অটোয়া, বৃহস্পতিবার ১৮ এপ্রিল, ২০১৯
পথ কোথাও না - ড. অমল রায়

প্রাক-কথন:
এই পৃথিবীতে মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত আনন্দ-বেদনা আর আশা-নিরাশার তরঙ্গে দোদুল্যমান। আপাত:দৃষ্টিতে এখানে কারো কারো জীবনের পথ তুলনামূলকভাবে সরল, আবার কারো কারো পথ নানা জটিলতায় আকীর্ণ। কার্য-কারণ সম্পর্কের নিরিখে এখানে সব সময় সবকিছু বিচার করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। তাই অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ "ভাগ্য" নামক এক অর্বাচীন বান্ধবকে আশ্রয় করে সান্ত্বনা খোঁজে।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষের নিরন্তর জিজ্ঞাসা "কি এই জীবনের উদ্দেশ্য?" জন্মের পর থেকে আমাদের অনেক কটা বছরই কেটে যায় কেবল কোন কিছু বুঝার জন্য নিজেকে তৈরী করতে, তারপর প্রাপ্ত বয়সে জীবিকা নির্বাহের নিমিত্তে কর্ম আর সন্তান পালনের মধ্যে দিয়েই জীবনের মুখ্য সময় ব্যয় হয়। তারপর এক সময় যৌবন পেরিয়ে মানুষ বার্ধক্যে উপনীত হয়, অত:পর বয়োবৃদ্ধকালে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা! যুগ যুগান্তর ধরে বংশানুক্রমিকভাবে মানুষ এই আবর্তে আবর্তিত। কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ এই চক্রবুহ্য ভেদ করে অন্যপথে গমন করে জীবনের একটা অর্থ বা উদ্দেশ্য খোঁজার চেষ্টা করলেও জীবনের উদ্দেশ্য কি এই সম্বন্ধে একটা সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো মানুষের অজানা! আর এই অজানার পথ ধরেই পৃথিবীর সকল প্রান্তেই মানবজাতির অহর্নিশি পথ চলা। এটা বলাই বাহুল্য যে মানুষের এই বিরামহীন চলার পথের আমিও একজন সামান্য পথিক! জীবনের এই বিরামহীন পথ চলার এক পর্বে আমার জীবনের একটি অধ্যায় - ক্যানাডায় অভিবাসন এবং এর একটি বিশেষ অঞ্চলে কর্মসূত্রে বসবাস। সেখানে আমার বসবাসের কিছু অভিজ্ঞতা আর সেই অঞ্চলের মানুষের কিছুটা ইতিহাস নিয়ে আমার এই লিখা।

আমার নতুন কর্মস্থল: এর ভূ-প্রকৃতি ও আমার অনুভূতি:
সেদিন ছিল ১৫ অক্টোবর, ২০১৭ সাল। আমি ম্যানিটোবার ব্র্যান্ডন শহর থেকে যাত্রা করি প্রায় ২০০ কি:মি: দূরে উইনিপেগ বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে। উইনিপেগ থেকে মন্ট্রিয়ল হয়ে ক্যানাডার রাজধানী অটোয়ায় আগমন। তারপর অটোয়ায় রাত্রি যাপন। পরদিন সকালে অটোয়া বিমানবন্দরে - গন্তব্যস্থল উত্তরমেরুর কাছাকাছি ক্যানাডার একটি ছোট্ট শহর ইকালুইট (Iqaluit)। ক্যানাডিয়ান নর্থ এয়ারলাইন্স-এর সুপরিসর বিমান। বিমান অটোয়া ছেড়ে আকাশে উড়লো! একদিকে স্ত্রী-পুত্রদের জন্য মন বিষন্নতায় ভরা, অন্যদিকে আবার মনের ভিতর নতুন আর এক ভূ-পৃষ্ঠ দেখার জন্য উন্মাদনা এবং সেই সাথে আমার নতুন কর্ম কেমন লাগবে সেই নিয়ে অন্তহীন ভাবনা। বিমানের ভিতর গরম প্রাত:রাশ সহ আন্তরিক আতিথেয়তার মধ্য দিয়ে তিন ঘন্টার বিমান ভ্রমণের পর দুপুর সাড়ে বারোটায় অবশেষে ইকালুইট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ। এখানে চারিদিকে তাকিয়ে অবাক হওয়ার পালা – সত্যিই এ এক নতুন জগৎ। তখন কেবল মাত্র মধ্য-অক্টোবর – যদিও তখন এখানে তাত্ত্বিকভাবে হেমন্তকাল, কিন্তু - এরই মধ্যে এখানকার তাপমাত্রা নেমে গেছে হিমাঙ্কের নিচে আর এর রাস্তাঘাট সহ চারিধার তুষারে আবৃত।   

