অটোয়া, শুক্রবার ২০ মে, ২০২২
একুশ শতকের সংকট এবং সম্ভাবনার পথ (চার) - দীপিকা ঘোষ

জল সংকটঃ
১৯৩৩ সালে নোবেল পুরস্কারবিজয়ী অস্ট্রিয়ান-আইরিশ পদার্থবিদ ডক্টর আর্ভিন শ্রোডিঞ্জার (Erwin Schrodinger), ১৯৪৩ সালে একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, জীবন হচ্ছে ‘A chemical structure in living cells.’ সত্যিই তাই।  উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ, পশুপাখী থেকে মানুষ পর্যন্ত জীবশরীর হচ্ছে এক থেকে কোটি কোটি মাইস্ক্রোপিক সেলের এমন এক সুশৃঙ্খল পরিকাঠামো, যা জীবদেহের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ৬৫ থেকে ৯০ শতাংশ অবধি জল ও জলীয় পদার্থ দ্বারা পরিপূর্ণ।  জীবন রক্ষায় জলের ভূমিকা তাই অপরিহার্য।  জীবের যথার্থ বাসভূমি হয়ে উঠতেই সাগর-মহাসাগর পরিবেষ্টিত, জলের শয্যায় শায়িত বসুধার দেহ গঠন হয়েছে।  জীবকোষের প্রধান তিন স্তরের মতো পৃথিবীও গঠিত প্রধান তিনটি স্তর দিয়ে ( Interior Layers)।  পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এরা জীবকোষের মতোই পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় ব্যস্ত রয়েছে সারাক্ষণ। এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে বিভিন্ন পদার্থমিশ্রিত ভূগর্ভের বিপুল জলরাশি।  এ কথা বলা তাই অত্যুক্তি নয়, ভারী বেডশিটের মতো তিন স্তরের পৃথিবীদেহ ভেসে রয়েছে নানা ধরনের কেমিক্যাল এবং শক্ত পদার্থমিশ্রিত তরল জলের বিছানায়। 
     পৃথিবীর চারপাশেই নানা রূপে ছড়িয়ে রয়েছে জলের আবরণ।  আকাশের মেঘমালায়, বাতাসের উড়ন্ত ঢেউয়ে, আবহাওয়া পরিমণ্ডলে, নদনদীতে, লক্ষ বছরের স্তরীভূত গ্লাশিয়ারে, বরফনদীতে, বিশাল লেকে, মাটির নিচে সর্বত্রই বিছানো জলের পরশ।  জীবের উপযোগী তাপমাত্রা ঠিক রাখতে সাগর-মহাসাগরের জল কোটি কোটি ঢেউয়ের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের সোলার রেডিয়েশন শুষে নিচ্ছে অবিরাম।  তৈরি করছে বৃষ্টি।  ভিজিয়ে দিচ্ছে বায়ুমণ্ডলের শুষ্কতা।  সূর্যের অতি উত্তাপ থেকে রক্ষা করছে পৃথিবীর পরিবেশ।  ঊর্বরতা দিচ্ছে ফসলের মাঠকে।  আবার প্রকৃতির রিসাইকেল পদ্ধতি বৃষ্টির জল ঝরিয়ে ভূগর্ভসহ সব জলাধারগুলোতে সঞ্চিত করছে নতুন করে জলরাশি।  পূর্ণ করছে জলের ঘাটতি।  জলের সঙ্গে জগত এবং জীবের সম্পর্ক তাই জড়িয়ে রয়েছে ওতোপ্রতোভাবে।  ভূপৃষ্ঠের ৭০ ভাগ আবৃত রয়েছে জলে।  কিন্তু তারপরও বর্তমান শতাব্দীতে জলসংকট নিয়ে উদ্বিগ্নতা বাড়ছেই।  জনউন্নয়নের বিভিন্ন রিপোর্টগুলোও জানাচ্ছে, আপাতত প্রতি বছর পৃথিবীতে কম পক্ষে এক মাস ১১০ কোটি মানুষ জলাভাবে কষ্ট পায়।  জলঘাটতির অভিজ্ঞতা হয় ২৭০ কোটি মানুষের।  তাহলে কি অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের মতো জলের পরিমাণও সীমিত হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীতে? বসুন্ধরার ভাণ্ডার থেকে একদিন জলও কি নিঃশেষিত হয়ে যাবে?
