অটোয়া, শনিবার ২১ মে, ২০২২
পটলের নেমন্তন্ন - সুজিত চট্টোপাধ্যায়

টলের পাত্তা নেই। অথচ তারই আসার কথা ছিল সবাই আগে।
রথতলায় সব্ধ্যে ছ’টায় তিনজনে মিলিত হয়ে, হরিদার দোকানে চা খেয়ে, অটোরিকশা নিয়ে যাওয়া হবে মন্টুর বাড়ি। আজ মন্টুর বৌভাত।

সময়টা ভালো নয়। বন্ধুরা, আত্মীয়রা, অনেকেই বলেছিল,,, মন্টু, এই সংক্রমন কালে বিয়ে করবি! কয়েক মাস পিছিয়ে দেওয়া যায় না?
মন্টু সেসব কথার গুরুত্বই দেয়নি। বলেছিলো,,
কয়েক মাস পরে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে, সেই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে কী? পারবেনা। সুতরাং, যা হয় হবে।
হয়ে গেল বিয়ে। একেবারে সাদামাটা ছিমছাম ভাবেই, যথাযথ নিয়ম মেনে। আজ বৌভাত।
সবাই এসে গেছে, কনেযাত্রী পর্যন্ত। হাতে গোনা এইতো কটা লোক। সে গেল কোথায়? পটল?  আশ্চর্য!

বিয়েবাড়ি। তবুও যেন বিয়েবাড়ির মতো নয়। সেই পরিচিত জৌলুশ নেই। হৈচৈ নেই। অকারণ ব্যস্ততা দেখিয়ে দৌড়োদৌড়ি নেই।
পরী সাজ যুবতীদের ঝর্ণা ঝরানো বাঁধভাঙা হাসির ফোয়ারা নেই।
যুবকদের আড়চোখের চাহনি নেই।
বিগতা যৌবনাদের কড়া শাসনের গোয়েন্দাগিরি নেই। বয়স্ক জেঠুদের যৌবন স্মৃতির জোটবদ্ধ গুলতানি নেই।
বালক বালিকাদের বকা খাওয়া মাতোয়ারা দৌরাত্ম্য নেই। 
সানাইয়ের সুরেও যেন বিরহের ধুন।
অদ্ভুত অচেনা উৎসব বাড়ি।
যেন বারোয়ারী দুর্গা পুজোর একাদশীর দিনের, প্রতিমা বিসর্জন না হওয়া পুজো মন্ডপ।
প্রতিমা, প্যান্ডেল, আলো, সাজসজ্জা সবই আছে। শুধু নেই সেই উচ্ছ্বাস, উৎসাহ। চলছে চলুক গোছের ব্যাপার।
ফাঁকায় ফাঁকায় গুটিগুটি গোটাকয়েক লোক আসছে। এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে, নিষ্প্রাণ একটা পেন্নাম ঠুকে, নির্বাক বিদায়।
আইসক্রিম, ফুচকা ওয়ালাদের চোখে মুখে খদ্দের হীনতার হতাশ এক্সপ্রেসন।
প্রতিমার চোখেও অপার বিস্ময়। ওহে উৎসব প্রিয় ভক্তগন, কখন আসবে আমার বিসর্জনের চাকাযুক্ত বাহন? আন বাবারা আন। তোদের ভালবাসার আঘাত আর যে সইতে পারিনা।