ইকালুইট ক্যানাডার নবীনতম স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল (Territory) নুনাভুট (Nunavut)-এর রাজধানী। আনুষ্ঠানিক ভাবে একটি বিশেষ অঞ্চল হিসাবে নুনাভুটের যাত্রা শুরু ১৯৯৯ সালের ১লা এপ্রিল। এর আগে ১৯৯৩ সালের মে মাসে এই অঞ্চলের আদিবাসী এবং ক্যানাডা সরকারের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ভূমি দাবিনামা চুক্তি (Land Claim Agreement)-স্বাক্ষরের মাধ্যমে এর স্বীকৃতি ঘটে এবং এই আদিবাসী নাগরিকদের এই অঞ্চলের ভূমির উপর কতিপয় বিশেষ অধিকার প্রদান করা হয়। নুনাভুট-এর প্রধান অধিবাসী ইনুইট (Inuit) যাদের আগে মানুষ বলত এস্কিমো (Eskimo - এর শাব্দিক অর্থ “কাঁচা মাংস ভক্ষণকারী – এবং এই শব্দটি এখন একটি অপমানমূলক শব্দ )। নুনাভুটের ২৫টি জনপদের মধ্যে ইকালুইট বৃহত্তম, যদিও এর জনসংখ্যা মাত্র আট হাজার। যদিও ইকালুইট ছাড়া বাকি ২৪টি জনপদে ইনুইটদের সংখ্যা ৯০ শতাংশের কাছাকাছি, ইকালুইটে তাদের সংখ্যা মাত্র ৫৫ শতাংশের মত। তাই ইকালুইট ক্রমে ক্রমেই হয়ে উঠছে একটি বহুজাতিক শহর। ফ্রবিশার উপসাগর (Frobisher Bay)-এর  কুল ঘেঁসে এই ছোট্ট জনপদটির ভু-প্রকৃতি বন্ধুর  - সর্বত্র উঁচু- নীচু, পাহাড়ী আঁকা বাঁকা পথ এবং এর চারিদিক পাথুরে-পর্বত বেষ্ঠিত। সাগরের কুল ঘেঁসে তুলনামূলক ভাবে সমতল ভূমিতে শহরটির কেন্দ্রস্থল অবস্থিত, আর আবাসিক গৃহস্থালীর অবস্থান শহরটির দুই প্রান্তের দুই পাহাড়ের উপর। উত্তর মেরুর কাছাকাছি এই অঞ্চলটির অবস্থান আর্কটিক বৃত্ত (৬০ অক্ষাংশ থেকে শুরু করে উত্তর মেরুর চুঁড়া পর্যন্ত)-এর কিছুটা বাইরে হলেও  এই শহরটির ভু-প্রাকৃতিক পরিচয় তুন্দ্রা -অঞ্চল – বৃক্ষ শূণ্য। বছরের প্রায় আট মাস এর সমস্ত ভূমি তুষারে আবৃত আর গ্রীষ্মে স্থানে স্থানে কিছু ঝোপ জাতীয় উদ্ভিদ আর ভূমি সংলগ্ন শেওলা আর হরেক রকমের বনফুলের সমারোহ। এখানে মাটির স্তর খুব পাতলা এবং এই পাতলা স্তরের নীচে বছরের প্রায় সবটা সময় ধরে তাপমাত্রা থাকে হিমাঙ্কের নীচে এবং তাকে বলা হয় Permafrost যার অর্থ চিরস্থায়ী বরফ। একদিকে বরফের এই স্থায়ী স্তর ভেদ করে গাছের শিকড় গভীরে যেতে পারে না আবার আর এক দিকে গাছের সালোক-সংশ্লেষণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় যথেষ্ট তাপমাত্রার অভাবের কারণে এখানে গাছ জন্মাতে পারে না – তাই এই অঞ্চলের প্রকৃতি বৃক্ষ হীন – মরু সদৃশ। তবে পাহাড় আর সমুদ্রের মিলনে এই জনপদটির প্রাকৃতিক দৃশ্য মনোরম! ইকালুইট শহরে আমার বাসস্থানটি তুন্দ্রা রিজ  (Tundra Ridge) নামের এক পাহাড়ের উপরে। একটা প্রখর রোদ্দের সোনালী দুপুর পার করে পড়ন্ত বিকেলে যখন আমার ঘরের পশ্চিমের জানালা খোলে ফ্রবিশার সাগরের পানে দৃষ্টি প্রসারিত করা যায় তখন কি যেন এক অনাবিল আনন্দে মন ভরে উঠে!

