অটোয়া, বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
আমার কিশোরীবেলার পাঠশালা (২) –গুলজাহান রুমী

আমার কিশোরীবেলার পাঠশালা (১) পড়তে ক্লিক করুন

দুই
মার জন্মের অনেক আগেই আব্বা মুরাদনগরের ওসি ছিলেন। তারপর আরও দুবার পুলিশ ইন্সপেক্টর হিসেবে দীর্ঘ একটা কাল মুরাদনগরে আব্বা কাটিয়ে দিলেন। আমি যখন মুরাদনগরে স্কুলে ভর্তি হই আব্বার ইন্সপেক্টর হিসেবে এই জোনে প্রথম মেয়াদ এটি। তারও আগে ওসি হিসেবে দীর্ঘ সময় এখানে ছিলেন। যার জন্য মুরাদনগরের মানুষ ও প্রতিটি ধুলিকণার সাথে আব্বা জড়িয়ে যান। স্কুল ও কলেজ জীবনে আব্বা ফুটবল প্লেয়ার হিসেবে খ্যাত ছিলেন। মুরাদনগরে ক্লাব, স্কুল, বালিকা বিদ্যালয় এমনকি কলেজ প্রতিষ্ঠায় আব্বার অনেক ঘামশ্রম জড়িয়ে আছে। মুরাদনগরে আমার একমাত্র ভাইয়ের  জন্ম হয়। আমার আগে এক বোন জন্মের পরপরই মারা যান। মুরাদনগরের মানুষ জানতেন, একটি পুত্রসন্তানের জন্য আব্বার বাসনার কথা। মুরাদনগর ক্লাবঘরে এমপি ডাঃ ওলিউল্লাহ চাচার নেতৃ্ত্বে মিটিং বসে, তারা দাবী তুলেন নবজাতকের নাম হবে মুরাদনগরেরই নামে। আব্বা বেশ চনমনে মেজাজে পুত্রের নাম মুরাদ কবুল করে ঘরে ফেরেন ক্লাব থেকে। আমার পিঠাপিঠি ভাইটির নাম মুরাদনগরের মানুষেরই খায়েসে সেদিন থেকেই মুরাদ হয়ে যায়। মুরাদনগরের মানুষের ভালবাসার এই দানটি আমার ভাই সারা জীবন বহন করবে। গরু জবাই দিয়ে শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে মুরাদের নাম রাখা হল। আমার জন্ম যদিও চৌদ্দগ্রাম কিন্তু আমার স্মৃতির পটে চৌদ্দগ্রামের কোনো ছবি ভাসেনা যেরকম মুরাদনগর স্মৃতিপটে ভাসে। পরে আরেকবার এখানে আব্বার বদলি হয় এবং এখান থেকেই আব্বা অবসর গ্রহণ করেন।

পাঁচটি থানা পরিদর্শন নিয়ে আব্বা সদা ব্যস্ত থাকতেন। আমাকে তাই আরদালী কাকার হাত ধরে প্রথম দিন ভর্তি হতে স্কুলে যেতে হল। ঐদিন হোমনা থানাতে কিছু একটা ঘটে যায় আর আব্বা হুড়মুড় করে স্পীডবোট দিয়ে চলে যান সেই কথাটা কেবল মনে পড়ে। কোথা থেকে একটা চওড়া খাল এসে সেই আদ্যিকালে গোল্লাছুট খেলতে খেলতে নদী গোমতীতে এসে মিশে গেছে। খালটা থানা চত্বরের পাশ দিয়ে আমাদের বাসার নাগাল দিয়েই গেছে। সেই খালে জিঞ্জির দিয়ে নোঙর করে রাখা হত স্পীর্ডবোর্ট। আমাকে স্কুলে নানিয়ে যে আব্বা হোমনা চলে গেলেন সে দৃশ্যটা এখনও যেন ধুলিমলিন স্মৃতির পৃষ্টা খোলে দেখতে পাই। স্পীর্ডবোটের   চেনা শব্দটা এখনও যেন কানে বাজে বেদনার মত। খালের পাশ দিয়ে থানাচত্বরকে নিরাপদ রাখার জন্য চওড়া আর অনেক উঁচু একখান দেয়াল ছিল। আমাদের বাসায় একটা মইও রাখা ছিল, সেটা দেয়ালে লাগানো থাকত সব সময়। আব্বা স্পীর্ডবোর্ট দিয়ে কোথাও যাবেন শুনলে আমি মইতে চড়ে বসতাম। সেদিনও মইতে চড়ে আব্বার চলে যাবার দৃশ্য দেখেছি। স্পীর্ডবোর্ট যেতে যেতে গোমতীতে গিয়ে পড়েছে আর কোথায় যে মিলিয়ে গেছে আকাশে উড়াল চিলের মত। মনে হয়েছিল আব্বা গোমতীর পানি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিগন্তের ওপারে উড়েউড়ে চলে গেছেন। হোমনা বুঝি রুপকথার এক রাজ্য, হোমনা যেতে হলে দিগন্তের ওপারে যেতে হয়। সেদিন আমার হোমনা যাবার ভীষণ ইচ্ছে করে স্পীর্ডবোর্ট চড়ে। অন্যান্য দিনেও আব্বা স্পীর্ডবোর্ট চড়ে কোথাও গেলে আমার খুব ইচ্ছে হত। কিন্তু কোনোদিন চড়া হয়নি। সরকারী লোক বা সরকারের কাজ ছাড়া এটি কেউ চড়ার উপায় নাই যতদিন আব্বা ইন্সপেক্টর। এই জ্ঞানটা আপনাআপনি আমাদের হয়ে গিয়েছিল।

