অটোয়া, শনিবার ২১ মে, ২০২২
বেলা সাঁঝের পাণ্ডুলিপি (এক) - দীপিকা ঘোষ

    কার্তিক মাসের শেষ বিকেলে হঠাৎ এক ঝটকা ঝড়বৃষ্টিতে বদলে গিয়েছিল বৈরাগী প্রকৃতির চেহারা।  রোদহীন বিষণ্ন পরিবেশ পরিপুষ্ট বেদনা নিয়ে গলে পড়ছিল সবখানে।  আকাশের কোণে কোণে কালো মেঘের আনাগোনা ইতিউতি তখনো উড়ছিল।  প্রতাপ নিজের ঘরে বিছনায় শুয়ে রোজকার অভ্যাসমতো গভীর মনোযোগে ডায়েরি লিখছিলেন।  জানালার পাশে বার্ধক্যে পা রাখা এক দেশি আমড়ার গাছ।  নড়বড়ে জীবনের সাক্ষী হয়ে বেঁচে রয়েছে আজও।  তার শীর্ণ ন্যাড়া ডালে অনেক সময় ধরে থেমে থেমে কাতরস্বরে একাকী একটি ঘুঘু ডাকছিল।  উদ্বেলিত বাতাসের হুহু করা শব্দের মতো তার বিষাদযন্ত্রনা আছড়ে পড়ছিল প্রতাপের মর্মে এসে।  শুনতে শুনতে লেখা থামিয়ে পাখিটিকে একবার পলকহীন নিরীক্ষণ করলেন প্রতাপ।  অস্ফুটে বললেন– 
     তোর দেহমনও কি বাধর্ক্য ছুঁয়েছে নাকি আমার মতো? বড় নিঃসঙ্গ লাগছে বুঝি? তাই এত চেনা-চেনা লাগছে তোর আকুতিকে?
     তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওই সঙ্গেই চোখে পড়েছিল ডালের শেষ প্রান্তে এক নিঃসঙ্গ হলুদ পাতা ঝিরিঝিরি হাওয়ায় অসহায় হয়ে কাঁপছে। যেন বৃন্ত থেকে খসে পড়ার সীমাহীন ভয় অস্থির করেছে তাকে। বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে প্রতাপ তাই লিখলেন– 
  Dancing with death! মৃত্যুর সঙ্গে নৃত্য! গাছের বিবর্ণ পাতা জীবনের সাঁঝবেলায় মৃত্যুর সাথে অস্থির হয়ে লড়ছে! মৃত্যুর পরশ পেয়েই কাঁপছে নাকি থরথরিয়ে? বার্ধক্য মানেই কি রোজ-রোজ মৃত্যুর সঙ্গে নৃত্য করা? ‘আমি মরণের সাথে খেলিব আজিকে ঝুলনখেলা নিশীথবেলা’, কবিগুরু বলেছিলেন। কে যেন লিখেছিলেন সেই চিরকেলে কথাটা - Old age is an Island surrounded by death?  তাই বুঝি দেহ যত হালকা হয়ে পড়ে, মন ততো বিগলিত হয় বারবার? মৃত্যু কি শেষে এভাবেই গ্রাস করে পার্থিব দেহটাকে? কারণ জড়দেহটারই তো কেবল মৃত্যু হয়! কিন্তু কে তাকে বিগলিত করে বিষণ্ন অনুভবের পরশ দিয়ে? কে জাগায় এভাবে ভয়ের শিহরণ?  বিছানার একপাশে ছোট্ট একটি চাপ পড়লো। কাঁধ ঘুরিয়ে উঠে বসলেন প্রতাপ। মনীশ ত্রিবেদী গম্ভীর মুখে নিঃশব্দ পায়ে কখন যেন প্রবেশ করেছেন। অসময়ে তাঁর উপস্থিতিতে বিস্ময় নিয়ে তাকাতেই মনীশ বললেন– 
     এত মনোযোগ দিয়ে কী লিখছিলেন দাদা? অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম পাশে এসে! মনে হলো হয়তো অসময়ে এসে পড়েছি! ফিরে যাই! কিন্তু তারপরই মনে হলো, নাঃ! এলামই যখন আপনার কুশল সংবাদটা একবার না হয় জেনেই যাই! 