সরকারি নিয়ম। সুতরাং পঞ্চাশ জনেই সীমাবদ্ধ।
কয়েকজন আত্মীয় পরিজন, কনেযাত্রী জনাদশেক আর  মন্টুর বন্ধুরা।
বন্ধুরা  বলতে মাত্র তিনজন। সদা, বিশু আর পটল।
মন্টুর আরও বন্ধুবান্ধব আছে তো বটেই। তবে নিয়মের বেড়াজালে বন্দী হয়েছে তারা। তবে তাদের প্রতিও সুবিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মন্টু।
তা না হয় হবে, কিন্তু পটল কোথায় গেল? সে তো নেমন্তন্ন মিস করবার বান্দা নয়।
বিয়ে শ্রাদ্ধ পৈতে তো বটেই। সত্যনারায়ণের সিন্নির নেমন্তন্ন পেলেও  সে ছাড়ে না। এমনই পেটুক খাদ্যরসিক ওই পটল।
সে তার প্রাণের দোস্ত মন্টুর বৌভাতের খাওয়া হাতছাড়া করবে, হতেই পারে না। নিশ্চয়ই কিছু গোলমেলে ব্যাপার।
সদা ফোন লাগালো। ঘন্টি বেজে বেজে থেমে গেল। বিশু মরিয়া হয়ে বললো,,, সদা, চল ওর বাড়িতে। দেখি কী ব্যাপার?
ওরা বেরুতে যাবে ঠিক তখনই কয়েকজন লোক, আপাদমস্তক সাদা পোশাকে ঢাকা। ঐ পি পি ই,, না কি যেন বলে? সেইগুলো পড়ে, একরাশ খাবারের প্যাকেট নিয়ে ঢুকলো।
একটা ঘরে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখে, যেমন যন্ত্রচালিত রোবটের মতো এসেছিল, তেমনই বেরিয়ে গেলো।
বোঝা গেল খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারটা, সেই আগের মতো হচ্ছে না। সেখানেও বদল হয়েছে। প্যাকেট সিস্টেম। পাত পেড়ে খাওয়ার জমানো খতম।
জেঠুদের দুরত্বের গুলতানিতে মৃদু গুঞ্জন।
ওখানে এখন ইতিহাসের প্রবল জাবরকাটা স্মৃতিচারণ।
সেই কলাপাতা, মাটির ভাঁড়, বোঁটাযুক্ত লম্বাটে বেগুনভাজা, কিংবা শেষ দিকে কম্পিটিশন করে সন্দেশ পানতুয়ার  ভাঁড়ার ফাঁকা করে দেওয়া, কিছুই বাদ যাচ্ছেনা সেই দীর্ঘশ্বাসযুক্ত স্মৃতিচারণায়।

নিমন্ত্রিতদের পোশাক পরিচ্ছদ একইরকম রয়েছে। তবে সংযোজন শুধু মাস্ক নামক একটি অসম্ভব অপছন্দের নাকমুখ ঢাকা আচ্ছাদন।
তবে সেগুলো যে সকলের সঠিক জায়গায় বিরাজ করছে তেমন দাবী করা যাবে না।
কারুর নাকের ফুটোর নিচে ঠোঁটের আগায় আটকে আছে। কারুর আবার থুঁতনির কাছে লেপটে পড়ে আছে।
মহিলাদের মধ্যে অনেকেই শাড়ী ব্লাউজের সঙ্গে কালার ম্যাচিং ব্রান্ডেড সুদৃশ্য দামী মাস্ক ব্যবহারের দুরন্ত প্রয়াস চালাচ্ছেন।
কারুর মাস্ক আবার কানের ডান কিংবা বাম হ্যাঙ্গারে  বাদুড়ের মতো টিংটিং করে দোল্লা খাচ্ছে।

প্যাকেট এসে গেছে। সুতরাং অহেতুক দূরে দূরে থেকে ভয়মিশ্রিত কালক্ষেপ করার কোনও মানেই হয়না। হাতে নাও বাড়ি যাও।
শুখনো নিয়ম রক্ষার দেঁতো হাসি। যেন, নদী আছে জল নেই, সমুদ্র আছে ঢেউ নেই, মেঘ আছে বৃষ্টি নেই গোছের ব্যাপার। যেন বল গোলপোস্টে লেগে বাইরে চলে গেল। গোল হলো না।
কিন্তু পটল কোথায়? আচ্ছা ছেলে তো! সত্যি সত্যিই এলো না? ছি ছি,, খুবই অন্যায়। জানালোও না কিছু। ফোন পর্যন্ত রিসিভ করলো না। এক্কেবারে ছোটলোক একটা। ওর মুখ দেখাও পাপ।
ওদের রাগ করা স্বাভাবিক।
বন্ধুত্বের বন্ধন, অনেক কিছুই দাবী করে। অনাদায়ে বন্ধুত্ব ভেসে যায়। তৈরি হয় হতাশা, অভিমান। আসে অভিযোগ, দূরত্ব, অবিশ্বাস। শেষে বিচ্ছেদ, শত্রুতা।