আমি যখন এখানে আসি তখন যদিও হেমন্তকাল কিন্তু আমার গ্রীষ্ম-মন্ডলীয় মনে তা হলো শীত  - কিন্তু সেটি ছিল সহনীয়! তারপর ধীরে ধীরে এই বল্গাহরিন আর সান্তাক্লজের দেশে শুরু হলো হিমবাহের দাপট! ক্রমে ক্রমে সাইবেরিয়ার হিমশীতল বায়ু এসে গ্রাস করতে লাগলো মেরুভুমির শহর ইকালুইটকে। সূর্যের প্রলম্বিত আলোর দিন ক্রমে ক্রমে সংকুচিত হতে শুরু হলো – ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দিনের দৈর্ঘ্য কমতে কমতে এসে ঠেকলো মাত্র প্রায় ৬ ঘন্টায়, আর বাতাসের শীতলতা সহ দিনের তাপমাত্রা মাঝে মাঝে নেমে গেল হিমাঙ্কের প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ ডিগ্রী নিচে। তারপর এক সময় ডিসেম্বরের ২১ তারিখ উত্তর গোলার্ধের সবচেয়ে ছোট দিনটি এসে চলে গেল। এবার দিন বড় হবার পালা। তিল তিল করে বাড়তে লাগলো দিনের দৈর্ঘ্য! ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ থেকে মার্চের ৩ তারিখ পর্যন্ত আমি চলে গিয়েছিলাম ইকালুইটের বাহিরে ক্যানাডার দক্ষিনে। আবার ইকালুইটে ফিরে এলাম মার্চের ৪ তারিখে! মার্চের ৫ তারিখে সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গলো এক আনন্দদায়ক চমকে – মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে এখানে দিনের দৈর্ঘ্য হয়ে গেছে অনেকটা প্রসারিত। 

