অটোয়া, শনিবার ২৭ নভেম্বর, ২০২১
বেলা সাঁঝের পাণ্ডুলিপি (ছয়) - দীপিকা ঘোষ

     কাল সারা রাত ঘুম হয়নি প্রতাপের।  আজকাল ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুমঘোর নামতে চায় না চোখের পাতায়।  অবশ্য ওষুধ খেয়েও যে কাল নিদ্রাহীন রাত কেটেছে তার কারণ অন্য।  দুটো জেদি দাঁত তাদের আজন্মকালের বাসস্থান ছেড়ে নড়তে চাইছে না কিছুতেই।  এক সপ্তাহের ওপর পড়বো পড়বো করেও অমীমাংসিত মামলার মতো ঝুলে রয়েছে অবাঞ্ছিত অস্তিত্ব নিয়ে।  এমন অবস্থা এতটাই পীড়াদায়ক আর যাতনার যে এককালে এদের অস্তিত্বের গুরুত্ব ছিল, সেটা অকৃতজ্ঞের মতো ভুলতে বসেছেন প্রতাপ।  এষা স্কুলে যাওয়ার আগে ডাইনিং টেবিলে দাদুকে দেখতে না পেয়ে একটু আগেই তাঁর ঘরে ঢুকেছিল।  আয়নায় দাঁড়িয়ে ঠোঁট উল্টে তখন নড়বড়ে দাঁত দুটোকে জিভ দিয়ে সাবধানে নাড়াচ্ছিলেন প্রতাপ। এবং সঙ্গে যন্ত্রনায় কুঁকড়ে উঠে একটু একটু অস্ফুট শব্দও করছিলেন।  এষা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে দাদুর কমর্কাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছিল গভীর মনোযোগে।  হঠাৎ গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলো –
     কী হয়েছে দাদু?
     উত্তরে প্রতাপ ভেংচি কাটার মতো ঠোঁট উল্টে নিজের ঝুলন্ত দাঁত দুটোকে দেখালেন।  মুখে বললেন –
তোমার দাদুর মতো ওরাও জীবনের বহু গভীরে শেকড় ছড়িয়েছে কিনা, কিছুতেই তাই বাড়ি ছেড়ে উঠতে চাইছে না!
     এষা নিজের মহাজ্ঞান থেকে জানতে চাইলো –
ওরা খুব দুষ্টু তাহলে?
     তা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার ইচ্ছে থাকলে কেউ যদি দুষ্টু হয়, তাহলে নিশ্চয়ই দুষ্টু!
     এষা আবারও তার জ্ঞানের মহিমা ছড়ালো –
দাদার দাঁতও কি দুষ্টু?
     যন্ত্রনায় ক্লিষ্ট হয়েও হাসলেন প্রতাপ –
না দিদিভাই! তারা তো শেকড় ছড়ায়নি! তাই তারা ভালো!   
     আর আমার দাঁত?
     তোমার দাঁতও ভালো। 
     তাহলে তোমার দাঁত দুষ্টু কেন?
     প্রত্যুত্তরে প্রতাপ চার বছরের নাতনীকে নয়, নিজেকেই উপদেশামৃত পান করাতে যাচ্ছিলেন।  সুদীর্ঘ জীবনের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা বেলাসাঁঝের প্রান্তে এসে আজকাল অজস্র মণিমুক্তো থেকে থেকে ছড়িয়ে দেয়।  প্রয়োজন মনে করলে তাদের দু’চারটিকে মাঝে মধ্যে মনে মনে নাড়াচাড়া করে দেখেন প্রতাপ।  লিখে রাখেন ডায়েরির পাতায়।  জানেন, প্রয়োজন মনে করে ভালোবেসে কেউ কোনোদিনই পড়বে না সেগুলো।  তবুও কেমন এক অদ্ভুত মমত্বের ছোঁয়া তাদের ওপরে লেগে রয়।  পরম যত্নে দু’চারটি তাই লিখে রাখেন ডায়েরির পাতায়।  কিন্তু কথা বলতে গিয়ে পেছনে পায়ের শব্দ শুনে আয়না থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলেন, মোহিনী এসে দাঁড়িয়েছ।  প্রান্তিককে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত সে।  প্রতাপ কিছু বলার আগেই মোহিনী কড়া চোখে তাকালো – 
এষা, না খেয়ে চলে এসেছো কেন? যাও, মাসিদিদা অপেক্ষা করছে! খেয়ে স্কুলে যেতে হবে!   
