অটোয়া, মঙ্গলবার ২৫ জুন, ২০১৯
বন্ধনহীন গ্রন্থি- অপূর্ব শর্মা

‘জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উক্তিটি যেন হাসান আজিজুল হকের ‘স্মৃতিগদ্য: বন্ধনহীন গ্রন্থি’ গ্রন্থের জন্য প্রযোজ্য। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবন্ধ-নিবন্ধ আর স্মৃতিগদ্যকে একত্রিত করে প্রকাশক ‘আত্মজৈবনিক’ ধাচের যে গ্রন্থটি আমাদের উপহার দিয়েছেন, সেটি পাঠে রবী ঠাকুরের সেই উক্তিটিই মনে হচ্ছে বার বার। কারন যে ছয়চালি­শটি লেখা অন্তর্ভূক্ত করে বইটি প্রকাশ করা হয়েছে সেগুলো যদি গ্রন্থভূক্ত না হতো তাহলে আমরা বঞ্চিত হতাম হাসান সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পাঠ থেকে।  
হাসান আজিজুল হকের যে কোনও রচনাই বাংলা সাহিত্যের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। তাঁর লেখা যেভাবে আমাদের প্রাণিত করে, দিক নির্দেশনা দেয় ঠিক তেমনি করে সমকালে আমাদের মানসভূমিকে আর কারও লেখা উদ্বেলিত করেনা। তাঁর ব্যক্তিক জীবন থেকে পাঠও আমাদের চলার পথের পাথেয়। পাঠকমাত্রেই হাসান অধ্যয়নের জন্য ব্যাকুল থাকেন। অনুসন্ধিৎসুদের অভিপ্সা পুরণ করতে প্রকাশকরাও দ্বারস্থ হন প্রখ্যাত এই লেখকের। তবে, এখন আর সকলের প্রত্যাশা তিনি পুরণ করতে পারেন না তিনি। শারিরীক অক্ষমতার কারনে আগের মতো লিখতে পারেন না। এ কারনে অনেক প্রকাশককে হতাশ হতে হয়। কিন্তু কেউ কেউ উদ্দেশ্যকে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছতে হাটেন বিকল্প পথে। এখানে, ওখানে থাকা লেখাগুলোকে একত্রিত করে লেখকের সঙ্গে পরামর্শক্রমে তা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। যার ফলে হাসান আজিজুল হকের অনেক লেখা যেমন বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে, তেমনই পুরণ হচ্ছে পাঠকদের প্রত্যাশা। যে গ্রন্থ সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে এই ভূমিকা সেটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লেখাকে একত্র করে প্রকাশ করলেও গ্রন্থমান বিচারে হাসান আজিজুল হকের আত্মজৈবনিক অন্য গ্রন্থের তুলনায় কোনও অংশেই কম নয়, বন্ধনহীন গ্রন্থি। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে। ব্যক্তিগত ও আত্মজৈবনিক, রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজ ও সমকালীন বিষয়-আশয়সহ মোট তিনটি পর্বে সাজানো এ গ্রন্থটি নানা কারনেই গুরুত্বপূর্ণ। সময়কে ইতিহাসের সাথে সংযুক্ত করে ব্যক্তির চোখে দেখার যে প্রয়াস গ্রন্থে চালিয়েছেন লেখক তা সত্যিই অতূলনীয়। 
বইয়ের প্রথম পর্বটির শিরোনাম ব্যক্তিগত ও আত্মজৈবনিক। এ পর্বে আছে ‘মায়ের মুখ’, ‘শৈশবস্মৃতি’, ‘বালক বয়স’, ‘একটুখানি ছেলেবেলা : মা ও বাবা’, ‘ছেলেবেলার উৎসব’, ‘শৈশবের মেলার স্মৃতি’, ‘খানিকটা বেলা হলে’, ‘চরুলিয়ার স্মৃতি’, ‘খানিকটা ফিরে দেখা’, ‘আমার আলমামাতের’, ‘জানু আপার লেখক হয়ে ওঠা’, ‘স্মৃতি সততই সুখের নয়’, ‘আমার প্রিয় শিক্ষক’, ‘প্রেম গাঢ় হয় বর্ষায় নয়, শরতে’, ‘সবাইকে বন্ধু ভাবাটা আমার অভ্যাস’, ‘মফস্বল-মহানগর’, ‘বাঙালির খাদ্যাভ্যাস’, ‘সাঁওতালগন’, ‘পিছনপানে তাকিয়ে’, ‘শেষপর্যন্ত জীবনের পক্ষেই’, ‘ত্বকী নামের ছেলেটি’, ‘হারিয়ে যাওয়া ঢাকা’, ‘বর্ষা, বর্ষণ, মন-কেমন করা’, ‘শরতের কথা’, ‘এ পথে আমি যে’, ‘উৎসবে মানুষ নতুন হয়ে উঠে’, ‘আরো একটি কন্যা’, ‘ফেলে আসা দিনরাত্রি’, ‘ছুটির জীবন জীবনের ছুটি।’ 
রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজ শীর্ষক পর্বে আছে ‘রাষ্ট্র হোক জনগণের’, ‘প্রকৃত গণতন্ত্র হনুজ দূরস্থ, তবু ভালো কিছু হোক’, ’৭৫-এর ঘটনা গণতন্ত্রের মূলে কুঠারাঘাত’, ‘ভুল অঙ্কেরও সঠিক উত্তর হয়’ লেখা। সমকালীন বিষয়-আশয় পর্বে, ‘গুরুত্বের জায়গা তো উচ্চশিক্ষায় বাংলা’, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়’, ‘শরণার্থী, সমাধান জানা নাই’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভরসার একমাত্র ভূমি’, ‘নিখোঁজদের ঠিকানা’, ‘শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষায় এগিয়ে আসুন’, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার’, ‘কোরবানি : ত্যাগের বদলে প্রদর্শনের উৎসব!’, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার’, ‘দেশকে ভালোবাসতে হলে দুঃসাহসিক হতে হবে’, ‘প্রশ্নগুলোকে অ্যাকিলিসের বর্শা করে তুলুন’, ‘স্বাধীন দেশে এ কোন নতুন অভিজ্ঞতা’ প্রভৃতি। গ্রন্থের প্রতিটি লেখাই স্বতন্ত্রতায় ভাস্মর। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে লেখা হলেও একটি লেখার সঙ্গে অন্য লেখার সাযুজ্য নেই। শৈশব, কৈশর এবং ব্যক্তিজীবন যেমন উঠে এসেছে তেমনই সমাজ এবং রাষ্ট্রভাবনাও ঠাই পেয়েছে আলোচনায়। প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে লেখক যেমন নির্মোহ থাকার চেষ্টা করেছেন তেমনই দিয়েছেন অকপট স্বীকারোক্তি। বাহুল্যতা নেই কোনও পর্বেই। প্রথম পর্বে প্রথম লেখাটি পাঠ করলে গ্রন্থে যে কোনও ধরনের অতিরঞ্জন নেই সেটা অনুমিত হবে সহজেই।  
‘ছোটোবেলায় দেখতাম একমাস দেড়মাস পরে পরে গাঁয়ের বউদের-যে বয়সেরই হোক-একবার করে ঘন্টা দুয়েক কাঁদতেই হবে। একেবারে নিয়মমাফিক। কেনও কান্না সে কথা কেউ জিজ্ঞেস করবে না, সে নিজেও বলবে না। কবেকার কোন শোক বুকের মধ্যে পাথরের মতো জমে আছে- হয়তো মাঝবয়সী কোনো বউয়ের বিশ বছর আগে একটা মরা ছেলে জন্ম নিয়েছিল, হতে পারে সেই শোকটাই। হয়তো মায়ের কোনকালের মৃত্যু, ভাইবোনের মৃত্যু কিংবা শিশুবয়সেই চলে যাওয়া কোন সন্তানের শোক-এরকম যে কোনো ঘটনা হতে পারে। কিংবা হয়ত তেমন কিছুই নয়-কোনো বিশেষ ঘটনা নয়-কতকাল সংসার করছে, কেন আজো বেঁচে আছে, মরে যায়নি! হয়তো শুধু সংসারের ছাইপাঁশ ভেতরে গাদা হয়ে আছে- সেটাকে কেদে বের করে দিয়ে একটু হালকা হওয়া। মা চাচিদের সবাইকে এরকম কাঁদতে দেখেছি। 
এই কান্নাকে সবাই সমীহ করে। কেউ কোনোরকম বাধাও দেয় না, সান্ত্বনাও দেয় না। কাঁদছে কাঁদুক। মা যেদিন কাঁদবে সেদিন ভোরবেলা থেকেই বুঝতে পারা যেত। তার ভারী গোলমুখ আরও ভারি।’ 
মায়ের মুখ শিরোনামের এই কথাগুলো উদৃত করার মূল কারন হচ্ছে, হাসান আজিজুল হক মায়ের কথা বলতে গিয়ে যেমন বাহুল্যতা বর্জন করেছেন তেমনই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটি সামাজিক প্রথা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এরকম একটি উপাচারযে এক সময় গ্রামবাংলায় প্রচলিত ছিলো সেটা আমরা জানতে পারলাম তারই কল্যানে। এই প্রথামে আজ উধাও হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে চিরকালীন