অটোয়া, শনিবার ১৭ আগস্ট, ২০১৯
মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকায় নারীঃ পরিপ্রেক্ষিত সিলেট (শেষ অংশ) - অপূর্ব শর্মা

মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকায় নারীঃ পরিপ্রেক্ষিত সিলেট -প্রথম অংশ পড়তে ক্লিক করুন 

মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকায় নারীঃ পরিপ্রেক্ষিত সিলেট - দ্বিতীয় অংশ পড়তে ক্লিক করুন

মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকায় নারীঃ পরিপ্রেক্ষিত সিলেট - তৃতীয় অংশ পড়তে ক্লিক করুন 

দীপালি চক্রবর্তী

দীপালি চক্রবর্তী ১৯৩৩ সালের ৫ জানুয়ারি জগন্নাথপুর থানার ভবানীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সত্যেন্দ্র নাথ চৌধুরী, মাতা হীরালতা চৌধুরী। ১৯৪৭ সালে সুনামগঞ্জের মনোরঞ্জন চক্রবর্তীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়।
দীপালি চক্রবর্তী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের একনিষ্ঠ কর্মী, সুনামগঞ্জ মহিলা সমিতির কর্ণধার ও নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবিকা। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সুনামগঞ্জের গ্রাম পর্যায়ে জনগনকে সংগঠিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। 
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দীপালি চক্রবর্তী ভারতের বালাটে অবস্থান করেন। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার, অস্ত্রসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বালাটে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে অবস্থানকালীন সময়ে ওই এলাকায় মহামারি আকারে কলেরা দেখা দেয়। স্থানীয় আদিবাসী খাসিয়ারা এই কলেরার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অভিযুক্ত করে। এ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখেন দীপালি। 
সেই সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য মতিয়া চৌধুরী ভারতের আসামে পৌছেন। মতিয়া চৌধুরীর আগমন উপলক্ষে একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এই সমাবেশ আয়োজনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন দীপালি চক্রবর্তী। 
দীপালি চক্রবর্তী শুধু নিজেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি, তাঁর উৎসাহ অনুপ্রেরণায় তাঁর ২ ছেলে এবং ১ মেয়ে পরাধীনতার শৃংখল মুক্তির আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ২০০৩ সালের ৩১ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী 

দৈনিক যুগভেরী সম্পাদক ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী স্বাধীনতা আন্দোলনে ছিলেন সোচ্চার। একাত্তরের উত্তাল তরঙ্গের দিনে সিলেটের নারীদের মিছিলের অগ্রভাগে নিয়ে আসতে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন। সিলেটের ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি নারীদেরকে উজ্জীবিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে মার্চ মাসে সিলেটে যে বিশাল মিছিল বের হয় তাতে অগণিত নারী অংশগ্রহণ করেন। এর বিপুল অংশ তাঁর আহ্বানে সারা দিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। শুধু তাই নয় নিজের শিশুকন্যা ফাহমীনা নাহাসকেও তিনি শামিল করেছিলেন স্বাধীকার আন্দোলনের মিছিলে।  
মুক্তিসংগ্রাম শুরু হওয়ার পর পরই ফাহমীদা রশীদ চৌধুরীর স্বামী আমিনূর রশীদ চৌধূরী মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার আহ্বান সংবলিত প্রায় ২ লক্ষাধিক লিফলেট যুগভেরী প্রেস থেকে মুদ্রণ করেন। মধ্যরাতে মুদ্রণ কাজ শেষ হলে যথাসময়ে যথাস্থানে সেগুলো পৌঁছে দেওয়া ছিল দুরহ ব্যাপার। এই দায়িত্ব সাহসিকতার সাথে পালন করেন ফাহমীদা রশীদ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর রাতে সিলেট স্টেশন ক্লাবে আওয়ামীলীগ নেতা ইছমত চৌধুরীর হাতে তুলে দেন লিফলেটগুলো। ইপিআরসহ অন্যান্যদের মধ্যে তা বন্টন করা হয়। যা এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত ও প্রানসঞ্চার করতে সহায়ক ভুমিকা পালন করে। মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিকভাবেও সহায়তা করেছেন তিনি। তাঁর কাছে এসে খালি হাতে ফেরৎ যায়নি কেউ।
’৭১ সালের ৬ মে আমিনূর রশীদ চৌধূরীকে আটক করে পাকবাহিনী। নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে তাঁর উপর অমানুষিক অত্যাচার চালায়। অন্যদিকে হাউজ এরেস্ট করে রাখা হয় ফাহমীদা রশীদ চৌধূরীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের। ১৬ সেপ্টেম্বর কাকতালীয়ভাবে মুক্তি পেয়ে তারা লন্ডনে চলে যান। সেখানে প্রথম অস্থায়ী বাংলাদেশ মিশন অফিস চালু করতে ভূমিকা রাখেন ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী। অস্থায়ী বাংলাদেশ মিশন অফিস প্রতিষ্ঠায় তিনি ঘুরে ঘুরে চাঁদা সংগ্রহ করেছেন অন্যান্যদের সাথে।  দেশ স্বাধীন হলে ফিরে আসেন মাতৃভূমিতে। শুরু করেন পুনর্গঠনের কাজ। ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী ১৯৩৮ সালের ১৭ জুন সিলেট শহরের ছড়ার পাড় এলাকায় পৈতিক নিবাসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ ইব্রাহিম, মাতা হামিদা বানু। ১৯৫৭ সালে বিট্রিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা সিলেটবন্ধু আমীনূর রশীদ চৌধূরীর সাথে বিয়ে হয় তাঁর। 