নববধূর বেশে বসে থাকা মন্টুর বউয়ের সামনে এসে দাঁড়াল ওরা। মন্টুই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে আলাপ করালো।
একটা শাড়ী এনেছিল ওরা। শুভবিবাহের শুভকামনা। নববধূর হাতে তুলে দিলো পরম যত্নে ভালবাসায়। স্যানিটাইজ লোশন মাখা হাতে। নববধূর মেহেন্দি রঙে আলপনা আঁকা হাতে নয়। নববধূর হাত সাদা গ্লাভসে ঢাকা।
এখন এ সবকিছুই মেনে নিতে হবে। মানিয়ে নিতে হবে। যা প্রচলিত রীতি নিয়মের বাইরে।
সাবধানতাই বোধকরি নিরাপত্তার প্রথম চৌকাঠ।

এবার সকলেই আস্তে আস্তে বাড়ি ফিরে যাবার রাস্তা ধরবে। রাত আটটার পর থেকেই, রাস্তা একেবারে  ফাঁকা হয়ে যায় আজকাল।
এই আবহে কেউই বাড়তি সাহস দেখাতে ভরসা পায়না।
সদা আর বিশুর হাতে দুটো প্যাকেট তুলে দিয়ে মন্টু বললো,,, কী ব্যাপার, পটল আসেনি? কেন রে? তোদের তো একসঙ্গেই আসার কথা।
সদা আমতা-আমতা করে বললো,,,,
কী জানি, ঠিক বুঝতে পারছিনা। ব্যাটা ফোনও রিসিভ করছেনা।
মন্টু একটু চুপ করে থেকে বললো,,, একটা কাজ করতে পারবি?
বিশু প্রবল উৎসাহ দেখিয়ে বললো,,, বল না,, কী করতে হবে?
মন্টু, আর একটা খাবারের প্যাকেট বিশুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,,,, এটা পটলের জন্যে নিয়ে যা। ওর হাতে দিয়ে বলিস, আমি পাঠিয়েছি। আরও বলিস,, ও আমার জীবনের এমন একটা দিনের কথা ভুলে গেল কীকরে জানিনা, কিন্তু আমি ওকে ভুলিনি।
মন্টুর এই কথায় রাগ কতখানি ছিল বোঝাগেল না, কিন্তু অভিমান প্রকাশ পেল প্রচুর।
বন্ধুত্ব সম্পর্কের এটি একটি মহান অধিকার, অভিমান।

এখন রাত ন’টা। কিন্তু চারপাশের পরিবেশ দেখলে মনে হয়, মধ্যরাত। পটলের বাড়িটা গলির ভেতর। সদা আর বিশু সেই গলিতে ঢুকতে গিয়ে থমকে গেল। একপাল বেওয়ারিশ কুকুর সমস্ত গলিটার দখল নিয়ে নিয়েছে। সেখানে এখন তাদেরই রাজত্ব। বহিরাগতের উপস্থিতি তাদের একেবারেই পছন্দ নয়। তাদের সমবেত প্রবল প্রতিবাদ চিৎকারে, চারপাশের নিঝুম নিঃস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল।
অতগুলো কুকুরের কান ফাটানো ঘেউঘেউ শব্দে, দুজন অনাহুত নিরীহ মানুষের বুক যে কেঁপে উঠলো না, তেমন নয়। তবে, গলি ছেড়ে পিঠটান দিলো, তেমনও নয়।
বাঙালি এখন ভীরুদের দলভুক্ত হয়েছে ঠিকই। তাইবলে কর্তব্য বিমুখ কাপুরষ হয়ে পরেনি, সেকথা হলফ করে বলা যায়।

