অটোয়া, বুধবার ২৮ জুলাই, ২০২১
বেলা সাঁঝের পাণ্ডুলিপি (তিন) - দীপিকা ঘোষ

(তিন) পৌষ মাস শেষ হয়েছে অনেকদিন।  কিন্তু ব্যস্তময় শহর জুড়ে এখনো হিমেল শীতের পরশ নেই। জীবনের চারপাশে উপচে পড়া ভিড়।  সবকিছুই বড় বাড়াবাড়ি করে ঠাসা। তবুও সেই ভিড়ে যেন জগদ্দল পাথরের মতো চেপে থাকে শূন্যতার হাহাকার। অনিঃশেষ ব্যাকুলতায় ঝরে পড়ে প্রেমহীন, দয়াহীন, দায়দায়িত্ব, বিবেকহীন সমাজের দীর্ঘ নিঃশ্বাস।  প্রকৃতিও কেমন সর্বরিক্ত হতাশায় ধুঁকেধুঁকে মরে।  তার কান্না বিলাপের ঢেউ হয়ে ছড়িয়ে যায় সবখানে।  প্রতাপ দোতলার ঘরে শুয়ে সমস্তই দেখতে পান।  চোখে পড়ে, রাস্তা দিয়ে উথলে পড়া জনজীবনের জোয়ার।  গাছপালা উজাড় করে, খালবিল ভরাট করে ক্রমাগত বেড়ে চলা শহরের বিস্তার।  উঁচু উঁচু বাসস্থান প্রতিদিন ঢেকে দিচ্ছে উন্মুক্ত আকাশ।  প্রতিমুহূর্তে আটকে দিচ্ছে প্রাণদায়ী হাওয়াকে।  কবে যে শিশিরসিক্ত হেমন্তের সকালকে শেষবার দেখেছিলেন প্রতাপ।  আজ আর সেটা মনে পড়ে না।  নিসর্গের সেসব সম্পদ মানুষের ভালোবাসা, আদর্শ, ক্ষমা, প্রেম এবং আরও অনেক মানবিক সৌন্দর্যের মতো কবেই হারিয়ে গিয়েছে জীবন থেকে! তাদের দেখতে হলে স্মৃতির চোখ মেলে দিতে হয়।  আর আজকাল সেই চোখে যতকিছু ভালোলাগা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখেন প্রতাপ।  যখন অলস মুহূর্তের আলস্য নিয়ে ছেলেবেলার দিনগুলো পায়চারি করে বেড়ায় তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত মগজ থেকে উদ্বেলিত অন্তরে।  
     প্রতাপ চ্যাটার্জির বাড়িতে বহুদিন পরে চার বন্ধুর আসর জমেছে আজ।  গল্পে-সল্পে, আলাপ - আলাপনে আজকের আড্ডাখানা জমেও উঠেছে বেশ।  দিলদার হোসেন আপাতত স্বস্তিতেই আছেন।  খুণের দায়ে বিচারে জীবন দিতে হয়নি ছোট ছেলেকে।  তাঁর বড় ছেলের ধনী শ্বশুর মেজর হায়দর, সামাজিকভাবে জাঁদরেল মানুষ।  জীবনে সহায়তা এবং সহায়, দুটোরই অনেক জোর।  তার হস্তক্ষেপেই দিলদার হোসেন জীবনের কঠিন মহাসমর পেরিয়েছেন আজ।  স্ত্রী ফিরে এসেছেন নিজের সংসারে।  এমনকি জেলখানায় মাস দুয়েকের কারাভোগ শেষ না হতে মুক্ত করা হয়েছে তাঁর ক্রিমিন্যাল ছেলেকে।  গত সপ্তাহে সে দেশান্তরী হয়েছে নিরাপদে।  মেজর হায়দারের বড় জামাই লিবিয়ায় বহু বছর ধরে সরকারি চাকুরে।  সেখানেই শেষ পর্যন্ত দিলদারের ছেলের স্থায়ী আশ্রয় মিলেছে। 
যাওয়ার আগে ছেলেকে অনেক করে হুঁশিয়ার করেছেন দিলদার -  
ফাঁসির দড়ি থেকে যে বেঁচেছো সেটা কিন্তু আমার ক্ষমতার জোরে নয়!  তোমার বড়দার শ্বশুর, মেজর হায়দর আলি সাহেবের ক্ষমতায়!  এই কথাটা মাথায় রেখো! কারণ অপরাধ যত বড় হয়, তাকে ধামাচাপা দিতে ততো বড় শক্তির প্রয়োজন পড়ে! তবে বাস্তবতা হলো, জীবনের ক্রিটিক্যাল প্রয়োজনে বড় শক্তির সহয়তালাভ কদাচিৎও আসে না! তোমার নিজের সবরকম দায়ভার এবার থেকে তাই নিজেকেই নিতে হবে! ভবিষ্যত জীবনে সেভাবেই চলার চেষ্টা করো!
