অটোয়া, শনিবার ২১ মে, ২০২২
ছুটির ফাঁদে - যুথিকা বড়ুয়া

র্মজীবনে মানব সেবাতেই দিবাকরের দিন যায় আর রাত পোহায়। পড়ন্ত বেলার শেষে ক্লান্ত সূর্য্যমিামা কখন যে অস্তাচলে ঢলে পড়ে, সন্ধ্যে পেরিয়ে বাইরের পৃথিবী অন্ধকারে ছেয়ে যায়, মালুমই হয় না। অবিশ্রান্ত রুগীর সেবা-শুশ্রূষা করতে করতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-আনন্দ-উচ্ছাসে একেবারে ভাটাই পড়ে গিয়েছে। 
     পেশায় দিবাকর একজন মেডিক্যাল ডাক্তার। স্ত্রী মালবিকা নার্সারীস্কুলের শিক্ষয়িত্রী। স্ত্রী এবং বৃদ্ধা মাকে নিয়ে দিবাকরের ছোট্ট ছিমছাম নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার। শহরের নিড়িবিলি রেসিডেন্সি এলাকায় শ্বেতপাথরের মোজাইক করা অট্টালিকার মতো বিশাল বাড়ি। বাড়ির সদর দরজার একটু উপরে নেইম প্লেটে বড় অক্ষরে খোদাই করে লেখা,‘শান্তি কুটির।’ 
     চল্লিশের উর্দ্ধেঃ বয়স মালবিকার। জীবনের অর্ধেকটা পেরিয়ে এসেছে, কিংবা তারও বেশী। কিন্তু বিবাহিতা জীবনে নিজের সাধ-আহাল্লাদ কিছুই পূরণ হয়নি। জীবনে অর্থ-ঐশ্বর্য্যই কি সব! আর যাই হোক, অন্তত মনের সুখ কখনো কেনা যায় না। হিসেব কষলে দেখা যায়, যোগ-বিয়োগ সবই শূন্য। জীবনে কত আশা ছিল মালবিকার। কত স্বপ্ন ছিল। কিছুই পূরণ করতে পারে নি। যেদিন প্রসবকালীন জটিলতার অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে একটি মৃত কন্যা সন্তানের জন্ম লগ্নেই ওর চিরদিনের মতো বিনষ্ট হয়ে যায়, সন্তন ধারণের ক্ষমতা। সেইদিন থেকেই নারী জাতির পরম কাক্সিক্ষত স্বপ্ন এবং মধুচন্দ্রিমার সেই আবেগে সোহাগে অনুরাগে আনন্দময় রজনী আর ফিরে আসে নি ওর জীবনে। ফিরে আসে নি, দাম্পত্য জীবনের সুখ-শান্তি, আনন্দ-কোলাহল এবং অন্তরঙ্গ আলাপনের সেই আনন্দঘন মুহূর্ত। ভাগ্যবিড়ম্বণায় প্রাত্যহিক জীবনের এক একটি দিন অতিবাহিত হয়, নীরব, নিরুচ্ছাস, নিস্প্রেম, নিরানন্দে। কোনো আবেগ নেই, অনুভূতি নেই। যেন একই পথের দুই মোসাফির। একই ছাদের নীচে, এক সাথে বসবাস করেও দুজনার মন-মঞ্জিল দুইপ্রান্তে। দিবাকর উদয়াস্ত রুগী সেবায় নিমগ্ন হয়ে ডুবে থাকে। আর মালবিকা, নার্সারী স্কুলের ছোট্ট শিশুদের নিয়ে ভুলে থাকে মাতৃহীনতার যন্ত্রণা। ভুলে থাকে বন্ধা নারীর কলঙ্ক, অপবাদ। যা আজও ওকে পিছু পিছু ধাওয়া করে, অপদস্থ করে। আর তা থেকে নিস্তার পেতেই হৃদয় নিঃসৃত স্নেহ -মমতা-ভালোবাসা বিতড়ণে নিমজ্জিত হয়ে পূরণ করে, মা হওয়ার সাধ। যার ফলে উভয়ে উভয়ের সান্নিধ্যে নির্লিপ্ততার কারণে ক্রমে ক্রমে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে, দুটি আত্মার একতা, ঘনিষ্ঠতা, হৃদ্যতা এবং পরম আত্মীয়তা। অচীরেই বেড়ে যায় মানসিক দূরত্ব। যেদিন আপন স্বার্থে মান-অভিমানের দ্বন্ধে ও বিবাদে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে শ্রদ্ধা-ভক্তি, প্রেম-ভালোবাসা ও দাম্পত্য জীবনের মূল্যবোধের শিকড় হৃদয়ের গভীরে পোঁছোবার আগেই একটু একটু করে ছিঁড়তে শুরু করছিল। 