ওরা, পটলের বাড়ির সামনে চলে এলো। পুরনো দোতলা সাবেকী বাড়ি। জানালা গুলো সব বন্ধ। অন্ধকার। মা আর ছেলে থাকে।
পটলের বাবা গেল বছর মারা গেছেন। ক্যান্সার। সাধ্যমত চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
ভদ্রলোক সাধারণ বেসরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। অল্প রোজকার।
বাকিটুকু বোধকরি বলবার প্রয়োজন নেই। এমত অবস্থায় অন্য সব বিত্তহীনদের যে দশা হয়। এক্ষেত্রেও তার কিছুমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেনি।

সদা গলা নামিয়ে মোলায়েম করে ডাকলো,,
পটল, বাড়ি আছিস,,,,, পটল,,,,
একতলার একটা জানালার পাল্লা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
মাসিমা। পটলের মা। ঘর অন্ধকার। মাসি মা'র মুখ ভালো করে দেখা যাচ্ছেনা।
কে বাবা,, ও তোমরা? কিছু বলবে?
মাসিমা' তো এমন করে কথা বলেন না। গম্ভীর শুধু নয়, একটা যেন যন্ত্রনা ক্লিষ্ট হতাশার স্বর।
তোমাদের ভেতরে আসতে বলতে পারবো না। যা বলার ওখান থেকেই বলো।
সদা আর বিশু মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। দুজনেরই কপালে ভাঁজ। মাসিমা এমন করে কথা বলছেন কেন?
সাধারণত ওরা এলে মাসিমা খুশিই হন। দরজা খুলে, ভেতরে বসিয়ে কত কথা বলেন। সক্কলের খোঁজ খবর নেন। হাসিমুখে যাহোক কিছু না খাইয়ে ছাড়েন না। কিন্তু আজ,,,?
সদা, বিশুর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
পটল কী ঘরে আছে? একবার ডেকে দেবেন?
তোমরা মন্টুর বৌভাত বাড়ি থেকে আসছো তো?
বুঝতে পেরেছি। পটল জানতো তোমরা আসবে। তাই যাবার সময় আমাকে বলে গেছে, তোমাদের সঙ্গে মন্টুর বৌভাতে যেতে না পারার জন্যে, ও খুবই দুঃখীত।
সদা বিচলিত হয়ে বললো,,,
যাবার সময় মানে! পটল কোথায়?
হাসপাতালে। বেলেঘাটা আই ডি।
মাসিমা' আঁচলের প্রান্ত, জলভরা দুচোখে চেপে ধরলেন।
পৃথিবী কী দুলে উঠলো? কান ঠিক শুনছে তো?
আকাশের অবস্থা ভালো নয়। বৃষ্টি আসবে।
নীল আঁকাবাঁকা সর্পিল বিদ্যুৎ রেখা, মেঘভর্তি আকাশের এমাথা থেকে ওমাথা চড়চড় করে ফাটিয়ে  দৌড়াদৌড়ি করে যাচ্ছে।
বিশু, অসম্ভব উদ্বেগ নিয়ে বললো,,,,
কিন্তু কখন! কীভাবে? 
মাসিমা'র গলায় কাঁপন। জানিনা বাবা। ভালোই তো ছিল। হঠাৎই কদিন ধরে বলছিল,,, শরীর খারাপ লাগছে। জ্বর জ্বর ভাব, গলায় ব্যথা। আমি ভেবেছিলাম সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু,,,,,
মাসিমা কথা শেষ করতে পারলেন না। ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন।
