অটোয়া, সোমবার ২৫ জানুয়ারি, ২০২১
তৃষিত তেপান্তর - সাইফুল ভুঁইয়া

বারিধারায় আমেরিকান অ্যাম্বেসির সামনে বিশাল লাইন। লোকজন সম্ভবতঃ দাঁড়িয়েছে শেষ রাত থেকেই। না হয় এত ভোরে এসেও শত লোকের পেছনে দাঁড়াতে হবে কেন? কেউ কেউ আবার বাসার দারোয়ান কিংবা গার্ড পাঠিয়ে জায়গা রেখেছে। আমার সেই ভাগ্য নেই।  কলাবাগানের একটি মেসে ক’জন মিলে থাকি। আমার রুমে আমরা দু’জন। আমি আর আফসার। শুধু মাত্র টিউশনির পয়সা দিয়ে দিন চলে আফসারের। বয়সে অনেক ছোট বলে সে আমাকে ভাইজান ডাকে। খুব সম্মান করে। আমরা দুজন ঘরে ইংরেজিতে কথা বলা প্র্যাকটিস করছি গত কিছুদিন থেকে। আফসার খুব ভোরে উঠে দৌড়াতে যায়। আমি একটু অলস। এক দুই দিন দৌড়ের পর রণভঙ্গ।   

শেষ পর্যন্ত ডাক এল আমার - কাউন্টার নম্বর পাঁচে। 

তখন দুপুর প্রায় দুইটা। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ। তাও কাউন্টারে গিয়ে সবল হয়ে উঠলাম। ভিসা অফিসার কাগজ দেখছেন আর প্রশ্ন করছেন ইংরেজিতে। আমিও খই ফুটাচ্ছি মুখে। ভুল কি শুদ্ধ বালাই নেই মোটেও। তবে ভিসা অফিসার আটকাতে পারছে না কিছুতেই। এক পর্যায়ে বললেন – তোমার মতো একজন অপেক্ষাকৃত নবীন অফিসারের জন্য সরকার কেন বছরে পঁচিশ হাজার ডলার খরচ করতে যাবেন সেটা কিছুতেই আমার বোধগম্য হচ্ছে না। স্যরি আমি তোমাকে ভিসা দিতে পারছিনা। আমি বললাম – সরকার তরুণদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে চায়। তাই এই পিএইচডি প্রোগ্রাম স্কলারশিপ। আমাদের ফরেন মিনিস্ট্রি তো নোট ভারবাল দিয়েছে। সমস্যা কোথায়?   
: স্যরি! আমি কনভিন্সড না। তাই তোমাকে ভিসা দিতে পারছি না।  
: আমি কি আবার ভিসার জন্য ইন্টারভিউ দিতে পারব?
: অবশ্যই – অন্য উইন্ডোতে ট্রাই করতে পারো, তবে আমি দিচ্ছি না। 

কি আর করা – ফিরে এলাম এক বুক কান্না নিয়ে। আবার শুরু হলো নব উদ্যোমে ভিসার ইন্টারভিউর প্রস্তুতি। ভাবলাম এবার আঁট-ঘাঁট সব বেঁধে যাব। ফরেন মিনিস্ট্রিতে গেলাম। বললাম আপনাদের নোট ভারবাল তো আমেরিকান অ্যাম্বেসি অনার করে নাই। কি করবো? বলল কিছু করার নেই আমাদের। আমেরিকান অ্যাম্বেসিই শুধু আমাদের নোট ভারবাল মানে সরকারি অনুরোধপত্র প্রত্যাখ্যান করে।