স্রোতে। সামাজিক বিধি নিষেধের কারনে অবরোধবাসীনী নারীদের আপনার মতো করে কান্নারওযে অধিকার ছিলো না সেটাই যেন প্রকারান্তরে বিবৃত করেছেন লেখক। নিজ মায়ের কথা উলে­খ করে এককালের অন্ধকার অধ্যায়কে এত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন যা আমাদেরকে ভিন্নতর এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ফেলে আসা অতীত আসে বর্তমান হয়ে। নিজের মাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তার এইযে অকপট স্বীকারোক্তি সেটাই একজন হাসান আজিজুল হকের জাত চেনাতে আমাদেরকে সাহায্য করে।   গ্রন্থে শৈশবস্মৃচারণ করতে গিয়ে বার বার আবেগপ্রবন হয়েছেন লেখক। পেছনে ফিরে তাকিয়ে যে আখ্যান বিবৃত করেছেন তিনি, তা যে কোনও পাঠককেই স্মৃতি কাতর করবে। ফেলে আসা অতীত আর বর্তমানের মধ্যেযে যোজন যোজন পার্থক্য সেটাই ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি সাবলীলতার ভাষ্যে। মৃত্যুচিন্তাকে উপেক্ষা করলেও জীবনের গতিযে মৃত্যুর দিকেই ধাবমান তার অকপট বর্ননা আমাদের ব্যথাতুর করে। আলোচনায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাথে জীবনকে সংযুক্ত করে উপস্থাপন করে ইতিহাসের প্রতি আমাদেরকে সংযুক্ত করার যে প্রয়াস তিনি চালিয়েছেন তা আমাদেরকে শুধু চমৎকৃতই করে না ছাইচাপা পড়ে থাকা সমৃদ্ধির কথকতা চিন্তার ক্ষেত্রকেও স¤প্রসারিত করতেও সাহায্য করে। প্রতিটি অধ্যায় নিখুতভাবে চিত্রিত করায় ছবির মতো তা ভেসে উঠে আমাদের চোখের সামনে। আমরাও স্মৃতিকাতর হই। আমাদের শৈশবের সাথে একাকার হয়ে যায় লেখকের শৈশব। তিনি যখন বালক বেলার কথা বলেন, তখন আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠে সামাজিক পশ্চাৎপদতার কথা। বিধবা বিয়েযে শুধুমাত্র হিন্দু সমাজেই নিষিদ্ধ ছিলো, তা কিন্তু নয় মুসলমান সমাজও একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল। নিজ ফুফুর বর্ননা দিতে গিয়ে বিষয়টিকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তা সেকালে নারীর করুণকথার মুখোমুখি আমাদেরকে দাঁড় করায়। 
বিস্তৃত জনপদবহুল রাঢ়ের হিন্দু সমাজে বিদ্যাসাগর মশাই দন্তস্ফুট করতে পারেন টি একটুও, হিন্দু বিধবার বিয়ের কথা তখন কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল; অদ্ভুত কথা, ভদ্র মুসলমান পরিবারেও সেকথা উচ্চারণ করা যেত না। প্রতিবেশী সমাজের প্রভাব কি-না আমি জানি না। আমার ফুফু নয় বছর বয়সে সেইযে ঢুকেছিলেন আমাদের বাড়িতে- কলেরায় মারা যান তার স্বামী একেবারে বেঘোরে, বলতে গেলে পাশের বাড়িতেই- কেউ কোনদিন ভাবেনি আরেকবার তিনি নিজের সংসার করতে ইচ্ছা করতেওতো পারেন। একবারে সত্তর বছর বয়সে তিনি তাঁর ভাইদের কাঁধে চড়ে মাঠের কোল ঘেঁষে প্রদীপের মতো দেখতে কাকচক্ষু জলে ভরা দিঘিটির উত্তর-পশ্চিম কোণে বড় একটা আমগাছের নিচে তাঁর নিজের মায়ের পাশে গিয়ে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে রইলেন।   
