অটোয়া, মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর, ২০২০
কথা সাহিত্যে সুন্দরবন - ডঃ সুবীর মণ্ডল

লে-জঙ্গলে রোমাঞ্চে ভরা সুন্দর – এটা পৃথিবীর সবচাইতে বড় ব-দ্বীপ। ‘সুন্দরী গাছ’ বা সমুদ্রবনের অপভ্রংশে – ‘সুন্দরবন’। প্রাচীনকালে বলা হত ‘আঙ্গিরীয়’ বন। বিবর্তনের বহু পথ ঘুরে কবে যে সেটা ‘সুন্দরবন’ হল, সঠিক করে বলা যায় না। বন বা অরণ্যের চিন্তা জড়িত সুন্দরবন নামক শব্দটির সঙ্গে। সুন্দরী গাছের নাম থেকেই নাকি সুন্দরবন এমন কথাও গবেষকরা বলে থাকেন। এক সময় যা ছিল অরণ্য, আজ তা কেটে অনেকটাই জনপদ। অরণ্যকে জনপদে রূপান্তরিত করেছে মানুষ। অরণ্যের নামেই সেই জনপদের নাম। এই জনপদেই হচ্ছে আজকের সুন্দরবন। সুন্দরবনে অরণ্য আর জনপদ পাশাপাশি। তাকে বিচ্ছিন্ন করেছে জল। নোনাজল। মাকড়সার জালের মতো সরু-মোটা নদী-খাঁড়ি বেয়ে নোনাজল জনপদ অরণ্য ঘুরে শেষে সমুদ্রে। সুন্দরবন শেষ হয়েছে সমুদ্রে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যা ‘পূর্ব সমুদ্র, যা বঙ্গোপসাগর। যার তটভূমিতে কোথাও গ্রাম, কোথাও বন। জোয়ার-ভাঁটায় আন্দোলিত সুন্দরবনের তট, দ্বীপভূমি সেখানে বেঁচে থাকার নিয়ত সংগ্রাম মানুষের। সঙ্গী ধর্মীয় বিশ্বাস-সংস্কার। সঙ্গী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিচিত্র উদ্ভিদ-প্রাণীজগৎ, ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বাঁধভাঙ্গা বন্যা, জলের নীচে কুমীর, কামোট, মাটির নীচে লুপ্ত সভ্যতা, ঐতিহাসিক-ভৌগোলিক প্রাচীন গরিমা, লোকায়ত বিশিষ্ট আঙ্গিক, আঞ্চলিক ভাষা-কৃষ্টি-সমাজ-অর্থনীতি, এক কালের আলাদা পরগণা, তারও আগে মহাকাব্যিক অবস্থান, এইসব নিয়েই আজ সুন্দরবন। এপার-ওপারের সুন্দরবন। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ প্রান্তের মানচিত্রটি যেন একটি বড় নারকেল পাতার বর্ণময় আলপনা। বঙ্গোপসাগরের সুনীল জলধারা দিয়ে এই ভূখণ্ডটির নদী বা জলপথগুলো পুষ্ট। নদনদী মোহনার কাছাকাছি এসে যেন সাগরের বৈভব নিয়ে বহমান, স্থলভাগের অধিকাংশই বনাঙ্গনে ছাওয়া আর বাকিটুকু নোনা জলের কাদামাখা সমতল ভূমি। ষড় ঋতুতে সুন্দরবনের মায়াবী প্রকৃতির রূপও বারে বারে বদলায়। এই রহস্যময় অরণ্যের বাইরেও থেকে গেছে এক বিস্তৃত জন-অরণ্যের পৃথক রাজ্যপাট। 

ভারতীয় সুন্দরবন অংশে মোট দ্বীপের সংখ্যা ১০২টি। তার মধ্যে মানুষ বাস করে ৫৪টি দ্বীপে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও উত্তর ২৪ পরগনার মোট (১৩+৬) = ১৯টি ব্লক নিয়ে সুন্দরবনের জনবসতি। মোট কৃষি জমির পরিমাণ ৪৫১৪.২৬ বর্গকিলোমিটার। মোট ৯৬৩০ বর্গ কিমিতে সীমায়িত ভারতীয় সুন্দরবন। ১৮৭টি গ্রাম পঞ্চায়েত, মোট গ্রামের সংখ্যা ১০৯৩, নদীবাঁধ ৩৫০০ কিমি, উত্তর ২৪ পরগনায় অবস্থিত সুন্দরবন অধ্যুষিত ৬টি ব্লক হল (১) হিঙ্গলগঞ্জ (২) সন্দেশখালি-১ (৩) সন্দেশখালি-২ (৪) বসিরহাট-১ (৫) মিনাখা (৬) হাসনাবাদ। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় অবস্থিত সুন্দরবনের ১৩টি ব্লক হল (১) কাকদ্বীপ (২) সাগর (৩) নামখানা (৪) পাথরপ্রতিমা (৫) মথুরাপুর-১ (৬) মথুরাপুর-২ (৭) কুলতলী (৮) জয়নগর-১ (৯) জয়নগর-২ (১০) ক্যানিং-১ (১১) ক্যানিং-২ (১২) বাসন্তী (১৩) গোসাবা। ২০১১ এর লোক গণনা অনুসারে মোট জনসংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ (৫০০০০০০)।