আফসার বলে – 
ভাইজান বিষয়টা বুঝতে পারলাম না। পয়সা দেবে সরকার- ওদের ভিসা দিতে সমস্যা কি? নাকি ওরা ভেবেছে গরিব দেশ। অফিসার পাঠিয়ে যদি পয়সা না দেয় তাহলে তো খরচ দিতে হবে ওদেরকেই। একটা কাজ করেন – আমাদের মিনিস্টার সাহেবের সাথে সরাসরি দেখা করেন।  সরকারের মান সম্মান বলে কথা – দেখবেন কাজ হবে। পরদিন খুব সকালে সশরীরে হাজির হলাম মন্ত্রী সাহেবের বাসায়। কিন্তু আশায় গুড়েবালি। তিনি নিচে নামবেন না আজ। বরিশালে গিয়ে ওনার গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে। উঁনি পায়ে খুব আঘাত পেয়েছেন। তাই পায়ে প্লাস্টার নিয়ে পূর্ণ বিশ্রামে আছেন।  
মন্ত্রীসাহেব এক সময়ের ঝানু আমলা। মন্ত্রী হয়েছেন টেকনোক্রেট কোটায়। যা বলেন তা করেই ছাড়েন। উনি যখন সচিব ছিলেন তখন একবার আমার স্ত্রীর কোন এক প্রজেক্টের ব্যাপারে ওনার সাথে দেখা করার সুযোগ হয়। জানতে চাইলেন নিজের জন্য উচ্চশিক্ষার চেষ্টা না করে স্ত্রীর প্রজেক্ট নিয়ে মন্ত্রণালয়ে ঘুরাঘুরি করছি কেন? বললাম মাস্টার্স পাশ করেছি সরাকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক কষ্ট করে। পিএইচ ডি করার টাকা পাবো কোথায়। উনি বললেন ইচ্ছে থাকলে টাকা কোন ব্যাপার না। ভর্তি হও অন্ততঃ নিজের যোগ্যতায়। বাকি দায়িত্ব সরকারের।    

এক সময়  মন্ত্রী সাহেবের কথাই সত্যি হলো। 
উনি কি তাহলে জানতেন যে একদিন তিনি মন্ত্রী হবেন এবং যা বলেছেন তার প্রমাণ হাতে নাতে দেবেন? এক সময় আমার ডাক এলো তিন তলার ড্রইং রুমে যাবার। বিশাল বড় ড্রইং রুম। আজ আমি ছাড়া আর কোন অপেক্ষমাণ লোক নেই এই রুমে। তরুণ বয়সের একটি ছেলেকে আমার রুমে উকি মারতে দেখলাম। তবে জিজ্ঞেস করলো না কিছুই। কিছুক্ষণ পরেই দেখি লেবু চা, সাথে কিছু বেশ মচমচে সুস্বাদু বিস্কুট। বুঝলাম আজ আর দেখা হবে না। আমার দৌড় আজ চা পর্যন্তই। 

হঠাৎ মনে পড়ল দু’বছর আগের কথা। 
মন্ত্রী সাহেব তখনো মন্ত্রী হননি। তবে বড় আমলা। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের চালিকা শক্তি। নতুন দায়িত্ব নিয়ে বেশ ব্যস্ততা তাঁর। আগের মতো আর অফিসে গিয়ে দেখা করা সম্ভব না। অগত্যা বাসায় গেলাম এক সন্ধ্যায় – শুভেচ্ছা জানাতে। গুলশানের অভিজাত এলাকায় একটি ছয়তলা ভবন। পুরোটাই ওনার বাসা। এর আগেও এই বাসায় এসেছি। তবে আজ একটু আলাদা। গেটেই কড়া পুলিশী পাহারা। পিএ’র কাছে পর্যন্ত যাওয়ার কোন উপায় নেই। অনেক বুঝিয়ে বললাম যে আমি একটু শুভেচ্ছা দিতে এসেছি - কোন কাজে না। পুলিশ ভাইজান তো মহা বিরক্ত। বলে - স্যার তো কাজের লোকদের সাথেই এখন দেখা দিতে পারেন না। ফুল দিতে চাইলে নাম লিখে রেখে জান। আমরা পৌঁছে দেব। এক পর্যায়ে একজন সদয় হয়ে আমাকে ঢুকতে দিলেন।   

তিন তলার ড্রইং রুম আজ বেশ সর গরম। অপেক্ষমাণ অন্ততঃ জনা বিশেক।  তবে অকাজের লোক আমি ছাড়া আর কেউ নেই। সবার হাতেই কাগজ বা চিরকুট আছে। আজ কেন জানি সবাইকেই বসতে দেয়া হয়েছে উপরে - তিন তলায়। রাত প্রায় বারোটা ছুঁই ছুঁই। উনি ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে সবাই সোফা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। আমিও। সবার সালাম উনি একসাথে নিলেন মাথা নাড়িয়ে। কথা বলা শুরু করেছেন এক পাশ থেকে। এক এক করে।     
: কাকে বলতে হবে বলো –  আচ্ছা ঠিক আছে।
: তোমার কি – ট্রান্সফার? কোথায় যাবে? 
: না স্যার – ঢাকায় আসতে চাই। 
: ঠিক আছে, কাগজে দাও আর পরশু আমার পিএসকে ফোন করে খোঁজ নিও।  
পাঁচ মিনিটের মধ্যে প্রায় সবার সাথে সাক্ষাত শেষ। বাকি শুধু আমি। এই মধ্যেই ওনার দুই পকেট প্রায় চিরকুটে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। আমাকে দেখেই প্রশ্ন - এখানে কি করছো? তোমার না সেপ্টেম্বরের সেশন ধরার কথা। বললাম এই সেমিস্টার ধরতে পারিনি স্যার। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অ্যাডমিশন ডেফার করবে বলেছে। ‘ওকে বেস্ট অব লাক’- বলে উনি সেদিনের মতো বিদায় দিলেন আমাকে।     