     ভালো করেছেন! আমার মনটাও কেমন উতলা হচ্ছে আজ! কথাবার্তা বলে একটু হালকা করা যাক!
     মনীশ চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন–
     খবর শুনেছেন?
     কোন খবর? 
     দিলদার স্যারের ছোট ছেলের? বখে গিয়ে সীমা ছাড়িয়েছিল!  আজ সকালে দু’খানা রিভলবারসুদ্ধ পুলিশ অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেল! স্যার নিজেই ফোন করে ধরিয়ে দিয়েছেন! যাবার আগে রাগের মাথায় ঘুষি মেরে সে বাবার নাক ফাটিয়েছিল! ভাগ্যিস রিভলবার চালায়নি! দুপুরবেলা তাই হাসপাতাল থেকে ফোন করেছিলেন স্যার! এখন সেখান থেকেই এলাম!
     এখন ঠিক আছেন তো? প্রতাপের দু চোখে উদ্বিগ্নতার আগুন ফুলকি হয়ে উড়লো। 
     হ্যাঁ দাদা! অল্পের ওপর দিয়ে গেছে! 
     যাক, তবু ভালো! দিলদার সাহেবের কাজটা অনেক আগেই করা উচিৎ ছিল! এতটা বাড়াবাড়ি তাহলে হয়তো বা হতো না! রাহাজানি, খুণ, মানুষের বাড়ি ডাকাতি, ব্যাংক লুট কিছুই তো বাকি রাখেনি শুনেছি!
     সে ফিরিস্তি অনেক লম্বা দাদা! বহু জন্মের পাপ থাকলে ঘরে এমন কুলাঙ্গার জন্মায়! আজ ঘরে অত্যাচার সইতে না পেরে স্যার পুলিশ ডাকতে বাধ্য হয়েছিলেন!  কিন্তু এমন ঘটনায় স্যারের স্ত্রী বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন!  ছেলে জেল থেকে ছাড়া না পেলে কক্ষনো নাকি ফিরবেন না আর!
     এই তো আমাদের জীবন মনীশবাবু! We are the makers of our own destiny!
     ঠিকই বলেছেন! অনেক বড় বিপদেও স্যারকে কখনো কাঁদতে দেখিনি! আজ মনে হলো বড় একা হয়ে গেছেন! আমার হাত ধরে হাউহাউ করে কাঁদলেন অনেকক্ষণ! বললেন, রাগে-অভিমানে ছেলেটাকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে বড় অন্যায় করেছি! কেউকাটা কাউকে ধরে দেশের বাইরে যদি ওকে পাঠিয়ে দিতে পারতাম! আপনার চেনাজানা কেউ আছেন মনীশ স্যার? জেল থেকে ছাড়িয়ে আনা গেলে হয়তো প্রাণে বেঁচে যেত ছেলেটা!
     প্রতাপ মাথা নাড়লেন–
     কিন্তু বাইরে গিয়ে আর ক্রাইমে জড়াবে না, তারও তো নিশ্চয়তা নেই! আছে কি? 
     ঠিক কথা! তবে আমার সে রকম কেউ জানাশুনো নেই, স্যারকে তাই আশ্বাসও দিতে পারিনি! কাকেই বা বলবো? আপনার কি সেরকম কেউ…?
     নাঃ! সে রকম জাঁদরেল কেউ নেই মনীশবাবু, যাকে ধরলে…!
     তাছাড়া দাদা, এসব ব্যাপারে কাউকে কি অনুরোধ করা যায়, বলুন তো?