সদা, বিস্ময় ভরা হতাশ গলায় বললো,,,
কিন্তু,, মাসিমা,,,, ও, আমাদের কিচ্ছু জানালো না,,
আমরা কেউ কিছুই জানতে পারলাম না,,, এতবড় একটা ঘটনা,,,, কেন মাসিমা? আমরা কী এতটাই পর,,?
বিশু বললো,,,, হ্যাঁ, মাসিমা। অনেকবার ফোন করেছি। বেজে বেজে থেমে গেছে। আমরা কী দোষ করেছি মাসিমা?
মাসিমা, নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন,,,
ও নিজে নিজেই সবকিছু করেছে। পরীক্ষাও কখন করিয়েছে, জানিনা। আমাকে কিচ্ছুটি জানায়নি। আজ সকালে বেরিয়ে গেল। বললো,, একটু কাজ আছে, এক্ষুনি ফিরে আসবো।
মাসিমা'র চোখে আবারও জল। গলা কাঁপছে।
ফোনটা ওর ঘরেই আছে। বেলা বারোটা নাগাদ ফোনটা বেজে উঠলো। আমি ধরলাম।
মাসিমা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। আওয়াজ করে কেঁদে উঠলেন। আর সেই মাতৃস্নেহ মাখা কান্না ভেজা গলায় বললেন,,,
ও,, বললো,,, মা, আমার সেই অসুখটা হয়েছে মা। ওরা আমাকে এখানে ভর্তি করে নিয়েছে। মা, তুমি কিচ্ছু চিন্তা ক`রো না। আমি ভালো হয়ে যাবো।
মাসিমা একটু থেমে, আবার বললেন,
আমাকে, কাউকে কিছু বলতে বারণ করে দিলো। বললো, আজ মন্টুর বৌভাত। এই খবর পেলে ওদের আনন্দ নষ্ট হবে। ওরা নিশ্চয়ই ফোন করবে। তুমি ফোন বাজলেও ধরবে না। আমি আবার কাল সকালে ফোন করবো। ওদেরও কাল সব বলবো। এই বলে ফোন কেটে দিলো।
সদা বললো,,, ও নিশ্চয়ই অন্য কারোর ফোন থেকে কথা বলেছে। মাসিমা, ফোনটা একবার দেখাবেন। মানে,, সেই ফোন নাম্বারটা নেবো।
বিশুর দিকে তাকিয়ে বললো,,, ওই নাম্বারটা পেলে, হয়তো তার কাছে কিছু খবর পাওয়া যেতে পারে।
বিশু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
মাসিমা কিন্তু সে কথার কোথাও উত্তর না দিয়ে বললেন,,, অনেক রাত হয়েছে। সময় ভালো নয়। তোমরা বাড়ি যাও।
মাসিমা, জানালা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন। সদা বাধা দিয়ে বললো,,,, মাসিমা, একটা কথা,, জানি, বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা। মাসিমা,,
আমরাও কিন্তু আপনার ছেলে। সবসময় আপনার পাশে আছি। পটল সুস্থ হয়ে বাড়ি না আসা পর্যন্ত, সবরকম ভাবে আমরা সব্বাই আপনার সাথে আছি।
কথা দিন মাসিমা, আমাদের নিরাশ করবেন না।
ক্যাকটাসেও ফুল ফোটে। ঠিক তেমনই বুকে অজস্র কাঁটার যন্ত্রণা চাপা দিয়ে, মাসিমা বললেন,,, সন্তানের ভালবাসার আবদার মা কখনও অস্বীকার করতে পারে? তোরাও যে আমার সন্তান বাবা।

