অটোয়া, মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর, ২০২০
জাতীয় শোক দিবস-এর আলোচনায় বঙ্গবন্ধুর ছোট বোনের, ছোট নাতি হাসানুজ্জামান এর স্মৃতিচারণ – কবির চৌধুরী

টোয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের “৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস-২০২০”, যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালন করে। কোভিড-১৯ মহামরীর প্রেক্ষাপটে আরোপিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে, দূতাবাস কর্তৃক আয়োজিত কর্মসূচির মধ্যে ছিল জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন, এক মিনিট নীরবতা পালন, বিশেষ প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শণ এবং আলোচনা সভা। সকাল ৯.১৫ ঘটিকায় বাংলাদেশ হাউজে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করার মধ্য দিয়ে “জাতীয় শোক দিবস” উপলক্ষে গৃহীত কর্মসূচীর সূচনা করা হয়। পরবর্তীতে বিকাল ৫.০০ ঘটিকায় দূতাবাসের প্রথম সচিব অপর্না রানী পালের সঞ্চালনায় জাতীয় শোক দিবসের দ্বিতীয় কার্যক্রম শুরু হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনসহ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সকল নিহত সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত মাননীয় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাণী পাঠ করে শোনান যথাক্রমে দূতাবাসের উপহাইকমিশনার চিরঞ্জীব সরকার, কাউন্সেলর সাখাওয়াৎ হোসেন, কাউন্সেলর দেওয়ান হোসেনে আইয়ুব, ও কাউন্সেলর শাকিল মাহমুদ।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবনের উপর নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনীর পর অনুষ্ঠানে উপস্থিত সুধীজনের অংশগ্রহণে জাতির পিতার বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালোরাত্রি ও ততপরবর্তী অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন যথাক্রমে- হাইকমিশনার মিজানুর রহমান,  বঙ্গবন্ধুর ছোট বোনের ছোট নাতি হাসানুজ্জামান, মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মুহিবুর রহমান, আশ্রম সম্পাদক কবির চৌধুরী, বাকাওভ সভাপতি  শাহ বাহাউদ্দিন শিশির, এবং মন্ট্রিয়েল থেকে আগত আওয়ামী লীগ নেতা মতিন মিয়া, মাসুদ সিদ্দিকী, মুন্সি বশির প্রমুখ। 

  অটোয়া কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে আসা বঙ্গবন্ধুর ছোট বোনের, ছোট নাতি হাসানুজ্জামান ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস এর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন- “আমার নানীর নাম খাদিজা হোসাইন লিলী। উনি বঙ্গবন্ধু'র সবচেয়ে ছোট বোন। ১৫ অগাস্ট আসলেই নানী'র অনুভতির কথা মনে পড়ে। নানী বলতেন যে উনার ভাবীর (বঙ্গমাতা) সাথেই উনি পান খাবার প্রতিযোগিতা করতেন - কারটা বেশি লাল হয়। ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ এর পর, আমার নানী আর কখনো পান মুখে নিতে পারেননি। 
  নানীর দুটি কথা খুব মনে পড়ে আর এখনো আমাকে ভিতরে কাঁপিয়ে তুলে। নানী বলতেন "১৫ আগস্ট, এ আমি এতিম হয়ে যাই। মিয়া ভাই (বঙ্গবন্ধু) প্রায় ভাবিকে বলতেন, ‘রেনু, তোমার জন্য রাসেল যা, আমার জন্য লিলী তা।’ আমার ভাবি আমার সঙ্গী ছিলেন আর অনেক খেয়াল রাখতেন।" 
 আমার নানী কেবল উনার অভিভাবক হারায়নি ১৫ আগস্ট। উনার মেয়ে, রোজির, বিয়ে হয় শেখ জামাল এর সাথেই জুলাই মাসে। আমার খালা শহীদ হয়ে যান ১৫ আগস্টের কালো রাতে। আমার মা এবং বাবার বিয়ে হয় ১০ আগস্ট ১৯৭৫ এবং আমার মা'র শেষ বারের মতো দেখায় হয় তার বোনের, মামীর এবং মামার সাথে ১৪ আগস্ট রাত এগারোটা'র দিকে। 
 আমার নানাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৯৭৭ সালে উনি ছাড়া পান| আমার দাদা, নুরুজ্জামান, তখন পুলিশ এর এসপি ছিলেন এবং যতটুকু উনার পক্ষ্যে সম্ভব ছিল, উনি সেটা করেছেন। আমার দাদা আমার নানাকে প্রটেক্ট করার চেষ্টা করেন। আমার নানা, সায়েদ হোসাইন, এস্টাব্লিশমেন্ট মিনিস্ট্রির একজন সিনিয়র অফিসার ছিলেন।
 ছাড়া পেয়ে নানা উনার রোজির লাশের খোঁজ করেন এবং চিঠি লিখেন জিয়াউর রহমানকে। আজকে বনানী কবরস্থানে অনেকেই যান কিন্তু জানেন না যে কে এই কবর গুলো চিহ্নিত করে। আমার বাবা, ইঞ্জিনিয়ার শাহিদুজ্জামান, ১৯৭৭ সালে ভোর বেলার দিকে বনানী যান এবং বাশ দিয়ে কবর গুলোকে চিহ্নিত করেন এবং পরে ১৯৭৯ সালে দেয়াল দাওয়া হয়। 


