অটোয়া, শুক্রবার ২০ মে, ২০২২
প্রথম দেখা - অর্পনা শীল

     দীর্ঘ এক যুগের প্রতীক্ষার অবসান হল, আজ তাও এভাবে। অবশেষে দেখা হল অয়নের সাথে। আদ্রিতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল যদি খুঁজে পায় কোনও পথের একটু চেনা চিহ্ন।
     অয়ন তখন ২৪ বছরের তাগড়া তরুণ। দাপিয়ে বেড়ানো সময় গুলোতে সে হাত বাড়িয়ে ছিল বোবা ডায়রির পাতায় স্মৃতিচিহ্ন হতে। হয়তোবা...
     সালটা ২০০৮। জীবনের প্রয়োজনে বিশ কিলো দূরের স্কুলে চাকরি করত আদ্রিতা। পাশাপাশি পড়াশুনা তাই নিজেকে চারপাশে তাকানোর সময় হতো না খুব একটা। নিজের ক্যারিয়ার এর বাইরের পৃথিবীটা খুব একটা দেখেও দেখে না সে।
     এরি মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল স্কুলের কাছের বাড়ির সমবয়সী কলেজ পড়ুয়া একটি মেয়ের সাথে। নাম তাজিন। প্রায়ই টিফিন টাইমে দুজন চুটিয়ে গল্প করত। টিফিন ভাগাভাগিও হত। যদিও তাজিন আপু বলেই ডাকত আদ্রিতাকে।  
     একদিন তাজিন একটা ছেলের গল্প শোনায় আদ্রিতাকে। ছেলেটা প্রতিদিন একটা মেয়েকে ২০ কিলো রাস্তা বাইকে ফলো করে আসে যায়। কিন্তু মেয়েটার সামনে যেতে সাহস হয়নি আজও। গল্পটা তার ভাইয়ের কাছে শোনা। ছেলেটা তাজিনের ভাইয়ের ব্যবসায়িক পাটনার। আর সব শেষে এটাও বলে যে ফলো করা মেয়েটা আদ্রিতা স্বয়ং। একগাল হেসে আজগুবি বলে উড়িয়ে দেয় আদ্রিতা।
     হেসে উড়ানো কথাটা প্রমাণ দিতে পরদিন এক তোড়া ফুল আর চিরকুট। নামহীন চিঠিতে কিছু প্রেম প্রেম অনুভূতি ঝড় সড় হয়ে আছে। সাদা জামাটায় তোমাকে বেশ লাগছিল। সত্যিই সে সেদিন সাদা জামাই পরেছিল। একটু ভড়কে গেল আদ্রিতা।  
     পরদিন চকলেট। এভাবে ডায়রি, কলম মাঝে মাঝে ই আসতে লাগল। সাথে তাজিনের হাসি ঠাট্টা তামাশা তাকেই ঘিরে এক উন্মাদনা তৈরি  হল। 
     এতে আদ্রিতার মনের পরিবর্তন খুব একটা না হলেও আজগুবি গল্পটার অস্তিত্ব  একটু একটু করে টের পেতে লাগল। 
     ব্যপারখানা বুঝতে বুঝতে চলে এসেছে অনেকদুর। আজকাল বাসস্ট্যান্ড এ এলেই চারপাশে কাউকে খুঁজে  সে। যেন কেউ কোথাও তাকে দেখছে। পথ চলতে কেমন যেন ঘোরের  মধ্যে সব  গুলো মুখ দেখতে থাকে। এ নয়তো... পরক্ষনে ছি ছি এ আমি কি ভাবছি।
     মাস খানেক পরের কথা। বিকেলে তাজিনের ফোন এল। বাবার ফোন  নাম্বারটা  চাই। কারন হিসেবে জানায় উনি চেয়েছেন। মানে যিনি ফুল পাঠায়... তার মা বাবাকে দিয়ে প্রপোজাল পাঠাবেন। খানিকটা চমকে উঠে। এখন বিয়ে… সম্ভব নয়। ওকে খানিকটা ধমকও ধেই। তবুও কেন জানি ফোন নাম্বারটা মেসেজ করি। বাবার কাছে ফোন আসে। জানতে পারি ওরা চট্টগ্রামে থাকে। বাবামার একমাত্র সন্তান। পড়াশুনা শেষ করতে পারেনি। নিজেদের ব্যবসা দেখে। সেই সুত্রে এদিকে আসা যাওয়া। তাজিনের বাবাই প্রস্তাবটা দেয়।
     পাহাড়ি নদীর কুলে শ্রাবন বেলায় বসন্ত দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষায়। নিজের এই ফিলিংসটা  ঠিক বুঝতে পারে না আদ্রিতা। ভাললাগা, বিরক্তি   কৌতূহল, মিলেমিশে একাকার। কয়েক দিন হল তাজিনের দেখা নেই। স্কুলে  এসে খবর পাঠায়। তাজিন আসল। একটু অন্যরকম  লাগছে। চোখ ছলছলে, মুখটা গম্ভীর। অয়ন ভাই আর নেই আপু।   
     কি?
