অটোয়া, সোমবার ২৩ মে, ২০২২
একজন প্রবীনের সাথে সংলাপ – চিরঞ্জীব সরকার

     মাদের পাশের বাড়িতে একজন প্রবীন ব্যক্তি ছিলেন যার কিছু কিছু ব্যাপার আমাকে খুব আকৃষ্ট করত। একজন প্রবীন ব্যক্তি আসলে একটি প্রাচীন বৃক্ষের মত যে কিনা কালের সাক্ষী হয়ে  দাঁড়িয়ে থেকে কত শত ঘটনা  প্রত্যক্ষ করে। প্রাচীন একটি বৃক্ষের তলে ঘটা কত ঘটনার নায়ক নায়িকারা এ ধরাধাম থেকে   বিদায় নিলেও বৃক্ষটি কিন্তু  নব প্রভাতের নতুন  নায়ক নায়িকাদের নব নব ঘটনা এখনো দেখে চলেছে, আরো কত দেখবে। সাধারনত  আমাদের দেশের যেকোন নদীর খেয়াঘাটে বা গ্রাম্য হাট বাজারের কাছে অনেক বয়স্ক একটি বট গাছের দেখা মিলে। আমরা যখন স্কুলে পরতাম তখন আমাদের গ্রামের হাইস্কুলটার কাছেই একটা বিশাল বটগাছ ছিল। গাছটির নীচে একটি ছোট দোকান ছিল। আমাদের কাছে  তখন যে দুই এক টাকা  থাকত  তা দিয়েই ওই দোকানটি থেকে  লজেন্স, চানাচুর বা সামান্য একটু বিস্কুট কিনে স্কুলের সাথীদের সাথে গল্প করতে করতে খেতাম ওই বট বৃক্ষটির নীচের শীতল ছায়ায়। আবার স্কুল থেকে খানিকটা এগোলে বাইশারী বাজারের কাছে যে খালটি ছিল তাঁর অপরপারেও একটি বট গাছ ছিল। খেয়া পার হয়ে ওপারে গিয়েও মাঝে মাঝে  ওই গাছটিরও ছায়ার নীচে যখন দাঁড়াতাম তখন মনে হত এ ছায়া যেন সারা শরীরে  মমতা মাখানো এক শীতল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। সে বটবৃক্ষদুটি এখনো কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বছর দেড়েক আগে যখন আবার জীবন জীবিকার অমোঘ তাগিদে ঘর থেকে বহু  দূরে আসতে হল তখন আসার আগে আবারো আমি বৃক্ষদুটির কাছে গিয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে এসেছিলাম। গাছ দুটির ভরা যৌবন এখন আর নেই। মনে হচ্ছিল যেন একটা বৃদ্ধ শরীর নিয়ে কোনমতে বেঁচে   থাকার সংগ্রাম করছে আলো হাওয়া আর অনাবিল আনন্দ মিশানো এ বর্নিল পৃথিবীর একটি কোনে একটু মাটিতে।
     আমার প্রতিবেশী সে প্রবীন ব্যাক্তিটির নাম ছিল ডাঃ দিগেন্দ্র নাথ বসু। উনি পেশায় ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। ওনাদের মুল বাড়ি ছিল যেখানে থাকত সেখান থেকে কিছুটা দূরে। উনি প্রতিদিন সকালে ওখানে গিয়ে ওনার হাতে লাগানো গাছগাছালির পরিচর্যা করতেন। ওনার কাছে যখন ওই সময় কোন রোগী আসত তখন তাঁর নাতি নাতনিরা উচ্চস্বরে ডেকে বলত, ‘ও দাদু, রোগী আসছে’। ওনার অনেক নাতি নাতনি ছিল। ফোঁড়ার চিকিৎসায় ওনার বেশ সুনাম ছিল। অনেক দূর থেকেও এ ফোঁড়া ফাটানোর দাওয়াই নিতে ওনার কাছে রোগীরা আসত। আমি মাঝে মাঝে হঠাৎ করেই ওনার কাছে গিয়ে হাজির হতাম। তখন আমাদের দুজনের মাঝে বেশ আলাপ জমে উঠত। ওনার প্রধান