     আসছে রবিবার, ৮ই ফাল্গুন, দিবাকর-মালবিকার ১৫তম বিবাহ বার্ষিকী। ইচ্ছা হয়, জীবনকে নতুন রংএ, নতুন ঢংএ নতুন করে সাজাতে। জীবনকে নতুন করে ফিরে পেতে। প্রিয়তম স্বামী দিবাকরকে একান্তে নিঃভৃতে নিবিড় করে কাছে পেতে। ওর গহীন ভালোবাসার অবগাহনে নিমজ্জিত হয়ে বুদ হয়ে থাকতে। অথচ সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই দিবাকরের। কোনকালেই বা ছিল! দিবাকর বিলেত ফেরৎ মেডিক্যাল ডাক্তার। সারাদিন নিজের চেম্বারে রুগী নিয়ে পড়ে থাকে। রুগীর সেবা-শুশ্রুষা করে। হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই ওর মনের আক্ষেপ, অভিমান ভুলে থাকার চেষ্টা করে। একরাশ মনবেদনা নিয়ে ভুলে থাকার চেষ্টা করে, সন্তানহীনতার যন্ত্রণা। 
     কিন্তু কতক্ষণ! শরীরিক ক্লান্তি অবসন্নতায় একসময় যথারীতি ফিরে আসে বাড়িতে। বাড়িতে ঢুকেই কর্ণগোচর হয়, মালবিকার উচ্ছাসিত কণ্ঠস্বর। টেলিফোনে কথা বলছে ও’। একটু ব্যতিক্রমই মনে হচ্ছে। সে একেবারে আবেগে উতল। ব্যাপারটা কি! 
     দিবাকর দ্রুত পায়ে এগিয়ে যেতেই ওর নজর এড়ায় না। স্বতঃস্ফূর্ত মালবিকার চোখমুখ থেকেও ঝড়ে পড়ছে একরাশ মুক্তাঝড়া অনিন্দ হাসি। মুহূর্তে একধরণের কৌতূহল প্রচন্ড উৎসুক্য করে তোলে দিবাকরকে। ওর মধ্যে প্রতিক্রিয়া ঘটে। যা ক্ষণপূর্বেও কল্পনা করে নি অপ্রস্তুত দিবাকর। হঠাৎ একগাল হেসে খুব মোলায়েম করে বলল,-‘কে গো মলি! তুমি কার সাথে কথা বলছো!’ 
     ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে মালবিকা। যেন আকাশ থেকে পড়লো। নিজের কানদু’টোকে কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। কি স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর দিবাকরের। যেন কত ভাব-ভালোবাসা দুজনার। 
     মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ের ঘোরে পড়ে গেলেও মনের মধ্যে দীর্ঘদিনের পূঞ্জীভূত গ্লানি-মান-অভিমান সব নিমেষে দূরীভূত হয়ে গেল। ক্রোধের লেশমাত্রও নেই। 
     মালবিকাও অবিলম্বে রিসিভারটা রেখে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। সহাস্যে বলল,-‘জানো, অলকার বিয়ে!’
     সবিস্ময়ে দিবাকর বলল,-‘এ্যাঁ, বলো কি! আমার সেই ছোট্ট শালিকা, ওলির বিয়ে?’