স্ত্রীকেও বলেছেন – 
অপমান আর অসম্মান ছাড়া তোমাদের সংসারে কখনো কিছু পাইনি! শেষ অবধি এতবড় অপরাধ ঢাকতে ছেলের শ্বশুরের কাছে আমায় ভিক্ষে চাইতে হলো!  কিন্তু আমার এমনই দুর্ভাগ্য যে, সন্তানস্নেহের অন্ধত্ব হৃদয়ের এতবড় রক্তপাতের যন্ত্রনাকেও তোমায় উপলব্ধি করতে দেয়নি! সন্তান কি তোমার একার মনিরা? সে আমার নয়? তার ব্যথা  আমার বুকে বাজে না? তবুও খুণে ছেলেকে বাঁচাতে আজ আমি যেভাবে খুণ হলাম, তার ব্যথা ভোলার মতো নিষ্ঠুর হয়ো না! এই আমার অনুরোধ! 
     জ্ঞানীজনেরা বলেন, অতীত নিয়ে ভেবো না! শুধু বর্তমানে বেঁচে থাকো।  কারণ সেটাই প্রশান্তিলাভের একমাত্র পথ।  বন্ধুদের কেউই আজ তাই দিলদারের ছেলের সংবাদ জানতে অবাঞ্ছিত কৌতূহলে আজকের আড্ডাকে ভারাক্রান্ত করতে চাননি।  বরং জীবনের অলিগলির পথ ধরে পৃথিবীর যাত্রাপথ বর্তমানে কোন অনিশ্চিয়তার পথে যাত্রা করেছে, মানুষের আদর্শহীন সমাজ ভবিষ্যতে আরও কতটা গভীর অন্ধকারের খাঁদে পড়ে পথ হারাবে, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় আজ আসর মেতে উঠছিল।  এরই মধ্যে বিগলিত চেহারা নিয়ে এষা দাদুর কাছে এসে বসলো।  প্রতাপ স্নেহবিগলিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন – 
কিছু বলবে দিদিভিাই?
     তোমরা আমার আত দেখবে?
     আর্ট? বাব্বা! কী আর্ট করেছো, নিয়ে এসো তো দেখি!
এষা ছুটে গিয়ে তার কীর্তি এনে দেখালো।  দুটি আঁকাবাঁকা রেখার ওপরে একখানা বড় সাইজের বৃত্ত।  হুমড়ি খাওয়া অবস্থায় বসে আছে।  জগদীশ দেখতে দেখতে কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলেন – 
     এটা কী এঁকেছো এষাদিদি?
     মানুস!
     মানুষ? হ্যাঁ মানুষই তো বটে! তবে আমাদের মতো মানুষ! যাদের আর কিচ্ছু নেই জীবনে! কেবল বিশাল মগজখানা দুই ভাঙাচোরা ঠ্যাঙের ওপর বসে থেকে আদ্যপান্ত শুধু ভেবেই চলেছে!
তার কথা শুনে মনীশ হেসে উঠলেন জোরে জোরে –
ঠিক বলেছেন স্যার! দিদান জন্মের পর থেকেই আমাদের দেখছে কিনা! আমাদের মতো মানুষ সম্পর্কে তাই ওর আইডিয়াটা একেবারে পরিষ্কার!
     সাধারণভাবে দিলদারই বরাবর সবার মধ্যে সরব থাকেন বেশি।  আজ সম্ভবত সঙ্গত কারণেই তিনি স্বল্পবাকের ভূমিকা নিয়েছিলেন।  মনীশের কথায় এবার সাগ্রহে এষাকে কোলে টেনে নিয়ে বললেন –
     তোমার আর্টটা আমাকে দেবে দিদিমণি? ভারি সুন্দর হয়েছে! এটাকে আমি এই এত্তবড় ফ্রেমে বাঁধিয়ে আমার ঘরে রেখে দেব! সবাই দেখে তোমায় ধন্য ধন্য করবে! বলবে, বাব্বাঃ দিদিমণি তো খুব সুন্দর আর্ট করে!