বাংলা কথাসাহিত্যে কোনও বিশেষ অঞ্চলের জনজীবন, সংস্কার, বিশ্বাস, সামাজিক-রীতিনীতি, জীবনসংগ্রাম ও বৃত্তিকেন্দ্রিক জীবনের কথা এসেছে অনেক পরে। আসলে একটু একটু করে জীবনমুখী হতে হতেই লেখকেরা বিশেষ অঞ্চল বা জনপদকে গল্প-উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে নির্বাচন করেন। কথাসাহিত্যের সূচনাপর্বে নগরই গুরুত্ব পেয়েছে বেশি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কথাসাহিত্যর বিষয় ও পটভূমি পালটে যায়। ত্রিশের দশক থেকে বাংলা কথাসাহিত্যে ঘটল ভৌগোলিক বিস্তৃতি। সময়ের দাবিতে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বাংলা কথাসাহিত্যে এল জলজঙ্গলময় সুন্দরবন অঞ্চল। কথাসাহিত্যে উপজীব্য হল এই প্রত্যন্ত এলাকার জনজীবন যা, বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে ছিল একেবারে অপরিচিত। এক বিচিত্র সংগ্রামী জীবনের স্রোত এখানে বয়ে চলে। জীবনসংগ্রাম এখানে বড় কঠিন। ঐতিহ্য পরম্পরা লোকসাহিত্য, মঙ্গলকাব্যে সুন্দরবন যতটা বাঙ্ময় হয়ে উঠেছিল, ততটা আধুনিক কথাসাহিত্যে বাঙ্ময় হয়ে প্রথমদিকে উঠতে পারেনি। তবে পরবর্তীকালে কথাসাহিত্যে সুন্দরবন গুরুত্ব পেতে লাগল। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে আজকের তরুণ প্রজন্মের কথাসাহিত্যিকদের হাত ধরে সুন্দরবন পটভূমি হিসেবে ছোটগল্প ও উপন্যাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। সাম্প্রতিক কালের কথাসাহিত্যে ধরা পড়েছে সুন্দরবনের মানুষ ও প্রকৃতি। এমনকি ইংরাজি সাহিত্যেও ক্রমশঃ জায়গা করে নিচ্ছে সুন্দরবন। বর্তমানে বহু গবেষকের চোখে এই জনপদ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বঙ্কিমচন্দ্র যে একেবারেই সুন্দরবনের কথা বলেননি এমন নয়। তাঁর ‘লোকরহস্য’-এর অন্তর্গত “ব্যাঘ্রাচার্য বৃহল্লাঙ্গুলা” এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য। ‘কপালকুণ্ডলা’তেও এসেছে সুন্দরবনের প্রসঙ্গ। ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘ডমরুচরিত’-এ সুন্দরবন নিয়ে মজলিশি গল্প শুনতে পাই ডমরু ধরের মুখে। শিবনাথ শাস্ত্রীও শুনিয়ে গেছেন সুন্দরবনের বাঘের গল্প। যোগীন্দ্রনাথ সরকার সংকলিত ‘বনেজঙ্গলে’ তে সুন্দরবনের যেসব গল্প আছে, তা অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক। হেমেন্দ্র কুমার রায় একজন বর্ণময় সাহিত্যিক, যাঁর হাতে সুন্দরবন অন্য রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। তাঁর অমর সৃষ্টি “সুন্দরবনের রক্ত পাগল”, “সুন্দরবনের মানুষ বাঘ”।   

