  তার সুরের মধ্যে যেন কুরুক্ষেত্রের মৃত্যু পুরিতে গান্ধারীর শোক- মূর্ছনা। কামিনী ভীষণ  মর্মাহত হলো।
     নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। রবিবাবুর একমাত্র পুত্র রুদ্র এবং একমাত্র কন্যা শ্যামা। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগেই। বর্তমান আইন মোতাবেকে বাবার সম্পত্তির ভাগীদার হয়েছে শ্যামা এবং সে তার পাওনা বুঝে নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেছে বছর তিনেক আগে। রুদ্রের বাবা নিজের আদর্শ দিয়ে ছেলেকে মানুষ করতে চেয়েছিল। কিন্তু বিধিবাম। ভালো রেজাল্ট করা সত্ত্বেও বিএ ফার্স্ট ইয়ারে বসে তার পড়ার পাট চুকে যায়। বাবা ব্রেন স্ট্রোকে প্রায় বছর চারেক ঘরে পড়েছিল প্যারালাইজড হয়ে। সংসারের হাল ধরতে হয় রুদ্রকে। একদিকে সংসার খরচ অপরদিকে বাবার রোগের পিছনে বাড়তি ব্যয়। তাই বলে রুদ্র পিছু হটাবার পাত্র নয়। বাবার পেশাকেই আঁকড়ে ধরে। শক্ত হাতে তুলে নেয় বাবার নিজস্ব ট্রাক্টরের স্টিয়ারিংকে। অবশেষে বাবা মারা গেলেন। মায়ের পছন্দ মত তার মামাবাড়ির দেশের মেয়ে কামিনীকে বিয়ে করে ঘরে আনে রুদ্র। সবই ঠিকঠাক চলছিল। রুদ্র মা-স্ত্রীকে নিয়ে স্বর্গের সিঁড়িতে সুখের আঁচল পেতে ছিল। ট্রাক্টর চালানো সহ চাষবাসের পাশাপাশি সে চালিয়ে যায় বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজ। আর শরীর সম্পর্কে ভীষণ সচেতন রুদ্র। খেলাধুলা সাথে সাঁতারটাও  চালিয়ে যায় শরীরকে সতেজ রাখার জন্য। সুখের সংসারে চার বছর আগে অতিথি হয়ে এসেছে তাদের আদরের মেয়ে লতা। সে যেন এই সংসারে শান্তির সাগরে সোনার তরী। সে-তরীর যাত্রী তার স্ত্রী ও মা আর রুদ্র নিজেই কান্ডারী। দুটো বছর কেটে যায় সুখস্বপ্ন মুখর রাতের মত। কিন্তু রুদ্রের হাতের বৈঠা কেঁপে ওঠে প্রলয় তুফান তাণ্ডবের মুখে। সুখের অন্তরালে মায়ের দেহে কখন যে মারণ কর্কট রোগ বাসা বেঁধেছে তা কেউ জানতে পারেনি। দু'বছর আগে সেকেন্ড স্টেজে মায়ের লাঙ্কস ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। যথা সর্বস্ব খুইয়ে মাকে বাঁচিয়ে তোলার ব্রতে লিপ্ত হয়েছিল রুদ্র। চাষের জমি তো বটেই, খুইয়েছে বাবার কেনা ট্রাক্টরটিও। শেষ পর্যন্ত কর্কট রোগের সমস্ত ধাপ অতিক্রম করে মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নিয়েছেন রুদ্রের মা। রেডক্রসের এক কর্তার অনুগ্রহে বছর খানেক হল সে বরাবরের জন্য পুলকারে ড্রাইভিং এর পেশায় যুক্ত হয়েছে। পয়সা তেমন কিছু না জমলেও নতুন পেশায় নিজেকে নিযুক্ত করেছে নতুন রূপে। এই পেশায় নিযুক্ত হয়ে যেন সে ফিরে পেয়েছে তার বাল্য শিক্ষার আঙিনা। সে নিজে না পড়ালেও কচিকাঁচাদের নিয়ে যাওয়া-আসার মধ্য দিয়ে তাদের সঙ্গে জমে উঠেছে তার সখ্যতা। গত জানুয়ারিতে নিজের মেয়ে লতাকেও ভর্তি করেছে সেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে, যে স্কুলের পুলকার সে ড্রাইভ করে। পঠন-পাঠনের সময় পার হয়ে গেলে নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য শেষ করে বাড়ি ফিরে মেয়ে-স্ত্রী এবং পাখিদের সঙ্গে তার সুখবাস হয়। এখন আর চাষবাসের কোন ঝুট ঝামেলা নেই। অনেক বেশি মসৃণ জীবনযাপন। কিন্তু হায়! আবার