অটোয়া, বৃহস্পতিবার ১৮ এপ্রিল, ২০১৯
The story of a cold night at Amsterdam -রহমতুজ্জামান রানা

এই শহরে আগেও একবার ঘুরে গিয়েছি তাই এবারে আর নতুন করে কিছু মনে হয়নি শুধুই চোখ পিট পিট করে আশপাশ দেখে গিয়েছি।
বাস থেকে নামার পর দেখলাম স্টেশন হতে সব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বন্ধ, এই দিকে ২০১৬ এর কাউণ্ট-ডাউন শুরু হতে আর মাত্র ১ ঘণ্টা বাকি। সাথে কোন ম্যাপ নেই, অ্যাপ নেই শুধু জানি সেন্ট্রালে যেতে হবে, রাস্তার ডাইরেকশন দেখে দেখে হাঁটা শুরু হল। যেখানে-সেখানে একটু পর পর আতসবাজি হচ্ছে, দেখে বুঝার উপায় নেই সেন্ট্রাল আর কত দূর? ১২টা বাজার পর হাঁটা বন্ধ করে আশেপাশের আতসবাজি ই দেখতে লাগলাম। লোকজন পাশ কাঁটিয়ে যাবার সময় হাত মেলাচ্ছে আর নতুন বছরের উইশ করে যাচ্ছে।
আস্তে আস্তে গলির মত রাস্তায় ঢুকে পড়লাম, পুলিশের গাড়ি খুব তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে গেল বুঝলাম সামনে কোন বিপদ হয়তো, একটু পরেই গাড়ি ব্যাক করে চলে যাচ্ছে, সামনে এগুতেই দেখলাম ছোট আতসবাজির মত কিছু একটা ফুটে চলেছে ৪-৫ মিনিট ধরে, থামার কোন লক্ষন নেই, রাস্তায় অনেক গাড়ি মাঝপথে থেমে আছে নয়তো ব্যাক করছে।
 
একটু পরে এক তুর্কি খাবারের দোকানে ঢুকে পড়লাম, উদ্দেশ্য বাইরে ঠাণ্ডা থেকে গাঁ বাঁচানো। ১ ঘণ্টা হয়ে গেছে প্রায় আর কতক্ষণ বসে থাকা যায় ভেবে বাইরে চলে আসলাম। গ্রামে ইলেকশনের যেমন ছোট খাটো মিছিল হয় ঠিক সেরকম ভাবে স্লোগান ধরে একদল মেয়ে এগিয়ে আসছে। ওরা বিয়ার খেয়ে বেড়ে উঠা, ওদের কণ্ঠ এতোটাই ভরাট যে আমাদের অনেক পুরুষ আবৃত্তিকারের কণ্ঠও ফেইল। ধীর কদমে সেন্ট্রালের রাস্তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। একটু পরে খোলা জায়গায় এসে দাঁড়ালাম, এতো মানুষ যে অনেকটা ইজতেমার ময়দানের মত। সবাই বাড়ি ফিরবে বলে গাড়ির জন্য ওয়েট করছে হয়তো, রাত ২টা বাজে মাত্র আমাদের কোন তাড়া নেই। এতো মানুষ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে কেউ কারও দিকে ভ্রূক্ষেপ করছে না, আর রাস্তায় সাইকেলের জন্য সাইড দেবার তো প্রশ্নই আসে না, যে যেভাবে পারছে সাইড নিয়ে সাইকেল চালাচ্ছে। আমদের একজনকে তো এক মেয়ে অনেকটা ধাক্কা দিয়েই সাইকেল নিয়ে এগিয়ে গেল, আমরা পিছন থেকে দেখে মজা নিচ্ছি।
 
এবার ডাম স্কয়ারের দিকে যাবো, ওইদিকে বেশ কিছু মিউজিয়াম আছে আর একটু পাশেই রেড লাইট স্ট্রীট। খুঁজে খুঁজে প্রায় ১ ঘণ্টা পথ হেঁটে ডাম স্কয়ার পৌঁছালাম। একটু এগুতেই বুঝলাম আমরা এই রাস্তার পাশ দিয়েই একটু আগে গিয়েছি, মোট কথা এতোক্ষণ ঘনচক্কর খেয়েছি এবং সেটা ২ বার। আমি মনে মনে খুশি, যাক নতুন জায়গায় চক্কর তবে আমি একাই খাই না, বাকিরাও খায়।
 