বিশ্বকবি সমগ্র বিশ্ব ও ভারতে পরিভ্রমণ করেছেন, কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের কথা হল ঘরের কাছে সুন্দরবনের মায়াবী অরণ্যের হাতছানি তাঁকে মুগ্ধ করতে পারেনি। রবীন্দ্র সাহিত্যে তাই সুন্দরবন একটা অধরা পটভূমি। সুন্দরবনের গোসাবাতে তিনি হ্যামিল্টন সাহেবের আমন্ত্রণে ১৯৩২ সালে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুন্দরবনের পটভূমিতে একটি গল্পও তিনি লেখেননি। শুধু বলে গেছেন নিজের মুখে “আমি যে ওদের ভাষা জানিনা, না হলে আমিই লিখতাম”। রবীন্দ্রনাথের এই নীরবতা সুন্দরবন সম্পর্কে, যা বর্তমানকালের সাহিত্য পাঠককে ব্যথিত করে বলে আমার মনে হয়েছে। রবীন্দ্রসাহিত্যে সুন্দরবন একেবারেই ব্রাত্য, এটা মন থেকে মেনে নেওয়া খুব কষ্টকর। তাঁর চোখে সুন্দরবন কেমন রূপ লাভ করত তা বাঙালী পাঠক কোনোদিন জানতে পারবে না, এটা খুবই পরিতাপের বিষয়। রবীন্দ্রোত্তর শরৎচন্দ্র শ্রীকান্তের প্রথম পর্বে মেজদার মুখে শুধু “দি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের” কথা বসিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন। তবে কথাসাহিত্যিক রাজশেখর বসু সুন্দরবনের দিকে চোখ মেলে তাকিয়েছেন তাঁর ‘দক্ষিণরায়’ সুন্দরবনের পটভূমিকায় লেখা অনবদ্য গল্প।

বিভূতিভূষণের কথাসাহিত্যে নিশ্চিন্দিপুর, পাঁচপোতা, টাকি, শ্রীপুর, নকীপুর প্রভৃতি এলাকার কথা এসেছে। সুন্দরবনের কথা সাহিত্যে বসিরহাট, হাসনাবাদ, সন্দেশখালি, আতাপুর, ন্যাজাট, আমতলি, গোসবা, রাঙ্গাবেলিয়া, দয়াপুর, লাহেড়ীপুর প্রভৃতি অঞ্চলের পাশে আমরা পেয়েছি সুন্দরবনের রজত জুবলি, রমাপুর, রামপুর, কচুখালি, ভাঙ্গাতুষখালি, সাগর কাকদ্বীপ, পিয়ালি, কুলতলি, বালি, বিজয়নগর প্রভৃতি অঞ্চলের জনজীবনের বর্ণময় কথা। তাঁর ‘ইছামতী’ উপন্যাসে সুন্দরবনের সামাণ্য ছোঁয়া পাই। সুন্দরবনের অসামাণ্য রূপকার হলেন মনোজ বসু। তাঁর ‘জলজঙ্গল’, ‘বনকেটে বসত’, উপন্যাস দুটি সুন্দরবনের সংগ্রামী মানুষের জীবন পাঁচালি, বৃত্তিকেন্দ্রীক জীবনের বিশ্বস্ত দলিল। কথাসাহিত্যিক মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা সুন্দরবন কেন্দ্রীক উপন্যাস হল “হলুদ নদী সবুজ বন” সুন্দরবনের বিভিন্ন জনপদ বার বার উপন্যাসে ও ছোটগল্পে নানান আঙ্গিকে ব্যবহৃত হয়েছে। গোসবা, ন্যাজাট, সাতজেলিয়া, লাহিড়ীপুর, বাসন্তী, পাথর প্রতিমা, জয়নগর, ক্যানিং, কাকদ্বীপ, ফেজারগঞ্জ, সাগরদ্বীপ, হিঙ্গলগঞ্জ, হাসনাবাদ, বরুণহাট, যোগেশগঞ্জ, কুমিরমারী, হেমনগর, গোসবার বিধবাপল্লী, ছোট মোল্লাখালি ইত্যাদি জনপদ থেকে কথাসাহিত্যিকরা লেখার প্রচুর উপাদান সংগ্রহ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে বর্ণময় শক্তিমান ব্যক্তিত্ব হলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। তিনি সুন্দরবনমনস্ক ছোট গল্পকার। তাঁর ‘সাগরসঙ্গম’, ‘অরণ্যপথ’ গল্প দুটি সুন্দরবনের পটভূমিতে লেখা। আশাপূর্ণা দেবীর ‘হঠাৎ দোলা’ গল্পটি সুন্দরবনের এক মধুর স্মৃতিচারণ। সমরেশ বসু শুধু নাগরিক জীবনের লেখক নন। তাঁর চোখে সুন্দরবনের মায়াবী প্রকৃতি ও জনজীবন অন্য মাত্রা পেয়েছে। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস ‘গঙ্গা’র পটভূমি সুন্দরবনের মৎস্যজীবীদের নিয়ে। সুন্দরবন কেন্দ্রীক বাংলা কথাসাহিত্যে ক্লান্তিহীন জীবন শিল্পী হলেন শক্তিপদ রাজগুরু। দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের নানান দ্বীপে দ্বীপে তিনি ঘুরেছেন এবং দেখেছেন ওখানকার জনজীবন, মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তিনি তাঁর গল্পে বলতে চেয়েছেন – “সুন্দরবনের মানুষেরা বাঁচে অন্যভাবে – তাঁদের মধ্যে আছে বাঁচার একটা নগ্ন প্রচেষ্টা”। তাঁর লেখা ‘গহনবন গহীনগাছ’, ‘নোনাগাঙ’, ‘অবিচার’, ‘অমানুষ’, ‘দন্ডক থেকে মরিচঝাঁপি’, ‘আঘাত’ ইত্যাদি উপন্যাসে আছে বাদাবনের মানুষের সংগ্রামী জীবনের কথা। সুন্দরবনের উপেক্ষিত, বঞ্চিত, শোষিত জেলেদের জীবন তাঁর হাতে শিল্পরূপ পেয়েছে। তাঁর “আঠারো ভাটির মা” ও শরৎ গুনিন অবিস্মরণীয় ছোটগল্প।     

সুন্দরবনের বাদা অঞ্চলের অন্যতম রূপকার হলেন বরেন গঙ্গোপাধ্যায়। দীর্ঘদিন তিনি সুন্দরবনে শিক্ষকতা করেছিলেন জীবন ও জীবিকার তাগিদায়। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে তাই তিনি লিখতে পেরেছিলেন সুন্দরবন কেন্দ্রীক একাধিক উপন্যাস ও ছোটগল্প। “বনবিবির উপাখ্যানে” সুন্দরবনের মানব ইতিহাস, জনজীবন, আরণ্যক পরিবেশ, মানুষের সংস্কার ও লোকবিশ্বাস প্রতিফলিত হয়েছে অসাধারণভাবে, তাঁর “বাগদা” সুন্দরবনের জলকরের পটভূমিতে লেখা অবিস্মরণীয় উপন্যাস। সদ্য প্রয়াত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে “সুন্দরবন” অন্য মাত্রা লাভ করেছে। তাঁর অবিস্মরণঈয় সৃষ্টি “জল জঙ্গলের কাব্য” আজও পাঠককে মুগ্ধ করে। সুন্দরবনের জনজীবনের ছবি অংকনে আব্দুল জব্বারের তুলনা হয়না। তাঁর “বাঘের খোঁজে” উপন্যাসে সুন্দরবনের মানুষের এক বিচিত্র নেশার সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর স্মরণীয় সৃষ্টি “সাগর দ্বীপের মহাজন” ও “জয়নগরের মোয়া”। এই অঞ্চলের কথ্যভাষার উপস্থাপনার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ ভারতের নানান জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে সুন্দরবনে চলে যান। সুন্দরবনের পটভূমিতে লেখা তাঁর “জোয়ার”, “বনবিবির বনে” দুটি ভিন্ন স্বাদের ছোটগল্প। বর্তমানে বহু তরুণ কথাসাহিত্যিক ছোটদের জন্য সুন্দরবনকেন্দ্রিক ছোটগল্প লিখেছেন এবং লিখে চলেছেন। তরুণ শক্তিমান ছোটগল্পকার অধ্যাপক প্রণব সরকার, ডঃ সোহরব হোসেন থেকে ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়, উৎপলেন্দু মণ্ডল, তাপস দাশ, মনোজ দাশ, ডঃ সুভাষ মিস্ত্রী, গোবিন্দ সরকার, ডঃ কুমুদ নস্কর, পূর্ণেন্দু ঘোষ, সাত্যকী হালদার, অজিত বাইরি, কল্যাণ মণ্ডল, ডঃ শঙ্কর প্রামাণিক, ডঃ তৃপ্তি ব্রহ্ম, ডঃ কালীচরণ কর্মকার, প্রণব সরকার সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। তাঁদের