অটোয়া, শনিবার ১৭ আগস্ট, ২০১৯
কালজয়ী মৃত্যুঞ্জয়ী বীর ক্ষুদিরাম বসু - হাসান মনসুর

ছাত্রবস্থায় বড়দের সাথে মিছিলে যখন গলা মেলাতাম , "এই শতাব্দীর ক্ষুদিরাম , ........ লাল সালাম"। তখন থেকেই এই নামটির সাথে আমার পরিচয়। আরও পরে জানতে পারি এই মহান বিপ্লবীর জীবন , কর্ম , সাহসের গল্প। আবার একটা গানও ছিল " একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি " এই গানটা শুনে চোখে ভাসতো - একজন বিপ্লবী - শান্ত সাম্য ভাবে হেঁটে ফাঁসীর মঞ্চে উঠছেন। এই কালজয়ী গানটি গেয়েছিলেন লতা মুঙ্গেশকর , তার হৃদয়ের সমস্ত আবেগ , উচ্ছ্বাস উজাড় করে। মুলত বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর জীবন নিয়েই এই গান। ১৯৭১ সালে বিজয়ী বীর বাঙ্গালীর যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস , যুদ্ধের মহানায়ক , মুক্তিযুদ্ধের মুল চেতনা এবং খলনায়কদের কর্ম এবং ভুমিকা - আমাদের প্রজন্মকে দীর্ঘ একটি সময় জানতে দেয়নি , ১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে আসা অবৈধ সামরিক শাসকরা। ভুল ও বিকৃত ভাবে বাঙালীর সর্বশেষ মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস তখন বই পুস্তকেও লেখা হতো। সেখানে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন নিয়ে জানার কথা আমাদের বেশী নয় - তাও যা আমরা জানি তা পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস বই থেকেই। বিভিন্ন সময়ে আমরা শুনেছি এই মাটির স্বাধিকার আন্দোলনে সাহসী মানুষদের নাম - যারা যাদের সাহস আর বীরত্ব দিয়ে বেনিয়া ব্রিটিশদের মসনদ হেলিয়ে দিয়েছিলেন। লোকমুখে শোনা বা গল্পের বইয়ে পড়া - বীরকন্যা প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত ( যোশী) , মাস্টারদা সূর্য সেন , লোকনাথ বল, হ্যাঁ, ১৮ বছরের কিশোর ক্ষুদিরাম বসু আর প্রফুল্ল চাকীর কথা -- আমার কাছে রূপকথার মত লাগতো। ১৮ বছরের কিশোরটির কথা বলছি - তার নাম ছিল ক্ষুদিরাম বসু । মা লক্ষ্মী দেবী আগেই ২ ছেলে সন্তান হারিয়েছিলেন কিন্তু জীবিত ছিলেন তার ৩ কন্যা সন্তান। এসময়ে তিনি মা হলেন আর এক পুত্র সন্তানের। আগের দুজন পুত্র সন্তানের পরিণতির কথা ভেবে মায়ের বুক কেঁপে উঠলো। তাঁর এই ছেলেটি তাঁকে ছেড়ে চলে যাবে না তো? প্রতিবেশীদের পরামর্শে তখন তিনি তিন মুষ্টি খুদের বিনিময়ে নবজাতককে বিক্রি করে দিলেন তাঁর বড় আত্মজার কাছে। সে থেকে ছেলেটির নাম হয়ে গেল ক্ষুদিরাম। ক্ষুদিরাম বসু। ক্ষুদিরাম বড় হতে লাগলো তাঁর বড়দিদির কাছে। ছোটবেলা থেকে ছিলেন খুব ডানপিটে স্বভাবের। স্কুলে পড়েছিলেন মেদিনিপুরে। স্কুলেই তাঁর বিপ্লবী দলে যোগ দেয়ার হাতেখড়ি হয়। তাঁর শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর হাতে। তাঁর উপর ভার পড়লো বিপ্লবীদের খবরের কাগজ " সোনার বাংলা " বিলি করা। একবার এক মেলায় পত্রিকা বিলি করার সময় পুলিশ তাকে ধরে ফেলায় ক্ষুদিরাম পুলিশের নাকে ঘুষি মেরে ওখান থেকে পালিয়ে