অটোয়া, শুক্রবার ২০ মে, ২০২২
কুচবরণ কণ্যা - স্বপঞ্জয় চৌধুরী

মার নাম কালোনি
সদর বাজারের পাশ দিয়া যেই নদীডা 
হাপের লাহান আইক্যা বাইক্যা গ্যাছে
তার নামে নাম আমার। 
বাবায় চাইছিল ঘরে বিজলি বাত্যি ফুডাইয়া 
মরদ পোলা আইব কিন্তু কী আফসোস
কালা ম্যাগের লাহান বৃষ্টির রাইতে
যহন আমার জন্ম হইলো।
বাবার মুহেও যেন কালা আসমানডা ভাইংগ্যা পড়লো।
দাদি কোনমতে কোল থিকা নামাইয়া ছাতি ফুডাইয়া
হনহন কইরা উডান পাড়ি দিল।
আমি কানতেই থাকলাম
মা আমারে বুকে নিল 
বুকে নিয়া শালদুধের বোডাডা বাড়াইয়া দিল
আমি মায়ের চোহের দিকে চাইয়া রইলাম
তার চোহে পানি আমারে চুমা খাইল।
আমি কালনী নদীর পাড় দিয়া ঘুরি,
 বিল থিক্যা লাল লাল শাপলা উডাই, 
নাও বাই, কুড়াল দিয়া গাছ কোপাই
বাপের আর পোলার সখ নাই,
আমি পোলা হইয়া উঠি, স্কুলে যাই সাইকেল চালাইয়া
প্যাডেলে পাও মারতে মারতে আমার পা-ও এহন শক্ত মরদের মতো।
পাকা ধানগুলান যহন কিলবিলাইয়া হাসে ;
বাবার লগে আমিও যাই ধানের ডগা থিকা হাসি ছিড়া আনতে, 
ঢেঁকিতে পার মাইরা আমিও ধান ভানতে পারি, 
ছড়ার পিডে ছড়া কাটতে কাটতে আমিও ফুডাই হুরুমের সাদা শরীর। 
শুনলাম পাশের গেরামে চেয়ারম্যান এর পোলা আইছে বিরাট পাশ দিয়া।
দেখতে নাকি কাচা হলুদের মতো। 
মাইনষের কাছে গপ হুনতে হুনতে আমারো মন চাইল তারে ইট্টু দেহি। 
উডান ভরা মানুষ তারে দেখতে আইছে।
আমি মানুষ ঠেইলা ঠেইলা ভিতরে গেলাম; তারে দেখলাম।
সেও আমারে দেখলো জানিনা কেন এমন অবাক হইয়া চাইয়া ছিল।
তার কী আমার এই কাজল চোহের সুরমা ভালো লাগছে
নাকি আমার চাইর হাইত্যা চউল, লিকলিকাইন্যা কোমর, জোছনা রংগা তিল। 
যাহ কী যে ভাবি এইসব। আমারে কী কারো ভালো লাগতে পারে।
আমি কালা, কুইচ্যা কালা, ম্যাগের মতো কালা, 
নাওয়ের পাডাতনে দেওয়া আলকাতরার মতো কালা। 
তাইতো আমার জন্মে বাবায় খুশি না, 
দাদি পান ছেঁচতে ছেঁচতে বিড়বিড় করে 
এই মাইয়া পার করতে খবর আছেরে কাশেম, 
জমিজমা সব বেচোন লাগবো, পতে নামবিরে পুত বাপের ভিডা হারাবি।
আমার চোহে পানি আহে, আমিতো নদী তাই আলগা বাতাসেই ঢেউ ওডে।
কতবার যে সুনু, পাউডার মাইখ্যা নিজেরে ধলা করতে চাইলাম পারলাম না।
এই চামড়ার রঙ ঘষলেও ওডেনা বাপজান।
কত সমন্ধ আহে যায়, আমি হাডি, সুরা ফাতিহা পড়ি,
চুল খুলি, মাজনে মাজা চকচকা দাঁতগুলা দেহাই। 
দেইয়াতে দেহাইতে আমি ক্লান্ত হইয়া যাই। 
আমার বুকের মইধ্যে কালনী গাঙের পানি, 
আমিও ঢেউ তুলতে জানি।
চোখ বন্ধ করো মা আমি তুফান ডাইক্যা আনি।

স্বপঞ্জয় চৌধুরী,
বারিধারা, ঢাকা।