অটোয়া, বুধবার ২৮ জুলাই, ২০২১
অনুশীলা - সুদীপ্ত ঘোষাল

     নুতোষ রায়, একটি নামী পাখা কোম্পানীর ম্যানেজার এবং সখের লেখক ও বটে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে লেখা দিয়ে বাহবা, সম্মান টুকটাক পেয়েছেন এবং হয়তো পাবেন ও। তা, তিনি পড়েছেন এক সমস্যায়। অনলাইনে একটি গল্প প্রতিযোগীতাতে ওনাকে লেখা দিতে বলা হয়েছে যার বিষয়বস্তু হলো "ভাঙ্গা হৃদয়।" কিন্তু এক বিপত্তির সম্মুখীন উনি। একটা লাইন ও লিখতে পারছেন না। এক এক সময় কিছুই বের হতে চায় না মাথা থেকে। তখন অসহায়ের মতন ছঠফঠ করতে থাকেন উনি। সিগারেটের পর সিগারেট জ্বলে শেষ হয়ে যায়। ওনার গিন্নী পাশের ঘরে দৈনিক সিরিয়াল ভক্ষণে ব্যস্ত। বাস্তবিক ই উনি সিরিয়াল দেখেন না, গলাধঃকরন করেন। এ হেন উমা দেবী মানে অনুতোষ বাবুর অর্ধাঙ্গিনী, অনুতোষবাবুর এই lockdown condition টা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন। মাঝে মধ্যে টিপ্পনী কাটতেও ছাড়েন না। আজ যেমন বললেন "কি গো, লেখা আসছে না মাথাতে? তাহলে একটু বসে সিরিয়াল কটা দেখলেই তো পারো? হয়তো কোন প্লট খুঁজে পেলেও পেতে পারো।" বলে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে উদ্গত বিপুল হাসিরাশির বেগ সম্বরন করেন। আর অনুতোষ বাবু, স্ত্রীর প্রতি এক দারুণ অগ্নিবান হেনে ব্যালকনি তে এসে সিগারেট এ অগ্নি সংযোগ করলেন।
     বাইপাসের ধারের এই ফ্ল্যাটের ব্যালকনি তে দাঁড়ালে সময় কোথা থেকে কেটে যায় বুঝতেও পারেন না অনুতোষ বাবু। তীরবেগে ধাওয়া গাড়ীগুলোকে দেখলে জীবনের গতিময়তার ছবি টা কেমন যেন ষ্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয় লেখক অনুতোষ বাবুর মনে। নীচে কারোর কথা শোনা যাচ্ছে। তিনি কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করতে থাকেন, যদি কিছু লেখার রসদ মেলে ওখান থেকে? গরজ বড় বালাই যে।
     কলিং বেলটা এমন ভাবে বেজে উঠলো, যে সব চিন্তা ভাবনার জাল ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই করে দেয় সুচিশীলার। বিরক্তি নিয়েই দরজা খুলেই চমকে যায়। দেখে সামনে দাঁড়িয়ে অনু, অনুতোষ। বিরক্তি কে না সরিয়েই ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে "কি ব্যপার তুমি এখানে? আরো কিছু জানার বা জানানোর বাকী রয়ে গিয়েছে নাকি? সব ই তো চুকে বুকে গিয়ছে আজকের সন্ধ্যেতে, তবে কিসের জন্য এখানে আসা?" শীলা মনে মনে একটু সংযত হল এই ভেবে যে সম্পর্কটা শীলার দিক থেকে ভাঙ্গা হয়েছে। তাই অনুতোষকে এত কথা না বললেই পারতো।
     ইচ্ছে না থাকলেও অনুতোষকে ভিতরে আসতে বলে শীলা। বলে "যা বলার তাড়াতাড়ি বলে ফেল, মা-বাপী একটু পরেই ফিরবে।" একটা কাঁচা মিথ্যে কথাকে কেমন ভাবলেশহীন হয়ে বলে দেয় শীলা। তার মানে অভিনয়টাও রপ্ত করে ফেলেছে এতদিনে। ওর মা-বাপী কোলকাতার বাইরে গিয়েছে নিমন্ত্রন খেতে। আসবেন দুদিন পরে। তার মানে অনুতোষের উপস্থিতিও এখন ওর কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। অনুতোষ এসে বসে সোফাতে। সামনের ছোট টেবলটাতে হাতের ব্যাগটা রাখে। সোজাসুজি শীলার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে "এভাবে সব কিছু নিজের হাতে শেষ করে দিলে? আমাকে শোধরানোর সময়টুকু পর্যন্ত দিলে না?" বলে অনুতোষ মুখটা আড়াল করে। হয়তো চোখের জলটা ওকে দেখতে দিতে চায় না। আবার বলতে শুরু করে "আমি জানি এখান থেকে আমি অপমানের চাইতে বেশী কিছুই পাবো না। তবুও এলাম। আমার কথাটা একটিবার ভেবে দেখো। আর দোহাই তোমার, একবারটি বলো আজ যা যা বলেছিলে সব মিথ্যে।" এবার খোঁচা খাওয়া বাঘের মতোই ফুঁসে ওঠে শীলা। বলে "এখন তুমি আমাকে বলছো সব ভুলে যেতে? কেন ভুলতে যাবো? কি লাভ তাতে