স্পীর্ডবোর্টে আব্বার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে কল্পনায় দেখি আমিও উড়ে চলেছি আব্বার সাথে, সাইসাঁই বাতাসে আমার চুল উড়ছে, গোমতীর জলধোয়া স্নিগ্ধ বাতাস আমার চোখেমুখে আদর খেলে যাচ্ছে। আমি যেন উড়ে চলেছি স্বর্গের ঠিকানায়। আব্বা পাঁচটি থানার দায়িত্বে ইন্সপেক্টর ছিলেন। প্রায় দিনই আব্বাকে কোথাও না কোথাও যেতে হত থানা পরিদর্শনে। মাঝে মাঝে অনেক ফোর্স নিয়ে পেট্রল ডিউটিতে যেতেন। প্রায় সময়ই হাঙ্গামা কোথাও না কোথাও লেগেই থাকত। আম্মা যখন অনেকটা সময় নিয়ে নামাজ ও দোয়া কালাম পড়তেন তখন বুঝতে পারতাম আব্বা কোথাও বিপদের মধ্যে গেছেন। আমাদের কোনো ভাই বা চাচা-মামা ধরণের নিকটজন আমাদের কাছাকাছি থাকতেননা কেউ। আমাদের পৃথিবীজুড়ে ছিলেন আব্বা কেবল। আম্মা যখন জায়নামাজে বেশীক্ষণ তসবি-তাহলিলে পড়ে আছেন দেখতাম, আমরা ঠাওর করতে পারতাম আব্বা কোথাও বিপদের মধ্যে আছেন। ধপ করে সারা আলো যেন নিভে গেছে মনে হত তখন। তারপর একসময় আব্বা যখন ঘরে ফিরতেন জগতের আলোগুলো আবার জোনাকির আলোর মত আমাদের প্রাণ আলোয় আলোয় পূর্ণ করে দিয়ে যেত। আমার ছোট আপা আব্বার পেটে কান লাগিয়ে দেখতেন মফস্বলে আব্বা কেমন খাবার খেয়ে এসেছেন। ছোট আপা বয়েসে আমার বেশ বড় ছিলেন, অপরাপর তিনজন বড় আপাই আমার অনেক অনেক বড়। ছোট আপা যখন আব্বার পেটে কান লাগিয়ে  দেখতেন আব্বার খাবারের মেনুটা কি হতে পারে, আমি তখন হা করে ছোট আপার দিকে তাকিয়ে থাকতাম মেনুটা জানার জন্য।ছোট আপা যে মেনু বলতেন আমি তাই বিশ্বাস করে ফেলতাম। আপা আব্বাকে খুব ভালবাসতেন, সারাবেলা আব্বার গায়গায় আঠার মত লেগে থাকতেন। আপার এই ভালবাসা চোখে দেখা যেত কিন্তু আমি আমার নিজের মত করে পরম যতনের ভালবাসা দেখাতে পারতামনা। ছোট আপা আব্বার ধমকধামক ও পিটুনিও খেয়েছেন বেশিবেশি। পড়ালেখায় মন বসাতেননা, স্কুলে যেতে আপার ছিল দারুন অনিহা। আব্বার হাতে একটা কঞ্চি আর ছোট আপা কেঁদেকুটে স্কুলে যাচ্ছেন আর পেছনে ফিরে দেখছেন আব্বা বেত নিয়ে কতদূর আছেন। এই দৃশ্য আশপাশের লোকজন বেশ মজা করেই দেখত। আমি তখন খুব ছোট ছিলাম বা ছিলামনা বলে মনে থাকার কথা না বা দেখিনি । কিন্তু আম্মা বা অন্য আপাদের কাছ থেকে এই গল্পটি শুনতে শুনতে আমার তখন মনে হত, দুর, ছোট আপা একটুও চালাক না, কেন আব্বার বেতের নাগালে থাকছেন, দৌঁড়ে নাগালের বাইরে কেন যাচ্ছেননা? আমি ছোট আপার জাগায় কল্পনা করে মনেমনে পালাই। আব্বার হাতে চিকন কঞ্চিটা সাপের জিহ্বার মত লকলক করছে, আপাকে ছুঁইছুঁই করেও নাছুঁয়ে বাতাসে শপাং শপাং করছে। তাবৎ থানা মহল্লার লোকজন বাপবেটির কান্ড দেখে মজা লোটছে। আহারে আমার ছোট আপা।

