অটোয়া, সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯
মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকায় নারীঃ পরিপ্রেক্ষিত সিলেট (তৃতীয় অংশ) - অপূর্ব শর্মা


মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকায় নারীঃ পরিপ্রেক্ষিত সিলেট – প্রথম অংশ পড়তে ক্লিক করুন

মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকায় নারীঃ পরিপ্রেক্ষিত সিলেট – দ্বিতীয় অংশ পড়তে ক্লিক করুন

 

তৃতীয় অংশ 

ঊষা দাশ পুরকায়স্থ

মুক্তিসংগ্রামে সিলেটের যে সকল নারী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ঊষা দাশ পুরকায়স্থ। প্রগতি ধারার এই নারী নেত্রী স্বাধীকার আদায়ের দাবীতে ছিলেন সোচ্চার। পরাধীনতার শৃংখল থেকে দেশকে মুক্ত করতে তিনি নেমেছিলেন রাজপথে। অবতীর্ণ হয়েছিলেন সংগঠকের ভূমিকায়।

ঊষা দাশ পুরকায়স্থ ছিলেন সিলেট মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী। একাত্তরের মার্চের অগ্নিগর্ভ সময়ে মহিলা পরিষদ ছিল প্রতিবাদমুখর। মহিলা পরিষদের উদ্যোগে সিলেটের অলিতে গলিতে সভা, মিছিল মিটিং পিকেটিংয়ের কাজ চলে তাঁর তত্বাবধানে। মুক্তিকামী মানুষকে জাগ্রত করে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’-এ কালো পতাকা নিয়ে সিলেট শহরে নারীরা একটি মিছিল বের করেন। মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন ঊষা দাশ পুরকায়স্থ।

২৫ মার্চের পর সিলেট নগরীর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। সেই পরিস্থিতিতেও নিজেকে গুটিয়ে রাখেন নি তিনি। মুক্তিকামী মানুষের জন্য কিছু করতে সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়েছেন। ৩০ মার্চ ভোরে পুলিশ লেন থেকে চারজন বিদ্রোহী সিপাই এসে তাঁর কাছে আশ্রয় চাইলে তিনি নিজ বাসায় তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করেন। একদিন, একরাত তাঁরা তাঁর রান্নাঘরের মাচায় কৌশলে লুকিয়ে ছিলেন। ৩১ মার্চ তাঁরা নিরাপদে অন্যত্র পাড়ি জমান। গন্তব্যে পৌঁছতে যাতে তাঁদের কোন অসুবিধা না হয় সে জন্য যাবার সময় তিনি তাঁদের হাতে কিছু নগদ টাকা তুলে দেন। শুধু এই পুলিশ সদস্যরাই নন, ২৬ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত অনেক মেডিক্যাল ছাত্র ও কর্মী তাঁর আশ্রয়ে ছিলেন।

পাকবাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন, গণহত্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে থাকা সমীচীন হবেনা বুঝতে পেরে ঊষা দাশ স্বামী, শিশুপুত্র ও কন্যাদের নিয়ে ভারতের মেঘালয়ে চলে যান। সেখানে প্রগতিশীল নেতা-কর্মীদের সাথে সংযোগ স্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা ও শরনার্থীদের সহায়তা এবং সাহায্য সংগ্রহের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। শুধুমাত্র নিজেকেই এইসব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করেননি তিনি, তাঁর প্রেরণায় তাঁর দুই কন্যা নিবেদিতা দাশ পুরকায়স্থ ও রাখী দাশ পুরকায়স্থ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নানা কাজে অংশ নেন।

ঊষা দাশ পুরকায়স্থের পৈত্রিক নিবাস ছিল সিলেটের গোয়ালা বাজারের দাশ পাড়া গ্রামে। পিতা দীনেশ চন্দ্র দাশগুপ্ত, মাতা হেনাপ্রভা দাশগুপ্ত। পিতার কর্মস্থল ছিল অবিভক্ত ভারতের শিলং-এ। সেখানেই ১৯২৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪২ সালের অক্টোবর মাসে বিয়ানীবাজার থানার লাউতা গ্রামের এডভোকেট বিরজামোহন দাশ পুরকায়স্থের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। ২০০৫ সালের ১ জুন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

ষোড়শী চক্রবর্তী

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করেছেন ষোড়শী চক্রবর্তী। জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত করতে তিনি ছিলেন অন্তপ্রাণ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এই নেত্রী প্রতিটি প্রগতিবাদী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ৬৯ এর গণআন্দোলনের সময় সিলেট রেজিস্ট্রারি মাঠে আয়োজিত সমাবেশে সিলেটের মহিলা সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তিনি। এই সমাবেশে মতিয়া চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।

সিলেট মহিলা পরিষদের প্রচার সম্পাদিকা ছিলেন ষোড়শী চক্রবর্তী। মুক্তিসংগ্রামের সময় প্রচারের দায়িত্বটি তিনি যথাযথভাবেই পালন করেন। মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে মহিলা পরিষদের উদ্যোগে সিলেট নগরীতে অনুষ্ঠিত সকল কর্মসূচীতে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে তিনি যেভাবে প্রচারণা চালান তা সিলেটের ইতিহাসে বিরল। কোনো মহিলা হিসেবে সিলেটে তিনিই প্রথম মাইক হাতে রিকশায় চেপে প্রচারণা চালানোর সাহস দেখান। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’-এ কালো পতাকা নিয়ে সিলেট শহরে নারীরা যে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তার অগ্রভাগে ছিলেন তিনি।