     পৃথিবীর অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের মতো জলের পরিমাণও সীমাহীন নয়।  মোট পরিমাণ ৩৩৩ মিলিয়ন কিউবিক মাইল ( ১.৩৮৬ বিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার)।  কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের অবশ্য ধারণা, পৃথিবীর সম্পূর্ণ জলশূন্য হবার সম্ভাবনা নেই।  কারণ সাগর মহাসাগরে যে গ্রহের ৭০ শতাংশ নিমগ্ন রয়েছে এবং যেখানে প্রকৃতির রিসাইক্লিং পদ্ধতির কারণে জল সর্বদা একই পরিমাণে থেকে যায়,  জলশূন্যতার কারণ সে গ্রহে থাকবে কেন?  কিন্তু নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর উল্টোটারই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।  যেখানে বলা হচ্ছে,  ১ ‘The Earth has lost a quarter of its water.  In its early history, the Earth’s oceans contained significantly more water than do today. A new study indicates that hydrogen from split water molecules has escaped into space,’ ( sciencenordic.com. ‘The water has lost a quarter of its water’ by Sybille Hildebrandt - published: Tuesday, 13 March 2012).  এছাড়াও বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর মোট জলের ৯৭ ভাগই অব্যবহারযোগ্য জল।  বাকী ৩ ভাগ স্থলভাগের পশুপাখী, উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ, মানুষ এবং মিষ্টি জলের প্রাণিদের ব্যবহারের উপযোগী। এর ২ ভাগ আবার গ্লাশিয়ার আর বরফসাগরে জমাটবাঁধা অবস্থায় রয়েছে।  অর্থাৎ মাত্র ১ ভাগ ফ্রেশ ওয়াটার ব্যবহারযোগ্য রয়েছে।  বর্তমানে জলসংকট বলতে এই সুপেয় পানীয় জল সম্পর্কেই বলা হচ্ছে।  
     জলঘাটতি সম্পর্কে এখনই যদি সচেতনতা তৈরি না হয়,  যদি এখনই অপচয় প্রতিরোধ করা না যায়, তাহলে সুদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর জলশূন্য হওয়ার পরিণতি প্রতিরোধ করা নাও সম্ভব হতে পারে।  এটা ঠিক, বর্তমানে বহু দেশই রিসাইক্লিং পদ্ধতি অনুসরণ করে।  কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ ইনফ্রাসট্রাকচারের জন্য (পাইপ লাইনে লিকেজ থাকায় কিংবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায়), মানুষের দায়িত্বহীনতার ফলে  সরবরাহকৃত জলের অনেকটাই নষ্ট হয়।  যেমন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন ৬ বিলিয়ন গ্যালন পরিশোধিত জল পাইপলাইন দিয়ে বেরিয়ে যায়।  বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে কৃষিকাজে, নাগরিক জীবনে শিক্ষাহীনতার কারণে দৈনন্দিন দরকারে নির্বিচারে জলের অপচয় ঘটে।  যার জন্য ভূগর্ভ থেকে বিপুল পরিমাণে জল উত্তোলন করা হয়।  বর্তমানে পৃথিবীতে কৃষিকাজে (সেচকৃষি) ব্যবহৃত হচ্ছে ৭০ শতাংশ জল।  ২০ ভাগ ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন কলকারখানায়।  এছাড়াও বেশিরভাগ থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট জলনির্ভর হওয়ায় উৎপাদন পদ্ধতিতে দরকার হয় প্রচুর পরিমাণে জল।  খরাকবলিত অঞ্চলে যে কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ার  আশংকা ক্রমাগত বাড়ছে। 
     বর্তমানে তীব্র জলসংকটে ভুগছে পৃথিবীর ৩৬টি দেশ।  পরিবর্তিত জলবায়ুতে বৃষ্টির ধরন বদলে যাওয়ায়, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে চলায়,  অতিরিক্ত ব্যবহারে একদিকে বিভিন্ন জলাশয় শুকিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে দ্রুতগতিতে বেড়ে চলা জনসংখ্যার দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে, ফসল উৎপাদন ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলতে অপরিণামদর্শীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মাটির নিচেকার বিশুদ্ধ জল।  পাশাপাশি বাসস্থানের প্রয়োজনে, রাস্তাঘাট নির্মাণে, বিভিন্ন বৈধ-অবৈধ প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট নির্মাণের কাজে ডোবা, পুকুর, নদনদী, খালবিল  ভরাট করা হচ্ছে।  অতএব কৃষিকাজ থেকে শিল্পকলকারখানা, স্যানিটেশন থেকে জীবনের নিত্য প্রয়োজনে জলের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূগর্ভস্থ জলের ওপরেই ক্রমাগত চাপ বাড়ছে।  জলঘাটতির সমস্যা একুশ শতকে তাই সংকটে পরিণত। এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে ভবিষ্যতে।  এ সম্পর্কে ডেনিস সেন্টারের এনার্জি পলিসির ডিরেক্টর এবং ‘অরহুস ইউনির্ভার্সিটির’ প্রফেসর বেঞ্জামিনের মন্তব্য, ২ ‘Unless water use is drastically reduced, severe water shortage will affect the entire Planet. There will be no water by 2040 if we keep doing what we are doing today,’ (www.theworldcounts.com>planet-earth>freshwater. ‘When will the World run out of Water?’ Professor Benjamin K Sovacool,  Aarhus University, Denmark ) .  