নিয়তির লিখন খণ্ডান দায়। বেস্ট লাক আর আমার কপালে আসেনি।  পেরিয়ে গেছে দু’বছর। এখন আটকা ভিসা জটিলতায়। অসুস্থ শরীর এবং পায়ে প্লাস্টার নিয়ে মন্ত্রী সাহেব আজ অফিসে এসেছেন। ওনারও একই কথা – আমেরিকান অ্যাম্বেসি সরকারি নোট ভারবাল রিফিউজ করে কিভাবে। অফিসে এসেই আজকের কাজ শুরু আমার ঝামেলা দিয়ে। আমি চুপ করে বসে আছি। বললেন – দুশ্চিন্তা করো না আমি তোমার মিনিস্ট্রির সচিবকে বলে দিচ্ছি। সে এটি নিয়ে মুভ করবে। আমি বললাম -  স্যার! পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিজি সাহেবকে বললে ভাল হতো। শুনেছি এ ধরনের কেসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি যোগাযোগ ভাল কাজ করে। আমার ভাগ্য আজ খুবই ভালো বলতে হবে। 

মন্ত্রী সাহেব সাথে সাথেই ফোন করলেন ডিজি (আমেরিকা) সাহেবকে।    
: শোন সারজিল – আমার হাতে তোমাদের একটি নোট ভারবাল আছে। আমি পড়ে শোনাচ্ছি। আমেরিকান অ্যাম্বেসী এটি অনার করেনি। সরকারি নোট ভারবাল ওরা ডিনাই করে কিভাবে। তুমি সরাসরি আমেরিকান অ্যাম্বেসেডারের সাথে কথা বলো।
: স্যার! এরকম ওরা এর আগেও করেছে। আমাদের নোট ভারবাল ডিনাই করেছে এবং মাঝে মাঝে করে। তবে কোন সমস্যা হবে না। আমার কাছে পাঠিয়ে দেন ওনাকে। আমি সব ব্যবস্থা করছি। 

কথা শেষ হতেই আমাকে প্রশ্ন করলেন – তুমি কি অফিসের গাড়ি নিয়ে এসছো?  বললাম না স্যার। 
তাহলে তো ঢুকতেই পারবে না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি। এক্ষনি যাও – সারজিলের সাথে দেখা করো। ও অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।

সারজিল হাসান। পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মহাপরিচালক (আমেরিকা অ্যান্ড প্যাসিফিক)। খুব সুঠামদেহি বেশ লম্বা এক ভদ্রলোক। এর আগে উনার পোস্টিং ছিল নিউইয়র্কে। কথা বলেন চমৎকার। অধিকাংশই ইংরেজিতে। আমি যেতেই তিনি তার পিয়নকে বললেন ডাইরেক্টর সাহেবকে আমার সালাম দাও। আর তিনজনের জন্য কফি দিতে বলো। আমাকে বলল – 
: উড ইউ লাইক টু হ্যাভ সাম ইনস্ট্যান্ট কফি – নো মিল্ক। ইউ মাস্ট লাইক ইট। 
 ( ইনস্ট্যান্ট কফি চলবে – দুধ ছাড়া, তবে আপনি অবশ্যই  পছন্দ করবেন)।
: শিউর – থ্যাংকস। (অবশ্যই ধন্যবাদ।) 
: হোয়েন স্যুড ইউর ক্লাস স্টার্ট? (আপনার ক্লাস কখন শুরু হচ্ছে।)  
: ওয়েল! অরিয়েন্টেশন আগষ্ট থার্টিফার্স্ট অ্যান্ড ক্লাস স্টার্টস সেপ্টেম্বর ফার্স্ট।
(হ্যা! অরিয়েন্টেশন হবে আগষ্ট ৩১শে এবং ক্লাস সেপ্টেম্বর ১ তারিখে।)   
: নো ওয়ারিজ। ইউ হ্যাভ মোর দ্যান এ উইক টাইম। এভ্রি থিং স্যুড বি ওকে।
(দুশ্চিন্তা করবেন না – আপনার এক সপ্তাহ’র বেশি সময় হাতে আছে। সব ঠিক হয়ে যাবে।)