     খুশিতে বিগলিত হয়ে হাসলো এষা।  তারপর কোল থেকে নেমেই হাসিমুখে ছবিখানা এনে বড় দাদুর হাতে তুলে দিলো।  দিলদার হোসেনের দশাসই চেহারার সঙ্গে বিশাল একখানা ভুঁড়ি থাকায় এষা তাঁকে নিজ থেকেই একদিন ‘বড় দাদু’ বলে ডাকতে শুরু করেছিল।  যেমন জগদীশ দাদুকে বলেছিল, ‘জোস্তা দাদু’ এবং মনীশ দাদুকে ‘মনবা’। প্লেটে খাবার সাজিয়ে চায়ের ট্রে হাতে করুণাময়ী ঢুকলো।  এষাকে দেখতে পেয়েই তাকালো বিস্ময় নিয়ে –
     ওঃহোঃ! তুমি তাহলে এখানে? আমি আরও ভেবেছি, বুঝি ঘুমুচ্ছো এখনো! দেখেছেন দাদা, প্রন্তিককে নিয়ে বাইরে যাওয়ার আগে বৌমা বারবার আমায় বলে গেছে, ওকে যেন বিকেলে ঘুম পাড়ানো হয়!  বিছানায় দিয়ে এসেছিলাম! জানেন তো, ঘুমোতেও দেখেছি! তারপর দাদুদের যেই সাড়া পেয়েছে, কখন চুপিচুপি ওপর থেকে নেমে এসেছে দেখেন! বৌমা জানতে পারলে কি রক্ষে আছে?
মনীশ বললেন –
আহা! থাকতে দাও না করুণা! বৌমা কিচ্ছু রাগ করবে না! দিদান হলো বৃদ্ধদের আসরে ভোরের শিশিরভেজা ফুল!  ও থাকলে আমাদের শুকনো আসরেও প্রাণের জোয়ার জাগে! আমরা সবাই শৈশবে ফিরে যাই! আজ রাতে না হয় সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়বে! কী দিদান, তাইতো?
     এষা দু’পাশে মাথা দুলিয়ে মাথা নিচু করলো।  করুণা চায়ের কাপ টেবিলে নামিয়ে দিতে দিতে বললো – 
কিচ্ছু ঘুমোবে না ছোটদাদাবাবু! ওকে চেনেন না, তাই বলছেন! বসে বসে চোখ বড় করে টিভিতে কাট্টুন দেখবে! আর উদিকে সকাল নটার আগে কিছুতেই বিছানা থেকে তোলা যাবে না! ইস্কুলের সময় পেরিয়ে যাবে! আর বৌমা আমার সাতগুষ্ঠি উদ্ধার করতে থাকবে!
     তুই চুপ করতো করুণা! যা, নিজের কাজ করগে যা! প্রতাপ ঘরের প্রসঙ্গ চাপা দিতে চাইলেন।
     সে তো করবোই! তাই বলে দুটো সত্যি কথাও কি বলতে পারবো না নাকি দাদা? কাজ করে খাই বলে আমাদের কি মান অপমান বোধ নেই? আমাকেই তো আবার আপনার নাতনিকে গুছিয়ে ইস্কুলে দিয়ে আসতে হবে! বৌমা যাবে  কেবল আপনার নাতিকে নিয়ে!
     ও বাব্বাঃ! আমাদের দিদান আবার স্কুলেও যায় নাকি? মনীশ হাসিমুখে নাতনির দিকে তাকালেন।
করুণাময়ী ফরফরিয়ে বললো –
হ্যাঁ ছোটদাদাবাবু! সে তো গেল বচ্ছর থেকেই যাচ্ছে!
মনীশের চোখ এবার প্রতাপের মুখে উঠলো –
সত্যিই, কী দিনকালই পড়েছে দাদা! আমাদের সময়, গাঁয়ের শিবেন মাষ্টারের স্কুলে যাওয়ার আগে ছেলেমেয়েদের পাঁচ বছর বয়সে হাতেখড়ি হতো! তারপর সব শুভদিন দেখেশুনে স্কুলে যাওয়া! আর এখন? নড়বড়ে পায়ে দাঁড়াতে শেখার আগেই তাদের বোঁচকা বানিয়ে স্কুলে ফেলে আসা হচ্ছে!