যে বৈশিষ্ট্য ছিল সেটা হল সব কাজ উনি নিজ হাতে করতেন। উনি ডাক্তারীর বাইরে যে দুটি কাজ করতেন তার একটি হল গরু পালন  ও অন্যটি হল কৃষি। প্রতি শীতকালে দেখতাম উনি আলুর চাষ করছেন। নিজ হাতে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে জমি তৈরী করতেন। আর আমি ওনার এ কৃষিকর্ম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম আর খনার একটি বচন মনে মনে ভাবতাম যদিও বচনটিতে আলুর প্রসঙ্গে কিছু বলা হয়নি। খনার ওই বচনটি ছিল,’ষোল চাষে মুলা, তার অর্ধেক তুলা, তার অর্ধেক ধান, বিনা চাষে পান’। ভাবতাম পানচাষ কতই সহজ, জমিতে কোন চাষ দিতে হয় না। খনার বচন মোতাবেক পানের জমিতে আদৌ  চাষ না দিতে হয় কিনা জানিনা  তবে পানের বরজ দেখে আমার মনে হয়েছে এক একটা বরজ তৈরী করতে যথেষ্ঠ শ্রম ও যত্নের প্রয়োজন এবং বরজে পাটকাঠী পুতে প্রতিটি পানের লতাকেই ওটার সাথে সংযুক্ত করে রাখতে হয় যেটা জমি চাষের চেয়ে কম কষ্টসাধ্য নহে।
     ওনাকে আমি কোনদিন অসুস্থ হতে দেখিনি শুধুমাত্র মৃত্যুর সপ্তাহ দুই আগে ছাড়া। ওনার বয়স যখন সত্তর তখন আমার বয়স বার বা তের। উনি যখন একদিন ক্ষেতে কাজ করছিলেন তখন আমি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম আপনার এ বয়সেও যে এত সুন্দর স্বাস্থ্য এর পিছনে আসল কারনটা কি। উত্তরে তিনি যেটা আমাকে বলেছিলেন সেটা সবার জানা থাকলেও সেটা মানার লোক কিন্তু খুব একটা বেশী হবে না। উনি আমাকে বলেছিলেন, ’early to bed and early to rise, makes a man healthy, wealthy and wise’. আবার আমাকে একদিন উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন বিশ্রাম বা rest কাকে বলে। আমি বললাম যখন কেউ কোন কাজ করে না সেটাই হল বিশ্রাম। আমার এহেন উত্তর ওনার পছন্দ হল না। আমাকে বললেন, ’change of work is rest’-অর্থাৎ একটা কাজ শেষে অন্য একটা কাজে প্রবেশের মাঝখানে বিরতিটুকুর সময়টি হল বিশ্রাম। কথাটা মনে লেগে গেলেও এর বাস্তব প্রয়োগ এখনো করতে পারিনি, আগামী দিনগুলিতে পারারও সম্ভাবনা একেবারে শূন্যের কোঠায়।
     যে লোকটা সারাদিন এরকম শারিরীক পরিশ্রম করত সন্ধ্যার দিকে আবার দেখতাম তিনি বিছানাটায় মশারীটা টানিয়ে শুয়ে পড়েছেন। তখন উনি শুয়ে শুয়ে বিবিসির সংবাদ শুনতেন রেডিওতে। ওনার একটি বেশ বড় সাইজের রেডিও ছিল। তখনকার সময় গ্রামে টেলিভিশন তো দূরের কথা দু একটা বাড়িতে রেডিওরও দেখা মেলত না। ওনার মশারী ফেলানো খাটের এক কোনে বসে আমিও মাঝে মাঝে বিবিসির সংবাদ শুনতাম। ফ্রিকোয়েন্সীর ওঠা নামার কারনে মাঝে মাঝে রেডিওতে কোন শব্দই শোনা যেত না। ওনার রেডিওটা আবার কেউ ধরতে পারত না। শুধু রেডিও কেন ওনার