সিলেট পাকহানাদার বাহিনীর দখলে চলে গেলে অন্যান্যদের সাথে তিনিও ওপারে পাড়ি জমান। ভারতের সোনাখিরা শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করেন মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়। পূর্বে গ্রহণ করা নার্সিং প্রশিক্ষণ এসময় কাজে লাগান তিনি। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় নিয়োজিত হন ষোড়শী। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে ক্যাম্পে ক্যাম্পে তৎপরতা চালান।

মুক্তিযুদ্ধের সাথে শুধু নিজেই সম্পৃক্ত ছিলেন না, ছেলে অঞ্জন চক্রবর্তী মুক্তিসংগ্রামে যাতে অংশ নেন সেজন্য তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেন। ভারতের করিমগঞ্জের হিন্দি স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়া ছেলেকে বিদায় জানান তিনি। ষোড়শী চক্রবর্তীর উৎসাহ অনুপ্রেরণায় দেশকে শত্রুমুক্ত করতে বহিঃশত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়েন অঞ্জন চক্রবর্তী।

ষোড়শী চক্রবর্তী বিশ্বনাথ থানার জানাইয়া গ্রামে আনুমানিক ১৯২৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা পদ্মলোচন চক্রবর্তী, মাতা স্বর্ণলতা দেবী। ষোড়শীর বয়স যখন চার বছর তখন তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। মায়ের তত্বাবধানে বেড়ে উঠেন। ১৯৪৬ সালে ছাতকের শিমুলতলা গ্রামের অনিল কুমার চক্রবর্তীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৯২ সালের ৫ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আলম রওশন চৌধুরী

আলম রওশন চৌধুরী ১৯৩২ সালের ৯ নভেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুজ জাহির চৌধুরী। তাঁদের আদি নিবাস ছিলো ফুলবাড়ী এলাকায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আলম রওশন চৌধুরী অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়।

আলম রওশন চৌধুরী পারিবারিকভাবেই রাজনীতি সচেতন ছিলেন। সে কারণে স্বামী ফরিদ গাজীর রাজনীতিতে প্রতিবন্ধকতার কারণ না হয়ে নিজেও জড়িত হন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে। দেওয়ান ফরিদ গাজীর অনুপ্রেরণায় অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সিলেটে অনুষ্ঠিত মহিলাদের সমাবেশের উদ্যোক্তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। সমাবেশের দিন সিলেট শহরে কালো পতাকা নিয়ে মহিলারা একটি মিছিল বের করেন। এই মিছিলে অগ্রভাগে থেকে তিনি শ্লোগানে প্রকম্পিত করেন রাজপথ। সময়ের সাথে সাথে রাজনীতিতে অপরিহার্য হয়ে উঠেন রওশন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় তাঁদের শেখঘাটের আবাসস্থলটি আওয়ামী লীগ অফিসে পরিণত হয়। নির্বাচনের প্রার্থী স্বামী দেওয়ান ফরিদ গাজীর পক্ষে প্রচারণায় নামেন তিনি। এই নির্বাচনের ব্যয় নির্বাহ করতে তাঁর হাতের গহনা বিক্রি করে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। নির্বাচনে জয় লাভ করেন ফরিদ গাজী।

অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে এই আন্দোলনের সাথে নারীদের সম্পৃক্ত করতে তৎপরতা চালান রওশন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অসংখ্য মহিলা যোগ দেন আন্দোলনে। মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে সিলেট নগরীতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের প্রতিটি কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছেন তিনি। ২৩ মার্চ সিলেটের ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ তাঁদের শেখঘাটের বাসায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। সেখানে তিনিও উপস্থিত ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে পাক আর্মির হামলা চালানোর আগাম খবর পেয়ে তিনি শহরের কুয়া্রপাড় এলাকায় আত্মগোপন করেন। খবর পেয়ে সেখনে ২৭ এপ্রিল হানা দেয় পাক আর্মি। কিন্তু কৌশলে সন্তানদের নিয়ে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হন। এরপর ফুলবাড়ীতে চলে যান। সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করে গ্রামের বাড়ী নবীগঞ্জের দিনারপুরে পাড়ি জমান। বাড়িতে কিছুদিন থাকার পর ২৮ এপ্রিল রাতে সন্তানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে শ্রীমঙ্গল সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে যান। ভারতের করিমগঞ্জ কলেজ হোষ্টেল তাঁদের থাকার ব্যবস্থা হয়। তাঁদের অবস্থান স্থলে প্রতিদিনই শরণার্থীদের ভীড় জমতো। আগত যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন তিনি। অগণিত শরণার্থীর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে ফরিদ গাজীর সাথে দেখা করতে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এবং মুক্তিযোদ্ধারা আসতেন। তাঁদেরকেও দেখভাল করতে হতো তাঁকে।

দেশ স্বাধীন হলে মহিলা আওয়ামী লীগ সহ অন্যান্য মহিলাদেরকে সংগঠিত করে শরণার্থী শিবির থেকে ফিরে আসা লোকজনকে পুনর্বাসন করতে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। চাঁদা তুলে যাকে যতটুকু সম্ভব সাধ্যমত সহায়তা করতে কার্পণ্য করেন নি। ১৯৯৫ সালের ৩ নভেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।… চলবে

(সূত্রঃ বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বিভন্ন গ্রন্থ এবং সংবাদ পত্র) 

সিলেট, বাংলাদেশ