     বলেই ক্ষণপূর্বের অকপট সারল্য হাসিটা ওর মিলিয়ে গেল। কেমন অন্যমনস্ক হয়ে খুব গভীর তন্ময় হয়ে কি যেন ভাবছে। কিন্তু কি ভাবছে, তা বুঝলো না মালবিকা। অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। 
     দিবাকর মনে মনে ভাবে, দেখতে দেখতে কতগুলি বছর কেটে গেল, বিগত কয়েক বছর মলিকে কিছুই দেওয়া হয় নি। কখনো আবদারও করেনি। অভিযোগও করেনি। ভাগ্য বিড়ম্বণায় সর্বাবস্থায় বিরূপ পরিস্থিতিকেই সর্বান্তকরণে মেনে নিয়েছে। কিন্তু দিবাকর, স্বামী হিসেবে ওরও তো একটা দায়িত্ব কর্তব্য আছে। আর তৎক্ষনাৎ দিবাকর মনস্থির করে, এবার ১৫তম বিবাহ বার্ষিকীতে মলিকে সারপ্রাইজ দেবে। একঘেঁয়ে রুটিন মাফিক কর্মজীবন থেকে কিছুদিনের জন্য বিরতি নিয়ে সমুদ্র-সৈকতে যাবে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, বৃদ্ধা মাকে নিয়ে। তিনি বাতের ব্যথায় কোথাও নড়তে পারেন না। সারাদিনের বেশীর ভাগ সময় শুয়ে বসে কাটান। সকাল সন্ধ্যে দুইবেলা বাড়িতে পালা করে লোক আসে ওনাকে মাসাজ করতে। তার দেখভালের জন্যও একজন বিশ্বস্থ কাউকে দরকার, কিন্তু স্বেচ্ছায় দিবাকরের এতবড় একটা দায়িত্ব নেবে কে! তা’হলে?
     শুনে দিবাকরের বাল্যবন্ধু ভাস্কর বলল,-‘আরে এয়ার, ডোন্ট ওরি! ম্যায় হুঁ না!’ প্রভুভক্তের মতো আনুগত্য হয়ে মাথাটা ঝুঁকিয়ে বলে,-‘বান্দা হাজির হ্যায় দোস্ত। বিপদের সময়ই বন্ধুর পরীক্ষা হয়। মাসিমাকে নিয়েই তো তোদের ভাবনা। ঠিক আছে, ওনার দায়িত্ব আমার। ওনার দেখাশোনা আমিই করবো। তুই শুধু বাড়ির চাবিটা আমায় সঁপে দিয়ে যা ব্যস, কেল্লাফতে!’  
     অপ্রত্যাশিত বন্ধুর আশ্বাস পেয়ে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে দিবাকর। চোখের তারাদু’টিও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো চিক্চিক্ করে ওঠে। ঝড়ে পড়ছে উচ্ছাস। স্বহাস্যে ভাস্করের পৃষ্ঠদেশে আলতোভাবে একটা চড় মেরে বলে,-‘ইয়ে হুই না বাত। দোস্ত হোতো এ্যায়সা।’
     দীর্ঘদিন পর প্রিয়তমার ঠোঁটের কোণের ক্ষণে ক্ষণে মিষ্টি হাসির ঝিলিকটাও নজরে এড়ায় না দিবাকরের। যেন শুস্ক মরুভূমির বুকে একপশলা বৃষ্টি ঝড়ার মতো উচ্ছলতায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে মালবিকা, উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। প্রহর গোনে, কবে আসবে সেই শুভক্ষণ। তাতে দিবাকরকে আরো উৎসাহিত করে, উদ্ধত করে। 

(দুই)
সমস্যা সমাধান হতেই রায়চৌধুরী দম্পতীর শুরু হয়ে যায় অবকাশ যাপনের প্রস্তুতিপর্ব। সাময়িক প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এসে গেল ঊষার প্রথম সূর্য্যরে স্নিগ্ধ নির্মল কোমল হাস্যেৎজ্জ্বল একটি আনন্দময় সকাল। যেন পৃথিবীর সমস্ত মানুষগুলিকে অকুন্ঠভাবে আহ্ববান করছে, স্বতঃস্ফূর্ত মনে উল্কার মতো দ্রুত কক্ষচ্যুত হয়ে আনন্দময় কোনো এক প্রান্তরে চলে আসার জন্যে। 