ডিজি সাহেব মনে হয় জাদু জানেন। চা আর গল্প করার সময়টুকুর মধ্যে সব রেডি। আমাকে অ্যাম্বেসি থেকে আসা ফ্যাক্স কনফার্মেশনের কপি হাতে ধরিয়ে দিলেন। পরদিন আমেরিকান অ্যাম্বেসীতে ভিসা ইন্টারভিউ। ডিজি সাহেব বললেন- 
: এভ্রিথিং ফাইনাল – ইনজয় ইউর ট্রিপ টু ইউ এস এ – বেস্ট লাক।
 (সব কিছু চূড়ান্ত – আপনার আমেরিকা ভ্রমণ উপভোগ্য হোক -  ভাল হোক সব।)   

মেসে গিয়ে একটা শান্তির গোসল দিলাম। প্রচণ্ড গতিতে শাওয়ার ছেড়ে বসে আছি। খেয়াল নেই সময়ের। খাবারের সময় গড়িয়ে বিকাল হতে চলেছে। মেসে আজকের মেনু নাজিরশাল চালের গরম ভাত, পোড়া মরিচের আলু ভর্তা আর টাকি মাছের লাউ। আমাদের মেসের বুয়ার হাতে টাকি মাছের লাউ রান্না হয় অসাধারণ। আমার বাবা একবার হঠাৎ এসেছিলেন আমার কাঁঠাল বাগানের এই মেসে। তখন দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। বাসায় খাবারের তেমন কিছুই নেই। ভাতের সাথে তরকারি হচ্ছে শুধুই টাকি মাছ দিয়ে লাউ। সাথে পেঁয়াজ কাঁচামরিচ দিয়ে টাটকা ডিম ভাজা। এরপর উনি যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিনই এর স্বাদ ওনার মুখে লেগে ছিল। আমৃত্যু এর প্রশংসা করেছেন। আজ আমার অবস্থাও সেরকম। যা খাচ্ছি তাই ভাল লাগছে। নিজেকে বেশ হালকা লাগছে আজ। মনে মনে সময় গুনছি সারক্ষণ। আগামীকাল সকালের।    

আমি যখন অ্যাম্ব্যেসিতে পৌঁছলাম তখন সকাল প্রায় দশটা। আজও মানুষের বিশাল লাইন। আমার তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই আজ। তরতর করে চলে গেলাম মূল ফটকে। সিকিউরিটি নাম বলতেই বলল ফ্যাক্স পেয়েছি। আপনি ভেতরে গিয়ে তিন নম্বর কাউন্টারে সরাসরি পাসপোর্ট জমা দেবেন। আজ এই স্পেশাল কাউন্টারে ভিসার জন্য আরো দুইজন অপেক্ষমাণ। সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি এবং সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন। উইন্ডোতে যেতেই পাসপোর্ট জমা রেখে আমাকে বলল আপনাকে একটু বসতে হবে। আমরা ডাকব। ঠিক দশটা পাঁচ মিনিটে আমার ডাক এলো। ভিসা অফিসার একজন মহিলা। অভ্যর্থনা জানালেন খুব আন্তরিকতার সাথে। কথা বলছেন এমনভাবে মনে হল গল্প করছেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে সুজারল্যান্ডের জেনেভায় আমার জাতিসংঘের সম্মেলনে যোগ দেয়া, জার্মানিতে ট্রেনিং ইত্যাদি গল্প।  ভদ্রমহিলা কথা বলছেন আর আমার কাগজপত্র দেখছেন। অবাক ব্যাপার উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগমন সংক্রান্ত কিছুই উনি জানতে চাইলেন না। আমাকে একটি হলুদ কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বললেন -        
: আপনি চলে যান। এখানে অপেক্ষা করার দরকার নেই। বিকাল তিনটায় এসে পাসপোর্ট নিয়ে যাবেন। তবে আসার সময় ভিসা ফি বাবদ ছয় হাজার টাকার ড্রাফট নিয়ে আসবেন। আপনি যেহেতু স্টুডেন্ট ভিসা চাইছেন তাই এই ফি।  