ভাষায় ও কলমে নোনাজল আর সুন্দরী-গরানের গন্ধ। প্রকৃতি বনাম মানুষের সংগ্রাম গুরুত্ব পেয়েছে এইসব লেখক ও গবেষকদের লেখনীতে। সুন্দরবনের জঙ্গল হাসিল হয়েছিল কয়েকজন বিদেশিদের প্রচেষ্টায়। ফ্রেজার সাহেব তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ফ্রেজার সাহেবের জঙ্গল হাসিলের পটভূমিতে লেখা শচীন দাসের অনবদ্য উপন্যাস “অরণ্য পর্ব”। কথাসাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব সত্তর দশকে। সুন্দরবনের নানা গণ আন্দোদল হয়েছিল। তেভাগা গণ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সুন্দরবনের পটভূমিতে লেখা শিশির দাসের অসামাণ্য উপন্যাস “শৃঙ্খলিত মৃত্তিকা” এছাড়া সুন্দরবনের কৃষক আন্দোলনের এক বিশ্বস্ত দলিল শংকর বসুর “টঙ” গল্পটি। 

সময়ের পালাবদলে সুন্দরবনের কথাসাহিত্যের বিষয়বস্তু একেবারে বদলে যায়নি। কিছু কিছু ভাবনার নব সংযোজন হয়েছে সময়ের দাবিতে। সুন্দরবনের অত্যাচারিত ও শোষিত মানুষের প্রতিদিনের জীবনখানি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি হলেন জনপ্রিয় ছোটগল্পকার সাধন চট্টোপাধ্যায়। স্বাদে ও বৈচিত্র্যে তাঁর ছোটগল্প অনন্য। তাঁর “গহীনগাঙ” গোসাবার জেলে জীবনকে নিয়ে লেখা। “কুমীর” চিংড়ী তাঁর জনপ্রিয় ছোটগল্প। সুন্দরবনের প্রান্তিক সমৃদ্ধ একটি জনপদ হল কুমীরমারি। এই গ্রামের পটভূমিতে লেখা তাঁর বড় গল্প হল “নাগপাশ” যা পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। ওপার বাংলার প্রবাদপ্রতীম আলমাহমুদ-এর সুন্দরবনকেন্দ্রিক ধ্রুপদী গল্প “জলবেশ্যা” বর্তমানে আন্তর্জাতিক ছবির মর্যাদা পেতে চলেছে। কারণ চলচ্চিত্রায়িত হচ্ছে এই অসামাণ্য গল্পটি। গল্পের পটভূমি এক নদী থেকে বেরোনো অসংখ্য খাড়ির মধ্যে এক স্থায়ী চর। সেখানে মাসে কয়েক দিন এক বিশাল মশলার হাট বা বাজার বসে। হোলসেল মার্কেট। নানান বড় বড় ব্যবাসায়ী এখানে ব্যবসা করতে আসে। এই গল্পে কেন্দ্রিয় চরিত্র এক বেদেনি বেউলা সুন্দরী। সে বিভিন্ন ব্যাপারীকে রূপের মোহে টেনে আনে তার নৌকায়। বিষ দাঁত ভাঙা এক কালনাগিনী সাপ দিয়ে সে ব্যবসায়ীদের ভয় দেখিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাকে নৌকা থেকে ডাঙ্গায় নামিয়ে দেয়। বর্তমানে বহু ইংরাজি উপন্যাসিক পটভূমি হিসাবে সুন্দরবনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের অন্যতম অমিতাভ ঘোষের “হাংরি টাইড” অর্থাৎ “ক্ষুধার্ত স্রোত” উপন্যাসটি সুন্দরবনের পটভূমিতে লেখা বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় সাড়া জাগানো ইংরাজী উপন্যাস।   