সারি সারি অনেকগুলো ছোট ছোট দোকানে পর্দা দেয়া, লাল বাতি জ্বালানো। দোকানের সামনে গেলে মনে হবে লিঙ্গারিং এর দোকান, সামনে মডেল ম্যানিকুইন দাঁড়ানো। ভুল ভাঙবে যখন দেখা যাবে সেই ম্যানিকুইন হালকা স্ট্রিপ করছে। পুরো ব্যাপারটার মাঝে একটা আদিম-বুনো দাস প্রবৃত্তি আছে, কোন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এই দৃশ্য সহ্য করা সম্ভব নয়। বলা হয়ে থাকে, এই শহরে কেউ অনিরাপদ বোধ করলে সে যেন রেড লাইট স্ট্রীট এলাকায় চলে যায় কারণ ওখানে মতলববাজ লোকজন বেশি আর তাই পুলিশ প্রটেকশনও বেশি।
 
ওই এলাকা থেকে দ্রুত সরে এসে একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া বারের সামনে ফাঁকা বেঞ্চ পেয়ে ৪ জন বসে পড়লাম। রাত ৪ টা বাজে, খুব বেশি ঠাণ্ডা হওয়ায় আর হাঁটা যাচ্ছে না আর সবারই মাঝে খানিকটা ঝিমুনি ভাব। বসে বসে মানুষ দেখে যাচ্ছি।
হাতে সিগারেট দেখে একজন এগিয়ে এসে ১টা সিগারেট চাইল। বললাম দেয়া যাবে না, এটাই শেয়ার করছি, ওর এতে অনাপত্তি সাথে এবার নতুন আবদার, সিগারেট কেনার টাকা দাও। মেজাজটাই খারাপ করে দিল, একে তো সিগারেটের ব্রাদ্রারহুড এর অপমান করছিস তার উপর তোকে এখন টাকা দিব, যা ভাগ!
এক মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করছে, আমার বন্ধুদের দেখেছ? খেয়াল করিনি জানাতেই, এখানেই বসে আছো অথচ খেয়াল কর নি? মেজাজ গেল বিগড়ে, কত লোক যাচ্ছে আমি খেয়াল করেছি নাকি সবাইকে। এবার আবদার, তাঁর ফোন চুরি হয়ে গেছে তাঁকে সেল ফোনটা ধার দাও সে বন্ধুদের সাথে কথা বলবে। রোমিং করা নাই, ব্যাল্যান্স নাই জানাতেই চলে গেল।
একটু পরে লিকলিকে এক বুড়া চাচা, তার দাবি কিছু কয়েন দাও। দিব না জানাতেই চলে গেল। একটু পর কিং সাইজের একখানা গাঁজার স্টিক নিয়ে হাজির, যেটার দাম কম করে হলেও ৪-৫ ইউরো। তারচেয়েও মজার ব্যাপার একটু আগেই ফেরত পাঠালাম এখন কাছে এসে জানতে চাইছে, সে পার্টনার খুঁজছে এটা খাবার জন্য, আবার ধমক দিয়ে পাঠিয়ে দিলাম।
৩-৪ জন সুন্দরী মেয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো, একজন চমৎকার ভাবে জিজ্ঞেস করছে, একটা সিগারেট দেয়া যাবে? বললাম ৩-৪ টা দেয়া সম্ভব না তবে ১টা দিচ্ছি। ওরা চলে যেতেই চিন্তা করলাম, এতক্ষণ অন্যরা এসে চাইছিল দিচ্ছিলাম না আর এখন? নিজের হিপক্রেসির জন্য নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছি, কাম অন! এভ্রিথিং ইস এপ্রোচ এন্ড সাম অফ দেম নো হাউ টু ডু ইট।
এরপর আবার সেই বন্ধু হারিয়ে ফেলা মেয়েটি। আমার পাশের জন ঘুম থেকে উঠেছে দেখতে পেয়ে তাকেও সেই একই কথা জিজ্ঞেস করছে। এইবার খানিকটা ভয় পেলাম, মনে হল এই মেয়ে সুস্থ না আবার ঠিক মাতালও না। এখানে বিভিন্ন নেশাদ্রব্য আছে, দেখে মনে হবে সুস্থ কিন্তু সে আসলে থাকবে একটা ঘোরের ভিতর যা বাইরে থেকে দেখে বুঝার উপায় নেই। আবার মিথ্যে বলে অন্যদিকে খুঁজে দেখতে বলা হল। একটা ছেলে এগিয়ে আসলো, খুব সুন্দরভাবে জিজ্ঞেস করলো, একটা প্রশ্ন করতে পারি? সায় দিতেই, আচ্ছা বলতে পারো, রেড লাইট স্ট্রীটটা ঠিক কোন দিকে? রাস্তা বলে দিলাম। ও চলে যেতেই, আমরা একজন অন্যজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, রেড লাইট খোঁজে!
এইবার কেস পুরোই আলাদা। এক পাঁড় মাতাল এসে জানতে চাইছে, আমরা তাঁর বেঞ্চে কেন বসে আছি? ঠিক আছে বসে যখন পড়েছিই তখন তাকে টাকা দিতে হবে, সে কোন কথাই শুনবে না, তাকে টাকা দাও, অনেকটা মতিঝিলের বিল্ডিং তলা গুনে ফেলার মত জোকস। আমি ঠিক ভ্রূক্ষেপ করছি না, আরে পাঁড় মাতাল একটা আর আমরা ৪ জন ছেলে বসে আছি কি করবে ও একা? এরই মধ্যে আরও ২-৩ জন মাতাল এসে যোগ দিল, জানতে চাইল ও আমাদের বিরক্ত করছে কি না? বুঝলাম কেস খারাপের দিকে যাচ্ছে আর ওদের সাথে বুলডগের মত একটা কুকুর গলায় কোন চেইন নাই। বলা যায় না, ওইটারেও কিছু খাওয়াইছে কিনা। এতক্ষণের উষ্ণ জায়গাটা ছেড়ে সটকে পড়লাম।
 