মুরাদনগর ছাড়াও দাউদকান্দি, বাঞ্চারামপুর, দেবীদ্বার ও হোমনা থানা আব্বার আওতায় ছিল। হোমনা ছাড়া স্পীর্ডবোর্ট দিয়ে আর কোথাও যেতে হতনা আব্বাকে। মনে মনে কামনা করতাম, আল্লা, হোমনায় কেন রায়ট হয়না প্রতিদিন তাহলে আব্বা আমার স্বপ্নের জলযান স্পীর্ডবোট চড়ে নিত্যদিন যাবেন আর  স্বর্গ যাত্রার দৃশ্যটা আমার দেখা হবে। কিন্তু স্কুলযাত্রার দিন হোমনায় কোনো কান্ড ঘটুক আমি কামনা করিনি। তাহলে আব্বা আমাকে নিয়ে স্কুলে ভর্তি দিতে যাবেন, আর সকলে দেখবে ইন্সপেক্টর সাহেবের ছোট মেয়ে বাবার হাত ধরে প্রথম পাঠশালায় এসেছে। এতে আমার প্রথম স্কুলযাত্রার মর্যাদাটাই বেড়ে যাবে বলে ভেবে রেখেছিলাম। শিক্ষকরাও খাতিরযত্ন করবে। কিন্তু হায়রে দাঙ্গাবাজ হোমনা। আরদালী কাকা তাড়া দিতে দিতে মই থেকে আমাকে নামিয়ে স্কুলের পথে যাত্রা দিলেন। ততক্ষণে হোমনার পথে গোমতীর বুকে আব্বার স্পীডবোর্টের চেনা শব্দটা ক্ষীন হতে হতে মলিয়ে গেছে।