     পরক্ষণেই সে দাদুর দিকে চোখ ফেরালো –
ডাক্তার জয়ন্তর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে! আজ দুপুরে এবং কাল সকাল দশটায় এক ঘন্টার মতো ফ্রি আছেন। এই সময়টায় আপনাকে দেখতে পারবেন।  আজ যেতে চান? নাকি কাল?   
     শুধু শুধু আবার ডাক্তারের কাছে কেন মামণি?
     শুধু শুধু কেন বলছেন? খেতে পারছেন না! ঘুমোতে পারছেন না! এরপরও শুধু শুধু হলো?  
     এর আগের চারটে তো অমনিই পড়েছিল! তাই বলছি, এ দুটোও দু’দিন নাড়াচাড়া করলে…!   
     পড়বেই, কেন ভাবছেন? এ তো আর ছেলেবেলাকার দাঁত নয়! সববার একই রকম নাও হতে পারে!   
     কিন্তু বৃদ্ধ বয়সের প্রাকৃতিক নিয়ম নিয়ে এত অসহিষ্ণু হলে চলবে কেন মামণি?
     অসহিষ্ণু তো আর অমনি অমনি হচ্ছেন না! অসহ্য হচ্ছে বলেই হচ্ছেন! সমধানের উপায় যখন রয়েছে সেধে সেধে কেন কষ্ট করবেন? রেডি হয়ে থাকবেন! প্রান্তিককে স্কুলে দিয়েই আমি ফিরে আসছি। 
     দাঁত তুলবে নিশ্চয়ই? ব্যথা পাবো না?  
     যাতে না পান সেজন্য লোকাল এ্যানেস্থেশিয়া দেবেন হয়তো।  আগে চলুন সেখানে! দেখা যাক, কী অবস্থায় রয়েছে ওগুলো! 
     মোহিনী আর দাঁড়ালো না।  মোহিনীর চেতনা সবরকম কর্তব্য পালনে বড় সরব।  কিন্তু হৃদয়ের আকুতি তাতে নেই! প্রতাপের অন্তর সস্নেহ পিতৃত্বের সবটুকু অধিকার নিয়েও এই মেয়েটির সামনে অবলীলায় উন্মোচিত হতে বারবার তাই বাধাগ্রস্ত হয়।  পথিক নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।  গভীর আগ্রহে তার ফিরে আসার অপেক্ষায় তৃষিত চোখ মেলে বারান্দায় রোজ বসে থাকেন প্রতাপ।  ধীর পায়ে একসময় সন্ধ্যা নামে চারদিকে।  আঁধারের নিবিড় ছায়া পলকা দেহ  নিয়ে বৈদ্যুতিক আলোয় উধাও হয়ে যায় মুহূর্তে। তখন বারান্দায় বসে নিরিবিলি মুহূর্তগুলোতে বর্তমান থেকে অতীতে এবং অতীত থেকে ভবিষ্যতের পথে প্রজাপতির ছোট্ট ডানা হয়ে ইচ্ছেমতোন উড়ে বেড়ান প্রতাপ।  তাঁর সামনে সহসা অলকা এসে দাঁড়ান।  মুহূর্তেই অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ওঠেন।  মনে মনে হৃদয় খুলে স্ত্রীর সঙ্গে  অফুরন্ত কথার স্রোতে ভেসে যান প্রতাপ।  বুকের কন্দরে কত অবলা কথার ভিড় কতকাল ধরে জমতে জমতে পাহাড়সমান হয়ে আছে।  সবাইকে কি আর বলা যায়? স্ত্রীরা স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী বলেই না স্বামীদের যত অনুচ্চারিত কথা, সংগোপন অনুভূতির মখমলি ঢেউগুলো তাদের  সামনে আপনাআপনিই ফুলের পাপড়ি হয়ে খুলে যায়।    
     প্রতাপ হঠাৎ জিজ্ঞেস করেন – 
আচ্ছা অলকা, তুমি কি সত্যিই ফিরে এসেছো আমার এষা দিদিভাই হয়ে? লোকে তো সেটাই বলে! এষাকে হুবহু তোমার মতোই দেখতে! তোমারই মতো ওর কোমল মন! এই বয়সেই দায়িত্বসচেতন! আমার কষ্ট সইতে পারে না মোটে! থেকে থেকে দাদুর কাছে ছুটে আসে! ওর ছোট্ট হাতের ছোঁয়ায় সেজন্যই কি অসাধারণ স্নেহের পরশ পাই? জন্মান্তর তাহলে সত্যি হয় অলকা? মৃত্যুর ওপার থেকে মানুষ তাদের মায়াভরা সংসারে বার বার ফিরে ফিরে আসে! যে সংসার ছেড়ে প্রিয়জনেরা চলে গেলে বিচ্ছেদ বেদনায় বুক ভাঙে, সেই ভালোবাসার সংসার তারা নাকি ছাড়তে পারে না কিছুতেই! তাই কী?   