     প্রশ্ন হলো, প্রকৃতির পুনর্ব্যবহার পদ্ধতিতে যদি জলাধারগুলোতে নিয়মিত বর্ষা ও বৃষ্টির কারণে এবং তাপমাত্রা বাড়ায় গ্লাশিয়ার গলে যাওয়ায় নতুন করে জলসঞ্চয় ঘটে, তাহলে ভূগর্ভের জল খরচ হলে জলঘাটতি কেন তৈরি হবে? জলঘাটতির কারণ, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় আলট্রা ভায়োলেট রেডিয়েশনে বাষ্পায়িত জলের মহাশূন্যে চলে যাওয়া।  মিষ্টি জলের আধারগুলোর শুকিয়ে যাওয়া।  অধিক জনসংখ্যার কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়া।  এবং  মাটির নিচে নতুনভাবে সঞ্চিত হওয়ার আগেই জলসম্পদ খরচ করে ফেলা।  ৩‘According to a Nasa-led Study, many of the World’s fresh water sources are being drained faster than they are being replenished. Of the World’s major aquifers (gravel and sand-filled underground reservoirs), 21 out of 37 are receding, from India and China to the United States and France. The Ganges Basin in India is depleting, due to population and irrigation demands, by an estimated 6.31 centimeters every year.  Jay Famiglietti, senior water scientist at Nasa, has warned, that the water table is dropping all over the World. There’s not an infinite supply of water,’( timsmedleywriter.com>tech , `Is the World running out of fresh water’ by Tim Smedley, 18th April, 2017).  
     বিজ্ঞানীরা তাই বার বারই হুঁশিয়ারি শোনাচ্ছেন, পৃথিবীতে অন্তহীন জলসম্পদ নেই।  ভূপৃষ্ঠের চাইতে ( নদ-নদী, লেক, পুকুর প্রভৃতি) ভূগর্ভে জলসঞ্চয়ের আধারগুলোর (aquifers) পূর্ণ হয়ে উঠতে অনেক বেশি সময় লাগে।  ভৌগলিক অবস্থানের ভিন্নতার কারণে ঐতিহাসিক কাল ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি কিংবা তরলীভূত বরফজল পৃথিবীর সব অঞ্চলে সঞ্চিত নেই।  এছাড়া বৃষ্টির জল মাটির নিচে প্রবেশের জন্য যে প্রাকৃতিক অবকাঠামোর প্রয়োজন, সেগুলোর বেশিরভাগ মানুষের হাতে হয় ধ্বংস হয়েছে অথবা ধ্বংসের পথে।  অরণ্য, গাছপালা, ছোট ছোট ঝোপঝাড়, সবুজ ঘাসের বিস্তীর্ণ মাঠ বৃষ্টির জল দীর্ঘ সময় আটকে রাখায় জল ধীরে ধীরে ভূগর্ভে প্রবেশের সুযোগ পায়।  কিন্তু অতিমাত্রায় নাগরায়নে, কৃষিজমির সম্প্রসারণে কয়েক যুগ ধরেই এসব প্রাকৃতিক অবকাঠামোগুলোকে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে।  ফলে বৃষ্টির জল ভূগর্ভে যতটা না প্রবেশ করে, তার চাইতে বেশি পরিমাণ গড়িয়ে চলে যায়।  খানিকটা যায় সাগরে।  তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় সিংহভাগটাই বাষ্প হয়ে উড়ে যায়।  ওদিকে গত দুই শতাব্দী ধরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সভ্যতায় নদ-নদীর ব্যবহার বহু গুণ বেড়ে যাওয়ায়, জল দূষিত হওয়ায় এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ায় ভূপৃষ্ঠের বহু জলাশয় দূষিত অথবা নিঃশেষিত।  কিন্তু জনসংখ্যা বিরামহীনই বাড়ছে।  বাড়ছে শিল্পকলকারখানার সংখ্যাও।  নতুন প্রযুক্তিতে উচ্চ ফলনের কৃষিচাষও পৃথিবীর সবখানেই সেচনির্ভর।  অতএব জলসম্পদ  হ্রাস পাচ্ছে। 
     জল কম বেশি বিশ্বের সব দেশেই রয়েছে।  কিন্তু যেখানে পরিমাণের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি, জলসংকট সেখানে মারাত্মক আকার ধারণ করবেই।  কারণ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য অথবা মেডিসিন সরবরাহের মতো পানীয় জল হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে সব ধরনের প্রয়োজন মেটাতে সরবরাহ করা সম্ভব নয়।  এদিকে বিজ্ঞানপ্রযুক্তি সভ্যতায় মানুষের জীবনযাত্রার মানও বেড়েই চলেছে।  জনবিস্ফোরণ নগরায়ন এবং অর্থনীতিকে বড় করায় জলের প্রয়োজন বাড়ছে।  ভূগর্ভে জল থাকার গুরুত্ব বিবেচনা না করেই মানুষ বেহিসেবীভাবে খরচ করে চলেছে জীবনধারণের মূল সম্পদকে।  এমনকি যেসব রাষ্ট্রে এখনও পর্যন্ত প্রচুর লেক কিংবা অন্য জলাশয় রয়েছে, সেখানকার কোনো কোনো অঞ্চলেও দীর্ঘ অনাবৃষ্টির ফলে, নদনদী দূষণের জন্য, ভালো ম্যানেজমেন্টের অভাবে দেখা দিচ্ছে জলাভাব।  যেমন দীর্ঘকাল অনাবৃষ্টির জন্য জলসংকট থাকায় ২০১২-তে যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়নি। জলসম্পদে ধনী ব্রাজিলের ৮৫০টি শহর ২০১৯ থেকে তীব্র জলসংকটে ভুগেছে দুর্বল ম্যানেজমেন্টের কারণে।  আঞ্চলিক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাবও দেশটির উত্তরপশ্চিম অঞ্চলে রয়েছে।  