কোন জিনিসই কাউকে ধরতে দিত না। ওনার খাটের কাছেই ছিল একটা লোহার ট্রাঙ্ক। ওটার ভিতরই উনি ওনার অষুধের বাক্সটি সহ  যাবতীয় ব্যবহার্য জিনিস ঢুকিয়ে রাখতেন। এছাড়াও দৈনন্দিন কৃষি কাজের জন্য লাগে এরকম দা, কোদাল,খন্তা এসবও উনি কাউকে ধরতে দিত না। এমনকি ওনার ছেলেমেয়েদেরও না। ওনার পুত্রবধুরা দেখতাম ওনার জন্য চা বানিয়ে একটি বড় ফ্লাক্সে রেখে দিত। ফ্লাক্স থেকে ঢেলে ঢেলে বেশ আয়েশের সাথে উনি চা পান করতেন। এছাড়াও একটা কৌটার ভিতর ওনার জন্য সুন্দর করে পানের খিলি বানিয়ে রাখা হত। পান খাওয়া প্রসঙ্গে উনি একদিন আমাকে বললেন আহারের পর শুধুমাত্র নাকি একটু পানের পাতা চিবালে শরীরের জন্য তা খুবই উপকারী। তবে পান বলতে এখানে কেবলমাত্র বিশুদ্ধ পানকেই বোঝাচ্ছে, পানের সাথে চুন, সুপারী বা জর্দা খাওয়া নয়। এ বিষয়টিকে তিনি অনুপান বলে আখ্যায়িত করেন। পানের এ উপকারিতার কথা নাকি ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় বলে গেছেন ওনার ভাষ্যমতে। বৃটিশ আমলে উনি একটা সময় কোলকাতার একটা কোম্পানীতে চাকুরী করতেন। সে কোম্পানীর সাহেবদের গল্পও মাঝে মাঝে আমাকে করতেন।
     সবাই ওনাকে ডাক্তার দাদু বলেই জানতেন। একটা ঘড়ি, একটা ফ্লাক্স, একট রেডিও, একটা খাট, একটা ঔষধের বাক্স দিয়ে কি সুন্দর একটা শান্তিপূর্ন জীবন তিনি কাটিয়ে দিলেন। কখনো কোন কিছুর জন্য তাঁকে হাহাকার করতে দেখিনি। অল্প জিনিসেও যে মহাতৃপ্তি নিয়ে একটা শান্তিপূর্ন জীবন অতিবাহিত করা যায় তা ওনার জীবনটাকে দেখেই ছোটকালে প্রত্যক্ষ করেছি। আসলে আশার পাত্রের তলায় যদি ছিদ্র থাকে সে পাত্রে আমরা যত কিছুই ঢালি না কেন কোনদিন তা পূর্ন হবে না। কিন্তু যাঁদের এ পাত্রটায় কোন ছিদ্র নেই তাঁদের আশার পাত্রটি খুব সহজেই ভরে যায়। নিজের পাত্র ভরা থাকলে তবেই সেখান থেকে অন্যকে কিছু ঢেলে দেয়া যায়। আমাদের গ্রামে যখন আশির দশকে ‘সৈয়দ বজলুল হক কলেজ’ নামে একটি নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় তখন কলেজটির জন্য তিনি তাঁর জমি দান করে দেন। কলেজটির নতুন ভবনের বিজ্ঞানাগারটি নাম তাঁর নামে করা হয়েছে। এখন বাড়িতে গেলে চারদিকে শুধু শূন্যতা অনুভব করি। পুরানো মুখগুলির আর কাউকে দেখতে পাই না। এ পৃথিবী ছেড়ে তাঁরা একে একে সবাই চলে গেছে। তবুও আমি বাড়ি গেলে এ সমস্ত স্মৃতিবিরজিত জায়গাগুলির কাছে গিয়ে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে তাঁদের কথা আপনমনে ভাবতে থাকি। আর মনে মনে ভাবি আমিওতো একদিন হারিয়ে যাব সুন্দর এ পৃথিবী থেকে যেমনটি হারিয়ে গেছে ডাক্তার দাদুর মত যাঁরা যাঁদেরকে নিয়ে এখন আমি ভাবছি।

চিরঞ্জীব সরকার। কানাডা