     হউম। গত রোববার জিইসি মোড়ে বাইক এক্সিডেন্টে  মারা গেছে। স্পট ডেথ। সোমবার তোমাদের ওখানে যাবার কথা ছিল। বাবামাকে আনতে গেছিল।
     আদ্রিতা কিছুক্ষন  বসে রইল অসাড় এর মত নিরবে। কিছুক্ষন পর চেয়ার ছেড়ে  উঠে এল দোতলার খোলা বারান্দায় একা। উদাস আকাশে তাকিয়ে রইল হয়তো জল দুফোটা লুকোবে বলে। মন গরিমায় নিরালা প্রান্তরে শুধু ছায়াই মেখে গেল। অচেনা অজানা মানুষটা কল্পনায় থেকে গেল গভীর দাগ কেটে। আজ অয়নের মুখটা খুব দেখতে ইচ্ছে করল। অথচ কতবার এক সঙ্গে কফি খেতে খবর পাঠিয়ে ছিল। ভেতরে ভেতরে তাকে  দেখার অতৃপ্ত  আকুলতাই আজ আদ্রিতার হৃদয়ে একটু জায়গা করে দিল অয়ন। হয়ত চিরদিনের জন্য। 
     আজ আদ্রিতা ব্যাংকের অফিসার। লোন সেকশান দেখে। পোস্টিং চট্টগ্রাম। একটা হাউজ লোনের খেলাপির বাড়ি ব্যাংক কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হবে। সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দাখিলের দায়িত্ব পড়েছে তার উপর।একটা দোতলা বাড়ি। খনিকটা পুরোনো। পলেস্তারা খসে পড়েছে কোথাও কোথাও। দরজা নক করতেই সত্তরোর্ধ এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন। ঘরে নিয়ে বসালেন। খুব মায়া লাগল কেন জানি দেখে। ছল ছল চোখে না চাইতেই নিজের জীবনের করুণ কাহিনী বলে গেলেন। একমাত্র সন্তান হারানোর গল্প...যার কিছুটা তার চেনা লাগল। কথার শ্রাবনে ভেসে দীর্ঘ সময় পর আদ্রিতা বলে উঠল–
     মাগো আপনার ছেলের কোন ছবি আছে? আমি কি দেখতে পারি?
     হ্যাঁ।
     এই বলে ছেলের ঘরে নিয়ে গেলেন আদ্রিতাকে। দোতলার আলোবাতাস পূর্ণ ঘরটা ছেলের আসবাব দিয়ে যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছেন। সাথে দেয়ালে লাগানো বাইকে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো একটা ছবি।
     এই আমার সেই অচেনা অজানা প্রেমিক। চুপ্সানো অভিমানেরা ভাষাহীন ত্রুর মত হৃদয় মোড়কে জমানো কত কথা বলতে চাইল। তোমাকে দেখার তৃষায় এক যুগ হেঁটে গেছি।
     এই আমাদের প্রথম দেখা।।

অর্পনা শীল। বাংলাদেশ