     সবুর সয়না দিবাকরের। প্রগাঢ় বিশ্বাস নিয়ে দায়িত্বের বোঝা ভাস্করকে সঁপে দিয়ে সানন্দে বেরিয়ে আসে বাইরের পৃথিবীতে। সাময়িক অবসর নিয়ে স্বস্ত্রীক রওনা হয়ে যায় সমুদ্র-সৈকতে। কিন্তু মঞ্জুর হলো না বিধাতার। মাঝপথে গিয়ে তাদের বিশাল যাত্রীবাহী টুরিষ্ট বাসটা হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়ে অতি সংলগ্ন একটি নোংরা কর্দমাক্ত খাঁদের গভীরে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় আত্মচিৎকার, কাঁন্নার রোল। প্রাণ হারায় অনেকে। কেউ কেউ গুরুতরোভাবে ঘায়েল হয়ে অর্ধমৃত অবস্থা প্রায়। আর কেউ কেউ প্রাণে বেঁচে গেলেও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বিকলাঙ্গ শরীর নিয়ে প্রায় ন’মাস চিকিৎসাধিনে পড়ে থাকে স্থানীয় হাসপাতালে। সেখানেই এ্যাড্মিটেড ছিল, মিষ্টার এ্যান্ড মিসেস দিবাকর রায়চৌধুরী। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সঙ্গে কোনপ্রকার আইডেন্টিটি কিংবা বাড়ির ঠিকানা খুঁজে না পাওয়ায় এতবড় একটা মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সংবাদটি তাদের আত্মীয়-পরিজনের নিকট তাৎক্ষণাৎ গিয়ে পৌঁছায় নি। 
    একেই বলে নিয়তির নিমর্ম পরিহাস। দীর্ঘকাল পর দিবাকর-মালবিকার আসন্ন সুখের সংসারে কার যে নজর লেগে ছিল, একদিন সুস্থ্য হয়ে সশরীরে ফিরে আসে ঠিকই কিন্তু নিজেদের বাড়ি আর খুঁজে পায় না। সারাপাড়া পরিক্রমা করে বার বার একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়। মনে মনে ভাবে,-এ কি, আমাদের ‘শান্তি কুটির’ কোথায় গেল? এ তো দেখছি,‘ভবানী ভবন’ লেখা। কি আশ্চর্য্য, বাড়ির নক্সাও সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। কিন্তু তাইবা সম্ভব হয় কি করে?
     ইতিপূর্বে এক বয়স্ক ভদ্রলোক ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, -‘কাকে চাই?’
    পড়লো মরার উপর খাড়া। একেই নিঃসম্বল, মন-মানসিকতা দুর্বল, তন্মধ্যে অপ্রত্যাশিত অচেনা লোকের মুখদর্শণে দিবাকর হকচকিয়ে যায়। একটা শুকনো ঢোক গিলে মনে মনে বিড় বিড় করে বলল, এ আবার কে! ভাস্কর কাকে সঙ্গে এনে রেখেছে!
     ভবানী ভবনের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত নজর বুলিয়ে বিস্মিত কণ্ঠে বলল,-‘আ-আপনি, আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না। আপনি কে হে মশাই?’
     ঠোঁট চিবিয়ে চিবিয়ে ভদ্রলোকটি বললেন,-‘আজ্ঞে আমি হইলাম ভবানী চরণ দাস। এ বাড়ির নুতন মালিক। মাত্রর কিনছি!’
     মাথায় যেন বজ্রাঘাত পড়লো দিবাকরের। বুকটা ধড়াস করে উঠলো। কেঁপে ওঠে হৃদপিন্ড। মাথাটা বন বন করে ঘুরে ওঠে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। গর্জে ওঠে,-‘বলেন কি মশাই, এ বাড়ি আপনার? আপনিই এ বাড়ির মালিক? এ চত্তরে আগে তো কখনো দেখি নি আপনাকে। মশাই আপনার মস্তিস্ক, শরীরের তাপমাত্রা সব ঠিক আছে তো!’ 
     শুনে সাংঘাতিক চটে যান ভবানী চরণ দাস। চোখমুখ রাঙিয়ে মুখের পেশীগুলিকে ফুলিয়ে একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন। উত্তেজনায় ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলে প্রচন্ড তোতলাতে থাকেন। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,-‘আমারে কি পাগল পাইছেন? কি কন আপনি? আপনারা আইছেন কোত্থিকা? যত্তসব আজগুবি কথা। যান, যান। মানে মানে বিদায় হউন। ন-য়তো পুলিশ ডাকুম!’