     প্রতাপ উত্তর দিলেন না দেখে মনীশ এবার বললেন–
     কী কপাল দেখুন!  তিন তিনটে ছেলের কেউই বাবার সৎ গুণগুলো পায়নি! মেয়েরাও নাকি বিয়ের পরে সুখে নেই! বড়টা নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিল! বছর দুই আগে স্বামীর ঘর ছেড়ে তিন মেয়ের হাত ধরে স্যারের কাছে এসে উঠেছে! ছোটটাও কলেজ পালিয়ে বিয়ে করেছিল কোন এক কুখ্যাত মাস্তানকে! সেই মাস্তানও ছ’মাস আগে এক অপরাধের সাজায় পাঁচ বছরের জন্য জেলে ঢুকেছে! এসব খবর আজই প্রথমবার শুনলাম!
     কী করে শুনবেন? বলার মতো খবর তো নয় মনীশবাবু! এখন অসহায় হয়েছেন, স্বপ্ন মরে গেছে! তাই সত্য লুকিয়ে রাখার অহংকারও বেঁচে নেই! মানুষের জীবনে সেটাই স্বাভাবিক!
     সত্যি দাদা, কেউ সুখে নেই দেখছি! এতকাল সন্তান না থাকায় কষ্ট পেয়েছি।  আজ মনে হচ্ছে, একদিক থেকে বড় বাঁচা বেঁচে গিয়েছি! পৃথিবী যখন ছাড়বো, তাদের দুঃখের বোঝা পেছন থেকে অক্টোপাসের মত পায়ে পায়ে জড়িয়ে ধরবে না!  দিলদার স্যারের অবস্থা দেখেই বুঝেছি, ছেলেমেয়েরা নিজের দুঃখে যতটা কাতর হয়, তার চেয়ে ঢের বেশি দুঃখ বাজে বাবা-মায়ের বুকে! 
     প্রতাপ চ্যাটর্জি, মনীশ ত্রিবেদী, দিলদার হোসেন আর জগদীশ ডি’কোস্তা ছেলেবেলাকার বন্ধু নন। প্রৌঢ়ত্ব ছাড়িয়ে বার্ধক্যের কোঠায় পা রাখার পরে মনের এক বিশেষ অবস্থায় তাঁদের বন্ধু হয়ে ওঠা। প্রতাপ বিপত্নীক হয়েছেন কুড়ি বছর আগে। ডি’কোস্তা চিরকুমার। মনীশ সন্তানহীন। দিলদারের পাঁচ ছেলেমেয়ে জীবনভর অপমানের যন্ত্রনা ছাড়া তাঁকে প্রশান্তি কখনো দেয়নি। এঁরা প্রত্যেকেই চাকরি জীবনে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন। আপাতত সবাই অবসরপ্রাপ্ত। প্রতাপ তেয়াত্তরে পা রেখেছেন মাসখানিক আগে। কয়েকদিন আগে বাহাত্তর পেরিয়েছেন দিলদার আর জগদীশ। মনীশ অগ্রহায়ণে বাহাত্তর পূর্ণ করবেন। প্রতাপ চ্যাটার্জিকে দিলদার এবং জগদীশ ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করলেও মনীশ শুরু থেকে ‘দাদা’ বলে ডাকেন। প্রতাপ অবশ্য জগদীশবাবু, দিলদার সাহেব এবং মনীশবাবু ডাকতেই অভ্যস্ত। চ্যাটার্জির বাড়িতে প্রতি সপ্তাহেই চার বন্ধুর গল্পের আসর জমে প্রত্যেকের গরজে। তাঁর বাড়িকে বেছে নেয়ার কারণ প্রতাপের পুত্র এবং পুত্রবধূর আচরণ এ ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত অসংযত হয়নি কখনো। অতএব প্রাচিন গ্রীসের আড্ডাখানায় যেমন স্কলারদের আড্ডা জমে উঠতো সভ্যতার নানা দিকের আলাপ আলোচনা নিয়ে, এই আসরেও তেমনি কথামালার রসে সবার জ্ঞানতৃষ্ণা মেটে। জ্ঞানসরোবরে ডুব দিয়ে প্রত্যেকেই নিজের মতো করে মনের স্বাস্থ্য অটুট রাখার টনিক খুঁজে পান। চলবে...

দীপিকা ঘোষ। ওহাইয়ো, যুক্তরাষ্ট্র