খাবারের প্যাকেট গুলো, পাথরের মতো নিরস আর ভারী মনে হচ্ছিল। ওগুলো কিছুতেই গলা দিয়ে নামবে না।
বিশু আধো অন্ধকার গলির একপাশে প্যাকেট গুলো নামিয়ে রাখলো। তৎক্ষনাৎ ক্ষুধার্ত কুকুরের দল ঝাঁপিয়ে পড়লো সেগুলোর ওপর।
উৎসবের আনন্দ উৎসাহ নিমেষে ছড়িয়ে পড়লো পথের ধুলোয় অনাদরে।

এই বোধকরি জগতের আশ্চর্য লীলা। কোথাও নতুন ঘর গড়ে, কোথাও,,,,,।
আগামী কালের সূর্য নিশ্চয়ই সুবার্তা বয়ে আনবে সক্কলের জন্য।
মানুষ হিসেবে এটুকু বিশ্বাস অবশ্যই রাখা যেতে পারে। তাইনা??

এবার তাহলে আসল কথায় আসা যাক।
এতক্ষণ পটলকে নিয়ে যেসব কথা বলা হলো, মানে, পটলের অসুখ, হাসপাতালে ভর্তি ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে সে-সব নিছক কল্পনা।
মানে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটতে পারতো।
কিন্তু তা হয়নি। একেবারেই এমন কিছুই হয়নি। তাহলে,  সত্যি সত্যি কী হয়েছিল? আসুন দেখা যাক।

তখন রাত ন’টা। সদা আর বিশু, পটলের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে ডাকলো,,
পটল,,,, এই পটল,,,,,
সদর দরজা খুলে লিকপিকে পটল দাঁত বের করে হাসতে হাসতে এলো। পরনে বারমুডা হাফপ্যান্ট আর গায়ে গেঞ্জি। বললো,,,,
এইতো তোরা এসে গেছিস। তোদের জন্যেই সেই তখন থেকে অপেক্ষা করে বসে আছি। দে,,
পটলের কথা বলার ভঙ্গি, অনেকটা অভিনেতা চিন্ময় রায় অভিনীত টেনিদার মতো। ওই রকম চোখ মুখ নাচিয়ে, কেঁপে কেঁপে কথা গুলো বললো।
বিশুর মাথা গরমই ছিল। তার ওপর পটলের ওই রকম  কথা শুনে আরও ক্ষেপে গেল,,,
দে কিরে,, দে কী,,, কী দেবে তোকে? নির্লজ্জ। তোদের জন্যে বসে আছি,,,ওরে আমার  লাটসাহেবের নাতি রে,, একটা এমন ঝারবো, দাদুর নাম ভুলিয়ে দেবো, শয়তান কোথাকার। পটল, এক পা পিছিয়ে গিয়ে রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে বললো,,,, এই,, দাদু তুলবি না। একদম দাদু তুলবি না,,, বলে দিলুম।
বিশু এক পা এগিয়ে গিয়ে বললো,,, বেশ করবো তুলবো, কী করবি তুই?
পটল তার শারীরিক সামর্থ্য সম্পর্কে একশোভাগ সচেতন। তাই মিনমিন করে বললো,,,, কী করবো মানে! করার  কী আছে? আমার দাদু ফ্রীডম ফাইটার ছিলেন জানিস? রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলা প্রাকটিস কর।
তার আগে তুই আমার একটা ঘুষি একসেপ্ট কর। বলেই আস্তিন গুটিয়ে বিশু, পটলের দিকে তেড়ে গেল।
অবস্থা বেগতিক দেখে সদা, বিশুর হাত ধরে টেনে সরিয়ে দিলো। বিরক্তি স্বরে বললো,,, কী হচ্ছে কী এসব  অসভ্যতা! ছেলেমানুষি হচ্ছে না কি?
পটল নিজেকে সেফ সাইটে রেখে বললো,,,,
আমি কী করেছি, ওই তো,,,,
চুপ, একদম চুপ। সদা, পটলকে থামিয়ে দিয়ে তিরস্কারের ভঙ্গিতে বললো,,, দোষ স্বীকার করতে শেখ। আজ তুই যা করেছিস, কোনও ভদ্রলোক এমন করে না, বুঝেছিস?
তারপর, একটা পলিথিন ব্যাগ পটলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,,,, নে, ধর। তুই তিনটে প্যাকেট চেয়েছিলি, তিনটেই আছে, ধর।
পটল, দাঁত বের হাসতে হাসতে যেভাবে ছোঁ মেরে আহ্লাদ প্রকাশ করে ব্যাগটা হাতিয়ে নিলো, মনে হলো স্বর্গের ঐশ্বর্য হাতে পেলো।
এইখানে আমাদের আবারও একবার সেই জায়গায়  ফেরৎ যেতে হবে, যেখানে মন্টু ওদের হাতে খাবারের প্যাকেট তুলে দিচ্ছে। আসলে তখন ঠিক কী হয়েছিল,,,,,,