প্রণব সরকারের “পাহারাদার”, “চরা” দুটি ছোটোগল্প সুন্দরবনের সংগ্রামরত মানুষের জীবন নিয়ে রচিত। সুন্দরবনকেন্দ্রিক কথসাহিত্যে কখনও এসেছে গতানুগতিক বিষয়, কখনও এসেছে বিষয় বৈচিত্র্য, যেমন মৃণাল গুহ ঠাকুরতা এনেছেন এক সারেঙ জীবন (জল শুধু জল উপন্যাসে)। শক্তিমান তরুণ গল্পকার স্বপ্নময় চক্রবর্তীর “সর্ষে ছোলা ময়দা আটায়” গল্পে সুন্দরবনের মানুষের জীবনসংগ্রামের কথা গুরুত্ব পেয়েছে। বিশিষ্ট সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সুন্দরবনের জার্নাল’ ও ‘নীলুদার বেগম’ নীলুর সুন্দরবন লেখা দুটি অনবদ্য। তরুণ প্রজন্মের লেখকরাও লিটিল ম্যাগাজিন ও চলচ্চিত্র এবং টেলিফিল্মে নির্জনদ্বীপ সুন্দরবনকে অন্যরূপে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। আমানুষ, আনন্দ আশ্রম, বান্ধবী, অদ্বিতীয়া, নির্জনদ্বীপ, জালসন্নাসী এই সমস্ত চলচ্চিত্র সবই সুন্দরবনকেন্দ্রিক। আয়লা পরবর্তী সুন্দরবনের ছোটগল্পগুলি নতুন রূপ লাভ করেছে। এই সমস্ত ছোটগল্পে সুন্দরবনের বিপন্ন মানুষের স্বপ্নভঙ্গের করুণ ইতিহাস এবং তাঁদের ঘুরে দাঁড়ানোর কাহিনী বিশেষ করে গুরুত্ব লাভ করেছে। বর্তমান সময়ে সুন্দরবনের প্রকৃতি এবং মানুষকে নিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন ছোটগল্প রচিত হয়েছে। এদের মধ্যে শক্তিমান দুজন ছোটগল্পকার হলেন তাপস দাস ও মনোজ দাশ। তাপস দাসের “মউলে” এই গল্পে সুন্দরবনকে আমরা যেভাবে পাই ‘তখনো চাঁদ উঠেনি। রায়মঙ্গলের ঢেউ ভাঙ্গছে ভেড়িতে। বুদবুদ ছড়িয়ে পড়ছে ফেনায়, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। খসখস শব্দে মাটি খসে পড়ছে স্রোতে। সাবিত্রী দাঁড়িয়ে একা। একটু পরেই চাঁদ উঠবে রায়মঙ্গলের আকাশে। মাঝ আকাশ থেকে একটু পূবে ঢলে সামসেননগরের উপরে। বুদ্ধপূর্ণিমার আর কটা দিন বাকি। সাবিত্রী সেদিকে তাকিয়ে। গোধূলীর আলো-আধাঁরিতে সুন্দরবন ঘন কালো রেখার মতো দিকচক্রবাল জুড়ে পূর্বে সুন্দরবন, দক্ষিণেও। গা ছমছম করে উঠে সাবিত্রীর। দক্ষিণে যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে থাকে সে’। মনোজ দাসের পাতাঝরার দিন নামক ছোটগল্পে আমরা সুন্দরবনকে পাই এভাবেই ‘কথাটা ভাললাগল তমালকান্তির। পাঠাগার গড়ে তোলা, বাড়িতে ছোটখাটো সংগ্রহশালা তৈরি করা একটা সময় মানুষের নেশা ছিল। এখন এসব সামাজিক নেশার মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন মানুষ নিজেকে নিয়ে, নিজের জাগতিক সুখের পিছনে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। সমষ্টির কথা ভাবে না। কিন্তু একটি মানুষ সুন্দরবনের এই অজগ্রামে বসে সমাজের জন্য চিন্তা করছেন, এটা দেখে ভালোলাগল তমালকান্তির’। আলোচ্য গল্পে সুন্দরবনের আরো একটা রূপ তিনি এইভাবে তুলে ধরেছেন। ‘সিদ্ধার্থ চোখ ফেরাল না। নদীটা এখানে খুব বিস্তৃত। অস্তগামী সূর্যের ম্লান রশ্মি এসে পড়েছে সেই দূরবিস্তারী নদীর জলে। সিদ্ধার্থ নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল সেইদিকে’। উৎপলেন্দু মণ্ডলের “সুমনের ভারতবর্ষ” ‘কাঁকড়া’, মনোজ দাশের ‘পাতা ঝরার দিন’ ছোটগল্পগুলি খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। শক্তিমান কথাসাহিত্যিকদের কলমে সুন্দরবনের মানুষ এবং সংস্কৃতি নবরূপে গুরুত্ব লাভ করবে এ বিশ্বাস আমরা করতে পারি। সুন্দরবনের মাটি ও মানুষকে কেন্দ্র করে বহ্য সাহিত্য রচিত হবেই কারণ অনন্য তার ভৌগোলিক পরিবেশ ও মানুষের অনন্য জীবন-সংগ্রাম। 