     তবে নিঃসন্দেহে পরিশুদ্ধ পানীয় জল ও দারিদ্রের কষাঘাতে সবচেয়ে বেশি জর্জরিত আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ।  বিশেষত সাব-সাহারান আফ্রিকায় জলসংকট দীর্ঘ সময়ের।  এমনিতেই অনুর্বরতার কারণে ফসল উৎপাদন কম।  এর ওপর জনসংখ্যার পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধির ফলে  নগরায়ন এখানেই সবচাইতে দ্রুতগতিতে বাড়ছে।  সাহারা মরুভূমি তাতে আরও বেশি বিস্তৃত হচ্ছে।  কৃষিজমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে ক্রমশ।  জনবিস্ফোরণ, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সংঘাত-সংঘর্ষ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব জনজীবনকে আরও অনিরাপদ এবং আরও বেশি বিপর্যস্ত করে তুলছে।  এখানে জল ঘাটতির পরিমাণ ৪০ শতাংশ।  মোট জনসংখ্যার ১৬ পার্সেন্ট এই মহাদেশে বাস করলেও ফ্রেশ জলের পরিমাণ রয়েছে মোট জলের ৯ শতাংশ।  যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে গড়ে প্রতিদিন পরিবার প্রতি একজনের রয়েছে ৫৭৮ লিটার জল, যুক্তরাজ্যে ৩৩৪ লিটার, এশিয়ায় জনপ্রতি ৯৫,  সেখানে পুরো আফ্রিকায় গড়ে প্রতিজনের জন্য রয়েছে ৪৭ লিটার জল ।   
     বিশ্বের সর্বত্রই ব্যবহারযোগ্য জল নিয়ে উদ্বিগ্নতা বাড়ছে।  তবে ইউনাইটেড নেশনস- এর পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, জলসংকটের পরিস্থিতি এখনও পর্যন্ত সবচাইতে বিপজ্জনক অবস্থায় আফ্রিকাতেই রয়েছে।  আফ্রিকায় যে কোনো নদী অথবা লেকের জল দুটো, এমনকি তিন চারটি রাষ্ট্রকেও ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়।  নীল নদের জল ভাগাভাগি নিয়ে সুদান, ইথিওপিয়া-মিশরের নিত্য সংঘাত রোজকার গরম খবর।   ২০২৫ সাল নাগাদ আফ্রিকার আরও ২৫টি দেশ জল ভাগাভাগি নিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।   ৪‘While water stress occurs throughout the World, no region has been more afflicted than Sub-Saharan Africa. The Crisis in Darfur stems in part from disputes over water. The conflict that led to the crisis arose from tensions between nomadic farming Groups who were competing for water and grazing land both increasingly scarce due to the expanding Sahara Desert,’ (www.cfr.org>backgrounder>water- stress-sub-Saharan–‘Water Stress in Sub-Saharan Africa’  backgrounder by Christopher W. Tatlock, August 6, 2006).
     অবশ্য জলসংকটের বিরূপ পরিস্থিতি কোন মহাদেশে কতটা মারাত্মক অবস্থায় রয়েছে কিংবা ভবিষ্যতে কোন অঞ্চলে কতটা ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে মোড় নেবে সে সম্পর্কে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েইছে। ‘Water, Peace, and War: Confronting the Global water crisis’ এবং ‘Water: Asian’s New Battleground’ দুই বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা প্রফেসর ব্রহ্ম চেলানি অনেক বছর আগে থেকেই বলে আসছেন, জলঘাটতি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে ঘনজনবসতিপূর্ণ এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোতে।  জনপ্রতি সবচাইতে অল্প পরিমাণ জল এখানেই রয়েছে।  সম্পতি সেদিকে মনোযোগ আকৃষ্ট হয়েছে ভারতের বাইরের গবেষকদেরও।  এ সম্পর্ক জন গ্রীনবার্গ লিখেছেন, ৫‘Asia’s looming water problems have drawn increasingly attention  in recent years.  A 2016 projection from researchers at the ‘Massachusetts Institute of Technology’ concluded that there is a high risk of severe water stress in densely populated watershed by 2050,’ (www.politifact.com>jan>brahma-chellaney,`Yes, Asia is the most Water-Strapped Continent’ by Jon Greenberg, January 6, 2017).