মন্টু বললো একটা কাজ করতে পারবি?
বিশু, মহা উৎসাহে বললো, বলনা কী করতে হবে?
মন্টু বললো,,,, এই তিনটে প্যাকেট পটলকে দিয়ে দিস।
বিশু একবার সদার মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে, অবাক হয়ে বললো,,,, কেন? তিনটে কেন?
মন্টু বললো,,,, জানিনা, আমাকে ফোন করে বললো ওর নাকি শরীর ভালো নেই, আসতে পারবে না। তোরা তো আসবি, তাই তোদের হাতে যেন দিয়ে দিই,,, এইরকমই বলছিল আরকি,,  যাগগে, অত ভাবার কিছু নেই, নে ধর।

পটল, ব্যাগের মুখ ফাঁক করে চোখ বুলিয়ে দেখে নিচ্ছিল, ঠিক তিনখানাই আছে কিনা। বিশু, ব্যাপারটা লক্ষ্য করে তির্যক ভাবে বললো,,,,
হ্যাঁ হ্যাঁ , ঠিক করে গুনে নে। আমরা সরিয়ে টরিয়ে নিয়েছি কি না।
পটল জিভেজল সুরুৎ করে টেনে নিয়ে বললো,,
দূর, আমি কী তাই বলেছি, যাঃ।
সদা বললো, একটা সত্যি কথা বলতো! প্যাকেটের ব্যাপারটা তুই জানলি কী ভাবে! কই, আমরা তো জানতাম না।
পটল, সেই টেনিদার ভঙ্গিতে বললো,,,,,,,

খোঁজখবর রাখতে হয় গুরু। প্যাকেটের গায়ে ক্যাটারার কোম্পানির নামটা দেখেছিস? ভুঁড়িভোজ ক্যাটারার। আমাদের কাবলুদার। কাল রাতেই ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। খবরটা তখনই পেলাম। তখনই ঠিক করলাম, নেমন্তন্ন বাড়ি যাবো না। গেলে লোকসান হয়ে যাবে।
সদা আর বিশু, চোখ গোলগোল করে হাঁ হয়ে পটলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
ব্যাটা বলে কী। নেমন্তন্ন বাড়ি গেলে লোকসান হয়ে যাবে? এই ছ্যাঁচোড়টা কে রে? মানুষ কী শুধু খাবার জন্যে বিয়ে বা কোনও উৎসব বাড়ি যায়। এটা একটা কালচার, ভদ্রতা, লোকাচার, সখ্যতার মিলন মেলা। এই গবেট হতচ্ছাড়া কী সেসবের গুরুত্ব বোঝে?
পটল, বিড়বিড় করে বললো,,,, আমি জানি তোরা কী ভাবছিস। আমাদের বন্ধুত্ব অনেক দিনের কিনা। আসলে ব্যাপারটা হলো। এইসময়টা তো একেবারে অন্যরকম, তাই প্ল্যানটাও অন্যরকম। ঠিকঠাক আনন্দ টানন্দ কিছুই করা যাবে না। শুধু যাওয়া আর খাওয়া হবে।
তাছাড়া যখনই প্যাকেটে খাবারের কথাটা জেনে গেলাম, ভাবলাম, ধুস,, ওখানে গেলে একটার বেশি প্যাকেট পাবো না। মানে সেটাই ভদ্রতা। সকলের সামনে বারবার চাইতে বড্ড লজ্জা করবে। জানিসই তো আমি একটু বেশি খাই, মানে, খেতে ভালবাসি। তাই একটু চালাকি করে,,
রাগ করিস কেন? ছোট ভাই মনে করে, ক্ষমাঘেন্না করে দিস,,,
বিশুকে আর আটকানো গেল না।,,, ছোটভাই? তবে রে শালা,,,, বলে সবেগে পটলের দিকে ছুটে গেল। পটল বিপদ আঁচ করতে পেরে বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে সিঁড়ি দিয়ে ওপরের ঘরে গিয়ে খিল আটকে দিলো।
সদা আর বিশু হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে , তিনখানা প্যাকেট খুলে পটলের গপগপিয়ে  খাবারের দৃশ্য কল্পনা করছিলো।
ওফঃ, কী সাংঘাতিক!!

সুজিত চট্টোপাধ্যায়
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