নেমে এলো বিপর্যয়! কিন্তু এবার আর রুদ্রের ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সে- বিপর্যয় সমগ্র পৃথিবীর। এক চাল-চুলো গোত্রহীন  মারণ ভাইরাস দৈত্যের রূপ ধারণ করেছে দেশে দেশে। সে-দানব মানুষের বুকে জেঁকে বসেছে চিরমুক্তির পরশ কাঠির মত। তার ছোঁয়ায় যেন মৃত্যুর বীভৎসতা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ দেশের গণ্ডির ধার ধারে না। তার কাছে মানুষই যেন প্রতিদ্বন্দ্বী। অদৃশ্য ঘাতকের হাত থেকে বাঁচার জন্য মানুষ নিজেদের দেহে দিয়েছে প্রাচীর, নিজেকে আবদ্ধ করেছে রুদ্ধ ঘরে। তবু নিস্তার নেই! মৃত্যুর মিছিল এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। তার অপ্রতিরোধ্য গতির কাছে হার মেনেছে হিমালয় চাপা প্রাচীর, হার মেনেছে সাত সমুদ্র, হার মেনেছে দুর্গম মরুভূমি। বিলম্ব হলেও আমাদের দেশে তার আস্ফালন বেড়ে চলেছে ধীরে ধীরে। বিকল হয়েছে জনজীবন। বন্ধ হয়েছে সমস্ত যান্ত্রিক অযান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। সামাজিক দূরত্বই হয়েছে যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র। এই দূরত্ব পালন করতে গিয়ে মানুষ হয়ে উঠেছে অনেকটা অসহিষ্ণু। লকডাউনে শামিল হতে গিয়ে মানুষ হয়ে উঠেছে অতিষ্ঠ। তৃতীয় বিশ্বের এই দেশ লকডাউনের মাধ্যমে করোনার মোকাবেলা করতে গিয়ে অনাহারে মরার উপক্রম হয়েছে অসংখ্য মানুষ। রুদ্রও তার ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘ লকডাউনে কাজ হারিয়েছে রুদ্র। ঘরে আর্থিক সামর্থ্য যা আছে তাতে হয়তো চলতে পারে আর একটা মাস। সরকারি সাহায্যের মুখাপেক্ষী থেকে নির্বোধের পরিচয় দিতে রাজি নয় রুদ্র। গ্রামের সুনামধন্য সরকার বাবুদের ট্রাক্টর ড্রাইভিং এর কাজে যুক্ত হলো সে। খটখটে রোদ্দুর বৈশাখ মাস।গ্রামগঞ্জে খানাখন্দ বন্ধ করার সময়। এখন আর কেউ কোদাল ঝুড়িতে মাটি  কাটেনা। পুকুর অথবা শুকনো নদীর বুক থেকে মাটি-বালি কাটে 'জেসিপি' এবং ট্রাক্টর-ট্রলি তা বহন করে যথাস্থানে ফেলে দেয়। সরকারের ঘোষিত লকডাউনের নীতি মেনে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ চলছে। রুদ্র সেকাজে সদ্য লিপ্ত হয়ে ক্ষীণ আশার আলো দেখতে পেয়েছে। বেলা দশটার দিকে কাজে বেরিয়ে যায়, বিকেল চারটে নাগাদ আবার ফিরে আসে। মেয়ের সঙ্গে ক্ষণিক সময় কাটিয়ে স্নানে যায়। আজ রুদ্র নিয়ম ভেঙ্গে বিষন্ন মনে স্নানঘাটে গেল। স্নান থেকে সে ফিরে এলে তার স্ত্রী কামিনী বলল খাবারের কথা। রুদ্র জানিয়েছে-
-কামিনী বেলাটা বড্ড গড়িয়ে গেছে, খেতে ভালো লাগছে না,  একবারে রাত্রে খেয়ে নেব। 
-তাই বললে হয়?  দুপুরের খাওয়া তো হয়নি তোমার।
-তা হয়নি ঠিক।তবে দুপুরে বেশ জমিয়ে মসলা মুড়ি খেয়েছি।
-তাহলে একটু চা দিই।
-তা দিলে মন্দ হয় না।
     কামিনী তার স্বামী রুদ্রের জন্য চা তৈরি করতে গেল। রুদ্র ততসময় চিলেকোঠার পাশে পাখির খাঁচার দিকে গেল। দেখল এক কোণে বিষন্ন মনে তার ময়নাটি ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার সঙ্গে বেশ কিছু মৌনকথা বলল রুদ্র। স্ত্রী কামিনী ডাকতেই সে নিচে ফিরে এল এবং তার হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে জানতে চাইল-
-লতা কোথায়?