আমি ইচ্ছে করেই আর প্রশ্ন করলাম না। যদিও একবার মনে হয়েছিল যে জিজ্ঞেস করি আমি ভিসা পাচ্ছি কিনা। কাউন্টারের বাইরে আসতেই  অপেক্ষমাণ ইন্টারভিউ প্রার্থীদের জটলা আমাকে ঘিরে ধরল। জানতে চাইলো কি জিজ্ঞেস করেছে? বললাম – জিজ্ঞেস তো তেমন কিছু করেনি তবে গতবার পাসপোর্ট ফেরত দিয়েছিল। এইবার তা না করে দিয়েছে একটি হলুদ কার্ড – এই যা। একজন বললেন এর মানে আপনি ভিসা পেয়ে গিয়েছেন। আর এখানে জটলায় না থেকে বরং বাসায় চলে যান। ওরা সিসি ক্যামেরায় আমাদের সব কিছুই দেখছে।   

স্বপ্নের দেশ আমেরিকা। উড়াল দিতে আর মাত্র দুদিন।  
সারাক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে আছি। টানা বৃষ্টির সুরেলা আওয়াজ আর স্বপ্নের ঘোর চলছে সমান তালে। মনে হচ্ছে বাসায় সবাই আমার চেয়েও বেশি খুশি। আমার শ্বশুর খাস্তা বিস্কুট দিয়ে কলা খেতে খেতে শ্বাশুরিকে বলছেন – 
: নাজনিনের মা দেখেছো! তোমার মেয়ের কপাল খুবই ভালো। জামাই যাবে এখন – দেখবে ক’দিন পর মেয়েও যাবে। তখন প্রতিদিন তোমার সকালের ঘুম ভাঙবে আমেরিকার ফোনে। ভেবেছো? 

আগষ্টের ছাব্বিশ । আমার ফ্লাইট আজ রাতেই। ভাদ্র মাস কিন্তু  শ্রাবণের বৃষ্টির প্রতাপ এখনো কমেনি। চারিদক জলে থৈ থৈ! ঢাকা কুমিল্লার সড়ক পানিতে ডুবে গিয়েছে। তাই কুমিল্লা থেকে যাত্রা শুরু হলো ট্রেনে। সাথে মা বাবা ভাইবোন সহ এক বিশাল কাফেলা। কেউই এয়ারপোর্টে সী-অফ করা থেকে বঞ্চিত হতে চায় না। মাঝে মাঝেই ট্রেন লাইনেও কিছুটা পানি উঠেছে। পানিতে ডুবো লাইনের কাছে পৌছার আগেই ট্রেন একটু থামে। 
ফেরিওয়ালাদের বেচা কেনা বেড়ে যায়। কেউ ডাকে – এই আমড়া আমড়া! আমড়া ছিলা!
কেউ আবার বাদাম বাদাম - চিনা বাদাম বলে সুর করে ডকাছে। শাওন – স্বপ্নিলের আমড়া খুবই পছন্দ। ছোট ভাই শরিফ জানালা দিয়ে আমড়া আর বাদাম কিনে দেয় সবাইকে। তারপর ট্রেন আবার চলে মন্থর গতিতে। আমরা যখন কমলাপুর পৌঁছাই তখন বিকাল। 

আমার ফ্লাইট প্রায় মাঝরাতে। 
এয়ারপোর্টে সবাইকে বিদায় দিয়ে মালয়শিয়ান এয়ার লাইন্সের ফ্লাইটে এখন। মোয়াজ্জেম মামা বিমানের ভেতরে এসে আমাকে আরেকবার দেখে গেলেন। উনি মালয়শিয়ান এয়ার লাইন্সের পদস্থ কর্মকর্তা। ক্রুদের বলে গেলেন যেন নামার সময় একটু খেয়াল রাখেন এবং গাইড করেন ভালভাবে। বিমানটি এখন আকাশে – যাচ্ছে কুয়ালালামপুর। তারপর মালয়শিয়ান হোটেলে থাকব সারাদিন। বিকেলে আবার ফ্লাইট নিউইয়র্ক এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্য। অজানার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ছি, ছাড়ছি পরিজন। ভেবে ভেবে আমি কাঁদছি নীরবে। লুকিয়ে। একটু পরেই দেখছি পানি পড়ছে মাথার উপর থেকে ফোটা ফোটা। আবিস্কার করলাম পাশের সিটে কোন একজন ফ্রোজেন ইলিশ নিয়ে উঠেছেন প্লেনে। জানি না কিভাবে চুইয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে। সেকেন্ডের মধ্যেই সামাল দিতে ব্যস্ত হলেন একাধিক সুন্দরী বিমানবালা। সব ঠিক করে ফেললেন মুহূর্তেই।     