     নিরালায় বসে অন্তরের নির্জনতম কথাগুলো বলতে বলতে সময় কখন পেরিয়ে যায়।  প্রশ্নের জবাবও যেন একরকম করে পেয়ে যান প্রতাপ।  ভাবাবেগের মুহূর্ত পেরিয়ে গেলেই উপলব্ধি করেন, জগতের সব সত্যিকে সাধারণ ভাবনায় জানা যায় না বটে, তবে বিশ্বের বিরাট চৈতন্যের সঙ্গে মিলেমিশে মন যতটুকু খুঁজে পায়, তার সবটাই কেবল কল্পনার বিলাসিতা নয়।  অনেক শাশ্বত সত্যও উঠে আসে তাতে।  যেমন হাজার ঝিনুকের মাঝে হঠাৎ কোনো একটা থেকে বেরিয়ে আসে হীরকজ্যোতি মুক্তো!
     প্রতাপ ফের অস্ফুটে কথা বলেন – 
তোমার যেমন ইচ্ছে ছিল, সেভাবেই ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছি অলকা।  তাদের বিয়ে দিয়েছি! চরিতা অবশ্য বিয়ের পরেই স্বামীর সঙ্গে লণ্ডনে চলে গিয়েছিল! তারপর ওখানেই থেকে গেছে! ছেলেদের নিয়ে আগে প্রতি বছর আসতো আমার কাছে! এখন কদিনের ছুটি নিয়ে চরিতা একাই আসে দেখতে! ছেলেদের ছুটি মেলে না! স্বামীরও কাজ নিয়ে নানান ব্যস্ততা!   
     এটুকু বলেই থেমে পড়েন প্রতাপ।  পাছে এই নিভৃত আলাপচারিতাটুকু কারও কানে ধরা পড়ে।  পাছে কেউ মনে করে, বার্ধক্যের অবক্ষয়ে স্মৃতিবিভ্রম ঘটেছে তাঁর।  কিন্তু হাসিকান্নার ঢেউয়ের দোলায় ভেসে বেশিক্ষণ নীরব থাকতে পারেন না প্রতাপ।  আবারও তাই বলেন – 
তোমার কুড়ি বছর আগের বাঁধানো ছবিটায় সেদিন দেখি কেমন এক ভেজাভেজা, ছোপ লাগা দাগ পড়েছে অলকা! কী করে হলো কে জানে! আমাদের শোবার ঘরেই তো আছো! পথিক অবশ্য পরিষ্কার করিয়ে আবার বাঁধিয়ে দিয়েছে নতুন করে! এখন ফের আগের মতোই ঝকঝকে! সেদিন ওকে বলেছি, চলে যাওয়ার পরে আমাকেও যেন তোমার পাশেই রেখে দেয়! দেখতে অবশ্য বেমানান লাগবে! তা হোক না! বলে প্রতাপ অজান্তেই হেসে ওঠেন। 
     একটু থেমে থেকে পরে বলেন – 
তোমার তো আর বয়স বাড়েনি! সেই চল্লিশেই আছো আজও! কিন্তু আমি? চুল পেকে সাদা হয়েছে! দাঁতও পড়েছে কয়েকটা! কিন্তু তা হলোই বা! তাতে কী-ই-বা আর এসে যায় বলো!   