আজ মার্চ মাসের ১৮ তারিখ – এখানে দিনের দৈর্ঘ্য এখন প্রায় ১৩ ঘন্টা! দিনপঞ্জি অনুসারে এখানে বসন্ত ঋতুর আগমনে আরো ৪ দিন বাকি। আজ রবিবার বিধায় সারা সকালটা কাটল ঘরের ভিতর! দুপুরের খাবার সেরে আমার লিভিংরুমের জানালা দিয়ে বাহিরে চোখ রাখলাম  - সুন্দর রোদেলা দিন – সেলফোনে তাপমাত্রার খবর নিতে গিয়ে জানলাম মাইনাস ১১ ডিগ্রী – এটা এখানকার সহনীয় তাপমাত্রা! গতকাল বাহিরে বের হওয়া হয়নি – সিদ্ধান্ত নিলাম একটু বাইরে বেড়াতে যাব। শীতের সাধারণ জ্যাকেট  আর নিচে একটা সোয়েটার – সেই সাথে হাতমোজা আর শীতের টুপি পড়ে বের হলাম প্রকৃতি দর্শনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু বের হয়ে প্রচন্ড অবাক হওয়ার পালা। মনে হলো টুপি আর হাতমোজা বাহুল্য – আর ভিতরের সোয়েটারটা না পড়লেও চলত। এখন তাপমাত্রা মাইনাস ১১ ডিগ্রী – মনে হলো অবিশ্বাস্য – কিন্তু আশ্চর্য্য জনক হলেও এটাই এখানকার জন্য সত্য। এখানে বাতাসের আর্দ্রতা খুব কম হওয়াতে বাতাসহীন দিনে  মাইনাস ১১ ডিগ্রী অনুভূত হতে পারে প্লাস ১১ ডিগ্রী – এবং আমার কাছেও সেদিন তাই মনে হলো। মনে পরে বাংলাদেশে মাঘের শীতের সকালে কখনো ১১ ডিগ্রী  সেন্ট্রিগ্রেড তাপমাত্রা হলেই শীতে কাঁপাকাপি। তা সে যাই হোক তুষার মাড়িয়ে মাড়িয়ে খানিক দূর হেঁটে হেঁটে গেলাম আমার পাড়ার উপত্যকার এক প্রান্তে! সামনে তুষারময় চর – তুষারে ঢাকা ফ্রবিশার উপসাগর আর তার উপরে তুষার-আবৃত পর্বতমালা। দেখলাম তুষার ঢাকা চরে অনেকগুলো স্নো-মবিলের সমারোহ। চারিদিকে লোকজন স্নো-মবিলে করে তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আনন্দ-ভ্রমনে মতোহারা। আমি অনেক্ষণ ধরে হাঁটলাম – ক্ষণে ক্ষণে থেমে দাঁড়ালাম। তুষার-ঢাকা সাগরের উপর দিয়ে দৃষ্টি নিবন্ধ করলাম দুরের তুষারময় পর্বতমালায়! এক আশ্চর্য্য সুন্দরের ছোঁয়ায় মুহুর্তেই মন মোহিত হলো। চারিদিকের শ্বেত- শুভ্রতার মোহনীয় মহিমায় মন মুহুর্তে এক অনাবিল আনন্দধারায় আবেশিত হলো। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার চারিদিকে কেবলই তুষারে ঢাকা উঁচু উঁচু পাথুরে পর্বত! সেই এলাকার সবচেয়ে উঁচু পর্বতের চূড়ায় আমার দৃষ্টি আটকে গেল, মুহুর্তেই সিদ্ধান্ত নিলাম সেই পর্বতের চূড়ায় এখনি উঠব। তখনি রওয়ানা দিলাম – পায়ে শীতের বুট – তুষার মাড়িয়ে মাড়িয়ে অশেষ খুশীতে এক সময় সেই পর্বত শিখরে আরোহন করলাম। সেই চুঁড়া থেকে চারিদিকে ঘুরে ঘুরে মনের ক্যামেরায় কত শত ছবি তুললাম – কেবল সাদা আর সাদা  এবং সাথে রবির কিরণে তারা শুভ্র-সমুজ্জ্বল। আমার সেলফোনের ক্যামেরা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এই সৌন্দর্য্যকে কিছুটা ধরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ফোনে তোলা সেই ছবির দিকে তাকিয়ে মন বিরস হলো – মন হতাশায় ভরে উঠল- বন্ধুদের সাথে সেই সৌন্দর্য্য শেয়ার করার আশা অপূর্ণই থেকে গেল। কারণ এই শ্বেত-শুভ্র দিগন্ত প্রসারিত অফুরন্ত সৌন্দর্য্য ক্যামেরায় ধারণ করা প্রায় অসম্ভব – এবং এই সৌন্দর্য্য ভাষায় বর্ণনা করা আমার মত নিরস লোকের পক্ষে ভীষণ দুরূহ। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল এই সৌন্দর্য্য কেবল নিজের চোখ দিয়েই দেখতে হয়!