খোদেজা কিবরিয়া 

সিলেট মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন তিনি। উত্তাল মার্চে সিলেটে মহিলা পরিষদের উদ্যোগে নারীদের যে মিছিল অনুষ্ঠিত হয় সেই মিছিল আয়োজনের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন খোদেজা। মিছিলের অগ্রভাগে থেকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় দেশেই ছিলেন খোদেজা। সিলেট শহরের মীরাবাজারে অবস্থিত তাদের বাসায় অনেক মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় পেয়েছিলেন দুঃসহ সময়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন তিনি। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গোপনে যোগাযোগ রেখে তাদেরকে প্রয়েজনীয় তথ্য সরবরাহ করেছেন। নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে দেশ-মাতৃকাকে রক্ষায় তিনি ছিলেন তৎপর। রাজনীতিক স্বামীর সহচর্যে হয়ে উঠেছিলেন অনন্য।  
খোদেজা কিবরিয়া রীয়া ১৯৩৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবু জাফর আব্দুল্লাহ। মাতা সৈয়দা রফিকুন্নেসা। ১৯৬০ সালে এডভোকেট দেওয়ান কিবরিয়া চৌধুরীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আবেদা চৌধুরী  

নারী নেত্রী আবেদা চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভ সময়ে রাজপথে ছিলেন। স্বাধীকারের দাবিতে সিলেটের নারীদের উজ্জীবিত করতে যে ক’জন নারী মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম।  
আবেদা চৌধুরী পারিবারিকভাবেই রাজনীতি সচেতন ছিলেন। পারিবারিক প্রাগ্রসরতা তাঁকে মুক্তিসংগ্রামে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে। আবেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে সিলেটে মহিলা আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। 
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি সিলেটের নারীদের অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে সিলেটে যে ক’টা মিছিল, সভা, র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয় সেগুলোতে নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। পাশাপাশি চাঁদা সংগ্রহের জন্য ঘুরে বেড়িয়েছেন শহরের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। সে সময় মানুষ আট আনা, এক টাকার বেশি চাঁদা দিত না। আট আনা এক টাকা করে প্রায় ৬ হাজার টাকা সংগ্রহ করে তিনি আওয়ামীলীগের ফান্ডে জমা দেন।
সিলেট শহর হানাদারদের দখলে চলে গেলে আত্মরক্ষার্থে গোলাপগঞ্জের কানিশাইলে চলে যান আবেদা চৌধুরী। কূলে ৩ মাসের শিশু ও অপর ছোট্ট দুই সন্তান নিয়ে নিকটাত্মীয় ইনাম উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে অবস্থান করেন। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মত যাতায়াত ছিল। হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে তাদের তথ্য সরবরাহ করতেন তিনি। বিষয়টি স্বাধীনতার বিপক্ষের লোকজন অবগত হলে তাঁকে সেই স্থান ত্যাগ করতে হয়। তিনি সিলেট শহরে অবস্থিত হযরত শাহজালার (র.) এর দরগাহ এলাকায় অবস্থিত বোনের বাসায় আশ্রয় নেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় সেখানেই ছিলেন। দেশ স্বাধীন হলে পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
আবেদা চৌধুরীর জন্ম ১৯৪০ সালের ৫ মে। তাঁর পিতার নাম হুমায়ূন বখত চৌধুরী। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার কানিশাইল ইউনিয়নের হাজিপুর গ্রামে তাদের বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধের ৮ বছর পূর্বে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জ ইউনিয়নের মোস্তফাপুর গ্রামের ইছসত আহমদ চৌধুরীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। দেশ স্বাধীনের পর সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামীলীগের সাংসদ মনোনীত হন তিনি।