  ৪৫ বছর হয়ে গেছে কিন্তু আমরা কখনো আমাদের মা এবং বাবার বিবাহ বার্ষিকী পালন করি নাই। এইটা কোনো নালিশ বা কষ্ট না যখন মনে পড়ে যায় আমার নানী'র কথা পরশ দাদা (যুবলীগ চেয়ারম্যান) এবং তাপস ভাইয়া (ঢাকা সাউথ এর মেয়র) কে নিয়ে। উনারা দুই ভাই এতিম হয়ে যান এবং তারা বড় হয় তাদের চাচির কাছেই - ফাতেমা সেলিম। 
  আমার এই মামীর ত্যাগ এর কথা শুরু করলে আজ এখানে শেষ হবে না। উনাদের চাচী ঘুম পড়াতেন তাদের মায়ের পছন্দের কিছু গান শুনিয়ে এবং নানা ভাবেই উনি অনেক কিছু ত্যাগ করেন যাতে করে পরশ দাদার এবং তাপস ভাইয়ার কোনো সময়ই তাদের মায়ের কথা মনে না পড়ে যায়। 
  আমরা অনেকেই আরেকজন এর বেপারে শুনিনি। আমার বিউটি খালা, সেরনিয়াবাত নানার মেয়ে। উনি এগারো বার গুলি বিদ্ধ হয়ে বেচে আছেন আজকে উনার বাবা, বোন এবং ভাইদের বেদনা নিয়ে। পরশ দাদা বিউটি খালা কে "বুলা" বলেই ডাকে। তিনি (বিউটি খালা); পরশ দাদা এবং তাপস ভাইয়ার খালা এবং ফুপু, দুটোই। 
  বঙ্গবন্ধুর ছোট বোনের, ছোট নাতি হিসেবে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি কিন্তু এই পরিচয় আমার অহংকার না। যতদিন ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচার না হয়, ততদিন আমরা জাতি হিসেবে কলঙ্কমুক্ত হবো না, আর অহংকার করে বলতে পারবো না যে আমরা বাংলাদেশী।
  বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসতে কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় এর দরকার নেই। বঙ্গবন্ধুকে যারা সম্মান দিতে পারে না উনার ত্যাগ এবং গভীর ভালোবাসার জন্য, তারা কোনো দেশের নাগরিক হতে পারে না।”

সভাপতির বক্তব্যে হাইকমিশনার জনাব মিজানুর রহমান বলেন- মা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষা যেমন অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে আবদ্ধ, তেমনি বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতি আর বাংলাদেশ একই সুতোয় গাঁথা। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি মিত্র বাহিনীর বাংলাদেশ ত্যাগ, আর্ন্তজাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশের অতি দ্রুত স্বীকৃতি পাবার ক্ষেত্রে সফল হন। কিন্তু ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ও বিয়োগান্ত ঘটনায় জাতির এই উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হয়। তিনি আরো বলেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তির শুভ মুহুর্তে জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের হত্যাকারীদের (কানাডাসহ অন্যান্য দেশে পালিয়ে থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের) বিচারের কাজ সম্পূর্ণ করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি সাধন এবং বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের স্বপক্ষে লড়াই করার উদ্দেশ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার কর্মসূচী এই স্বপ্নের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন প্রয়াস। মান্যবর হাইকমিশনার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার আহ্বান জানান।

এছাড়াও এইদিন হাইকমিশন অফিসে “বঙ্গবন্ধু কর্নার” উদ্বোধন করা হয়। উদ্ভোধনকালে হাইকমিশনার মিজানুর রহমান বলেন- “বঙ্গবন্ধুর কর্নারে বঙ্গবন্ধুর উপর পুস্তক, ডকুমেন্টরিসহ বিভিন্ন উপকরণ থাকবে যা সকল প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।”



অটোয়ায় নিযুক্ত হাইকমিশনার জনাব মিজানুর রহমানের কথার সাথে সুর মিলিয়ে আমরাও বলতে চাই- আসুন বাংলাদেশী অধ্যুষিত বিশ্বের বিভিন্ন শহরে আমরা একটি করে “বঙ্গবন্ধু কর্নার” বা “বঙ্গবন্ধু মিলনায়তন” গড়ে তুলি যেখানে- বঙ্গবন্ধুর উপর পুস্তক, ডকুমেন্টরিসহ বিভিন্ন উপকরণ থাকবে যা পড়ে এবং দেখে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।

জয় বাংলা- জয় বঙ্গবন্ধু
কবির চৌধুরী। অটোয়া, কানাডা