অটোয়া, বুধবার ২৮ জুলাই, ২০২১
দুজনেই গলি তবে দুটি ভিন্ন ধারায় – চিরঞ্জীব সরকার

র্তমান ভোগবাদী সমাজে মানুষকে ভোগের নেশায় এমন পেয়ে বসেছে যে সে ভুলতে বসেছে দীর্ঘমেয়াদে কোনটি ভাল আর কোনটি মন্দ। ভোগের বিলাসীতার চেয়ে ত্যাগের মহিমা অনেক বেশী গৌরবান্বিত। তৃপ্তিও অধিকতর। একটি আম নিজে নিজে খেয়ে ভোগ করা যায়। আবার সে আমটি ত্যাগের মহিমায় অনেকগুলি টুকরো করে সকলে মিলেও খাওয়া যায়। পুরোটা একলা ভক্ষনে যে স্বাদ তাঁর চেয়ে বহুজনকে বিতরন করে এক টুকরো খাওয়ার স্বাদ কোন অংশে কম নহে। বরংচ এখানে পাওয়া যায় অনাবিল এক পরিতৃপ্তি। পৃথিবীর সবার  সমস্ত মৌলিক প্রয়োজন মিটানোর সামর্থ্য এ পৃথিবীর থাকলেও একজন লোভী মানুষের চাহিদা মিটাতে সে অসমর্থ। কারন একজন লোভীর লোভ সর্বদা বাড়তে থাকে। সে শুধু পেতে চায়। তাঁর মানসে শুধু একটাই চিন্তা কিভাবে সে ভোগ করবে। আর এ বল্গাহীন ভোগের দৌড়ে সামিল হয়ে মানুষ আজ একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। হট সেল এখন ডিপ্রেশনের ঔষধ।

মানুষতো বুদ্ধিমান, সৃস্টির সবচেয়ে সেরা জীব। তাঁরতো এরকম দূর্দশায় পতিত হওয়ার কথা নহে। এ দূর্দশার কারন সে লোভের ট্রাপে পড়ে গেছে। একটা মার্কেট প্লেসে যদি এক বস্তা চাল ঢেলে রাখা হয় তবে নানান জাতের প্রানী এসে সে চাল খেয়ে চলে যাবে, কিন্তু একজন মানুষ আসলে পুরো বস্তার চাল একাই তুলে নেবে অন্য কোন মানুষের কথা বিন্দুমাত্র না ভেবে। এটা সে করে লোভের বশবর্তী হয়ে এবং এখান থেকেই তাঁর দুঃখ-দূর্দশার শুরু হয়। জীবজগতে মানুষ বাদে অন্য কোন প্রানী প্রয়োজনের অতিরিক্ত সঞ্চয় করে রাখে না। একটা পিপড়েকে কখনো দুটো গ্রেইনকে সঙ্গে নিয়ে চলতে দেখা যায় না। এমনকি বাঘ সিংহের মত হিংস্র প্রানীকেও একসাথে দুটো শিকার ধরতে সচরাচর দেখা যায় না।

মানুষ যখন সহজ সরল জীবন যাপন করে অল্পতে তুষ্ট থাকত তখন তাঁর কপালে এরকম দূর্ভোগ ছিল না। কিন্তু মহাশক্তিশালী কনজিউমারিজমের তীব্র স্রোত একবিংশ শতকের এ গ্রহের মানুষদের ভাসিয়ে নিয়ে বড় বড় শপিংমলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিলবোর্ডের আকর্ষনীয় আহ্বানে মোহিত হয়ে শপিংকে সে মনে করে মোক্ষলাভ। শপিং এর জন্য প্রয়োজন থিক ওয়ালেট বা থিন ক্রেডিট কার্ড। এখন এটি সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন মানি। আর মানির জন্য কর দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম। এ ভিসিয়াস সার্কেলে পড়ে সমাজের বিরাট একটা অংশ মানসিক অসু্স্থতায় ভুগছে। এ থেকে আপাত পরিত্রানের কোন উপায় না পেয়ে অনেকেই হতাশায় হাবুডুবু খাচ্ছে।

ভোগ তো দোষের কিন্তু নয় কিন্তু সমস্যটা অতি ভোগের আসক্তি। একবার একটি লোভী মাকরশা একি দিনে চারটি দাওয়াত পায়। মাকরশা চিন্তা করল কোন দাওয়াত মিস করা যাবে না। সে তাঁর শরীরের সাথে চারটি দীর্ঘ সুতা বেধে তাঁর চার ছেলেকে পাঠিয়ে দিল দাওয়াত করা চার বাড়িতে এবং বলল যখনি খাওয়া সার্ভ করা শুরু হবে তখনি যেন সুতা ধরে টান দেওয়া হয় যাতে সে গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে সে বাড়িতে রওহনা হতে পারে। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক ভাবে সেদিন চারটি বাড়িতেই একি সময় খাওয়া সার্ভ করা শুরু হলে মাকরশার চার ছেলে একি সময় সুতা ধরে টান দেয় এবং মা মাকরশার দেহটি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। চার বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার স্বাদ তাঁর আর হল না। আমাদেরকেও মনে রাখতে হবে মৃত্যু নামক এক অদৃশ্য সুতায় আমরাও বাঁধা। মাকরশাটি খেতে যাবার অবকাশ পায়নি কিন্তু আমরা খেতে বসলেও মৃত্যু নামক এ অদৃশ্য সুতাটিতে টান পড়লে খাওয়া রেখেই আসর গুটাতে হবে। অতিভোগ আসলে একটা রোগ যেটা থেকে পাপের বিষক্রিয়া শুরু হয় এবং সমাপ্তি ঘটে বিনাশে।

এ অতিভোগবাদ একধরনের  স্বার্থপরতার রোগ। রোগটাকে অনেকটা আইসক্রিম খাওয়ার সাথে তুলনা করা যায়। একজন মানুষ একটা আইসক্রিম কিনে নিজের মুখে পুরে দেয়। একজনি শুধু তৃপ্তির ঢেকুর তুলে। একাই সব কিছু খাব,একাই সব কিছু করায়ত্ত করব,একা আমিই সবচেয়ে সুখী থাকব। এটা স্বার্থপর আইসক্রিম ফিলসফি,  এটা একজনের মুখেই গলে অন্তিমে বিলীন হয়ে যায়। আইসক্রিম অন্যের কথা ভাবে না।  তাঁর স্বার্থপর ভাবনা এককেন্দ্রিক। তাঁর যাত্রাপথ ফ্রিজ টু মাউথ। সে ব্যক্তির সেবায় ব্যস্ত, সামগ্রিক সেবার ধারনা তাঁর ডিকশনারিতে নেই।

অন্যদিকে এ রোগের প্রকৃত চিকিৎসার ধারনা ক্যান্ডেল বা মোমবাতি থেকে পাওয়া যেতে পারে। ক্যান্ডেল গলে যায় আলো জ্বেলে জ্বেলে। অন্ধকারকে সে দূর করে দেয়। তাঁর আলোয় শুধুমাত্র একজন দেখে না সেখানে সমবেত সকলের দেখার জন্য তাঁর জ্বলা। একটি ক্যান্ডেল নিভে যাবার আগে শত ক্যান্ডেল প্রজ্বলিত করে রেখে যেতে পারে যেটি মূল ক্যান্ডেলটির মত সমনভাবে আলো বিতরনে সক্ষম। পরার্থে ক্যান্ডেল গলে যায় হাসতে হাসতে অসংখ্য মুখে হাসির আলোক বিলায়ে।

চিরঞ্জীব সরকার। কানাডা