     হঠাৎই চোখে পড়ে, গাড়ি থেকে নেমে আসছে পথিক।  সারাদিনের শ্রমে শরীর জুড়ে ক্লান্তির নিবিড় পরশ।  তবু তার অঙ্গ ঘিরে নীড়ে ফেরার  স্নিগ্ধ প্রশান্তিটুকুও গোপন থাকে না প্রতাপের চোখে।  একদিন তিনিও তো রোজ এভাবেই কাজ শেষে ফিরে আসতেন অলকার আশ্রয়ে।  কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই তাঁর পিতৃহৃদয়ে স্বস্তির ছোঁয়া লাগে।  পূর্ণ নির্ভরতায় নিশ্চিন্ত হয়ে উঠে দাঁড়ান ছেলের মুখে তাকিয়ে।  এ দৃশ্য রোজকার।  পথিক বাবার স্নেহপূর্ণ পিতৃত্বের মাধুর্যটুকু রোজই দেখতে পায়।  তারও বুকের তলায় তখন মাখোমাখো ভালোবাসা, প্রফুল্ল হয়ে খেলা করে।  স্নিগ্ধতা বুকের অলিন্দ ছেড়ে তার ক্লান্ত মুখে ছড়ায়।  তবুও মাঝেমধ্যে মন্তব্য করে –
এভাবে ভর সন্ধেবেলা এখানে একা একা বসে আছো কেন বাবা? শরীর খারাপ করবে না?  
     প্রতাপ অবশ্য উত্তর দেন না।  কারণ ছেলের চোখের স্নিগ্ধ ভালোবাসাটুকু ততোক্ষণে তাঁর চোখেও ধরা পড়ে। 
     মোহিনী স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এলো শ্বশুরকে ক্লিনিকে পৌঁছে দেবার জন্য।  সেই সঙ্গে জানালো, এক ঘন্টার বেশি সময় থাকা সম্ভব হবে না তার পক্ষে।  প্রান্তিকের ফেরার সময় দুপুর সাড়ে বারোটা। এষাকেও ফেরার পথে স্কুল থেকে ঘরে আনতে হবে।  বাড়ি ফিরে খাওয়ার দাওয়ার পাঠ চুকলে মোহিনীর নিজেরও কিছু কাজ আছে।  তারপরই  তো বিকেল শুরু হবে।  খানিক পরেই সন্ধ্যা।  সুতরাং সন্ধ্যার আগে অফিস থেকে ফেরার পথে পথিকই তাঁকে নিয়ে আসবে ক্লিনিক থেকে।
     প্রতাপের মনে হলো দাঁতগুলো বসে থাকার শক্তি সত্যিই যেন হারিয়েছিল।  একটু টানেই তাই সবিনয়ে উঠে এলো।  তবে তুলতে কষ্ট না পেলেও ক্লিনিকে অনেকটা সময় থাকতে হলো প্রতাপকে।  চার ঘন্টা পরে হঠাৎ একটা ধারালো ব্যথা শুরু হয়েছিল।  জানাতেই নির্দেশমতো একজোড়া পেইনকিলার খেতে দিলো নার্স। 
     মুখস্থ কথার মতো বললো –
লোকাল এ্যানেস্থিয়ার জন্যই এত সময় ব্যথাটা বুঝতে পারেননি! এখন অবশভাবটা কেটে গেছে, তাই ব্যথা পাচ্ছেন! তবে দু’তিন দিনের বেশি থাকবে না।  তিনদিন পরে দরকার না হলে পেইনকিলার খাবেন না।
     আর খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারটা?
     ওই যে বললাম, তরল খাবার খাবেন! আপনার বৌমাকে সবই জানানো হয়েছে!   
     এরপর আর কোনো ঝামেলা হবে না তো?
     নাঃ! ঝামেলা কেন হবে? সব ঠিক থাকবে।  আপনাদের বয়সে এসব দাঁত ফেলা, দাঁত বসানোর কাজ তো হরহামেশা হচ্ছে! এরপর ওই জায়গার গামটিস্যু ঠিক হয়ে গেলে একদিন এসে পারশিয়্যাল ডেনচারটা করিয়ে নেবেন। 
     নাঃ! সেটা আর করাবো না!   