জেবুন্নেসা হক

১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন সৈয়দা জেবুন্নেসা হক। ছাত্রলীগে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ছাত্রলীগের অন্যতম নেত্রী হিসেবে আবিভূত হন। ১৯৬২ সালের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন এবং ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি রাজপথে ছিলেন প্রতিবাদমুখর। এইসব আন্দোলন সংগ্রামে তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজপথে নেমেছেন অনেক ছাত্র-ছাত্রী।
অসহযোগ আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা ছিল তাঁর। প্রতিটি মিছিল সমাবেশে তাঁর উপস্থিতি নারী সমাজকে উজ্জীবিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশেই ছিলেন এই নারী নেত্রী। দেশের অভ্যন্তরে থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নানা তথ্য উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করেছেন। দেশ স্বাধীনের পর নির্যাতিতা নারীদের পুনর্বাসনে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। তাঁর সহায়তায় অনেক নারী নতুন করে শুরু করেন জীবন চলার পথ।  
জেবুন্নেসা হকের জন্ম ১৯৪৪ সালের ১ ফেব্র“য়ারি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার লস্করপুর গ্রামে। তাঁর স্বামীর নাম এনামুল হক। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৩ পুত্র ও ৩ কণ্যা সন্তানের জননী। জেবুন্নেসা হক বর্তমানে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য।

ফাতেমা চৌধুরী

ফাতেমা চৌধুরী ১৯৪৪ সালের ৪ আগস্ট সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার রণকেলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুল হামিদ চৌধুরী ও মাতা সাঈদা খাতুন চৌধুরী। ১৯৬৩ সালে তাঁর বিয়ে হয় ফুলবাড়ির আবুল বশর চৌধুরীর সাথে। স্বামীর সাহচর্য্য তাঁকে জীবন চলার পথে প্রেরণা যুগিয়েছে।
পারিবারিক রাজনৈতিক সচেতনতাই রাজনীতির প্রতি তাঁকে আকৃষ্ট করে। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে মহিলা আওয়ামীলীগে যোগদান করেন তিনি। ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০ এর নির্বাচন এবং অসহযোগ আন্দোলনে রাজপথে তিনি ছিলেন সোচ্চার। ১৯৭১ সালে মার্চ মাসে সিলেটে অনুষ্ঠিত আওয়ামীলীগের সকল মিছিল সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সব রকমের সহায়তা করেছেন।২৬ ফাতেমা চৌধুরী শুধু নিজেই স্বাধীকার আদায়ের আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন না, ছোট ভাই ইয়ামিন চৌধুরীকে মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত হতেও প্রেরণা যুগিয়েছেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে ইয়ামিন চৌধুরী যুদ্ধের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য ইয়ামিন চৌধুরীকে বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত করা হয়। 
দেশ স্বাধীনের পর ফাতেমা চৌধুরী আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। বিএনপি থেকে তিনি ১৯৭৯, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনীত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০০ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরন করেন।

