অটোয়া, শনিবার ২১ মে, ২০২২
হূবনাথ পান্ডে’র “আর এক আদিবাসী” – অনুবাদঃ স্বপন নাগ

মাদের কাছে কোনো কাগজ নেই সাহেব।
আমাদের সবকিছুই চলে মুখে মুখে
মৌখিক আমাদের পরম্পরা,
মুখে মুখেই আমাদের বেঁচে-থাকা, বেড়ে-ওঠা।
তোমাদের লেখাপড়া থেকে
আমরা অনেক অনেক দূরে সাহেব!
এ নিয়ে আমাদের কোনো দুঃখও নেই।

তোমাদেরও তো শুরু এই জঙ্গলেই
সভ্য হয়ে তোমরা জঙ্গল ত্যাগ করেছো,
ছেড়ে দাওনি তবু জঙ্গলকে।
আমরা রসদ হয়েছি তোমাদের সভ্যতার;
তোমাদের মহল, তোমাদের শিক্ষা,
তোমাদের খেলা, তোমাদের যুদ্ধ--
জঙ্গল নয়,
যেন আমাদের শরীর কেটেই বিকশিত হয়েছে।
আমাদের নৈবেদ্য করেই
গড়ে উঠেছে তোমাদের ভগবান।

তোমাদের ফূর্তি বড় যন্ত্রণার আমাদের,
আমাদের বুকের ওপর দিয়েই প্রতিবার
ছুটে গেছে তোমাদের রেলগাড়ি।
যে কাগজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছো
তাও বানিয়েছো জঙ্গলকেই দ'লে-পিষে।
এই জঙ্গলকে দেখেনি তোমাদের কাগজ,
তাই কাগজ চাইতে আজ এসেছো জঙ্গলে!

ঋষি মুনিরাও তো তোমাদেরই
আমাদেরই পাতার কুটিরে ছিল তাদের বাস,
আমাদের বলিদান দিয়েই
জ্ঞান বিতরণ করেছে শুধু তোমাদের।


যখনই চেষ্টা করেছি প্রতিবাদের
আমাদের রাক্ষস বলেছো তোমরা,
উপেক্ষা করেছো ভাল্লুক, বাঁদর, বনমানুষ বলে।
তোমাদের আদি কবিই তো বলেছিল--
আমাদের এক হাতে শাস্ত্র, অন্য হাতে অস্ত্র!
আর এখন
তোমাদের শাস্ত্রের কাছে হয় আমরা অবনত হই
অথবা মুখোমুখি হই তোমাদের অস্ত্রের।

তোমরা যুদ্ধে নিপুণ ছিলে
যুদ্ধই ছিল তোমাদের কারবার।
আমরা তো আজও
গাছের একটি সজীব ডালও কাটি না,
পশুহত্যা করব কী করে!
হাতে হাঁসুয়া নিয়ে বুনো জন্তু থেকে বাঁচি শুধু।
তোমাদের আধুনিক অস্ত্রের কাছে
আমাদের পরাজয় তো অনিবার্য,
কিন্তু তোমাদের শাস্ত্র?
যে শাস্ত্রে আগ্রহ ছিল না সেদিন,
এমনকি আজও!
যে শাস্ত্র তোমাদের করুণা শেখায় না,
প্রেম, দয়া শেখায় না,
তা নিয়ে কী কাজ আমাদের?

অরণ্য তোমাদের সমৃদ্ধির উৎস হতে পারে,
আমাদের কাছে তা কিন্তু আরাধনার,
আমাদের বেঁচে থাকার আধার!

শুধু তোমাদের জন্যেই
তছনছ হয়েছে আমাদের সবকিছু।
আর নয়,
আর একদমই নয়!
অরণ্য যে আমাদের--
তার কোনো প্রমাণ নেই আমাদের কাছে।
এরপরেও
যা-করার তোমাদের, করো।
আমরা এই জঙ্গল ছেড়ে,
জংলীপনা ছেড়ে কোথাওই যাব না।
তার মানে এই নয়, হাতে তুলে নেব অস্ত্র।
তোমাদের গল্পেই শুধু আমাদের যাবতীয় হিংস্রতা,
হিংস্রতা আমাদের জন্মগত নয়।
তবুও, আমাদের যাদের হাতে আজ অস্ত্র দেখছো --
সে সবই তোমাদের সভ্যতার ফল!
ওরা খেলছে তোমাদেরই খেলা --
যে খেলার কোনো শেষ নেই।

তোমাদের সভ্যতার সামনে
আমরা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব,
আমাদের অসভ্যতাকে সঙ্গী করে দেখতে চাই
কত ক্রুর হতে পারে তোমাদের মহান সভ্যতা!
আর দেখাতে চাই--
মার-খাওয়া মানুষেরাই হারে না প্রতিবার,
যারা মারে, তারাও জেতে না সব সময়!

মূল কবিতা-
হূবনাথ পান্ডে

অনুবাদ-
স্বপন নাগ । ভারত

কবি হূবনাথ পান্ডের জন্ম ভারতের বেনারস শহরে ১৯৬৫ সালের ১৩ই এপ্রিল। আধুনিক হিন্দি কবিতার জগতে হূবনাথ পান্ডে একটি চর্চিত নাম। বহুচর্চিত তাঁর কবিতা। সামাজিক বৈষম্য, রাজনীতিকদের নীতিহীনতা, জাতপাতে দীর্ণ ভারতীয় সমাজ প্রভৃতি তাঁর কবিতার বিষয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ 'কৌয়ে', 'লোয়ার প‍্যারেল', 'অকাল' প্রমুখ। অনূদিত 'এক অওর আদিবাসী' কবিতাটি সদ্যলেখা। এখনও কোনো গ্রন্থভুক্ত হয়নি। বর্তমানে কবি মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি বিভাগে অধ্যাপনায় যুক্ত।