প্রায় দুই দিনের ম্যারাথন জার্নি শেষে আমি যখন আমেরিকার ডেট্রয়েট এয়ারপোর্টে পৌঁছাই তখন দুপুর। ভাবলাম প্লেন থেকে নেমে রেস্টরুমে একটু ফ্রেশ হবো। তারপর দেখা করব আমাকে রিসিভ করতে আসা স্বজনদের সাথে। আনিরা-মাশিয়াত এবং শ্রদ্ধেয় মামা ডঃ হারুন রশিদ। নেমেই অবাক হলাম। ঠিক প্লেনের গেটেই ওরা সবাই দাঁড়ানো ফুল হাতে। আমি জানতাম না যে রিসিভ করতে আসা লোকজনকে প্লেনের এতো কাছে আসতে দেয়। 

এয়ারপোর্টের বাইরে এসে মাটিতে পা রেখেই প্রথম পুলক বোধ করি। ভাবি এই সেই স্বপ্নের দেশ আমেরিকা। দেখছি এখন মন ভরে - বাস্তবে। অতি নিকট স্বজনদেরও পেয়েছি কাছে। যখন গাড়িতে উঠি অডিও প্লেয়ারে তখন বাংলা গান বাজছে।  গাড়ি চলছে হাওয়ায় হাওয়ায়। বাজছে সাবিনা ইয়াসমিনের গান – ‘সন্ধ্যার ছায়া নামে এলোমেলো হাওয়া’ এরপর -       
অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান 
যেন ভুলে যেও না।
এ কী বন্ধনে বাঁধা দু’জনে
এ বাঁধন খুলে যেওনা।।
গান শুনছি আর মনে পড়ছে দেশে ফেলে আসা সব স্মৃতি। কাঁদছি মুখ লুকিয়ে – অনবরত। এ কান্না আবেগের উষ্ণতার কাছে নিঃশব্দ নতজানু,  এ কান্না হৃদয় গহিনের কেন্দ্র থেকে উৎসারিত ভালবাসার। যে মাটি এ দেহে দিয়েছে প্রাণ, আমি ছিন্ন করেছি সে মাটির টান। রেখে এসেছি মমতা মাখা সব দিনগুলো মায়ের চারণ ভূমিতে। রেখে এসেছি মা-বাবা, রেখে এসেছি উড়ন্ত শালিকের হলদে ঠোঁট, আমার শৈশব, কৈশো্র‌ আমার যৌবনের দীপ্ত অঙ্গীকার।   

ডেট্রয়েট বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পড়াশুনা ভালই চলছিল। প্রতিদিন অন্ততঃ একবার কল দেই বাসায়। ফোন বিল খুব বেশি। মিনিটে এক ডলার। তাই বেশি কথা বলতে পারি না। একদিন কল দিলাম প্রিয় মন্ত্রী সাহেবকে। শুধু ধন্যবাদ দেয়ার জন্য। ধরেই নিয়েছি কল হবে একতরফা। মানে আমি ধন্যবাদ জানিয়ে অফিসে মেসেজ রেখে বিদায় নেব। বাস্তবে অনেকটা সে রকমই ঘটল। পিএস সাহেব বললেন – স্যার ব্যস্ত খুব। একটা কনফারেন্স আছে একটু পরেই। তবে আপনি আমকে মেসেজ দিতে পারেন। আমার মেসেজ দেয়া প্রায় শেষ। অবাক ব্যাপার দেখি  প্রত্যুত্তর দিচ্ছে মন্ত্রী সাহেব নিজেই। বলছেন – 
: শোনো ভালোভাবে পড়াশুনা করো। আর একদিনের পড়া অন্যদিনের জন্য জমিয়ে রেখো না। তাহলে কুলাতে পারবে না। পিছিয়ে পড়বে। ভালো থেকো। আর কল করো মাঝে মাঝে।    

যদিও উনার সাথে আমার সেই ছিল শেষ কথা । কল করা হয়নি আর কোন দিনই। মনে মনে ভাবি কি কথা বলবো? উনার কি এতোদিন পর আদৌ মনে আছে কিছু?  আবার ভয়ও হয়। যদি জানতে চান দেশে ফেরত আসনি কেন? শত হলেও মায়ের ভূমি – মায়ের ভাষা – মায়ের ভালোবাসা বলে কথা। কিভাবে সব ভুলে বিদেশে কাটিয়েছি গত একুশ বছর?  

আমেরিকার দিনগুলো ভালোই কাটছিল আমার। আসার মাসখানেক পর একদিন বাসার আঙ্গিনার শুকনো পাতা রেকিং করতে যাই। নিজের ইচ্ছাতেই। বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও কাজ করলাম কিছুক্ষণ বেশ আগ্রহ নিয়ে - মনের আনন্দে। সবই ঠিক তবে ঠান্ডার দেশের এই ঠান্ডা যে আমাদের শরীরের জন্য না সেটা টের পেলাম রাতে। কোমরের ব্যথায় আর সোজা হয়ে দাঁড়ানোর উপায় নেই। জীবনে এই আমার প্রথম কোমর ব্যথা। পরদিন ইউনিভার্সিটির ফ্রি ক্লিনিকে গেলাম। ডাক্তার দেখে কিছু ব্যথার ঔষধ আর হট ওয়াটার ব্যাগ দিলেন। বললেন গরম পানির সেক নিতে। পরে যদিও ক্লিনিক থেকে নার্স কল করে জানাল যে আমার ময়েস্ট হিট নেয়া দরকার। মানে একটি একটি ভিজা কাপর কোমরে দিয়ে আর উপর হট ব্যাগ দিতে হবে। সরাসরি হিট শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এই ছোট্ট ঘটনাটি বাদ দিলে বাকি সব ভাল। বিপত্তি বাধে জানুয়ারিতে যখন এই শীতের দেশে আসল শীতের দেখা মেলে।   

আমেরিকা বিশাল দেশ। এর এক অঞ্চলে যখন মানুষ বরফ নিয়ে খেলে, বাচ্চারা বরফে খেলাঘর তৈরি করে, বরফে স্কি করে তখন অন্য অঞ্চলে মানুষ হয়তো খালি গায়ে ঘুরে বেড়ায়। আমেরিকার পঞ্চাশটি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে মিশিগান একটি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এই মিশিগানেরই এক প্রাচীন শহর ডেট্রয়েটে অবস্থিত। গাড়ি তৈরির বড় সব গাড়ি কোম্পানির কারখানা এবং হেড কোয়ার্টার এই মিশিগানে হওয়ায় একে বলে মোটর সিটি। নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এখানে কখনো হালকা আবার কখনোবা ভারি বরফ পড়ে। তবে ডিসেম্বরের থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়টাতে বরফ পড়ে খুব বেশি। বলব এমনই এক বরফ দিনের কথা। 

ডিসেম্বরে বড়দিনের ছুটি শেষ।  
শুধু শেষ নেই বরফের খেলা। ঝরছে তো ঝরছেই। ইউনিভার্সিটির ক্লাস শুরু জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে। তখনও কোন গাড়ি নেই আমার। বাসা নিয়েছি ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি এক ছোট্ট বাংলাদেশি অধ্যুষিত শহর হ্যামট্রামিকে। বাসা থেকে ইউনিভার্সিটির দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটারের মতো। ভাবছি যাবো কিভাবে। বাসে যাওয়া যায়। তবে মাঝে একবার বাস বদল করতে হয়।  সমস্যা হলো খুব বেশি বরফ পড়লে বাস সময় মতো আসে না। দুশ্চিন্তা সেখানেই। তবে হাতে ভালো আর কোন বিকল্পও নেই।   

জানুয়ারির সাত। আজ আমার উইন্টার সেমিস্টারের প্রথম ক্লাস। দাঁড়িয়ে আছি বাস স্টপে। দেশ থেকে নিয়ে আসা আঁটসাঁট জিন্স প্যান্ট, গায়ে উইন্টার জ্যাকেট এবং মাথায় ক্যাপ পড়ে। এই শীতের দেশে আজই হবে আমার প্রথম বাস ভ্রমণ। কিছুটা রোমাঞ্চিত। ভেতরে ভয়ও চলেছে সমান তালে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটি বাস মিস করেছি। অপেক্ষা করছি তাই পরের বাসের জন্য। বিশ মিনিট পর পর বাস। আমার আর সময় কাটে না। বাইরে তাপমাত্রা মাইনাস ১৭ সে.। শীতে বেশ কাবু হয়ে গিয়েছি দশ মিনিটের মধ্যেই। কাঁপছি থর থর। এক সময় বাস এলো। তবে গা গরম হওয়ার আগেই নেমে যেতে হলো পরের স্টপে বাস বদলের জন্য। আবার সেই দাঁড়িয়ে থাকা। 