     আকারে এশিয়া মহাদেশ সবচাইতে বড়।  পৃথিবীর মোট আয়তনের ২৯.৫০ ভাগ।  সমতল ভূমি, মরুভূমি, পাহাড়পর্বত, অজস্র নদ-নদীর পাশাপাশি সাগর মহাসাগরও রয়েছে।  কিন্তু পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশই রয়েছে এই মহাদেশে।  এশিয়ায় গড়ে   (কোথাও সর্বনিম্ন ৫৬৭, কোথাও সর্বোচ্চ ৬০০০) প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস রয়েছে ১১৬০ জনের।  জনবিস্ফোরণের কারণে এই জনবহুল মহাদেশে আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি জলের চাহিদাও অস্বাভাবিক দ্রুততায় বেড়েছে।  পৃথিবীর মোট জলের ৬৫ পার্সেন্ট ব্যবহৃত হওয়ার পরও এখানকার ৩০ শতাংশ মানুষ এরই মধ্যে জলাভাবের মুখোমুখি।  জলসংকট থেকে উত্তরণের উদ্দেশ্যে IIASA-এর ( International Institute for Applied Systems Analysis, অস্ট্রিয়ার লাক্সেনবার্গে অবস্থিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান।  জলবায়ু পরিবর্তিত বিশ্বের সামাজিক, অর্থেনৈতিক, পরিবেশ এবং প্রযুক্তিসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে এখানে গবেষণা করা হয় ) গবেষকেরা নতুন নতুন মডেল উপস্থিত করছেন।  কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান আদৌ সম্ভব হবে কিনা সে ব্যাপারে সংশয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে থেকেই যাচ্ছে।   
     যাই হোক, জলসংকটের চিত্র সর্বত্র সমান নয়।  অঞ্চলভিত্তিক পর্যায়ে বিভিন্ন রকমের।  যেমন দক্ষিণ চীনে জলঘাটতি নেই।  কিন্তু উত্তরাঞ্চল সম্পূর্ণ শুষ্ক।  উত্তরাঞ্চলের আটটি প্রদেশ মারাত্মক জলাভাবে ভুগছে।  তীব জলসংকটে থাকা পৃথিবীর ১৩টি দেশের মধ্যে চীন একটি।  নিয়মিতভাবে এখানে দূষিত জল পান করে ১৯০ মিলিয়ন মানুষ।  ভারতে ফ্রেশ জলের পরিমাণ বিশ্বের মোট ফ্রেশ জলের ৪ শতাংশ।  কিন্তু জনসংখ্যা মোট পপুলেশনের ১৬ ভাগ।  এখানেও জলাভাবের তীব্রতা সব অঞ্চলে সমান নয়।  উত্তরপশ্চিম ভারতে জলাভাবের তীব্রতা যত বেশি, পূর্ব ভারতে সে তুলনায় কম।  অবশ্য শহরাঞ্চলে পানীয় জলের মান গত কয়েক যুগ ধরে উন্নত হয়েছে।  তবে বাস্তবতা হলো,  গ্রামপর্যায়ে এর প্রভাব নেই।  চীন এবং ভারত, এশিয়ার দুই বিশাল রাজ্যেই বিরাট জনসংখ্যার  কারণে জিডিপি বৃদ্ধি ডবল ডিজিটের কাছাকাছি।  আর্থসামাজিক উন্নয়নে ধনী পরিবারের সংখ্যাও বাড়ছে।  অথচ ক্ষয়িষ্ণু নদ-নদী,  হ্রাসপ্রাপ্ত ভূগর্ভের জল ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।  এই পরিস্থিতি ক্রমশ পর্যায়ক্রমে চলতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ দুই দেশেই ফসল উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হবে।  ফলে জিডিপির হারও কমে আসবে কয়েক ডিজিট।  
     নাসার গবেষকরা  ২০০৩  থেকে ২০১৩ অবধি পৃথিবীর ৩৭টি বৃহত্তম জলাধার নিয়ে গবেষণা করেছেন।  তাতে দেখা যাচ্ছে, সিন্ধুনদ অববাহিকা অঞ্চলে ভূগর্ভের জল অতিমাত্রায় সংকুচিত হচ্ছে পাকিস্তানে জনসংখ্যা ঝড়ের বেগে বড় হওয়ার ফলে। শুধু কৃষি উৎপাদনেই এদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে ৮০ শতাংশ জল।  এবং সেখানে নতুন করে জল সঞ্চয়ও হচ্ছে না।  বর্তমান বিশ্বে বেশিরভাগ  দেশেই ধান উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় ভূগর্ভের জল।  বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।  এখানে সম্প্রতিকালে ৪.২ মিলিয়ন হেক্টর জমির  ধান চাষে খরচ করা হচ্ছে ভূগর্ভের জল।  নদনদী, খালবিলের জল ব্যবহৃত হচ্ছে ১.৩ হেক্টর কৃষিজমিতে।  এশিয়া মহাদেশে শুধুমাত্র ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং চীনের উত্তরাঞ্চল মিলে প্রতি বছর ৩৮০ থেকে ৪০০ কিউবিক কিলোমিটার ভূগর্ভের জল ব্যবহার করে।  ফলে মাথাপিছু জলের পরিমাণ কমছে।  সেটা ১০০ বছরে কিভাবে কতটা হ্রাস পেয়েছে বা পাচ্ছে,  তার দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশাল জনসংখ্যার দেশ ভারতের একটি গ্রাফিক চিত্র এখানে সংযোজন করা হলো – 



মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অবস্থাও সঙ্গীন।  অল্পসংখ্যক নদনদী এবং লেক থাকার দরুণ ঐতিহাসিক কাল ধরেই ফ্রেশ জলের উৎস এখানে সীমিত।  নানা রকম পরিবেশগত সমস্যার পাশাপাশি জলসংকটের তীব্রতা তাই প্রবল হচ্ছে।  লোকসংখ্যার কারণে (ক্রমাগত বড় হচ্ছে) কৃষিপণ্য উৎপাদনের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়েছে।  অরণ্য উজাড় করে সম্প্রসারিত হচ্ছে কৃষিজমি।  কিন্তু অনুর্বরতার জন্য মোট জলের ৮৫ শতাংশই ব্যবহৃত হচ্ছে ফসল উৎপাদনে।  অরণ্য ধ্বংস করায় প্রতি বছর অনাবৃষ্টি আর খরার পরিমাণ বাড়ছে।  ওদিকে দুর্বল ম্যানেজমেন্টের কারণে জল অপচয়ের ঘটনা এখানকার নিয়মিত স্বাভাবিক ঘটনা।  যেহেতু সাগরের জল লবণাক্তহীন ((Desalinate) করার ৭০ ভাগ প্রকল্পই (Desalination Plants) এখানে রয়েছে, কাজেই সাগরের জল অফুরন্ত মনে করে প্রয়োজন অতিরিক্ত জল ব্যবহারের অভ্যাস এখানে প্রচুর।  ভূগর্ভের জলও খরচ হচ্ছে বেহিসাবীভাবে।  ইতিমধ্যেই ফ্রেশজলের আধারগুলো ছোট হয়ে গেছে।  খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায়  গ্রামাঞ্চলের মানুষের ওপর জল ব্যবহারে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।  কৃষকের পক্ষে অধিক জল খরচ করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।  অতএব খাদ্য আমদানির পরিমাণও বাড়ছে।  সেই সঙ্গে খরাকবলিত অঞ্চলে বাড়ছে বুভুক্ষু মানুষের সংখ্যা।