-সে ঘুমিয়ে পড়েছে
-এই অবেলায়!
-আমার বকুনি খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেছে।
-তুমি ওকে আবার বকতে গেলে কেন?
     রুদ্রের কথার প্রত্যুত্তর দিতে গিয়ে কামিনীর গলা ঠেলে কাশি বের হলো। রুদ্র স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করল-
-কামিনী তোমার বুঝি শরীর খারাপ হয়েছে?
-না গো তেমন কিছু নয়, কদিন শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।
-কই আমাকে তো একবারও বললে না?
-বলার মত নয় বলেই বলিনি।
-তুমি কাজটা মোটেই ঠিক করোনি। এখন কেমন লাগছে বলতো।
-সামান্য জ্বর জ্বর আর গা গুলানো বমি বমি মনে হচ্ছে।
-তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। আকাশে মেঘ করেছে, ঝড় উঠতে পারে। তার আগে খেয়াঘাটের ডাক্তারবাবুর কাছে যেতে হবে।
     খেয়াঘাটের ডাক্তারবাবু বছর সাত আটকে হলো তিনি গ্রামে এসেছেন। ডাক্তার হিসাবে বেশ খ্যাতি অর্জনও করেছেন। ডাক্তারবাবুর কথা অনুযায়ী তিনি পূর্ব বর্ধমান জেলার অধিবাসী। ত্রিশ বছর বয়স থেকে তিনি এখানে ডাক্তারি করছেন। এখন তার বয়স পঁয়ত্রিশ। কোয়াক ডাক্তার হলেও হাতযশ  একদম কাঁচা নয়। তবে কাজের থেকে মুখটা চলে বড্ড বেশি। মিষ্টি ভাষা দিয়ে মানুষকে খুব সহজে আপন করে নেয়। রুদ্রের বাবা প্যারালাইসিসে শয্যাগত থাকার সময় থেকেই এ-বাড়িতে তার আসা-যাওয়া। মায়ের বেলায়ও ছোটখাটো ইনজেকশনের জন্য আসতে হতো। সেই থেকে রুদ্রের পরিবারের সঙ্গে ডাক্তারবাবুর ঘনিষ্ঠতা। সে ফোন করে একবার জেনে নেয় ডাক্তারবাবু আছেন কিনা। ডাক্তারবাবুর বার্তায় সবুজ সংকেত পায়। রুদ্র চায়ের কাপ শেষ করতে করতে, তার স্ত্রী কামিনী রেডি হয়ে নেয়। মেয়েকে সঙ্গে করে তারা পৌঁছে যায় খেয়াঘাটে ডাক্তার বাবুর চেম্বারে। ক্ষণিকের মধ্যে আকাশের মেঘের ঘনঘটা বাড়তে থাকে। ডাক্তারবাবু তড়িঘড়ি করে কামিনীকে নিরীক্ষণ করে। শেষ পর্যন্ত কামিনীকে বাইরে পাঠিয়ে রুদ্রকে ডেকে বললেন-
-রুদ্রদা চিন্তার কোন কারণ নেই, তুমি আবার বাবা হতে চলেছ।
-বলছেন কি ডাক্তার বাবু!?