অপেক্ষা আর অপেক্ষা। বারবার সময় দেখছি কখন বিশ মিনিট পার হবে। আমার সাথে আরো দুজন অপেক্ষায়। একপাশে মধ্যবয়সী একজন সাদা লোক। আমাকে দেখে বেশ লাপাত্তা ভাব । দেখে মনে হচ্ছে উনি জানতে চান - আদম তোমার বাড়ি কই! কিছুক্ষণ পর পর সিগারেট ফুঁকছে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে। আর তুষারপাত দেখছে কলোম্বাসের দৃষ্টিতে। আমার অন্য পাশে দাঁড়ানো একটি বেশ মোটাসোটা কালো মেয়ে। আমেরিকার এই ডেট্রয়েট শহরে আফ্রিকান বংশোদ্ভুত এই কালো মানুষ গুলোই সংখ্যা গরিষ্ঠ। তবে এদের অনেকেই আমাদের মতো এশিয়ানদের সগোত্রীয় এবং খুব আপন ভাবে। পাশে দাঁড়ানো এই মেয়েটি আমার দিকে তাকাচ্ছে একটু করুণার দৃষ্টিতে। হয়তো বুঝতে পেরেছে শীতে আমি বেশ বেকায়দায় আছি। তাছাড়া আমার গায়ের রঙ কালো হয়তো তাই একটু বাড়াতি দরদ।  জনাতে চাইলাম – 
: ডু ইউ হ্যাভ অ্যানি আইডিয়া হাউ লং উই হ্যাভ টু ওয়েট?   
: আই থিংক এনাদার টুয়েন্টি মিনিটস। উই অলরেডি স্পেন্ড টুয়েনি মিনিট। নো ওয়ারিজ। 
: হোয়াই সো লেট? 
: ইন স্নো স্টর্ম ইট হ্যাপেন্স অফটেন।  
আমার শরীর এই মধ্যেই অবশ প্রায়। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা। বাস স্টপের আশে পাশে কোন ষ্টোর নেই যে গিয়ে দাঁড়াব। শেষে উপায় না দেখে একটু দূরে একটি বারের দরজায় ধাক্কা দিলাম। কিন্তু সিগারেটের ধোঁয়া আর মদের ঝাঁঝালো গন্ধে আমার প্রায় বমির উপক্রম। শেষে আবার ফিরে এলাম বাস স্টপে। তবে এবার উল্টো পথে, বাসায়  ফিরে যাওয়ার স্টপে। দেখলাম আমার দেশ থেকে আনা পোষাকে মাইনাস বিশ ডিগ্রিতে ট্রাভেল করা সম্ভব নয়। আবারও দাঁড়িয়ে বরফে। মাঝে মাঝেই প্রচণ্ড ঠান্ডা দমকা বাতাস। মুখে কথা বের হচ্ছে না। গাল জমে গিয়ে শক্ত হয়েছে বরফের মতো। আমার পাশেই দাঁড়ানো মেয়েটিকে একটি চিরকুট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম-

আমি আর পারছি না দাঁড়িয়ে থাকতে। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারাব। যদি কোন দুর্ঘটিনা ঘটে, প্লিজ ৯১১ কল দিয়ে পুলিশকে আমার বাসার ঠিকানা এবং এই ফোন নম্বর দিও। 
বলতে বলতে যখন জমাট শরীর আমার যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছে ঠিক তখনই বাসের দেখা। যদিও আমার সাধ্য নেই বাসে উঠি। মেয়েটি এবং আর দু-একজন মিলে আমাকে ধরাধরি করে বাসে ওঠাল। কেউ কেউ মাসাজ দিল ঠান্ডায় জমাট মাংসপেশিতে। মনে হলো আমি ফিরে পেলাম এক নতুন জীবন। 

যখন বাসায় ফিরেছি তখন আকাশে ভরাট চাঁদ। 
চারদিক ফকফকে সাদা। মনে হয় অপূর্ব সাজে সেজেছে এই ধরা।

সাইফুল ভুঁইয়া
উইন্ডসর, কানাডা