করুণা উৎসাহ পেয়ে তার বকবকানি আরও বাড়ালো –
এক্কেবারে খাঁটি কথা বলেছেন ছোটদাদাবাবু! আমাদের এষা গোড়া থেকেই দেখছি, ইস্কুলে যাওয়া মোট্টে পছন্দ করেনি গো! যাকে বলে বৌমার মেরেকেটে ওকে জোর করে পাঠানো! এখন কি ওর পড়ার বয়েস হয়েছে বলেন তো?  কিন্তু আজকাল চাদ্দিকেই দেখছি, জম্ম থেকেই ইস্কুলের মধ্যে সবগুলোকে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে! ছোট মানুষ বলে কি ওদের সাধআহ্লাদ থাকতে নেই গো? তবে হ্যাঁ, আমার মুখে গপ্প শুনতে এষা কিন্তু খুব ভালোবাসে!
     কী গল্প শোনাও ওকে?
    এবার করুণার মুখের ওপর রাঙা লজ্জার হালকা ছায়া ভাসলো –
ওই, যেগুলো ছেলেবেলায় মা ঠাকমার মুখে শুনেছিলাম! সেই রাজকন্যে-রাজপুত্তুরদের গপ্প! তারপর ওইসব রাক্কস - খোক্কশের গপ্প! আমি বুঝতে পারি, এসব ওর খুব ভালো লাগে! শেষের দিকে প্রশান্তির আভাসে করুণার মুখে হাসির কিরণ ফুটলো। 
      করুণা চলে যেতে আবার চার বন্ধুর কথামালার আসর জমে উঠলো।  জগদীশ হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন –
শুনেছেন স্যার, দুই আমেরিকার টেকটোনিক প্লেট নাকি আফ্রিকা আর এশিয়া মহদেশ থেকে প্রতি বছর দেড় ইঞ্চি করে দূরে সরে যাচ্ছে? তাতে আটলান্টিক মহাসাগর আরও বেশি বড় হচ্ছে!  কিন্তু পৃথিবী তো আর মহাশূন্য নয়, যে তার আয়তন বিরামহীন বাড়তেই থাকবে! সবই যদি সাগর মহাসাগর হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে ডাঙার জীবের ভবিষ্যৎ কী হবে?
প্রতাপ হাসলেন – 
ভবিষ্যতের কথা কে বলতে পারে জগদীশবাবু?  তবে সাদা চোখে যেটা দেখি তাতে এটাই দাঁড়ায়, আটলান্টিক যত প্রসারিত হবে প্রশান্ত মহাসাগর ততো সংকুচিত হতে থাকবে! পৃথিবীর দেহগঠন অনুযায়ী এমনটাই স্বাভাবিক নিয়মে ঘটা উচিৎ!  তবে এই নিয়ম যদি ভাঙে, তাহলেও হয়তো নতুন সৃষ্টি শুরু হবে।
     তার মানে বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের পুরনো পৃথিবীতেই ফের নতুন সৃষ্টিকর্ম হবে? কিন্তু বিজ্ঞানীরা যে বলেন আমাদের পৃথিবীর মতো অসংখ্য মৃত পৃথিবী রয়েছে মহাবিশ্বে? তাহলে তো বলতে হয়, অন্যসব পৃথিবীর মতো আমাদের এই পৃথিবীও একদিন পরিত্যক্ত হবে?
     হতেই পারে।  কে জানে এর উত্তর? যার অতীত জানা যায় না, তার ভবিষ্যতও অজানাই থেকে যায়!
     না স্যার, অতীত তো জানাই গেছে! সাড়ে চার বিলিয়ন বছর অর্থাৎ চারশো পঞ্চাশ কোটি বছর আগে পৃথিবীর জন্ম শুরু! তারপর নানা ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে বর্তমান চেহারা!
     সেটা এখনো পর্যন্ত অনুমান জগদীশবাবু! স্থির সত্য নয়! সে কারণেই বহু ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট সত্যের বদল ঘটে।  আজ যাকে সত্যি বলে মনে হয়, নতুন আবিষ্কারে তার পূর্বশর্তের হেরফের হয়!
     মনীশ বহুসময় নীরবে কথা শুনছিলেন।  শুনতে শুনতে চায়ের পর্ব শেষ করে এবার মুখ খুললেন –
কিন্তু যার সৃষ্টি হয়েছে, একদিন তার ধ্বংস হবে সেটাই তো জানি।  পুরনো সৃষ্টিতে আবার সৃষ্টি কিসের দাদা?