জাহানারা আফসার

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাহানারা আফসার ছাত্রইউনিয়েনর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে হাতেগুনা যে দু’চারজন মহিলা হবিগঞ্জ শহরে মিছিল, মিটিং সমাবেশের সাথে যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে জাহানারা আফসার অন্যতম। 
হবিগঞ্জ শহরের রাজনগরে অবস্থিত তাদের বাসাটি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অঘোষিত অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হত। স্বামী আফসার আহমেদ ছিলেন ভাসানী ন্যাপের সভাপতি। সে কারনে উত্তাল মার্চের দিনগুলোতে করণীয় নিয়ে অনেকগুলো মিটিং অনুষ্ঠিত হয় তাদের বাসায়। প্রতিটি সভাতেই জাহানারা আফসার উপস্থিত থাকতেন। সেই সাথে হবিগঞ্জ শহরে শিরিশতলাসহ অন্যস্থানে অনুষ্ঠিত সভাগুলোতেও অংশ নিয়েছেন তিনি। র‌্যালীতে ছিলেন অগ্রভাগে।
হবিগঞ্জ শহর ছেড়ে যখন ভারতের কৌলাশহরে আত্মীয়ের বাসায় স্বামীসহ আশ্রয় নেন তখন মুক্তিযোদ্ধাসহ হবিগঞ্জের নেতৃস্থানীয়দের অনেকে সেখানে আসতেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হচ্ছেন, এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, কমাণ্ডেন্ট মানিক চৌধুরী, মোস্তফা আলী, রাজা সাহেব প্রমুখ। কাঙ্খিত লক্ষ্য কিভাবে অর্জন করা যায় তা নিয়ে তাদের বাসায় আলোচনা চলতো ঘন্টার পর ঘন্টা। 
জাহানারা আফসারের জন্ম ১৯৪৮ সালে। তাঁর পিতার নাম মীর আমজাদ হোসেন। স্বামী হবিগঞ্জ জেলা বারের আইনজীবি আফসার আহমেদ।

রায়হানা শফি       

মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে রায়হানা শফি অবস্থান করছিলেন চট্টগ্রামে। স্বামীর কর্মক্ষেত্র সেখানে থাকায় চট্টগ্রাম শহরের সিআরবি কলোনীতে তখন তাঁর আবাস। স্বামী শফি আহমদ ছিলেন ইস্টার্ন রেলওয়ের চীফ প্লানিং অফিসার। শফি আহমদের প্রেরণায় রায়হানা শফি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। রাজনীতিকে গণমানুষের অধিকার আদায়ের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। কর্মদক্ষতার পুরস্কার হিসেবে চট্টগ্রাম আওয়ামীলীগ রেলওয়ে শাখার সভানেত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। 
উত্তাল মার্চের দিনগুলোতে তাদের আবাসস্থল পরিণত হয় রাজনৈতিক নেতাদের গোপন আস্তানায়। প্রায় প্রতিদিনই সেখানে বৈঠক হতো। সেখানে আসতেন কর্ণেল এম আর চৌধুরী, ক্যাপ্টেন আমিন আহমদ, ক্যাপ্টেন হারুন আহমদ, এম.আর সিদ্দিকী, জহুর আহমদ চৌধুরী, এম.এ.মান্নান, মেজর জিয়া, মেজর রফিকুল ইসলাম প্রমুখ। সেইসব গোপন বৈঠকে রায়হানা শফিও অংশ নিতেন।
রায়হানা শফির জন্ম সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার কানিশাইলে। পিতা আজিজুস সামাদ চৌধুরী ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় বিয়ে হয় তাঁর। 
১৯৭১ সালে চার মাসের সন্তানসম্ভবা ছিলেন রায়হানা শফি। তবে, শারিরীক সমস্যা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি তাঁর পথচলায়। সময়ের প্রয়োজনে তিনি সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম রেলওয়ে কলোনী এবং শ্রমিক পাড়ায় মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করতে তিনি নিরলশ কাজ করেছেন। সেইসাথে অবাঙালি অফিসারদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছেন অবলীলায়। মুক্তিসংগ্রামের প্রাক্কালে তাঁর অন্যতম সাফল্য চাঁদা আদায়। দুঃসহ সেই সময়ে তিনি এক লক্ষ টাকা চাঁদা উত্তোলন করে বঙ্গবন্ধুর তহবিলে জমা দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে পাকহানাদারদের হাতে শহীদ হন তাঁর স্বামী শফি আহমদ। চট্টগ্রামের ফয়েজ লেকে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাক পশুর দল।