একটু এগুতেই দেখতে পেলাম নিচে আন্ডারপাস মেট্রো স্টেশন, সারা রাত ঠাণ্ডা বাতাসের ভিতর বসে কষ্ট করেছি অথচ পাশেই ছিল আণ্ডারগ্রাউন্ড।
ভোরে মেট্রো চালু হতেই চলে গেলাম শহরের দক্ষিণ দিকে। ভোরের স্নিগ্ধতার জন্যই হোক আর নির্জনতায় হোক বেশ প্রশান্তি কাজ করছিল মনে। ভ্যান গগ এর মিউজিয়ামের কাছে চলে আসলাম, চিত্রকর্মের সমঝদার আমি নই তাই অত টাকা খরচ করে আমার মত বাকিরাও কেউ ভিতরে যেতে চাইল না। সামনে এগুতেই বিখ্যাত “I amsterdam। ছবি তোলা শেষ করে ট্রামে চেপে বসলাম, ট্রাম কোথায় থামবে জানি না, আমাদের হাতে অঢেল সময়, আমরা শেষ স্টপেজে গিয়ে নামবো, এরপর আবার অন্য লাইনের ট্রাম, এভাবেই শহর ঘুরে ফেলবো, মোট কথা আর হাঁটছি না, ৭.৫ ইউরো দিয়ে কেনা ২৪ ঘণ্টার ট্রাম টিকিট উসুল করেই ছাড়বো।
 
বেলা যতই গড়িয়ে আসছে শরীর ততই স্তিমিত হয়ে পড়ছে। এরপর সারাদিন বাকিদের সাথে শুধুই চক্কর, আমার আর নতুন করে কিছুই দেখার নাই, যে যেদিকে বলছে সেদিকেই ছুটছি। শহরে স্থাপত্যের বেশ কিছু নিদর্শন রয়েছে। প্রায় পুরো শহর জুরেই নদী, রাস্তা অনেক জায়গায় খুব বেশি সরু, বিল্ডিংগুলো খানিকটা হেলে আছে, জানালাগুলো অস্বাভাবিক লম্বা, তবে এসব স্থাপত্ বিদ্যার মানুষ যারা তাঁদের ব্যাপার আমাদের মত আমজনতাদের জন্য এসব হল, ও দেখতে অদ্ভুত তো কিংবা হুম সুন্দর।
শেষ বিকেলে শহরের স্টেডিয়াম ‘অলিম্পিয়া’য় গেলাম, স্টেডিয়ামে ঢোকা হয়নি তবে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর ধারে ডকে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। একটা শান্তি শান্তি ভাব ছিল নদীটার মাঝে।
 
শহরে চলে আসলাম আবার। গাজাময় একটা শহর, সুভিনির শপে ঢুকলাম, দেখি গাঁজার নির্যাস থেকে ললিপপ, কেক, কুকি এমন কিছু নাই যেখানে গাঁজা দেবার চেষ্টা করে নাই। যেখানেই দাঁড়াচ্ছি সেখানেই গাঁজার গন্ধ, ট্র্যাফিক সিগন্যালে দাঁড়ানোর জায়গা থেকে শুরু করে ট্রামে উঠার লাইন কোন জায়গা বাদ নাই, রীতিমত অসহ্যকর অবস্থা। এক মুহূর্তের জন্য হলেও মনে হল, আমাদের দেশে মেয়েরাও হয়ত এভাবেই সিগারেটের গন্ধ সহ্য করে আসছে।
 
সব মিলিয়ে এই ছিল এবারের Amsterdam, ফিরেছি কিছু মানুষ দেখে আর বিচ্ছিন্ন কিছু বোধ নিয়ে।
 
 
রহমতুজ্জামান রানা
সহকারী অধ্যাপক, শাবিপ্রবি ।