দিন কয়েক পরে নতুন আরেক সখি এসে ঝুটে। বদলি হয়ে নূরুল হক নামের এক ওসি এসেছেন মুরাদনগরে। নতুন জয়েনকরা সেই ওসির মেয়ে লোনা। থানা চত্বরের খানিক দূরে আমাদের পরিপাটি বাংলোটা, অন্য পাশে ওসির জন্য নির্ধারিত বাসা। আর চারপাশ ঘিরে অন্যান্য অফিসারদের সারিসারি বাসা ও কনেস্টবলদের কোয়ার্টার। লোনা আর আমি নিত্যদিন একসাথে স্কুলে যেতাম। ঘরেও ফিরতাম একজোট হয়ে। তাই দেখে সাবেরা যেন মেজাজে মলিন হয়ে যায়। লোনার জন্যে সে আমাকে পুরো দখলে নিতে পারেনা বলে আরও বেশি আগলে নিতে চায় আমাকে। একদিন আমার ঘরে চলে আসে। আম্মাকে ধরে বসে আমাকে আসছে ঈদের দিনে তাদের বাড়ী বেড়াতে নিয়ে যেতে চায় বলে। ওর কথা শুনতে শুনতে আম্মার বেশ পছন্দ হয়ে যায় সাবেরাকে। রাজি হয়ে যান। ঠিক হয় সকালবেলা আমাকে নিজে এসে নিয়ে যাবে আর দুপুর থাকতেই বাসায় দিয়ে যাবে। আমি লোনাকেও নিয়ে যেতে চাই সাথে কিন্তু সাবেরা আমল দেয়না। প্রতিদিন বিকেলবেলা ও ছুটির দিনগুলোতে আমি ও লোনা পুতুল বিয়ে খেলতাম। কুতকুত খেলতাম। আমাদের বাসার মুল ঘরখানার একপাশে একটুখানি আঙ্গিনা। অদূরে আব্বার শখের গাভীঘর। এই ঘরটি পাকা একটি স্টোরেজ রোম ছিল। আব্বা এটিকে বিপুল উদ্যমে গাইরানীর বেডরুম বানিয়ে নেন। কক্ষজুড়ে অতিকায় মশারী টানানো, জাবনা খাবার জন্য পাকার ঢালাই ঘড়া সবকিছু আব্বা মনের মাধুরী মিশিয়ে জাগামত সাজালেন। দিনরাত বিরাটকায় মশারী্টা  টাংগানো। মশারীর ভেতরে রাজরানীর মত বিরাজ করছেন পুত্র অথবা কন্যা নিয়ে গরুর গাভী। বাছুর অবশ্য মশারীর কারাগারে সারাক্ষণ থাকতে চায়না কিন্তু গাভী ভাবলেশহীন জাবর কাটছে তো কাটছেই। আর আশপাশে হাটাচলা করে কখনো অকারণে ঘেউঘেউ করে জীবন গোজরান করে দেওয়া গোবেচারা কুকুর মশায়। গাভী আর কুত্তা-এই দুটি প্রাণী ছাড়া আব্বার যেন জীবন জীবনই না। সরাইল জাতের কুকুর যারা দেখেছেন তারা জানেন কেমন রাজাধিরাজ আদল এদের। বন্য চিতার মত দ্রুতগামী। আমাদের টমির তিন রঙের ডোরাকাটা মিহিন লোমের বাহার ছিল। অনেকদিন বেঁচেছিল টমি। সকালবেলা গাইকে গোসল দিয়ে আব্বা নিজে গোসল সারতেন। টমি নিজের গায় যেন পানির ছিটা নাপড়ে এরকম নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে প্রতিদিনই গাভীর গোসলের তদারকি করে। ঠান্ডা পানি গায় পড়লে গাভীটা বেশী উচাটন শুরু করে দিত, টমি তখন গাভীর পিলে চমকে হুঙ্কার ঝেড়ে দিত কয়েকটা। আর কী আশ্চর্য্য টমির শাসানোতে শীতকাতর গাভী বেচারী চুপ মেরে যেত। আব্বা হেসে টমিকে বলতেন, আপনি যান, আপনাকে বাহাদুরী দেখাতে হবেনা। আমি ভেবে পাইনা আব্বা কেন অবলা পশুদের সাথে এত নরম করে কথা বলেন, এরা কি আব্বার কথা বুঝে? আর মানুষের সাথে কথা বলার সময় আব্বার এত ভারী মেজাজ কেন? এসব প্রশ্নের শানে নজুল বয়েসে অনেক পেকে যাবার পরে বুঝেছি। স্কুল ছুটির দিন সাতসকালেই লোনা চলে আসত আমাদের বাসায়। আমরা দুজন মিলে আব্বার গাইকে গোসল দেওয়া দেখতাম। কিন্তু কিছুদিন পরই লোনা আমাদের বাসায় আসা বন্ধ হয়ে গেল। আমি খুব দুঃখ পেলাম। বিকেলবেলা বাক্সোপেটরা সাজিয়ে আর পুতুল বিয়ে হয়না। একাএকা পুতুলের পেটরার ডালা খোলে কাতর চোখে কেবল চেয়ে থাকি আমি। লোনা আসেনা। ---চলবে।

গুলজাহান রুমী 
অটোয়া, কানাডা।