     কেন করাবেন না? দেখতে ভালো লাগবে! সামনের এতগুলো দাঁত নেই!   
     প্রতাপ কথা না বলে দন্তহীন মাড়িতে এক চিলতে হাসলেন।  চোখে পড়তে তরুণী নার্সও কৌতুকে হেসে ফেললো।  পথিক একটু আগেই উপস্থিত হয়েছিল। মুখ ফেরাতেই চোখাচোখি হলো তার সঙ্গে।  বললো –
আপনার বাবাকে অনেক আগেই ডিসচার্জ করা হয়ে গেছে।  আপনার আসার অপেক্ষাতেই ছিলাম।  সব ঠিক আছে।  কোনো অসুবিধে নেই।  শুধু হাতটা একটু ধরে রাখবেন।  এ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হয়েছিল তো! বুড়ো মানুষ!   
     সন্ধ্যার পরে বাবাকে নিয়ে ঘরে ফিরলো পথিক।  ছেলের সঙ্গ পেয়ে বড় নিশ্চিন্ত হলেন প্রতাপ।  ঠিক শিশুরা যেমন ভয়ের মুহূর্তে স্নেহময়ী জননীর কোল আঁকড়ে ধরতেই নিজেকে বিপদমুক্ত মনে করে, সেভাবেই ছেলের হাত ধরে পরম নিশ্চিন্তে সাবধানে গাড়িতে উঠলেন প্রতাপ।  মনে মনে বললেন – 
আহা! বার্ধক্যে সন্তানের বলিষ্ঠ হাতের নির্ভরতায় কী সীমাহীন সুখই না পাওয়া যায়! বাবা-মায়ের জীবনে এমন স্পর্শ পাওয়ার প্রশান্তি কি স্বর্গলাভেও হয় কখনো?   
     পথিক সাবধানে নামিয়ে হাত ধরে বারান্দার সিঁড়িগুলো পার করতে করতে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো – 
ডেনচার করাতে রাজি হলে না কেন বলো তো? আজকাল সবাই করায়! মোহিনী ফোন করে জানালো, ডাক্তারবাবুর কথায় তুমি রাজি হওনি! হলে কি ভালো হতো না?   
     কী দরকার?
     দরকার নেই বলছো? তাহলে চশমা কেন পরছো? কেন চোখ দুটোতে অপারেশন করিয়েছ?   
     চলতে ফিরতে তাদের দরকার আছে।  অন্ধ হয়ে পরনির্ভরতায় কাজ কী!  কিন্তু দাঁতের আপাতত প্রয়োজন নেই! যেগুলো রয়েছে, খাওয়া-দাওয়ার কাজ তাতেই দিব্যি চলে যাবে! জীবনে প্রয়োজনের তালিকা বাড়ালেই বাড়ে! মানুষের চাওয়ার তো শেষ নেই!   
     কিন্তু দাঁতের প্রয়োজন আছে সেটা অস্বীকার করতে পারো না বাবা! কথায় বলে, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝে নাও!   
     ওসব কথার অর্থ সব সময় আক্ষরিকভাবে ধরতে যেয়ো না পথিক! এদের মেটাফোরিক্যাল মিনিংও আছে!   
     পথিক কথা বাড়ালো না।  সে জানে, তার আদর্শবাদী বাবা কামনার লাগাম টেনে রেখে সংযমের নিশ্চল সাধনা করায় আজীবন বিশ্বাসী।  তাই সমাজসংসারের সবখানে আজকাল যত রকম বিশৃঙ্খলা, যতকিছু অমানবিকতার দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে, তাদের অধিকাংশকেই তিনি মানুষের লোভের পরিণতি বলে বিশ্বাস করেন।  বারবার বলেন – 
     অসংযত কামনার  উচ্ছৃঙ্খল প্রকাশ কখনো মঙ্গলের পথ তৈরি করতে পারে না।! পরিণতিতে এর মূল্য তাই অনেক বড় করেই দিতে হবে!  

দীপিকা ঘোষ। যুক্তরাষ্ট্র