     থানা পুলিশের হুমকি শুনে ক্রোধ সম্বরণ করতে পারলো না দিবাকর। লেগে যায় তুমুল বাকযুদ্ধ। অথচ তখনও কল্পনাই করতে পারে নি যে, যাকে নিজের ভাইয়ের মতো স্নেহ করতো, ভালোবাসতো, ছোট থেকে একই সঙ্গে বেড়ে ওঠা, একই স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটি থেকে শুধুমাত্র বিদ্যা অর্জনই নয়, সুপ্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া বাল্যবন্ধু ভাস্কর মিত্র, যার ভরসায় নিজের বাড়ি, বাড়ির সমস্ত দায়-দায়িত্ব দিবাকর সঁপে দিয়ে গিয়েছিল, সে-ই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ভাবতে পারেনি, জীবনের সাঁঝবেলায় এসে নির্দয় নিষ্ঠুরের মতো ওরই বিশ্বস্থ বন্ধু ভাস্কর এতবড় কঠিন আঘাত হেনে প্রৌঢ়ত্বে নিঃশ্ব করে দিয়ে ওকে একেবারে পথে বসিয়ে দেবে। কিন্তু এমন হীনমন্যতা এবং সংকীর্নতাপ্রবণ মন-মানসিকতা ওর হোলোই বা কেমন করে? 
     তবু বিশ্বাস হয় না দিবাকরের। বোবা কাঁন্নায় বুকের ভিতরটা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেলেও কিছুতেই তা মেনে নিতে পারে নি। পাড়া-প্রতিবেশীর কানাঘুঁষোয় জানতে পারে, দুই দুটো জলজ্যান্ত প্রাণী দীর্ঘ ছ’মাস যাবৎ নিখোঁজ থাকার পর সারা পাড়ায় যখন হৈচৈ পড়ে যায়, আত্মীয়-পরিজন যখন অনুসন্ধানে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে, ঠিক তখনিই সুযোগের সদব্যবহার করে দিবাকরের হৃদয়-প্রাণ ‘শান্তি কুটির’ সবার অলক্ষ্যে বেনামে বেচে দিয়ে, ওকে বেঘর, নিরাশ্রয় করে দিয়ে পলাতক দাগী আসামীর মতো রাতারাতি শহর ছেড়ে অন্যত্রে আত্মগোপন করে ওরই বিশ্বস্থ বন্ধু ভাস্কর মিত্র। যা ঘূণাক্ষরেও কেউ টের পায় নি। কিন্তু সত্যিই কি তাই ঘটেছিল?
     ততদিনে দিবাকরের গর্ভধারিনী বৃদ্ধা মা, প্রভাবতী দেবীর বুঝতে কিছু বাকি থাকেনা। তার একমাত্র পুত্র ও বংশের প্রতীক দিবাকরকে হারানোর শোকে কাতরতায় তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েন। ওনার শূন্য বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় যে চলে যান, আর ফিরে আসেন নি। হয়তো পথেঘাটেই কোথাও মৃত্যুবরণ করেছেন, তা কেউই জানে না।

( তিন )
চরম বিপর্যয় দিবাকরের। স্বস্তিতে নিঃশ্বাসটুকুও ফেলতে পারছে না। অক্টোপাসের মতো অজানা বিভীষিকায় ওকে আঁকড়ে ধরে। ওদিকে মালবিকার মনের অবস্থাও তদ্রুপ। আকস্মিক জীবনে অনাকাঙ্খিত বিপদের সম্মুখীন হয়ে পঙ্গুত্বের গ্লানিতে মানসিকভাবে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে। হারিয়ে ফেলেছে মনে শক্তি। তন্মধ্যে দুঃস্বপ্নের মতো সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়ার দুঃসংবাদে মাথায় বজ্রাঘাত পড়ে। অবসন্ন ব্যাথাতুর দেহটা বহন করার মতোও শক্তি নেই। বিকৃতি চেহারা আর বিকলাঙ্গ শরীর নিয়ে মন বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে নিথর নির্জীব প্রাণীর মতো উইলচেয়ারে বসে আছে ঠিকই কিন্তু বুকের ভিতরের সমস্ত ব্যাথা, কষ্টগুলি তরল হয়ে ওর দু’চোখ বেয়ে নিঃশব্দে অঝোর ধারায় ঝড়তে থাকে। পারেনি সম্বরণ করতে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। ক্ষোভে দুঃখে শোকে বিহ্বলে হঠাৎ দিবাকরকে জড়িয়ে ধরে মুখ গুঁজে হু হু করে কেঁদে ওঠে। 