হাসান আজিজুল হকের আবেগঘন এই বক্তব্য আমাদেরকেও ব্যথাতুর করে তোলে। বর্তমানের সঙ্গে আমরা তার হিসেব মেলাতে পারিনা। তখন বুঝতে বাকি থাকেনা সত্যিই অগ্রসর হয়েছে আমাদের সমাজ। কিন্তু ঠিক যতটা অগ্রসর হওয়ার কথা ছিলো ততটা হয়নি। নানা প্রসঙ্গে আলোকপাত করতে গিয়ে সেটা বার বারই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবার চেষ্টা করেছেন তিনি।   সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের এই কালে দাঁড়িয়ে হাসান আজিজুল হক বার বার বলার চেষ্টা করেছেন একসময় বিদ্বেষ বলে কিছু ছিলো না, ছিলো না হানাহানি। সৌহাদ্যের অনন্য স্থান ছিলো বাংলাভূমি। কিন্তু কাল পরিক্রমায় আধুনিক যেমস হয়েছে মানুষ, তেমনই হয়েছে উন্মত্তও। প্রদীপের নীচে রয়ে গেছে এখনও অন্ধকার। সেই আলোকের তালাশই করেছে তিনি তার প্রতিটি লেখায়।  
একজন লেখক যখন তিনি সব বয়সের পাঠকের মাঝে সমান গ্রহনযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম তখনই তাকে স্বার্থক বলা যায়। হাসন আজিজুল হকের কৃতিত্বের জায়গাটা এখানেই- সব বয়সের মানুষই পাঠ করেন তাঁর লেখা। এবং তিনি নিজেও সকলের কথা চিন্তা করেই সাজান গদ্যের ক্যানভাস। কঠিন শব্দ দিয়ে গদ্যের জমিনকে কখনও দুর্বোধ্য করে তুলেন না। সহজপাঠ্যে রসাস্বাদনের সকলকিছুই বর্তমান থাকে তাঁর লেখায়। তিনি যখন লিখেন, 
ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত টানা ছবছর আমি যবগ্রাম মহারানী কাশীশ্বরী উচ্চ ইংরেজি ইন্সটিটিউট স্কুলে পড়েছি। ছাত্রী একজনও ছিল না। হিন্দু-মুসলমান কেউই তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতেন না। সময়টা তখন দুঃস্বপ্নে ভরা- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ১৯৩৫-এর আইন প্রচলনের ফলে নির্বাচন হয়েছে বাংলাদেশে, সা¤প্রদায়িকতা বাড়ল- কংগ্রেস ও মুসলিম লীগকে ব্রিটিশ সরকারের উস্কানি ও ভেদমূলক নীতির ফলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি একরকম করতে হচ্ছে। বিয়ালি­শ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন, তেতালি­শ সালের ভয়ংকর, দুঃসহ, সরকারের ইচ্ছাকৃত দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু, পাকিস্তান আন্দোলন- একের পর এক আঘাত আসছে, তখন। দূর নিভৃত গ্রামে বসে আমরা এসব তেমন টের পাই না বটে, তবু ঢেউ হলেও কিনারা পর্যন্ত আসে।

এইযে সাবলীলভাবে ইতিহাসের বাক বদলের আখ্যান তিনি তুলে ধরেছেন, তা আছে পুরো গ্রন্থ জুরেই। নিজ জন্মস্থান ছেড়ে আসার বেদনাকাতরতাও আমরা টের পাই ‘ফেলে আসা দিন রাত্রি’র শব্দভাষ্যে।   
জীবনের দীর্ঘপথ পরিভ্রমনের কথার পাশাপাশি, রাষ্ট্র-রাজনীতি এবং সমাজ নিয়েও গ্রন্থে আলোকপাত করেছেন তিনি। কল্যানমুখি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের কথা বলেছেন অকপটে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশ হবে জনগনের রাষ্ট্র এমন প্রত্যাশা হাসান আজিজুল হকের। তাঁর মতে, বহু ত্যাগের, বহু কষ্টের বিনিময়ে পাওয়া এ স্বাধীনতাকে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছতে হবে। সত্যিকারের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে সম্মিলিতভাবে।
পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট আমাদের জাতীয় জীবনে যে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে তা ব্যথিত করে লেখককে। তিনি জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনাকে গণতন্ত্রের মূলে কুঠারঘাত আখ্যা দিয়ে অকপটে স্বীকার করেন, ‘এমন নৃশংসতা বাংলাদেশে ঘটতে পারে, তা আমাদের কল্পনারও অতীত। এখন জানি, দেশের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে অবশ্যই বিদেশি মদদ যুক্ত হয়েছিল। ’ ৭৫-এর ঘটনা এজন্যই যেমন দুঃখজনক, শোকাবহ, ঠিক তেমনি একটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের মূলে কুঠারঘাতও বটে। 