যায়। ক্ষুদিরাম সাহসিকতার সাথে বহু কাজ করেছিল। বয়েস কম থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আর ক্ষুদিরাম নিজেও আত্মগোপনে চলে যেতেন। সেজন্য তাঁকে ধরতেও পারতো না। ক্ষুদিরাম শৈশব থেকেই দুরন্ত ও বেপরোয়া প্রকৃতির ছিলেন। এই দুরন্ত প্রকৃতির সাথে বিপ্লবী চেতনার ছোঁয়া পেয়ে ক্ষুদিরাম যেন এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠলেন। বাংলায় গুপ্ত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হেমচন্দ্র কানুনগোর সাথে ক্ষুদিরামের প্রথম সাক্ষাতের ঘটনায় তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়। ক্ষুদিরামের বয়স তখন তের-চৌদ্দ বছর হবে। একদিন হেমচন্দ্র কানুনগো মেদিনীপুরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ক্ষুদিরাম তাকে দেখে দৌড়ে এসে তার বাইক আটকালেন; বললেন, “আমাকে একটা রিভলবার দিতে হবে।” হেমচন্দ্র অচেনা অজানা একটা ছোকরার থেকে এই ধরনের আবদার শুনে স্বাভাবিকভাবেই বিরক্ত হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “তুই রিভলবার দিয়ে কী করবি?” ক্ষুদিরাম জবাব দিলেন, “সাহেব মারবো।” এরপর তিনি ইংরেজদের অত্যাচার-নির্যাতনের কাহিনী বলে কেন সাহেব মারবেন সেসব যুক্তি দিতে শুরু করলেন। হেমচন্দ্র সেদিন তাকে ধমক দিয়ে পাঠিয়ে দিলেও তার প্রেরণা দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর আলীপুর কোর্টের ইংরেজ চীফ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড, যিনি বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িতদের প্রতি প্রয়োজনের অতিরিক্ত কঠোর এবং নিষ্ঠুর আচরণ করতেন, তাঁকে হত্যা করার দায়িত্ব পড়ে সদ্য কৈশোরত্তীর্ণ ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকী নামক এক তরুণ বিপ্লবীর উপর। প্রফুল্ল চাকী এবং ক্ষুদিরাম তৈরি ছিল পিস্তল এবং বোমা হাতে। পিস্তল ছিল প্রফুল্ল চাকীর হাতে। বিপ্লবীদের তার উপর ক্ষোভের একটি কারণ ছিল একবার বিপ্লবীদের এক মিছিলে যোগ দেয়ার কারণে সুশীল সেন নামক এক বালক কে চীফ ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে প্রচন্ড ভাবে বেত্রাঘাত করা হয়। কিংসফোর্ডের নিরাপত্তার জন্য তাকে একসময় কোলকাতা থেকে মজঃফরপুরে বদলী করা হয়। কিংসফোর্ডকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত যখন নেয়া হয় তখন প্রফুল্ল চাকী মজঃফরপুরে যেয়ে রেকি করে আসেন। কোলকাতা থেকে বোমা পাঠানো হয় ক্ষুদিরামদের কাছে। জেলা জজ কিংসফোর্ডের পিছনে একই রকম গাড়িতে আরও দুইজন ইংরেজ ছিলেন। এডভোকেট কেনেডির স্ত্রী এবং কন্যা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো যে এই অসম সাহসী বিপ্লবীদের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় কিংসফোর্ডের পরিবর্তে এডভোকেট কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা যে গাড়িতে ছিলেন সেটিতে বোমার আঘাতে নিহত হয় মা ও মেয়ে। প্রফুল্ল চাকী নিজ পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা করেন। আর ক্ষুদিরাম ধৃত হন। তারিখ টি ছিল ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে ক্ষুদিরাম সব দায়িত্ব তাঁর কাঁধে নেন। তাঁর কোন সহযোগী এমনকি প্রফুল্ল চাকীর কথাও তিনি চেপে গেলেন। কোলকাতায় যাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁদেরকেও জড়ালেন না। ইত্যবসরে প্রফুল্ল চাকীর মৃতদেহ ওখানে নিয়ে এলে ক্ষুদিরামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রফুল্ল চাকী কে চেনেন মর্মে স্বীকার করেন। কিন্তু হিংস্র বৃটিশরা তারপরেও প্রফুল্ল চাকীর মৃত দেহ হতে মাথা কেটে নিয়ে কোলকাতায় প্রেরণ করেন পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য। ক্ষুদিরামের বিচারের সময় আশ্চর্যজনকভাবে দেখা যায় পশ্চিম বাংলা অর্থাৎ কলকাতা, মেদিনীপুর এসব অঞ্চলের কোনো উকিল তার পক্ষে দাঁড়াতে রাজি হননি। শেষে পূর্ববঙ্গের রংপুর থেকে যাওয়া কয়েকজন উকিল লড়েছিলেন ক্ষুদিরামের পক্ষে। কোর্টে উকিলদের অনেক জোরাজুরিতে ক্ষুদিরাম আগে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেয়া জবানবন্দি বদলে নতুন জবানবন্দি দেন। যেহেতু প্রফুল্ল মারা গেছেন, তাই উকিলরা চেষ্টা করেছিলেন যদি তার উপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে ক্ষুদিরামের দণ্ড লঘু করা যায়! কিন্তু এতেও লাভ হয়নি। ব্রিটিশরা বিপ্লবের প্রশ্নে কোনো রকমের ছাড় দেয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। ক্ষুদিরামকে ফাঁসির সাজা শোনানো হয়। এরপর ১৯০৮ সালের এগারো আগস্ট ক্ষুদিরামের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায়, হাসিমুখে গর্বের সাথেই ক্ষুদিরাম বরণ করে নিয়েছিলেন ফাঁসির দড়িকে। বিচারে ক্ষুদিরামের ফাঁসির আদেশ হয়। এটাই হওয়ার কথা। একজন ইংরেজ বিচারপতি ক্ষুদিরামের কাছে জানতে চাইলেন ক্ষুদিরাম কি বুঝতে পেরেছে ওর কি শাস্তি হয়েছে? উত্তরে ক্ষুদিরাম মৃদু হাসলেন। বিচারপতি আবারও একই প্রশ্ন করলো। আর এই মৃত্যুন্জয়ী বিপ্লবী একই রকম ভাবে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানালেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা কি জানতে চাওয়া হলে ক্ষুদিরাম বললেন তিনি খুব ভাল বোমা তৈরি করতে পারেন। যদি আর কিছুদিন সময় পেতেন তাহলে তিনি আরও অনেক ভারতবাসীকে বোমা বানানো শিখিয়ে যেতে পারতেন। তিন মুষ্টি খুদের বিনিময়ে বিক্রি করেও লক্ষ্মী দেবী বাঁচাতে পারলেন না তার এই পুত্র সন্তানটিকেও। ১১ ই আগস্ট ১৯০৮ সাল এই মহান বিপ্লবী অবিচল চিত্তে এগিয়ে গেলেন ফাঁসির মঞ্চের দিকে এবং নির্লিপ্তভাবে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়ে নিলেন। ক্ষুদিরামের মৃত্যু হয়েছে আজ এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই নামটি আমাদের কাছে এখনো বিপ্লবের প্রতীক হয়ে আছে। লাল সালাম -বিপ্লবী ক্ষুদিরাম।  

 হাসান মনসুর
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।