     বর্তমান বিশ্বে জলাভাব দূরীকরণে  Desalination Plants -এর ব্যবহার ধীরে ধীরে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলসহ ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছে।  কিন্তু বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন,  সাগরের জল পরিশোধন প্রযুক্তি জলাভাব দূর করার ক্ষেত্রে যতটা না নির্ভরযোগ্য, তার চাইতে অনেক বেশি বিপজ্জনক বিশ্বজলবায়ু সুরক্ষাসহ জীবজগতের নিরাপত্তা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে।  এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে।  সাগর ও পরিবেশ দূষিত হয়ে মেরিন লাইফ এবং অরণ্যবাসী বন্যপ্রাণি ধ্বংস হচ্ছে।  কারণ জল লবণাক্তহীন করার পরে ঘনীভূত জল (বর্জ্য অংশ।  যা অতিমাত্রায় নুন,  অন্যান্য ক্ষতিকর মিনারেল এবং কেমিক্যাল থাকার দরুণ দূষিত ) সমুদ্রে ডাম্প করা হয়।  ফলে প্রতি বছর মারা যায় ৩.৪ বিলিয়ন মাছ।  সাগরের অন্য প্রাণিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  এছাড়া দীর্ঘ অনাবৃষ্টি এবং হিট ওয়েভ সৃষ্টিতেও এই প্রযুক্তির ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। নষ্ট হচ্ছে জমির উর্বরতা শক্তি।  মানবসমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় সংঘাত সংঘর্ষে নিরন্তরই অশান্ত আরববিশ্ব।  সমুদ্রের জলে ‘বোরোন’ থাকায় ( টক্সিক এলিমেন্ট)  তা দীর্ঘদিন পান করায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যায়।  অবশ্য Desalinate প্রোসেসে ৫০ থেকে ৭০ পার্সেন্ট বোরোন সরিয়ে ফেলা হয়।  কিন্তু অবশিষ্ট অনুপাতও যথেষ্ট বিপজ্জনক।  পাকস্থলি, লিভার, কিডনি, ব্রেইনে ইনফেশকনের ঝুঁকি থাকে।  এই কেমিক্যাল ভূগর্ভ, নদ-নদী কিংবা লেকের জলে থাকে না।  অর্থাৎ এই প্রযুক্তি যতটা জলঘাটতি দূরীকরণের সমাধান, তার চাইতে অনেক বেশি  ঝুঁকিপূর্ণ  জগত ও জীবনের সার্বিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে।   
  Desalination Plant-এর ব্যবহার অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় সাগরের জল সবচাইতে বেশি ডিস্যালিনেট করে তেলসম্পদে ধনী দেশগুলো।  যেমন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন প্রভৃতি দেশ।  বিশ্বের মোট ডিসল্টেড জলের ৭৫ শতাংশই ব্যবহৃত হয় মধ্যপ্রাচ্যে।  কোনো নদী না থাকায় সৌদি সরকার একাই করে ২০ পার্সেন্ট।  এর জন্য প্রতিদিন ব্যবহৃত হয় ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি তেল।  কিন্তু তারপরও এখানে অপচয়ের ঘটনা প্রচুর। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিলাসবহুল শহরগুলো, রিসোর্ট, শপিংসেন্টার এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এটাই যেন জাহির করে, জলাভাব এসব ধনী রাষ্ট্রগুলোর জন্য কোনো সমস্যাই নয়।  কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত ত্রিশ বছর ধরে যেভাবে জলের অপব্যবহার হচ্ছে, তাতে একদিকে সাগর শুকোচ্ছে, জল বিষাক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে এই অঞ্চলে প্রতি বছর ভূগর্ভের জল এক মিটার করে নেমে যাচ্ছে।  যেমন, ইয়েমেনে, ইরানে গভীরতম ভূগর্ভ থেকেও এখন জল উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না।  
     এমন পরিস্থিতিতে এখানকার ভবিষ্যত কি আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠবে জলভাগের অধিকার নিয়ে? সৌদি আরব-ইয়েমেন-তুরস্ক-সিরিয়া, ইরান-ইরাক, প্যালেস্টাইন-ইসরায়েলের মধ্যে যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, তার পেছনে কি রাজ্যগুলোর জলনীতির কোনো প্রভাব রয়েছে? কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মধ্যপ্রাচ্যের বিরামহীন অস্থিরতার কারণ এই জিজ্ঞাসার উত্তরেই খুঁজতে চেয়েছেন।  ৬ ‘Access to water is a huge issue across the Middle East, where typically dry conditions, population growth, poor infrastructure and war have strained the little available water – at times sparking unrest. Protests linked to water have broken out in Iraq and Iran, and some experts have linked the Arab Spring uprisings to instability caused by droughts and heat waves,’ (Water Scarcity fuels tension across the Middle East by Linda Givetash, Nov 1, 2018).   