নিবেদিতা দাশপুরকায়স্থ 

ড. নিবেদিতা দাশপুরকায়স্থ ১৯৫০ সালের ৫ আগস্ট বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম এডভোকেট বিরজা মোহন দাশ পুরকায়স্থ, মাতা ঊষা দাশপুরকায়স্থ। মুক্তিসংগ্রামে তিনি করিমগঞ্জ এবং কলকাতার লবনহৃদে শরনার্থী শিবিরে কাজ করেন। 
মেঘালয়ে প্রচারকাজের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য সেই সময় একটি সাংস্কৃতিক দল গঠন করা হয়। এই সাংস্কৃতিক দল গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। এই দলের উদ্যোগে বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর প্রত্যেকটিতেই অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। সেসব অনুষ্ঠানে তাঁর লেখা গীতি নকশা পরিবেশিত হয়। 
শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথেই সম্পৃক্ত ছিলেন না; ভারতে মুক্তিযুদ্ধের জন্য তহবিল গঠনেও নিবেদিত ছিলেন নিবেদিতা। সেইসাথে শিলংয়ের হাসপাতালে চিকিৎসারত আহত মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিতা নারীদের খবর সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন। আহত গেরিলাদের সেবায় আত্মনিয়োগ করে তাদের জন্য ব্যান্ডেজ, তুলা, এন্টিসেপটিক, পেইনকিলার, স্যালাইন, জ্বরের ঔষধসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরীতে ভারতীয় পত্র-পত্রিকাতেও লেখালেখি করেছেন তিনি।

রত্না চক্রবর্তী 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জের মেয়ে রত্না চক্রবর্তীর ভূমিকা উল্লেখ করার মতো। পরিবারের সব সদস্য যখন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন, তখন রত্নাও যুক্ত হন স্বাধীকার আদায়ের আন্দোলনে। সুনামগঞ্জে ২৫ মার্চের পূর্বে অনুষ্ঠিত সকল মিছিল সমাবেশে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল অনিবার্য। গানের গলা ভাল থাকায় গণসঙ্গীতের মাধ্যমে ঝড় তুলতেন তিনি।
শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, সুনামগঞ্জ পাক হানাদারদের দখলে চলে গেলে রত্না চক্রবর্তী অন্যান্যদের সাথে ওপারে পাড়ি জমান। শুরু হয় তাঁর যাযাবর জীবন। ছোট ভাই মৃদুল কান্তি চক্রবর্তীকে সাথে নিয়ে ভারতের মেঘালয়, শিলং, বালাট, মাইলাম শরনার্থী শিবিরে গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। সঙ্গীতের মাধ্যমে মুক্তিকামীদের শুধু উজ্জীবিত-ই করেননি তিনি সেই সাথে ‘বাংলাদেশ বুলেটিন’ নামে একটি পত্রিকা বিক্রি করতেন; এই পত্রিকা বিক্রির সমুদয় অর্থ তুলে দেওয়া হতো অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের হাতে।  
রত্না চক্রবর্তী ১৯৫৪ সালে সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মনোরঞ্জন চক্রবর্তী। মাতা দীপালি চক্রবর্তী। মা বাবার উৎসাহ অনুপ্রেরণায় তিনি মুক্তিপথের অভিযাত্রী হন। ১৯৭৮ সালে শ্রীমঙ্গলের প্রফেসর নিখিল ভট্টাচার্যের সাথে তাঁর বিয়ে হয়।   