প্রতাপ উত্তরে জ্ঞানবান হয়ে হাসলেন।  বললেন –
ধ্বংস কোথায় মনীশবাবু? সবই তো সৃষ্টি! যেমন, সৃষ্টি + ধ্বংস = নতুন সৃষ্টি।  আবার, ধ্বংস +সৃষ্টি = নতুন সৃষ্টি।  সৃষ্টির ধারায় ধ্বংস বলে কিছু নেই! আমাদের এই দেহটা যে এত বৃদ্ধ হয়ে গেলো, সেখানেও তো প্রতিমুহূর্তে নতুন সৃষ্টির ঘনঘটা থেমে নেই!
মনীশ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে একটুখানি কী ভেবে সমর্থনের ভঙ্গিতে দুদিকে মাথা নাড়ালেন – 
   তা বটে! সেটাও ভেবে দেখার মতো! সাধারণ চোখে যাকে ধবংস বলে মনে হয়, কে জানে সেটাও হয়তো বা নতুন সৃষ্টিই! তবে আসল কথা হলো যার মন যেভাবে বিচার করতে চায়, যুক্তির ক্ষেত্রে সেটাই শেষ কথা! তাই কি বলতে চাইছেন দাদা?
   প্রতাপ উত্তরে দুদিকে মাথা নাড়ালেন নিঃশব্দে।  যার অর্থ কারও কাছেই স্পষ্ট হলো না।
     এখনো সন্ধ্যার ছায়া নামেনি।  সূর্যাস্তের আভাস পশ্চিম দিগন্তে সবেমাত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে।  উদাসী বাউলের চেহারা নিয়ে বাইরের প্রকৃতি রহস্যের পর্দা ফেলছে চারদিকে।  দিলদার হঠাৎই উঠে দাঁড়ালেন – 
আজ উঠি স্যার! গিন্নীর হুকুম আছে, দুই শ্যালককে নিয়ে সন্ধেবেলা উকিলের কাছে যেতে হবে!
মনীশ উদ্বেগ নিয়ে তাকালেন – 
উকিল?
দিলদার সামনে পা বাড়িয়েও পেছন ফিরে হাসলেন –
হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন স্যার।  তবে আমার নিজের বিষয়সম্পত্তির ব্যাপারে নয়।  সেসব যাদের আছে, তাদের ব্যাপার! শুনেছিলাম, গিন্নীর ভাইয়েদের নাকি বিষয়সম্পত্তি নিয়ে শরিকদের সঙ্গে কী সব ঝামেলা শুরু হয়েছে! তাই নিয়েই তারা আলোচনা করতে যাবেন! আমি কেবল উকিল চেনাতে সঙ্গে যাচ্ছি!
     সত্যিই! চাকরি থেকে অবসর মিললেও দায়িত্ব থেকে অবসর মেলার জো নেই দেখছি!
      কী করে থাকবে মনীশ স্যার! সবাই যে পরম আত্মীয়! কবরে শুতে না পারা পর্যন্ত কারও কাছ থেকেই মুক্তি মিলবে না! মুক্তি মিলেবে কেবল জীবনের সব অধিকার থেকে! দায়িত্ব থেকে কদাচিৎ নয়! বলেই দিলদার চিলতে হাসলেন মেঘভাঙা রোদ হয়ে।  তারপরেই বেরিয়ে গেলেন নিঃশব্দে।
জগদীশও ঘড়ির দিকে তাকালেন –
তাহলে চলুন মনীশ স্যার, আমরাও উঠি এবার! বাড়ি ফেরার আগে সন্ধেবেলার হাঁটাপর্ব শেষ করতে হবে।  তাছাড়া দোকানেও একটু যেতে হবে।  সামান্য টুকিটাকি কেনাকাটার ব্যাপার আছে।
তারপর পা বাড়িয়ে প্রতাপকে উদ্দেশ্য করে বললেন –
সাবধানে থাকবেন স্যার! আবাহাওয়ার খবরে শুনলাম, হিমালয় থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া ছুটে আসছে! তিন চারদিন নাকি থাকবে! আপনার তো আবার শ্বাসকষ্টের ঝামেলা রয়েছে! তাই সতর্ক থাকা ভালো! যাই হোক, শিগগির দেখা হবে! ভালো থাকবেন!
উত্তরে প্রতাপ হাত তুলে নমস্কার জানালেন।  অস্ফুটে বললেন –
আপনাদের জন্যও ভালো থাকার প্রার্থনা রইলো! সাবধানে যাবেন! চলবে...

দীপিকা ঘোষ। ওহাইয়ো, যুক্তরাষ্ট্র