     ইউরোপে প্রতি বছর পানীয় জল হিসেবে,  কৃষিকাজে, কলকারখানাগুলোতে, ট্যুরিজমে এবং অন্যান্য সার্ভিস সেক্টরগুলোতে কোটি কোটি কিউবিক মিটার জল সরবরাহ করা হয়।  আগে মনে করা হতো, যেখানে হাজার হাজার লেক, নদনদী এবং ভূগর্ভে জল রয়েছে সেখানকার জলসম্পদ সীমাহীন।  কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে  ১৯৮০ সাল থেকে অনাবৃষ্টি এবং খরার  কবলে পড়ে এখানকার জলাভাব ধীরে ধীরে মূতির্মান চেহারা নিয়ে দেখা দিচ্ছে।  মোট ইউরোপের ১৭ পার্সেন্ট অঞ্চল বর্তমানে জলসংকটে ভুগছে।  জনসংখ্যার আকার বিশাল  হয়েছে।  নগর সম্প্রসারণ ঘটেছে।  দূষণ বেড়েছে।  অনাবৃষ্টির সাইকেল নিয়মিত দীর্ঘ হচ্ছে।  তারপরও জলের অপচয় থেমে নেই।  ইউরোপীয় ইউনিয়নের এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির কর্মকর্তারা এখানকার ভবিষ্যৎ ভেবে উদ্বিগ্ন রীতিমতো।  বলেছেন, জলের ব্যবহার এমন অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় চলতে থাকলে এখানকার অর্থনীতি, সার্বিক উন্নয়ন এবং ইকোসিস্টেম মারাত্মক সংকটের মধ্যে পড়বে।
     ফ্রেশ জলের পরিমাণ সবচাইতে বেশি ব্রাজিলে।  ৮,২৩৩ কিউবিক কিলোমিটার।  পৃথিবীর মোট জলের ১২.৪ শতাংশ।  জীববৈচিত্র্যের লীলাভূমি আমাজনের ৬০ শতাংশ বিস্তৃত এর উত্তরপশ্চিম অঞ্চল জুড়ে।  হাজার হাজার নদনদী ব্রাজিলের ৭০ শতাংশ ফ্রেশ জলের উৎস।  যুগ যুগ ধরে তাই বিশ্বাস ছিল, জলসম্পদে আর্শীর্বাদপুষ্ট ব্রাজিলকে জলাভাবের মুখোমুখি কোনোদিনই হতে হবে না।  কিন্তু অতি অপচয়ের কারণ এবং বদলে যাওয়া জলবায়ু ব্রাজিলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষিজমিকে অনুর্বর করে তুলছে।  শীর্ণ হয়ে আসছে সেখানকার জলাধারগুলো।  জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবেশ দূষণ, মাত্রাতিরিক্ত খরচ এবং ড্রিস্ট্রিবিউশনের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় কৃষিকাজে তো বটেই, দৈনন্দিন জীবনেও আণ্ডারগ্রাউণ্ডের জল ব্যবহার অবৈধভাবে বহু অঞ্চলে বেড়ে গিয়েছে।  জলের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় বেশি থাকা সত্ত্বেও এখানকার অঞ্চল বিশেষেও দেখা দিচ্ছে জলাভাব।  তৈরি হচ্ছে মরুকরণ। ইন্দোনেশিয়ায় দ্রুত জনসংখ্যা বাড়ায় জলের পরিমাণ এবং চাহিদার মধ্যে গ্যাপ বাড়ছে দ্রুত। কারণ কৃষি সম্প্রসারণের ফলে এখানে ৮০ পার্সেন্টেরও বেশি জল ব্যবহৃত হচ্ছে ইরিগেশনে। 
     গত ১০০ বছরে, ১৯০০ থেকে  ২০০০-এর মধ্যে ফ্রেশ জল ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েছে সাত গুণ।  এই সময়ের মধ্যে গোটা পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি নদ-নদী, লেক, পুকুর, বিল-ঝিল বিলুপ্ত হয়েছে।  নিশ্চিহ্ন হয়েছে মিষ্টি জলের প্রাণিকুল।  ফ্রেশ জলের সিংহভাগই ব্যবহৃত হচ্ছে ইরিগেশনে (৭০%, বিভিন্ন ধরনের ফলমূল, শাকসব্জি,  ধান, গম, ভুট্টা, তুলো ইত্যাদি কয়েক গুণ উৎপাদনের কাজে)।  কোন ফসলে কতটা জল ব্যবহৃত হচ্ছে, পৃথিবীর কয়েকটি বড় দেশের চার্ট উপস্থাপন করে সেটি দেখানো হলো - 