     বেদনাহত বিমূঢ়-ম্লান দিবাকর পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শান্তনা দেবার মতোও একটা শব্দও আর উচ্চারিত হয় না। কি বলে শান্তনা দেবে সে! কখনো কি ভেবেছিল, জীবন নদীর জোয়ারে সুখের তড়ীতে ভাসতে ভাসতে একদিন আচমকা অতল তলে তলিয়ে যাবে। যেখানে কূল নেই, কিনারা নেই। নেই বেঁচে থাকারও কোনো অবলম্বণ। 
    পরবর্তীতে রায়চৌধূরী দম্পতীর জীবন নদীর খেয়া পুনরায় বাইতে শুাং করলেও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো প্রাণবন্ত মালবিকার চোখের তারাদু’টিতে কখনো কি আর খুশীর ঝিলিক দেখা দেবে? কখনো কি মুক্তাঝড়া উচ্ছাসিত হাসির ফোয়ারা আর শুনতে পাবে কোনদিন? কিছুই তো ফিরিয়ে দিতে পারবে না। ফিরেও আসবে না কোনদিন। শুধু নীরব নির্বিকারে বুকের মাঝারে জমে থাকবে, না বলা কিছু কথা। কথার আলাপন। আর অহরহ কানে বাজবে, খুশীর বন্যায় প্লাবিত করা ভ্রমরের মতো ভেসে বেড়ানো মালবিকার গুনগুন গুঞ্জরণে অপূর্ব সুরের মূছর্ণা। 
     হঠাৎ পলকমাত্র দৃষ্টিপাতে দিবাকরের নজরে পড়ে, বিষন্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে মালবিকার শরীর ও মন। কয়েক মাসেই অনেক বুড়িয়ে গিয়েছে। চোখমুখও শুকিয়ে মলিন হয়ে পুতুলের মতো ছোট্ট দেখাচ্ছে। কি যেন ভাবছে মালবিকা। 
     মনে মনে বিড়বিড় করে ওঠে দিবাকর,-কিচ্ছু ভেবো না মলি, আমি অঙ্গীকার বদ্ধ। আমার অকুণ্ঠ হৃদয়ের উজার করা নীরব ভালোবাসায় প্রিয়তমার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের দৃঢ় অঙ্গীকারে আমার বুকের সমস্ত কষ্টগুলি যতোই মলিন হোক, সর্বদাই লুকিয়ে রাখার চেষ্টার করবো, অতীতের কোনো এক শুভক্ষণের স্মৃতিবিজড়িত তোমার সেই একফালি অনিন্দ্য সুন্দর হাসির অন্তড়ালে।
     হঠাৎ মালবিকার গভীর সংবেদনশীল দৃষ্টি বিনিময় হতেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে দিবাকরের। ভারাক্রন্ত হৃদয়ে ক্ষণপূর্বের যন্ত্রণাদায়ক গহীন বেদানুভূতির তীব্র দংশণে মস্তিস্কের সমস্ত স্নায়ুকোষগুলিকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছে। অত্যন্ত পীড়া দেয় ওর মুমূর্ষ্য হৃদয়কে। হতাশায় নিরাশায় শুকনো বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠছে। অনুভব করে, অসহ্য যন্ত্রণা। 
     অনুতাপ আর অনুশোচনার অন্ত নেই দিবাকরের। হারিয়ে যাচ্ছে মনের শক্তি। বুকের পাঁজরখানাও ভেঙ্গে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। মালবিকার মুখপানে চোখ তুলে তাকাতেই পারে না। এ কেমন বিধাতার নিষ্ঠুর পরিহাস, বিড়ম্বণা, প্রবঞ্চনা! 
     প্রিয়তমা পত্নী, অর্ধাঙ্গিনী মালবিকাই ছিল চির অম্লান, চির সজীব, স্নিগ্ধ-শান্ত-কোমনীয় এক উদ্বিগ্ন যৌবনা অনন্যা। প্রেমের মহিমায় দ্বীপ্ত মমতাময়ী বিদূষী নারী, হৃদয়হরিনী। দিবাকরের নিবেদিত প্রাণ, শক্তির উৎস, ওর প্রেরণা, ভাই-বন্ধু-প্রেয়সী, সব। 
     কিন্তু মানুষের জীবন নদীর প্রবাহ সদা চঞ্চল ও বহমান। কখনো একইভাবে একই জায়গায় থেমে থাকেনা। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আমরণ এগিয়ে চলে তার আপন ঠিকানায়, নিজস্ব গন্তব্যে। নতুন দিগন্তে নতুন সূর্য্য ওঠা একটি সুন্দর সকালের আশায়। তদ্রুপ সময়ের নিমর্মতা কাঁধে চেপে বিকলাঙ্গ স্ত্রীকে সাথে নিয়ে দিবাকর শুরু করে নতুন জীবনধারা। বদলে যায় প্রাত্যাহিক জীবনের কর্মসূচী। অচেনা অজানা জায়গা। নিত্য নতুন অপরিচিত মানুষের আনা গোনা। যেখানকার পারিপার্শ্বিকতার সাথে খাপ খাইয়ে চলা তাদের পক্ষে ছিল অত্যন্ত দুস্কর। যেন প্রাণহীন সংসার। সুখ নেই, আনন্দ নেই, রূপ নেই, রঙ নেই। নিরস, নিস্প্রেম, নিরুচ্ছাস দাম্পত্য জীবন। তবু জীবন ও জীবিকার তাগিদে পুনরায় বাসা বাঁধে। বাসার এককোণায় ছ্ট্টো একটা ক্লিনিক, সেখানেই দিবাকর সকাল বিকাল দুইবেলা রুগী দ্যাখে। তাতে যা উপার্জন হয়, বাড়ি ভাড়া দিয়ে একরকম দিন কেটে যাচ্ছিল। 
     একদিন হঠাৎ এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক কাশতে কাশতে এসে বলে,-‘আসতে পারি ডাক্তার বাবু!’ বলে ভদ্রলোক নিজেই ঢুকে পড়ে দিবাকরের চেম্বারে।
     কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়ে দিবাকর তার আপাতমস্তক নজর বুলিয়ে দ্যাখে, ভদ্রলোকটির গাল ভর্তি দাড়ি। মাথার চুল এলোমেলো। পড়নের জামা-কাপড়ের অবস্থাও তদ্রুপ। মলিনতার ছাপ প্রকট। খুবই অসুস্থ্য দেখাচ্ছে। কি যেন ভাবল দিবাকর। তারপর বলল,-‘আপনি একটু বসুন। আমি এখুনিই আসছি।’ বলে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল। 
     তার পরক্ষণেই এসে দ্যাখে, ভদ্রলোকটি চেম্বারে নেই। এদিক ওদিক দেখলো, কোথাও নেই। সামনে টেবিলের উপর একটি বাইন্ডার পড়ে আছে। তাতে কিছু কাগজপত্র মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা। আশ্চর্য্য, ভদ্রলোক এসে গেল কোথায়? ওয়েটিং রুমেও নেই। ভেরী ইন্টারেষ্টটিং।
     ভাবতে ভাবতে বাইন্ডারটা খুলে দ্যাখে, সেগুলি অন্য কিছুই নয়, দিবাকরের অধিকার চ্যুত ‘শান্তি কুটির’ সহ সমস্ত বিষয় সম্পত্তির বৈধ মালিকানার একমাত্র প্রমাণপত্র। সেই সঙ্গে একটি লম্বা চিঠি। 
     তাতে লেখা- প্রিয় বন্ধুবরেষু দেব, 
     কি বলে যে নিজের পরিচয় দেবো, আমার জানা নেই। চেয়েছিলাম, নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থী হয়ে সম্মুখে এসে দাঁড়াবো। কিন্তু সেই স্পর্ধা আজ আমার নেই। ক্ষমার অযোগ্য জেনেও না লিখে পারলাম না। যেদিন শুনলাম, তোরা দুজনেই জীবিত এবং সশরীরে ফিরে এসেছিস, সেদিন থেকেই অনুতাপ অনুশোচনায় ডাঙ্গায় ওঠা মাছের মতো ছটফট করেছি শুধু তোর বিষয় সম্পত্তি ফিরিয়ে দেবার জন্যে। যেদিন লোভ-লালসায় নানান প্রলোভনের হাতছানি উপেক্ষা করতে না পেরে নিজের সততা এবং সত্যকে বিসর্জন দিয়ে মিথ্যার কাছে আত্মবিক্রয়, লোভের কাছে নতিস্বীকার এবং ভোগের কাছে বশ্যতা স্বীকার হয়ে আমায় সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে ফেলেছিল, সেদিন একবারও ভাবিনি, আমার প্রিয় বন্ধুবরেষু দিবাকর, সস্ত্রীক জীবিত। কখনোই ভাবতে পারিনি তোর অমায়িক আন্তরিকতার অনবদ্য সান্নিধ্য আবার ফিরে পাবো। কোনো জিনিসই তোর নড় চড় হয় নি। বাড়ির নক্সা খানিকটা বদলে গেলেও নামের সংশোধন করা হয়েছে। তোর ‘শান্তি কুটির’ নামকরণটির পূর্ণজনম হয়েছে।
     ভবাণী চরণ দাস অন্য কেউ নয়, সে আমারই ভগ্নিপতী। বর্তমানে উনি মৃত্যু শয্যায়। অস্তাচলে ডুবে যাওয়া সূর্য্যরে মতো জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে অন্তিম নিঃশ্বাসের প্রহর গুনছে। কিন্তু মাসিমার সেবা-শুশ্রূষা এবং ওনার তত্ত্বাবধানে কোনো ত্রুটিই আমি রাখেনি। মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লেও উনি আজও জীবিত এবং কৃষ্ণনগরের বৃদ্ধাশ্রমে সম্পূর্ণ সুস্থ্য আছেন। তোদের সুখ-শান্তি-আনন্দ সম্পূর্ণ ফিরিয়ে দিতে পারলে অন্তত কিছুটা হলেও পাপ কর্ম থেকে মুক্ত হতে পারবো। যদি সম্ভব হয়, আমায় ক্ষমা করিস। 
ইতি-ভাস্কর

      তৎক্ষণাৎ উর্দ্ধঃশ্বাসে মরিয়া হয়ে মায়ের কাছে ছুটে যায় দিবাকর। গিয়ে দ্যাখে, আরাম কেদারায় বসে বসে পান চিবোচ্ছেন প্রভাবতী দেবী। পিছনের বারান্দার রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল ভাস্কর। হঠাৎ দিবাকরের গলার আওয়াজ কর্ণগোচর হতেই থর্‌ থর্‌ করে ওর গা কেঁপে ওঠে। ঠোঁট কেঁপে ওঠে। লজ্জায় অপমানে দাগী আসামীর মতো মুখ লুকাবার চেষ্টা করে। ততক্ষণে দেখতে পেয়ে দ্রুত এগিয়ে আসে দিবাকর। অভিমানের সুরে বলল,-‘দেখা না করেই চলে এলি, ইডিয়েট! চেহারার এ কি হাল করে রেখেছিস? তোকে তো চিনতেই পারি নি। লজ্জা পাচ্ছিস কেন? আসলে, সবই আমাদের অদৃষ্ট। তা না হলে হঠাৎ সমুদ্র-সৈকতেই বা যাবো কেন বল! কপালের দুর্ভোগ থাকলে ঠেকাবার সাধ্য কার! শুধু দুঃখ একটাই, পঙ্গু হয়ে মালবিকা আজ উইলচেয়ারে পড়ে আছে। ওর মুখের দিকে তাকানোই যায় না। সড়ক দুর্ঘটনায় পা-দুটো হারিয়ে সারাদিন মনমরা হয়ে পড়ে থাকে। মুখে কথা নেই, হাসি নেই, জীবনে নতুন কোনো স্বপ্ন নেই, ইচ্ছা-আবেগ-অনুভূতি কিছু নেই। বাকী জীবন কিভাবে কাটাবো, বুঝতে পাচ্ছি না!’ 
     ভাস্কর তখনও নিরুত্তর। কি বলবে ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। অশ্রকণায় চোখদু’টো ওর চিক্ চিক্ করে ওঠে। ইতিপূর্বে দিবাকর ওর সন্নিকটে এসে বলে,-‘ষ্টুপিড্, আমায় কি তোর পায়ে ধরতে হবে?’ 
     আর তক্ষুণিই দ্রুত এগিয়ে এসে দিবাকরকে বুকে জুড়িয়ে ধরে ভাস্কর হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে।  (সমাপ্ত)

যুথিকা বড়ুয়াঃ  কানাডার টরোন্ট প্রবাসী গল্পকার, গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পী।