অটোয়া, মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর, ২০২০
ছেলেবেলার এক স্মৃতি - মোবারক মন্ডল

      প্রত্যেকেরই ছেলেবেলা আনন্দ, দুষ্টামি ও খেলাধুলায় পরিপূর্ণ থাকে। ছোটবেলার সব স্মৃতি একটা সময় স্মৃতিস্পটে ভেসে ওঠে। এরকমই আমার ছেলেবেলার একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে। ফরিদ চাচা হল আমার বড় দাদুর ছেলে। আমার এক বছরের বড়, বেশ চঞ্চল ও দুষ্ট। আমরা ছিলাম সহপাঠী এবং বন্ধু। আমরা তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। ঢিল মেরে আম পাড়া, কুল পাড়া, পিচ্ছিল লিক লিকে সরু গাছে উঠে পেয়ারা পাড়া ছিল আমাদের নেশা। নভেম্বরের এক বিকেলে আমরা নানির বাড়ি যাচ্ছি, পায়ে হেঁটে। তখন আমাদের নিজেদের সাইকেলও হয়নি।
     আমার নানির বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদের আমিনাবাদ গ্রামে। তখনও ভৈরব নদী আমিনাবাদ গ্রামকে গিলে খায়নি। ভৈরব নদীর তীরে আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল গাছ ঘেরা আমিনাবাদ এক বর্ধিষ্ণু, সাজানো গোছানো রুচিশীল গ্রাম। তখনও এই গ্রামের অনেক বাসিন্দা অশিক্ষিত, সরকারি চাকুরিজীবি নেই এবং চাষী ছিলেন। আমাদের বাড়ি থেকে আমিনাবাদ গ্রাম প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। আমরা হাঁটার সুবিধার জন্য মাঠ ভাগ করে নিতাম। প্ৰথমে পার হতে হত ‘বাবুনডিহির মাঠ’, তারপর ‘জিন তাড়ানির মাঠ’, তারপর ‘বাবুদের মাঠ’, ‘টিকরামপুরের মাঠ’। নদী এপাড়ে পড়ে সাহেবপাড়া এবং সবশেষে ঘোষপাড়া।
     নানির বাড়ি যাওয়ার রাস্তায় ‘জিন তাড়ানির’ মাঠ পার হওয়াটা ছিল আমাদের কাছে খুব চাপের। আমাদের মত ছোটদের ক্ষেত্রে ওই মাঠ পার হতে খুব ভয় করত। এই মাঠের কাছে এলেই সব কথা মনে পড়ে যেত। দিনে দুপুরে নাকি জিনেরা এদিক সেদিকে মানুষকে ভুলিয়ে নিয়ে যায়। শীতকাল, মাঠজুড়ে অড়হর এবং বেগুনের চাষ। বড় বড় বেগুনের গাছের মাঝে অজস্র কাকতাড়ুয়া। অদ্ভুত ভয়ানক সব চেহারা তাদের। কোনওটা কঙ্কালের আদলে, কোনওটা খ্যাংরাকাঠির মতো, ধানের খড় দিয়ে তৈরি মাথায়, মৃত মহিষের সিং। ফাইজুল মামা বলতেন, ‘‘বুঝলি মামু, কোনটা যে জিন আর কোনটা যে কাকতাড়ুয়া বলা খুব মুশকিল। বদ জিনেরা ওই কাকতাড়ুয়ার চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।’’
     মামার বলা এসব কথা ভাবছি আর দুজনে আগু পিছু হাঁটছি। হঠাৎ চোখ পড়ল, সামনের কাকতাড়ুয়ার দিকে। কালো মুখে, চোখহীন এক জোড়া গভীর গর্ত। তার নীচে যেন এক জোড়া চোখ আমাদের দেখছে। গা টা শির শির করে উঠল। মনে হল আমার দিকে ইশারা করল। আমি বাম দিকের আলের দিকে ঘুরালাম। কাকতাড়ুয়ার মুখটাও আমার দিকে ঘুরল। মনে হল আমাকে দেখছে। হঠাৎ আমার দুই পা হালকা হয়ে গেল। মনে হল ওটা জিন। আমাদের জিনে ধরতে আসছে। কোনও রকমে বললাম, ‘‘পালাআ---বে ফরিদ....ওই দ্যাখ, ওই কাকতাড়ুয়াটা মনে হচ্ছে জিন।’’ কোনও দিকে না তাকিয়ে দুজনের দে দৌড়! রবারের হ্যালহেলে চপ্পলে ফটাস ফটাস শব্দ। দু’দিকে তখন ঘন কালো অড়হরের ভূঁই। ফরিদ চাচা বলল, ‘‘দৌড় রে, দৌড়। এখানে থামিস না।’’- হঠাৎ আমার বাম পায়ের চপ্পলের ফিতে গেল ছিঁড়ে। চপ্পলের দিকে তাকিয়ে দেখি সামনের দিকে ফিতের অংশ ছিঁড়ে গিয়েছে। ওদিকে ফরিদ চাচা অড়হর এর ‘ভূঁই’ পার। মনে হল অন্ধকার ফুঁড়ে এক্ষুনি জিনটা আসবে। চটি হাতে নিয়ে পড়ি কি মরি দে ছুট। ছুটছি আর প্রতি মূহুর্তে মনে হচ্ছে এই বুঝি ধরল, এখন বুঝি সেদিনের ঘটনা মনের ভুল ছিল। হাওয়াতে কাকতাড়ুয়া নড়ছিল, তা দেখে মনে হয়েছিল এই বুঝি আমাদের দিকে ছুটে আসছে।
     চপ্পলের ফিতে ঠিক হওয়ার ছিল না। ক্ষয় হয়ে আসা চপ্পল ফেলে দিয়ে, খালি পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম। সাহেবপাড়া রাস্তার ধারে ছিল এক সাদামাটা মন্দির। মন্দিরে রাখা ছিল মুণ্ডুহীন খড়, মাটি দিয়ে তৈরি অসম্পূর্ণ মূর্তি। সিঁদুর দেওয়া কয়েকটি পাথর। একটি ত্রিশূল। চাচা বাঁশের বেড়ায় হেলান দিয়ে হা করে তাকিয়ে থাকল ওই মূর্তিটার দিকে।
     ধূলো ভরা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ফরিদ চাচা উল্লাসিত হয়ে বলল, ‘‘ওই দ্যাখ নদী।’’- তাকালাম, দিগন্ত বিস্তৃত মরা নদী। ও প্রায় ছোটার মতো করে হাঁটতে লাগল। আমি অনেকটা পিছনে। নদী দেখা ছিল ফরিদ চাচার নেশা। আমার ভয় করত। গেলাম নদীর পাড়ে। সেখান থেকে অনেকটা নীচে শান্ত গভীর নীল জলের ধারা! মনেই হচ্ছিল না এটা বর্ষার সময়কার ভয়ঙ্কর ডাক ছাড়া, সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া নদী।
     নদী দেখা শেষ করে নানির বাড়ি পৌঁছলাম পড়ন্ত বিকেলে। আম, কাঁঠাল এবং লিচু গাছের ছায়ায় মধ্যে নানির বাড়ি। নানিদের বাড়িটা ছিল মাটির। সামনে পিছনে বড় টানা বারান্দা। আর নানির ঘরটা ছিল বাড়ির প্রথম ঘর। বেশ বড় এবং গুছানো। আমার একটু কড়া ধাতের নানির বিছানাটা ছিল দড়ির খাটের। সব সময় বিছানা পাতা থাকত। একেবারে টান টান। ঠিক আমাদের বাড়ির চৌকিটার মতো। নানি ছিলেন খুব ধার্মিক। রোজ সূর্য ওঠার আগে পরিষ্কার উচ্চারণে কোরআন পড়া ছিল তাঁর প্রিয় কাজ। নানির ঘরে একটি বেঞ্চের উপরে তিনটি টিনের বাক্স ছিল। তার মধ্যে একটি বাক্সের প্রতি আমার খুব লোভ ছিল। ওই বাক্সের মধ্যে আমার আর্টিস্ট নানির বিভিন্ন রঙের কাঁথা থাকত আর থাকত নাড়ু। নানি বাড়ি যত বার গিয়েছি, ততবার নানি আমাকে এক পকেট করে দিত। আমি আরও বেশি চাইতাম। তাই লুকিয়ে আরও বের করে নিতাম।ওই বেঞ্চের নিচে থাকত বিভিন্ন আকারের কাঁচের বয়োম। কোনওটায় কুলের আচার, কোনওটায় তেঁতুলের আচার। কোনওটায় আমের, কোনওটায় আমড়ার আচার।