-হ্যাঁগো ঠিকই বলছি।
-কোন চেকআপ ছাড়াই আপনি কি করে কনফার্ম হচ্ছেন?
-এটা আমার দীর্ঘদিনের ডাক্তারি অভিজ্ঞতা, তবু তুমি যখন বলছ  আমি একটা পেগ কার্ড পাঠিয়ে দেবো, চেক করে নেবে।         ডাক্তারবাবু যতটা উৎসাহের সহিত জানালেন ততটাই ভারাক্রান্ত হল রুদ্র। বিষাদী কন্ঠে সে ডাক্তারবাবুকে বলল, "ঠিক আছে ডাক্তারবাবু আমি আসছি, এক্ষুনি বোধহয় ঝড় উঠবে।"         অদূরে দাঁড়ানো কামিনীর  হাত ধরে রুদ্র বাড়ির পথে পা বাড়াতেই কারেন্ট চলে গেল। খেয়াঘাটের বড় ভেপার লাইটটা চোখ বন্ধ করলো, অন্ধকার আছড়ে পড়লো রুদ্রের চলার পথে। পা যেন আর চলতে চাইছে না। অবসাদগ্রস্ত ভাবনা যেন রুদ্রের গমনাঙ্গকে অবরুদ্ধ করেছে। কিঞ্চিৎ পথ তার কাছে হয়ে উঠলো হাজার ক্রোশ। সারাদিনের গুমোট গরমের প্রাদুর্ভাব কাটাতে প্রকৃতি  রণচন্ডী রূপ ধারণ করে বইতে লাগলো। এলোমেলো দমকা হাওয়া প্রলয়ের দুর্ভাবনার নিরসন করে কিয়ৎক্ষণে পৌঁছে দিল বাড়ি। শুরু হলো প্রবল বর্ষণ। রুদ্র তার ছোট্ট বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখল ঘনঘন ঝলকিত বিদ্যুতের আলোয় অনেক পত্র-শাখার স্খলন, গ্রীষ্মের তাপদাহে মৃতপ্রায় তৃণ-গুল্মদের বৃষ্টির পরশে নব প্রাণের শিহরণ। রুদ্র চমকিত আলোয় শূন্য আকাশে যেন দেখতে পেল তার প্রাণের পাখিদের আর্তনাদের সকরুণ চিত্র। এমন ভাবনার মধ্য দিয়ে পিছন ফিরতেই সে দেখল ঘরে মোমের বাতি জ্বালিয়েছে কামিনী। পাশে তার মেয়ে
     মলিন মুখে দাঁড়িয়ে। প্রতিদিনের মত তার মনে নেই উচ্ছাস। বাবার কাছে আসতে তার সংকোচ বোধ হচ্ছে। রুদ্র মেয়ের দিকে দু' পা এগোতেই মাঝে এসে দাঁড়ালো কামিনী। সে সহমর্মী কন্ঠে বলল-
-কি গো তোমার কি হয়েছে?
-কেন বলতো?
-ডাক্তারবাবুর ওখান থেকে আসার পর কোন কথাই বলছো না! ডাক্তারবাবু তোমাকে ডেকে নিয়ে কি বলল?
-না তেমন কিছু বলেনি।
-তবে অমন করে মুখ গোমরা করে আছো কেন?
-ভাবছি বৃষ্টি যা হয়েছে, মাটির খাদান গুলো জল ভরে গেছে। অনির্দিষ্ট কালের জন্য হয়তো কাজ আবার বন্ধ হয়ে যাবে।
-তাতে কি হয়েছে, গ্রীষ্মের রোদ, দেখবে দুদিনেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
-ঠিক হলেই ভালো, আমার একটু অসুবিধা হলেও বৃষ্টির বড্ড দরকার ছিল। কামিনী একটা কাজ করো, আজ রাতে আর রান্নার দরকার নেই, আমার খাবারটা ভাগ করে খেয়ে শুয়ে পড়ি। কারেন্ট হয়তো দুই এক দিনের ভিতরে আর আসবে না।
     কামিনী রুদ্রের কথায় সহমত পোষণ করে। রুদ্র তার মেয়ে লতার সঙ্গে কিছু গল্প কথায় মেতে ওঠে। তার মাঝে কামিনী খাবার বেড়ে দিল। সকলেই আধপেটা খেয়ে শুয়ে পড়ল। মনোক্ষুন্ন লতা বাবার আদরে আর শীতল আবহে ঘুমের দেশে হারিয়ে গেল। কামিনী এত সময় উৎসুক হয়েছিল ডাক্তারবাবু একাকী স্বামীকে ডেকে কি বলেছে, সে কথা জানার জন্য। লতা ঘুমিয়ে যেতেই সে রুদ্রের বুকে আলতো দেহ ঢেলে সোহাগী সুরে বলল-
-বলো না গো ডাক্তারবাবু কি বলল?