সুন্দরবনের ইতিহাস-বিদ্রোহ-সাহিত্য-প্রকৃতি-পরিবেশ, ধর্ম-ভাষা-জীবমণ্ডল, নদনদী জীবন ও জীবন-সংগ্রাম, যা সতত অরণ্যের মত গহনব্যাপক এবং রোমাঞ্চকর। এই জনপদ কথাসাহিত্যের পটভূমি হিসাবে বিবেচিত হওয়ার জোরালো দাবি রাখে। সুন্দরবনে স্থায়ীভাবে বাস করে সাহিত্য চর্চা করেন এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়, এঁদের মধ্যে অনেকে ইতিমধ্যে খ্যাতিমান সাহিত্যিক হয়ে উঠেছেন। তবে এই মুহূর্তে খ্যাতি-অখ্যাতির প্রসঙ্গটা বৃত্তের বাইরে রেখে আমরা দেখতে পাই সুন্দরবন কেন্দ্রিক কথাসাহিত্যের নিরবচ্ছিন্ন চর্চায় নতুন জোয়ার এসেছে। একথা বলতে পারি সুন্দরবনে সাহিত্যচর্চায় ক্লান্তি অবসাদ সংক্রামিত হয়নি। চর্চা অনুশীলনের স্রোত অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এটাই আগামী দিনের শুভ সংকেত। কথা সাহিত্যের মানচিত্রে সুন্দরবন আজ উপেক্ষিত জনপদ নয়, আমি আশাবাদী শক্তিমান বর্তমান তরুণ লেখকদের ও গবেষকদের কলমে সুন্দরবনের মাটি-মানুষ-সংস্কৃতি মিলেমিশে আঞ্চলিক সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করবে। এখানকার অপরিসীম সাংস্কৃতিরক গুরুত্বকে প্রোজ্জ্বল করেছে দুই বাংলাকে ছুঁইয়ে থাকা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিরহরিৎ এই বাদা বন। ওপার বাংলার যেসব কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিকদের হাতে সুন্দরবন অসাধারণভাবে নবরূপ পেয়েছে তাঁরা হলেন পাভেল পার্থ, ইফতেয়ার মাহামুদ, আজাদুর রহমান, খসরু চৌধুরী, বিলু কবির, রাজীব আহমেদ, তোফা খান এবং হুমায়ুন খান। এপার বাংলার যেসকল গবেষক সুন্দরবনের অনন্য প্রকৃতি, বনসম্পদ, মানুষের জীবন-জীবিকাকে নিয়ে তথ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করে চলেছেন তাঁরা হলেন ডঃ ইন্দ্রানী ঘোষাল, ডঃ কুতুবুদ্দিন মোল্লা, ডঃ নির্মলেন্দু দাস, ডঃ মন্টু বিশ্বাস, ডঃ শশাঙ্ক শেখর মণ্ডল, তুষার কাঞ্জিলাল, অধ্যাপক জয়ন্ত মিস্ত্রি, অধ্যাপক প্রণব সরকার, শঙ্কর প্রামাণিক, ডঃ সুবীর মণ্ডল, ড. ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ড. সাদুল ইসলাম, ড. দেবব্রত নস্কর, অনুপমতি লাল, আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রণবেশ স্যানাল, কমল চৌধুরী, চন্দন সুরভী দাস, কল্যাণ রুদ্র, কে.সি. গাইন, মনোজ কুমার সাহা, সুনন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. কুমুদ নস্কর। আমার বিশ্বাস সুন্দরবনকে নিয়ে এবং তার সাহিত্যকে নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের উন্নত গবেষণা তরুণ প্রজন্মের গবেষকরা আগামী দিনে আরো আরো বেশি বেশি করে করবে। কথাসাহিত্যে সুন্দরবন আরো গুরুত্ব পাবে ভবিষ্যতে। 

তথ্যঋণ স্বীকারঃ নানান গ্রন্থ ও ব্যক্তি সহায়তা।

ডঃ সুবীর মণ্ডল  
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত