অটোয়া, মঙ্গলবার ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯
মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকায় নারীঃ পরিপ্রেক্ষিত সিলেট (দ্বিতীয় অংশ)– অপূর্ব শর্মা

 

মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকায় নারীঃ পরিপ্রেক্ষিত সিলেট -প্রথম অংশ পড়তে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় অংশ 

 

সুহাসিনী দাস

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যখন অগণিত বাঙালি নিরাপত্তার জন্য ওপারে পাড়ি জমায় তখন সেবাব্রতের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সুহাসিনী দাস দেশ মাতৃকাকে ছেড়ে কোথাও না যাওয়ার সংকল্প করেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এই নেত্রী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধ জয়ে। 

সুহাসিনী দাস মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পুরোটা সময় কুলাউড়ার রঙ্গিরকুল আশ্রমে ছিলেন। দুর্যোগময় দিনগুলোতে তিনি তাঁর বিচক্ষণতা দিয়ে আশ্রমকে রক্ষা করেন। পাকবাহিনী যখন দেশজুড়ে গণহত্যা চালাচ্ছিল তখন সুহাসিনী দাস রঙ্গিরকুল আশ্রমে থেকে মানুষের সেবায় রত ছিলেন। একাধিকবার পাকবাহিনী আশ্রমে হানা দিলেও প্রতিবারই তিনি আশ্রম ও নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। 

স্বাধীনতার পর সুহাসিনী দাস সক্রিয় রাজনীতি ছেড়ে সমাজসেবায় যুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিতা নারীদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসেন। নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী ও সুহাসিনী দাস মিলে গঠন করেন ‘শ্রীকৃষ্ণ সেবা সদন।’ ১৯৭২ সালে পঞ্চাশজন নির্যাতিতা নারীকে আশ্রয় দেওয়া হয় সেবা সদনে। এই অসহায় নারীদের বিপর্যয়ের মুখ থেকে রক্ষায় সুহাসিনী দাস গ্রহণ করেন অনন্য ভূমিকা। তাদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করে দেন তিনি। অনেককে করেছেন পাত্রস্থ।

সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলায় বাংলা ১৩২২ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম প্যারী মোহন রায়, মাতা শোভা রায়। বয়স যখন ষোল বছর তখন সিলেট শহরের জামতলার অধিবাসী কোটিচাঁদ প্রেস ও লাইব্রেরির মালিক কুমুদচন্দ্র দাসের সাথে বিয়ে হয় তাঁর। ২০০৯ সালের ৩০ মে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

প্রীতিরানী দাশ পুরকায়স্থ

প্রীতিরানী দাশ পুরকায়স্থ ১৩২৬ বাংলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম দিন দয়াময় দাশগুপ্ত এবং মাতা সুরেশ নন্দিনী দাশগুপ্ত। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা বিশ্বনাথ থানার দিঘলী গ্রামের হেমেন্দ্রকুমার দাশ পুরকায়স্থের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামীর সহচর্য তাঁকে মুক্তির পথে অগ্রসর হতে আকুন্ঠ সাহায্য করে। হেমেন্দ্রকুমার দাশ পুরকায়স্থের কর্মক্ষেত্র আসামে হওয়ায় মহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজী সুভাষ বসুর সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য হয় প্রীতিরানীর। এই দুই মহান নেতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের জীবন চলার পথকে গতিশীল করেন তিনি। বিপ্লবী জীবনসঙ্গীর উৎসাহ অনুপ্রেরণায় প্রীতিরানী নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন অনন্য উচ্চতায়।

মুক্তিযুদ্ধে প্রীরিরানীর রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। শুধু সংগঠকই ছিলেন না, অনেকগুলো গুরুদায়িত্ব তিনি পালন করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। এরমধ্যে অন্যতম ছিল মহিলা মুক্তিফৌজের দায়িত্ব। মুক্তিযুদ্ধে ৫ নম্বর সেক্টরের অধীন চেলা সাব-সেক্টরে গঠিত মহিলা মুক্তিফৌজের সভানেত্রী ছিলেন তিনি। ’৭১ সালের ৫ জুলাই ছাতকের বাঁশতলায় হেমেন্দ্রকুমার দাশ পুরকায়স্থের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ‘মহিলা মুক্তিফৌজ’-এর কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির প্রায় ৫০ জন নারী মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করেন দুঃসময়ে। এরমধ্যে অন্যতম ছিল চিকিৎসা সহায়তা প্রদান। তাঁর নেতৃত্বে ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে চিকিৎসা দিয়েছেন নারীরা। মহিলা মুক্তিফৌজের উদ্যোগে চেলায় স্থাপন করা হয় একটি অস্থায়ী হাসপাতাল। সেখানে নিযুক্ত ছিলেন দু’জন চিকিৎসক।

প্রীতিরানীর বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্বের ফলে সেই দুঃসহ সময়ে একঝাক নারী যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তা সত্যিই বিরল। তাঁর নেতৃত্বাধীন পরিচালিত এই সংগঠনের তৎপরতা প্রত্যক্ষ করেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামরুজ্জামান ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী। প্রীতিরানী দাশ পুরকায়স্থ ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

হেনা দাস

সহযোগ আন্দোলন চলাকালে পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষক সমিতির অন্যতম নেত্রী ছিলেন হেনা দাস। এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো সমিতি ও শিক্ষক সমাজ। শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে হেনা দাসকে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি তৈরী ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি তা যথাযথভাবে পালন করেন। এ কারনে পাক সরকার তাঁকে কালো তালিকাভূক্ত করে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর মে মাসের মাঝামাঝি নারায়নগঞ্জের ৪শ’জনের একটি গ্রুপের সাথে তিনি ভারতে চলে যান। প্রথমে আগরতলা এবং পরবর্তীতে কলকাতায় অবস্থান নেন। কলকাতার পার্কসার্কাসে সে সময় কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় সেখানেই ছিলেন হেনা দাস। কলকাতায় অবস্থান করে শরনার্থী এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। মহিলা পরিষদের নেত্রী হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের শুভানুধ্যায়ীদের সহায়তায় নারী ও শিশুদের পোষাক এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহ করে বিতরণ করেন তিনি।

সেই সময়, শরনার্থী হিসেবে ভারতে অবস্থানরত শিক্ষকদের কর্মসংস্থান এবং শিবিরগুলোতে ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সংগঠন ‘ক্যাম্প স্কুল প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্পের অর্থায়ন করে বিদেশি একটি সাহায্য সংস্থা। এই সাহায্য দিয়ে ৫০টি শরনার্থী শিবিরে বিদ্যালয় চালু করা হয়। শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়া ৫শ শিক্ষককে এসব স্কুলে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের প্রতিমাসে দেড়শ থেকে দুইশ’ টাকা করে সম্মানী ভাতা দেয়া হতো। স্কুলগুলোতে লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শ ও দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদের মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাতেন শিক্ষকরা। ঐ স্কুলগুলোর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন হেনা দাস।

১৯২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হেনা দাস সিলেট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সতীশ চন্দ্র দত্ত, মাতা মনোরমা দত্ত। তাঁর পিতা ছিলেন সিলেট বারের একজন নামকরা উকিল। ১৯৪৮ সালের ২৮ জুন কমরেড রোহিনী দাসের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। ২০০৯ সালের ২০ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। … … …. চলবে

(সূত্রঃ বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থ এবং সংবাদ পত্র) 
সিলেট, বাংলাদেশ