অনেক লেখক আছেন যাদের সামাজিক দায়বোধের জায়গাটা খুবই দুর্বল। তারা স্বপ্নময়তায় আরোহন করতে সচ্ছন্দ বোধ করেন। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে কলম ধরা থেকেও তারা বিরত থাকেন। হাসান আজিজুল হক এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সামাজিক ব্যভিচারের বিরুদ্ধে সবসময়ই সোচ্চার হয়ে উঠে তাঁর কলম। ওয়ান ইলিভেনের সময় অনেকেই যখন ভয়ে গুটিয়ে ছিলেন, তখন সোচ্চার ছিলো তাঁর কণ্ঠ। শিক্ষকদের গ্রেফতার ও নির্যাতনে আহত হন তিনি। ‘স্বাধীন দেশে এ কোন নতুন অভিজ্ঞতা’ শিরোনামে লেখায় এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করেন তিনি। প্রশ্ন তুলেন বিচার ব্যবস্থা নিয়ে। তার এই সাহসিকতা প্রশংশিত হয় বিশ্বব্যাপি। তবে, সাধুবাদ পাওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেন নি। বিবেকের তাড়না থেকেই সেদিন সোচ্চার হয়েছিলেন তিনি। যা তাকে আসীন করেছে অনন্য এক উচ্চতায়।     
গ্রন্থ প্রসঙ্গে লেখকের বক্তব্য দিয়েই যবানিকাপাত করতে চাই আলোচনার। ‘স্মৃতিগদ্য : বন্ধনহীন গ্রন্থি’ প্রকাশ প্রসঙ্গে হাসান আজিজুল হক বলেছেন-  
‘রাঢ়দেশে বিরাট এক একান্নবর্তী পরিবারে আমার জন্ম। এখন হিসাব করে দেখছি পরিবারের  লোকসংখ্যা ছিল তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। গরু ছাগল ভেড়া দেখাশোনার জন্য লোকজন,  ক্ষেত-খামারের কাজের সঙ্গে যুক্ত মাহিন্দার ইত্যাদি হিসাব করলে সংখ্যা চলি­শ ছাড়িয়ে যাবে। আর বর্ষায় চাষের সময় কিংবা শীতে ফসল বোনার মৌসুমে পঞ্চাশ ছাড়িয়ে যেতে পারত এই সংখ্যা। পাঁচ ভাইয়ের যৌথ পরিবারের মাত্র একজনই সপরিবারে জেলা শহর বর্ধমানে বাসা করে থাকতেন। মনে পড়ে, বর্ধমান শহরের এই ছোট্ট একতলা বাড়িটি বড় টানত আমাকে। আমার অন্তর্জীবনের ভূসংস্থানে অনেকটা জায়গাজুড়ে ছিল বহিলাপাড়ার এই বাড়ি আর পুরনো বর্ধমান শহর। এরকম অনেক গদ্যই লিখেছি আমি এই গ্রন্থে। সঙ্গে আছে রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজ নিয়ে দু-চার কথা, আছে সমকালীন অন্যান্য বিষয়-আশয় নিয়েও। বিশেষ কোনো পরিমার্জন ছাড়া একত্র করে এই সংকলনটি প্রকাশ করা হলো। লেখাগুলো একত্র করে গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করার পুরো কৃতিত্ব জহিরুল আবেদীন জুয়েলের।’ 

একজন প্রকাশকও যে খুবই গ্রন্থবিনির্মানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন তারও উদাহরণ এই গ্রন্থটি। প্রকাশকের এই ভূমিকা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। হাসান আজিজুল হকও তাই গ্রন্থ প্রকাশের পুরো কৃতিত্ব প্রকাশককে দিতে কুন্ঠাবোধ করেন নি। পাণ্ডুলিপি তৈরির কথা অকপটে স্বীকার করে অনেক বড় মনের পরিচয় দিয়েছেন লেখক। হাসান আজিজুল হক বলেই সম্ভব হয়েছে সেটা। এ কারনেই তিনি অন্যদের চাইতে আলাদা। তাঁর আসনটাও তাই সবার উপরে। 

 অপূর্ব শর্মা 
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, লেখক ও সাংবাদিক
সিলেট, বাংলাদেশ।