আমার? আজকের এই দিনটা তুমি তোমার নিজের জন্য ই দেখতে বাধ্য হলে। কে বলেছিলো তোমাকে, আমাদের সম্পর্কের মাঝে তোমার বন্ধুকে নিয়ে আসতে? ওকে এত বিশ্বাস করতে যে আমিও সেখানে গৌণ হয়ে যেতাম। তুমি, তোমার অফিস, ক্লায়ন্ট, ট্যুর নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়লে যে আমার দিকে তাকাতেই ভুলে গিয়েছিলে। অভিযোগ করলেই বলতে "একটু সপ্তক কে নিয়ে ঘুরে এলেই তো পারো।" অথচ যাকে এতটা ভরসা করতে, সে যে কতবার কতভাবে কদর্য ভাবে তোমাকে আক্রমণ করে গিয়েছে তা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। কতবার আমাকে লোভ দেখিয়েছে, তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে আমার কতবড় লাভ হবে। তখন আমাকে ও পরিপূর্ণ ভাবে পাবে। আমাকে ভালো রাখবে, এরকম আরো কত কথা। আমিও তো মানুষ। যে দূরত্বের সৃষ্টি তুমি করেছিলে ঠিক সেই দূরত্বকেই কমিয়ে দিয়ছিলো ও আমায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে। এক অনাস্বাদিত ভালোলাগার যন্ত্রণাতে বিদ্ধ করতে করতে। ঘোর কাটতেই নিজের ওপর খুব ঘেন্না ধরে গিয়েছিলো। আর তো তোমার কাছে ফেরার পথ নেই। তাহলে তোমাকে ঠকাতে হয়। সেটা আমার দ্বারা হবে না বলেই সরে যেতে চেয়েছি এবং গিয়ছি ও। আর আজ তোমাকে এই কথা বলতে গিয়ে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেছি, চুরমার করেছি। এছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিলো না। আমাকে ভুলে যাও।" এতগুলো কথা একসাথে বলে অনুতোষের হাতদুটো ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে থাকে শীলা।
     আস্তে করে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়ায় অনুতোষ। সশব্দে দরজা বন্ধ হতেই শীলা কান্নাতে ভেঙ্গে পড়ে সোফার ওপরেই। হঠাৎ ই ওর চোখ চলে যায় টেবলে ফেলে যাওয়া অনুতোষের ব্যাগ টির দিকে। চোখ মুছে খুলে দেখতেই দেখতে পেল তার দেওয়া সব পেন, আফটার শেভ, গ্রিটিংস কার্ড এবং ওকে দেওয়া শীলার "অনুশীলা" লেখা লকেট সহ হারটা। তার মানে অনুতোষ প্রস্তুত হয়েই এসেছিলো। তাই, হারটা মুঠোয় নিয়ে আর এক প্রস্থ চোখের জলের বন্যা বওয়ালো ও।
     হঠাৎ পিঠের ওপর হাত পড়তেই সম্বিৎ ফেরে অনুতোষবাবুর। ফিরে আসেন বর্তমানে। নীচের একজোড়া ছেলেমেয়ের কথা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলো তাঁর অতীতে। ওদের মধ্যে বোধহয় ব্রেক আপ এর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু ছেলেটি কিছুতেই মানতে রাজী নয়। অবশেষে হার মানলো মেয়েটি। জোড়া লাগে সম্পর্ক। জয় হয় একালের অনুশীলার। মনে একটা শান্তির রেশ ছুঁয়ে যায়। এবারে বোধহয় গল্পটা নামবে। তার আগে গিন্নীকে বলা দরকার।
     হাত ধরে গিন্নীকে সামনে এনে নীচের দিকে দেখতে বলেন অনুতোষ বাবু। বলেন, "একালের অনু-শীলা কে দেখো।" উমা দেবীর কাছে নিজের অতীত কিছুমাত্র লুকোন নি অনুতোষ বাবু। আর ওনার মতন মানুষকে এভাবে ঠকানোর জন্য শীলাকে কোনদিন ই ক্ষমা করেন নি উমা দেবী। তাই এবারেও ঠেস মারতে ছাড়লেন না "এখনো তুমি শীলাকে ভুলতে পারো নি না? আমার ই মন্দ কপাল যে তোমাকে ভোলাতে পারি নি।" অনুতোষ বাবু হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসেন উমাদেবীকে। গাঢ় আলিঙ্গনে বেঁধে বলতে থাকেন "এ তুমি কি বলছো গো? তুমি ই তো আমাকে বাঁচালে। নাহলে আমি তো ভেসে যেতাম। এরকম কথা আর কোনদিন বোলো না।" উমা দেবী এই সান্নিধ্যকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে থাকেন।
     তখন উমাদেবী প্রশ্ন করেন,"এবার তোমার গল্প নামবে তো? তা কি নাম দেবে গল্পের?"
     সংক্ষিপ্ত উত্তর বেরিয়ে আসে অনুতোষবাবুর মুখ থেকে "অনু-শীলা।"

সুদীপ্ত ঘোষাল
 বামুনারা,পশ্চিম বর্ধমান