জীবের সুস্থতার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য, খাদ্য উৎপাদনের জন্য ফ্রেশ জলের প্রয়োজনীয়তা তুলনাহীন। পৃথিবীর ইকোসিস্টেম নিয়ন্ত্রণেও ফ্রেশ জলের ভূমিকা অপরিসীম।  তাই একুশ শতকের পৃথিবীতে বিশ্বব্যাপি জলসংকটের সমস্যা ইতোমধ্যে ঘনীভূত হওয়ায় জলসম্পদের বণ্টন এবং ব্যবহারের পরিমাণ নিয়ে গবেষকদের উৎকণ্ঠা বাড়ছেই।  কারণ সব মহাদেশেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।  হিট ওয়েভ ও অনাবৃষ্টির দরুণ মরুকরণের চিহ্ন ফুটে উঠছে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে।  জলের পরিমাণ এবং চাহিদার মধ্যে গ্যাপ বাড়ছে নিয়মিত।  বর্তমানে বিশ্বের ১১০ কোটির বেশি মানুষ জলকষ্টে ভুগছে।  ২০৩০ সাল নাগাদ সৃষ্টি হবে ৬৫ শতাংশ গ্যাপ।  অথচ জলাভাবের সুযোগ নিয়ে এখনও জলকে ব্যবসায়িক উন্নয়নের মধ্যে রেখে আরও বেশি জলের অপচয় করা হচ্ছে (যেমন ফ্যাক্টরিতে জলের বোতল তৈরি করার কাজে, সুইমিং পুলে জলের অপব্যবহারে, শাওয়ারে অতিরিক্ত জল খরচা করে)।  বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন, জলকে জীবন ধারণের অমূল্য উপাদান হিসেবে উপলব্ধি করার চরম মুহূর্ত এখন উপস্থিত।  কাজেই  যে কোনো দেশের পরিকল্পনাবিদ থেকে নীতিনির্ধারক, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংঘবদ্ধ হয়ে  সুপরিকল্পিত নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন। 
     জলসংকট থেকে উত্তরণের উদ্দেশ্যে ২০১০-এর ২২শে মার্চ থাইল্যাণ্ডে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘বিশ্ব জলদিবস’।  এই অধিবেশনে বিশ্বের ৮০টি দেশের বিশেষজ্ঞরা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এগুলো হলো, (১) কঠোরভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ।  (২)  কিভাবে, কত পরিমাণ জল খরচ করা উচিৎ সে সম্বন্ধে সাধারণ মানুষকে শিক্ষা দান।  (৩) বৃষ্টির জল ধরে রাখতে প্রচুর জলাধার তৈরি করা।  (৪) ফ্রেশ জলের উৎসগুলো (নদনদী, লেক, পুকুর, খাল ইত্যাদি) যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা।  (৫) জলাশয় দূষণমুক্ত রাখা। (৬) শিল্পকারখানায় জলের ব্যবহার কমিয়ে আনা।  (৭) বিভিন্ন পাওয়ার প্ল্যান্টে জলের ব্যবহার সীমিত করা।  (৮) ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন।  (৯) কৃষিক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন।  (১০) অল্প জল প্রয়োজন হয় এবং সাগর জলে উৎপাদন সম্ভব হয় এমন ফসল আবিষ্কার।  (১১) দুর্বল এবং ত্রুটিপূর্ণ ইনফ্রাসট্রাকচারের উন্নয়ন সাধন (যাতে পাইপলাইনে লিকেজ না থাকে।  স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করে)।  (১২) জল ব্যবহারে সর্বত্র রিসাইকেল পদ্ধতি অনুসরণ করা।  (১৩) যেসব কারণে জলবায়ু পরিবর্তিত হয় তাদের বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা।  (১৪) ভূগর্ভে জলের স্তর যাতে নিচে নেমে না যায় সেটা নিয়মিত মনিটর করা। 
     প্রত্যাশাবাদীদের আশা, এগুলো অনুসরিত হলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি মানুষ সামাল দিতে সক্ষম হবে।  কারণ চ্যালেঞ্জের ব্যাপারে ইতোমধ্যে সচেতনতা শুরু করেছে।  যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফ্রেশ জলের পরিবর্তে বর্জ্যজলের ব্যবহার শুরু হয়েছে।  যেসব অঞ্চল শুষ্ক, সেখানে জলসঞ্চয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।  ভূগর্ভে জল কতটা রয়েছে সেটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।  সমুদ্রের জল ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ছে।  কিন্তু এতসব আশাবাদিতার পরেও যে দুটো কারণ (জনসংখ্যা বিস্ফোরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন ) পৃথিবীকে তৃষ্ণাময় ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তার সমাধান আদৌ নিশ্চিত করা যাবে কিনা, তার উত্তর এখনও পর্যন্ত বিশেষজ্ঞদের অজানাই রয়ে গেছে।           

দীপিকা ঘোষ ওহাইয়ো, যুক্তরাষ্ট্র