-ডাক্তারবাবু বলল, তুমি আবার মা হতে চলেছো
-সেকি!?
-হ্যাঁ।
     স্বামী-স্ত্রী দুজনে একান্তে ঋতুচক্রের দিনক্ষণ গুনতে থাকে। অবশেষে মাতৃত্বের সন্দেহ প্রকাশ করে কামিনী। মাতৃত্বের পূর্ব অভিজ্ঞতার লক্ষণগুলো নিজের মধ্যে দেখতে পায়। এবার শুরু হয় নিজেদের মধ্যে নতুন তরজা। রুদ্র কিছুতেই দ্বিতীয় বাচ্চা নিতে চায় না। কিন্তু কামিনী বেঁকে বসে। রুদ্রের কথায় প্রকাশ পায়, তার এই আর্থিক পরিকাঠামোর মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান বেমানান এবং একমাত্র মেয়ে লতাকে যথা শিক্ষা দিয়ে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তোলার কঠোর দৃঢ়তা। অপরদিকে কামিনীর একটাই যুক্তি, সে একটা পুত্র সন্তানের মা হতে চায়। কিন্তু রুদ্রের নারী-পুরুষ অভিন্ন যুক্তি চেতনার কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানে কামিনী। গর্ভের ভ্রূণকে পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। কিন্তু বড় দুরূহ বিষয় হলো যে, এই লক ডাউনের সময় একাজ গোপনে সুসম্পন্ন করার যেমন অসুবিধা তেমনি সংসারে অর্থের অনটন। নগদ অর্থ বলতে হাজার খানেক টাকা! এই দুঃসময়ে সেটাও হাতছাড়া করা কি বুদ্ধিমানের কাজ? বিকল্প পথ খুঁজতে থাকে রুদ্র। কর্মহীন দুদিনের প্রচেষ্টায় ডাক্তারবাবু আশ্বাস দিলেন, আড়াই হাজার টাকার বিনিময় তিনি ঔষধের ব্যবস্থা করে দেবেন। তবে টাকাটা নগদ হওয়া চাই। 
     ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথোপকথনের বিষয় উপস্থাপন করল রুদ্র তার স্ত্রী কামিনীর কাছে। স্ত্রীও মনে মনে ভাবতে থাকে পয়সা সংস্থানের কথা। শেষ পর্যন্ত কামিনী রুদ্রকে বলে বসলো, "আমাদের ময়নাকে বিক্রি করে দিলেই তো হয়?" স্ত্রীর মুখে ময়না পাখি বিক্রির কথা শুনে অতি শান্ত সুরে বলল-
-না কামিনী তা হয় না, বরং একটা কাজ করি?
-কি করবে শুনি।
-বরং সন্তানটাকে আমরা রেখে দিই।
-না তা আর হয় না, মন থেকে যাকে আমি ত্যাগ করেছি। তাকে রাখতে চাইনা।
-তাহলে পয়সা পাবো কোথায়? এই লক- ডাউনের বাজারে কেউ কাউকে এতগুলো টাকা ধার দেবে না।
-বললাম তো পাখিটাকে বিক্রি করে দাও
-এই অসময়ে পাখি কিনে কে-ই-বা টাকা অপচয় করবে বল?
-তুমি বললে হয়তো ডাক্তারবাবুই পাখিটা কিনে নেবে।
-তার মুখের উপরে কি করে আমার এই অক্ষমতার কথা বলি বলতো?