     সেদিন পৌছনোর পর নানি আমাদের খাইয়ে দাইয়ে বললেন, ‘‘তোরা বস ভাই। আমি বাড়ির পিছন থেকে ঘুরে আসি।’’ আমরা তো ওটাই চাই! আমার ফরিদ চাচা খুব পেটুক ছিল। যতই খায়, ওর পেট যেন ভরতো না। যেই নানি ঘর থেকে বেরোলেন, শুরু হল ওর বয়োম খুলে আচার খাওয়ার জন্য হাঁকুপাকু। শুরু হল আচার খাওয়া। এদিকে নানির কড়া নির্দেশ ‘‘ধুয়ে, মুছে, হাত শুকনো করার পরে বয়োমে ঢুকাবি।’’ কালো শুটকো চেহারার ফরিদ চাচা ও আমি কুলের আচারের খুব ভক্ত ছিলাম। আমিও ঢাকনা খুলে কুলের আচার গিলতে শুরু করলাম। হঠাৎ ফরিদ চাচা বলল, ‘‘হেই দেখছিস, ওই দেখ কোনের দিকে বয়োমে মিষ্টি রাখা আছে!’’ সত্যিই তাই। আমার চোখ পড়েনি। কোনের দিকে একটা ঝুলতে থাকা কাপড়ের আড়ালে রসে ভর্তি ডুমো ডুমো রসগোল্লার বয়োম। মুখটা সাদা কাপড় দিয়ে বাঁধা। তো ফরিদ চাচা রসগোল্লা ভর্তি বয়োমটা একটু আলোর দিকে আনল। দ্রুত মুখের কাপড়টা খুলেই রসে ভর্তি বয়োমে হাত ঢুকাল। বয়োম থেকে দুটি রসগোল্লা বের করে আনল। আমাকে না দিয়েই পেটুকটা একটি মুখে ঢোকাল, অন্যটি হাতে। মুখে ঢুকিয়েই দেখি চাচার চেহারা বদলে গেল! হা করে আমার দিকে তাকিয়ে। অথচ আমার দিকে নয়। পিছু ফিরে দেখি দরজায় বড় মামি! মামি কি বলছিলেন মনে নেই। আমি তাকালাম সামনে। ফরিদ চাচা মুখভর্তি রসগোল্লা নিয়ে দাঁড়িয়ে। ডান হাতে ধরা রসগোল্লা দিয়ে টসটস করে ঘরের মেঝেই রস পড়ছে। আমি ভাবছি, পেটুক চাচা রসগোল্লাটা গিলছেনা কেন? বড় বলে? তারপর দেখি দুই চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ছে। এদিকে দরজায় নানিও হাজির। দেখি ওরা মুচকি মুচকি হাসছে। চাচা রসগোল্লা গিলতেও পারে না, ফেলতেও পারে না। আমিও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। আমি বললাম, তুই খেয়ে নে। নানি কিছু বলবেন না। মেজো মামিও হাজির। এবার সবাই জোরে জোরে হা হা করে হাসতে লাগল। ফরিদ চাচার তখন চোখে-নাকে জল। মেজো মামি ওকে কলতলায় নিয়ে গেলেন।
     লজ্জা করছিল। নানি, মামি হাতে-নাতে আমাদের আচার খাওয়া ধরে ফেলেছে। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না ফরিদ চাচার কি হল! ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে গেল। আমিও একটা রসগোল্লা বের করে যেই কামড় বসিয়েছি, লবন, ঝাল আর সীমাহীন টকের তীব্রতায় মুখ যেন পুড়ে গেল! কি টক রে বাবা! আবার ঝাল ঝাল। লবণেও ভর্তি। জানালা দিয়ে ফেলে দিয়ে নানি বলে জোরে হাঁক দিলাম। কি এটা? রসগোল্লা নয় তো কি? নানি হাসতে হাসতে আঙিনা থেকে বললেন, ‘‘পাগলা ওটা দু’বছরের পুরনো লেবুর আচার।’’ আসলে আমরা লেবুর আচার কোনওদিন খাইনি, দেখিও নি। আমাদের গ্রামে ওসব হত না, আজও হয়না।
     তবে সেবার আমাদের খুব আদর জুটেছিল। মেজো মামা প্রচুর মর্টন চকোলেট কিনে দিয়েছিলেন। আমাদের সম্মানে সেদিন দেশি মুরগীর ঝোল হয়েছিল। খেতে বসে চাচা আমার ভয় পাওয়ার কথা সবার সামনে বলে দিল! সবাই হা-হা-হা করে হাসতে লাগলেন। বাড়ি ফেরার সময় নানি আমাদের প্রিয় আচারগুলো অনেকটা পরিমাণে একটি বড় টিফিনে ভরে দিয়েছিল। আমাদের দু’জনকে দু‘জোড়া নতুন চপ্পল কিনে দিয়েছিলেন।
     মনে মনে জিন, থুড়ি কাকতাড়ুয়াকে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম।

মোবারক মন্ডল
করিমপুর, পশ্চিমবঙ্গ