নিবেদিতা দাশ 

মুক্তিযুদ্ধের সময় নিবেদিতা দাশের বয়স ছিল ১৮ বছর। ছিলেন এক সন্তানের জননী। দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে স্বামী অনিল দাশ নিরাপদ স্থানে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেন। সিলেট নগরীর আম্বরখানা এলাকার লোহাড়াপড়ার বাসা থেকে অনিল দাশ স্ত্রী, সন্তান ও মাকে নিয়ে ২৪ মার্চ রাতে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। অনেকদিনের দুর্গম পথ পেরিয়ে নিবেদিতা দাশরা গিয়ে পৌছেন ভারতের চেলা শরণার্থী ক্যাম্পে। সেখানে প্রায় পয়ত্রিশ হাজার শরণার্থী ছিলো। শরণার্থীদের উজ্জীবিত করে তাদের বিভিন্ন কাজে লাগাতে চেলা মুক্তিফৌজ সহায়ক কমিটি, মহিলা শাখা গঠন করা হয়। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রীতিরানী দাশ পুরকায়স্থ আর সাধারণ সম্পাদক নিবেদিতা দাশ।
এই সংগঠনের সদস্যরা শরনার্থী ক্যাম্পের নারীদের বিভিন্ন হস্তশিল্পে প্রশিক্ষণ দিতেন। এছাড়াও আহত মুক্তিযোদ্ধা ও ক্যাম্পের অসুস্থদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। এই সংগঠনের তত্বাবধানে চেলায় বাঁশ ও ছন দিয়ে একটি মিনি হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। দু’জন চিকিৎসক এখানে আহত মুক্তিযোদ্ধা ও ক্যাম্পের অসুস্থদের চিকিৎসা প্রদান করতেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আসা অনেক মুক্তিযোদ্ধাকেও চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে এই হাসপাতালে। নিবেদিতা দাশদের কাজ ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা। এজন্য ক্যাম্পের প্রতিটি ঘর থেকে রিলিফ হিসেবে পাওয়া চাল ও ডাল সংগ্রহ করতেন তারা। 
নিবেদিতা ১৯৫৪ সালে সিলেটের বিশ্বনাথে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা নলিনী কান্ত দাশ, মা øেহলতা দাশ। ১৯৬৮ সালে সিলেট নগরীর আম্বরখানা লোহাড়পাড়া এলাকার প্রকৌশলী অনিল দাশের সাথে তাঁর বিয়ে হয়।

রাখী দাশপুরকায়স্থ

মুক্তিযুদ্ধকালে রাখী দাশপুরকায়স্থ ইডেন কলেজের ডিগ্রীর ছাত্রী ছিলেন। সম্পৃক্ত ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে। উত্তাল মার্চে তিনি যখন স্বাধীনতার দাবীতে মিছিল মিটিং সভা নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় ১৪ মার্চ তার পিতা এডভোকেট বিরজা মোহন দাশপুরকায়স্থ তাঁকে সিলেটে নিয়ে আসার জন্য ঢাকায় পৌছেন। রাখী দাশপুরকায়স্থের ইচ্ছে ছিল ঢাকায় অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের। সে কারণে তিনি সিলেট আসতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কিন্তু নিজ সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে সিলেটে আসতে হয় তাঁকে। সিলেটে এসে ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে পাড়ায় পাড়ায় ব্রিগেড গড়ে তোলা এবং অস্ত্র চালনা শিক্ষার লক্ষ্যে পরিচালিত কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত হন তিনি। মহিলা পরিষদে মা ঊষা দাশপুরকায়স্থের সাথেও কাজ করেন। 
২৬ মার্চের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌছালে জকিগঞ্জের সুতারকান্দি সীমান্ত দিয়ে ১৯ এপ্রিল আসামের কাছার জেলার করিমগঞ্জে পৌছান। সেখান থেকে মেঘালয়ের রাজধানী শিলং গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য একটি সাংস্কৃতিক দল গঠনে ভূমিকা রাখেন। এই সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্বে ছিলেন মণীষা চক্রবর্তী। একই সময়ে ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধিন আহত মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিতা মেয়েদের দেখাশুনা এবং খবর সংগ্রহে কিছুদিন কাজ করেন। পরবর্তীতে করিমগঞ্জের গাছকালিবাড়ি রোডের হিন্দি স্কুলে স্থাপিত বেইজ ক্যাম্পের সাথে সম্পৃক্ত হন।
রাখী দাশ পুরকায়স্থ এডভোকেট বিরজা মোহন দাশ পুরকায়স্থ এবং নারী নেত্রী ঊষা দাশপুরকায়স্থের তৃতীয় সন্তান। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য তাঁর জীবনসঙ্গি।  

সূত্রঃ বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ ও সংবাদ পত্র

অপূর্ব শর্মা
সিলেট, বাংলাদেশ

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন

প্রবন্ধ- দিলওয়ারঃ গণমানুষের কবি, পৃথিবীর কবি - অপূর্ব শর্মা