-মুখের উপরে বলতে না পারো, ফোন করে বলো।
-দেখা যাক কালকে কি করতে পারি।
     আর কোন কথা না বলে রুদ্রনাথ কামিনীর উল্টো দিকে মুখ করে কৃত্রিম ঘুমে বুঁদ হল। করোনার দেশে আজকের দিনটা তার বড় বেদনার। মারণ ভাইরাস যেন তার আনাচে-কানাচে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই সমূহ বিপদের মধ্যে নিজেকে স্থির রাখার মানসিক দৃঢ়তা রুদ্রের আছে। তবু একটু বিমর্ষ হয়েছে বিষয়টা গোপন এবং লজ্জার বলে। সে কারোর কাছে আড়াই হাজার টাকা চাইলে অনাসেই পাবে। কিন্তু তার ভয় যদি কেহ জানতে চায় টাকার কি প্রয়োজন। রুদ্রনাথ তো মিথ্যে কথা বলতে পারবে না। আবার সত্য বললেও লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। অতএব এযাত্রায় বাঁচার জন্য তার সাধের ময়না পাখিকেই বলি দেবে, এই সিদ্ধান্তকে মনের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করে রাতটা কাটিয়ে দিল রুদ্র। সকাল দ্বিপ্রহরে লজ্জা সংকোচের মাথা খেয়ে সে ফোন করল ডাক্তারবাবুকে। প্রস্তাবটা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারবাবু এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। রুদ্র স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে মাথাটাকে হালকা করল। কিন্তু ভাবনার মুদ্রা পৃষ্ঠকে যখন উল্টে দেখলো,  বিনিময়ে ময়নাকে তাকে দিয়ে দিতে হবে। বুকটা তার মুচড়ে উঠলো। ব্যথায় পাথর চাপা দিয়ে সে-যন্ত্রনাকে বুকের মধ্যেই গোপন করল। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে ফোন মারফত কথামতো দিন দুই পরে রুদ্র তার ময়না পাখি নিয়ে রওনা হলো খেয়াঘাটে ডাক্তারের উদ্দেশ্যে। পথ চলতে চলতে বারবার বুকটা তার কেঁপে ওঠে যদি ময়না বলে ওঠে, কামিনী কোথায় গেলে গো,  শুনছো? অথবা লতা লতা এসো খাবার খাও। পাখিটা যে তার মুখের কথা বলে বার বার! আজ থেকে তিন বছর আগে বিবাহ বার্ষিকীর দিনে কামিনীকে গিফট করেছিল রুদ্র। ভারী মিষ্টি স্বভাবের সে। নিষ্ঠুরের মতো তাকে চির নির্বাসন দিতে চলেছে রুদ্র। সে মনে মনে শপথ করেছে আজকের পরে আর কোনো দিন সে যাবে না খেয়া ঘাটে। নিজের আর্থিক অক্ষমতার জন্য নিজেকে ধিক্কার দিতে দিতে ছুটে চলল ভীরু অপরাধী শশকের মত। ময়নাকে ডাক্তারবাবুর হাতে দিয়ে আসতে পারলে সে যেন চির মুক্তি পায়। অবশেষে রুদ্র খেয়াঘাটে গেল, ডাক্তার বাবুর হাতে লোহার খাঁচা সহ পাখিটাকে দিয়ে দিল। ময়না একবারও ফিরে দেখলো না রুদ্রের দিকে! সে উপলব্ধি করেছে তার ময়নার অসহায় অভিমানের কথা। সে একবার শুধু তার হলুদ রেখা বলয় চোখের দিকে চাইল। কিন্তু ময়না এমন ভান করল, সে যেন তাকে চেনেই না। তার এই বাহানার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে নিগূঢ় প্রভুত্বের বদান্যতা। তার দিকে মায়াবী দৃষ্টিতে চেয়ে সে যেন তার এত দিনের অন্নদাতাকে কাঁদাতে চায়না। রুদ্র বুকটাকে পাষাণ করে লোহার গারদ বেষ্টিত ময়নাকে ডাক্তারবাবুর হাতে তুলে দিয়ে চলে এলো। হাতে করে নিয়ে এলো ভ্রূণহত্যা নাশক পিল। সে বাড়ি ফিরে তার স্ত্রী কামিনীর হাতে ওষুধটা তুলে দিলো। সে বক্ষ উজার করা মনচোরা প্রশ্বাস বায়ু ত্যাগ করে স্ত্রীর সামনে থেকে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল।
     কামিনীর কথা মত সব মেঘ কেটে গেল যথাসময়ে, আবার রুদ্রের স্বাভাবিক পথ চলা শুরু হয়েছে। তবে সে আর খেয়া ঘাটের ধারপাশ মাড়ায় না, যদি তার ময়না তাকে দেখে ফেলে।
     দু'চারদিনের খটখটে রোদে মাটির খাদান আবার শুকিয়ে গেছে। রুদ্রের কাজ শুরু হয়েছে জোর কদমে। লকডাউনও শিথিল হয়েছে যথেষ্ট, বেড়েছে কাজ করার সময়। এখন শুধু দিন নয় রাতের বেশ কিছু সময় কাজ চলে। মাঝেমধ্যে রুদ্রের বাড়ি ফিরতে রাতের দ্বিপ্রহর গড়িয়ে যায়।
     প্রতিদিনের মতো সেদিনও সকাল থেকে দশটা পর্যন্ত কাজ করে রুদ্র ফিরে এসেছে বাড়িতে। প্রচন্ড তাপদাহে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বিকাল থেকে শুরু হয় আবার কাজ, চলবে রাত বারোটা পর্যন্ত। কিন্তু রাত আটটা গড়াতেই শুরু হয় তার হাঁচি কাশি। হাঁচি-কাশি মানেই করোনার উপসর্গ, অন্যান্য যারা ছিল তারা সবাই রুদ্রকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করলো। সেও শরীরের গতিবিধি লক্ষ্য করে অপর একজনের কাছে ট্রাক্টর হস্তান্তর করে প্রায় এক  কিলোমিটার পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে এলো নিঃশব্দে। ঘরের পূর্বদিকে নারকেল গাছ পার হতেই রুদ্রের কানে ভেসে এলো ফিসফিস কিছু আলো-আঁধারি শব্দ! মাটির বুকে বিড়ালী পদক্ষেপে এগিয়ে গেল জানালার কাছে। জানালার কাছে কান পাততেই ঠাওর করল অভ্যন্তরে নারী-পুরুষের অভিসারী কথোপকথন। জানালার পাল্লার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে সাহস পেল না, বুকটা কেঁপে উঠলো অভূতপূর্ব উপলব্ধ এক অব্যক্ত গোপন যন্ত্রণায়। তবু পাথর-মূর্তির মত অন্ধকারের বুকে দাঁড়িয়ে শুনতে থাকে বন্য-গুহা-মানব মানবীর গুপ্ত প্রেমের ঐকান্তিক নিবিড় কথা। তাদের আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে রুদ্র স্পষ্ট হল, কামিনীর গর্ভের ভ্রূণ ছিল অন্ত:বাসি কালপুরুষের। মুহুর্তের মধ্যে বিশ্বাস ভঙ্গ আর অপমানের যন্ত্রণায় রুদ্রের সুঠাম দেহের শক্ত পেশীর শিরায় শিরায় রক্ত ধারা প্রবাহিত হতে লাগল খরস্রোতা নদীর মত। অপ্রত্যাশিত বর্ষণে বাঁধ ভাঙ্গা উন্মাদনায় নেচে উঠলো দেহ-মন। বন্য মোষ যেমন উইপোকার ঢিপি তছনছ করে ক্ষিপ্রতার বহিঃপ্রকাশ করে এবং তার প্রতিপক্ষের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তেমনি রুদ্র তার হৃদয়ের বাসর ঘর ভেঙে বাইরের দরজার কোলাপসেবল গেটে সজোরে ধাক্কা মারলো। শব্দ শুনতে পেয়ে কামিনী ঘরের ভিতর থেকে কম্পিত কন্ঠে বলল, কে!? কে!? খণিক নীরবতা, তারপরে কৃত্রিম প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল, তুমি কি করছ!? কামিনীর পরপর দুটো প্রশ্নে রুদ্র নির্বাক হয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবতে লাগল, সত্যিই তো পৃথিবীতে আমি কে? আমার বিশ্বাসের, আমার ভালবাসার মানুষের হৃদয় থেকে যখন আমি অনস্তিত্বের গহীন অন্ধকারে হারিয়ে গেছি। তখন নিজের কাছে নিজের অস্তিত্ব কুশপুত্তলিকা মনে হচ্ছে। কামিনীর দ্বিতীয় প্রশ্নেরও যৌক্তিকতা আছে। আমি কি করছি!? নিজের পুরুষত্বের অক্ষমতাকে পেশী শক্তি দিয়ে ঢাকতে গেলে পাছে দুর্গন্ধে নিজেকেই কলুষিত হতে হবে। তাতে নিজের সম্মান ফিরে আসবেনা, উপরন্তু কামিনীর সুখে বাদ সাধবো। "কিয়ৎক্ষণের মধ্যে ভাবনার  অবসান ঘটিয়ে রুদ্র জিরাফের মতো চলে গেল তার বাড়ির দক্ষিণ পাশের ছোট্ট পুকুরের দিকে।  
     সেখানে বড়জোর হাঁটু জল। রুদ্র একবারও পৃথিবীর দিকে ফিরে চায়নি। পরাজিত সাল- শোল ক্রোধে জলাশয়ের পাঁক খেয়ে যেমন আত্মহত্যা করে তেমনি সামান্য জলে রুদ্র ডুব দিয়ে মাটি আঁকড়ে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করল!
     সকাল হতেই রুদ্রের মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল। দু-চার গাঁয়ের মানুষ সামাজিক দূরত্ব কে অবজ্ঞা করে ভেঙে পড়েছিল রুদ্রের মৃত্যু স্থানের উদ্দেশ্যে। কিন্তু কেহই সে পর্যন্ত পৌঁছায়নি। জনস্রোত আটকে গেল খেয়াঘাটে এসে। মুহুর্তের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব রূপ নিল অসামাজিক রূপে। ডাক্তারবাবুর রটনায় রুদ্রের মৃতদেহ হয়ে উঠেছে করোনার স্তুপ।
     ডাক্তারবাবু নিজে মুখে বয়ান দিয়েছে, "গত চারদিন আগে তার কাছে রুদ্র এসেছিল যে উপসর্গ নিয়ে সেটা ছিল পুরোপুরি করোনারই লক্ষণ। করোনাভাইরাস যত সংক্রামক তার হাজারগুন সংক্রমিত হলো ডাক্তারের মুখের মিথ্যা রটনা।" তার বয়ানের সঙ্গে মিলে গেছে গত রাতে কাজ থেকে ফিরে আসার ঘটনার কথা। তবে অনেকের মুখে ও মনে প্রশ্ন ছিল, তাহলে পুকুরের জলে গিয়ে কেন মরবে? উত্তর ছিল একটাই, রুদ্র যে খুব ভালো মানুষ, সে আর একবার প্রমান করে গেল নিরাপদ দুরত্বে গিয়ে মরে।
     রুদ্রের মৃতদেহ মিশে গেলো করোণায় মরা মানুষের মিছিলে। তার শব যাত্রায় ছিল জনাকয়েক প্লাস্টিক মানুষ। পথে-ঘাটে কেউ গোবরের ছড়া কাটেনি, কেউ ছুঁড়ে দেয়নি একটা ফুল। পথের পাশের খোলা দরজা জানলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল স্বর্গের যান্ত্রিক রথ ও অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে। যে এ্যাম্বুলেন্সে বহন করেছিল রুদ্রের স্ত্রী ও মেয়েকে কোয়ারেন্টাইনের উদ্দেশ্য। গ্রামে জারি হলো লাল সংকেত। টিভির পর্দায় উদ্ভাসিত হল ডাক্তারবাবুর সুচতুর মস্তিষ্কপ্রসূত কল্পকথা।
     তবে কামিনীর সিঁথির শেষ সিঁদুরে নীরবে-নিভৃতে লেখা রয়ে গেল রুদ্রের মত সাঁতারুর সমাধি হাঁটু জলে!!

সজল কুমার পোদ্দার
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত