অটোয়া, শুক্রবার ২০ মে, ২০২২
ড. রাখীবৃতা বিশ্বাস-এর ‘সময়ের সন্ধানে’ কবিতাগুচ্ছ

সময়ের সন্ধানে - এক:
মে আর মানুষে ঘটে গেছে অসম লড়াই,
ডাক্তার ও দিয়েছেন জবাব।
প্রাণপাখি উড়ে গেছে অপরাহ্নের টুকরো আলো ছুঁয়ে।

অনিবার্য কারণবশতঃ ফ্লাইট আজ তিন ঘন্টা লেট,
সবাই নিঃস্বর, আপসেট্।

বাবার নিথর শবদেহ, কত শত ফুলে বিকশিত!
ধূপের ধোঁয়ায় ওঠে নামে বিষাদের ঢেউ অবিরত।

ঠিকরে বেরিয়ে আসা 
ঐ দুটি চোখের মনিতে,
তবু যেন বাঁধা পরে আছে...
অসহায় এক আর্তি ,
নিষ্ঠুর নিয়তির কাছে।

আর একটু পাব কি সময়?
শেষবার খোকাকে দেখার!
আরো একবার সময়ের অদৃশ্য আদালতে,
আবেদন খারিজ হয়ে গেছে।
হয়নি শুনানি কোনো তার!

সময়ের সন্ধানে - দুই:
দুদিন এখানে থাকো মা,
এখানে তোমার মতো অনেক মানুষেরাই থাকে।
দেখো কতো বন্ধু পাবে,
একা লাগবে না আর নিজেকে...

কাজটুকু সাড়া হয়ে গেলে,
ব্যাঙ্গালোর থেকে ফেরার পথেই
সোজা আগে আসব এখানে,
এয়ারপোর্ট থেকে।
তোমাকে নিয়েই ফিরব বাড়ি, 
আমরা আবার একসাথে।

মাত্র তো দুটো দিন মাঝে,
কোথা দিয়ে কাটবে সময়...
দেখো, কিছুই আর মনে হবে না যে।

দুটো দিন হল দুটো মাস,
তখনও মনেতে ছিল আশ।
আরো একবার,
তার ঘরেতে ফেরার!

বছরও ঘুরলো অবশেষ,
বুঝলেন জননী শেষমেশ...
খুকু তাকে দিয়ে গেছে ফাঁকি!
হাতে গোনা আর যেটুকু
সময় আছে বাকি,
বৃদ্ধাশ্রমেই তা হয়ে যাবে শেষ।

যাওয়ার বেলায় আজ নিঃশ্বাসের শেষ রেশ ছুঁয়ে,
অসহায় আর্তি তার ছিল শুধু নিয়তির কাছে!
চেয়েছিলো আর একটু সময় শুধু,
কিছু উত্তর ছিল যে পাওয়ার।
শেষ ইচ্ছে ছিল তার এটুকু জানার,
কি ছিল কারণ এই প্রবঞ্চনার!
মা কি ছিল তোর কাছে মস্ত দায়ভার?

দুর্বিষহ, ক্লেদাক্ত এক বোঝা?
আরো একবার সময়ের অদৃশ্য আদালতে,
আবেদন খারিজ হয়ে গেছে।
হয়নি শুনানি কোনো তার!
উত্তর মেলেনি কিছু সোজা।

সময়ের সন্ধানে - তিন:
ছোট থেকেই লেখাপড়ায় ভালো,
ইচ্ছা ছিল হবে ডাক্তার।
বাধ সাধল মফঃস্বলের রীতি ও সমাজ,
বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়েই
জুটলো শ্বশুরবাড়ি আর সংসার। 

কৃতি ছাত্রীর সুকৃতি সব,
হেঁশেলে গুমরে মরে।
কোল ভরেনি পাঁচ বছরেও,
আপদ বালাই সে তাই ঐ সংসারে।

এমন বউ, কে আর বল সংসারে তার রাখে!
আপন হল পর... ঘর ছাড়তে হল তাকে।
আইনের বলে নিষ্কৃতি তার নিতেই হল মেনে,
বিনা দোষেই সব অপরাধ নিজের ঘাড়ে টেনে।
বাপের ঘরেও ঠাঁই জোটেনি
ঘরপোড়া সেই মেয়ের।

নিজেকে শেষ করে, সে মুক্তি নিল...
এই পাপের সমাজ থেকে!
শেষ চিঠিতে কিছু প্রশ্ন 
সেও রেখেছে লিখে।

আর একটু সময় বাবা, 
আমায় পারতে না কি দিতে?
লেখাপড়া শেষ করে নিজের পায়েতে দাঁড়াতে!

আরো একবার সময়ের অদৃশ্য আদালতে,
আবেদন খারিজ হয়ে গেছে।
হয়নি শুনানি কোনো আর!
এমন করেই সুকৃতিরা হারায় বারবার,
সদুত্তর মেলেনা কোনো তার।

সময়ের সন্ধানে - চার:
রেতে দুমুঠো নেই ভাত,
ঠিকানা কেয়ার অফ্ ফুট্পাত।
তবু মুখে হাসি অম্লান,
দিদিমনির অবৈতনিক সন্ধেবেলার স্কুলের
কৃতি ছাত্র সে যে দীপ্তিমান।

দিদিমনিই তার পূর্ণ জগৎ,
খানিকটা মা, খানিক বড়দিদি।
তারই দেয়া আলোর পথ ধরেই,
দীপ্তি এখন ছাত্র আই. আই. টির।

দুচোখ ভরা স্বপ্ন এখন তার...
বিজ্ঞান সাধনা তার ব্রত।
সেও চায় আরেকটু সময়,
ভাসাতে তার স্বপ্নের উড়ান, উন্নত!

আরো একবার সময়ের অদৃশ্য আদালতে,
আবেদন হয়ে গেছে জমা।
চলছে শুনানি এখন!
উত্তর আসবে সদর্থক,
আগামী হবেই আশাব্যঞ্জক,
মন প্রাণ জুড়ে শুধু
এটাই প্রার্থনা।

ড. রাখীবৃতা বিশ্বাস
অধ্যাপিকা (ওয়েস্ট বেঙ্গল এডুকেশন সার্ভিস)
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