এখানে আসার পর বসন্ত আর গ্রীষ্মের অনেক গল্প শুনেছি – মধ্য গ্রীষ্মে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়তে বাড়তে এসে পায় ২৩-২৪ ঘন্টায় দাঁড়াবে। ছোটবেলায় ভূগোল বইতে নিশীথ সূর্যের দেশ হিসাবে নরওয়ের নাম শুনে সেই দেশের প্রতি একটা অজানা আকর্ষণ অনুভব করেছি। কোনদিন ভাবিনি ক্যানাডার একটা বড় অংশেও নিশীথ সূর্যের দেখা মিলে। শুনেছি দীর্ঘ্-আলোর দিন অনেকের কাছেই বিরক্তিকর – আলোকিত রাত তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। আমার কাছে রৌদ্রময় দীর্ঘ-দিন এমনকি রাত-বিহীন ২৪ ঘন্টার দিন আলোকিত জীবনের প্রতীক! অনেকে হয়ত শুনে হবাক হবেন যে আমার দেহ-যন্ত্রটা মনে হয় একটু অদ্ভুত রকমের অন্যরকম  - আমি যখন ক্লান্ত হই আমার ঘুম আসে – সেটা হোক রাত কিম্বা দিন! তবে সূর্যের আলোয় আলোকময় দিন (কিম্বা রাত) আমার বড় প্রিয়! আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছি কবে গ্রীষ্ম (জুন- সেপ্টেম্বর) আসবে তাঁর সর্বজয়ী আলোর পসরা নিয়ে আমাকে দিবস-রজনী আলোকিত রাখতে – আমি অপেক্ষায় আছি সেই দিনের যখন আমি কাঠফাঁটা রোদের রাতে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে কাটাব!

এখানে যেহেতু গাছ নেই তাই শীতকালে প্রচন্ড হিমের রাক্ষুসে দাপটে আক্রান্ত মুমুর্ষ- প্রায় অসহায় গাছদের জন্য মনোবেদনার কারণ ঘটে না। এখানে শীতের ভূ-পৃষ্ঠ শুভ্র তুষারের চাদরে আবৃত – বসন্তে আর গ্রীষ্মে এই তুষারের আবরণ কাটিয়ে এই ঢেউ-খেলানো পার্বত্যময় ভূ-পৃষ্ঠ সবুজ আর বেগুনি রঙের আস্তরণে নিজেকে সুশোভিত করে। সেখানে অনাবিল আনন্দে ফুটে উঠে নানা বর্ণের অসংখ্য রকমের মন-মাতানো সব বনফুল। সেই বনফুলের সাথে পাল্লা দিয়ে পথিকদের আকৃষ্ট করতে বেড়ে উঠে হাজারে হাজারে ব্লু-বেরির দল। ব্লু-বেরি আমার অতি আদরের একটি ফল। আমি অপেক্ষা করে আছি সেই দিনের যখন আমি নিশীথ সূর্যের মধ্যরাতে পায়ে হেঁটে পার্বত্য পথে ঘুরে বেড়াব -আর হরেক রকমের বনফুলের মাঝখান দিয়ে চলতে চলতে পরম মমতায় আমার অতি পছন্দের ফল  ব্লু-বেরি কুড়াব! 

ইকালুইট শহরটির ঠিক বাইরেই আছে সিলভিয়া গ্রীনেল নদীর ধার ঘেঁষে একটি মনোরম পার্ক যার নাম সিলভিয়া গ্রীনেল টেরিটোরিয়াল পার্ক (Sylvia Grinnell Territorial Park)। এই নদীতে আর্কটিক চার (Arctic Char) মাছের প্রাচুর্য্য। সিলভিয়া গ্রীনেল হ্রদে শীত কাটিয়ে তারা বসন্তে নদীতে আসে ডিম ছাড়ার জন্য  - তারপর দলবেঁধে ফ্রবিশার সাগরে যায় খাদ্যের সন্ধানে। আবার হেমন্তে ফিরতি যাত্রা সিলভিয়া গ্রীনেল হ্রদের উদ্দেশ্যে!

ইতিহাস: ইকালুইট এবং ইনুইট: 
উত্তরমেরুর অনেক এলাকার ইতিহাসের মত ইকালুইটের ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ!  হাজার হাজার বছর আগে যখন এই অঞ্চলটি ছিল একেবারেই সাগরের কোল ঘেঁষে এক বন্য মেরুভুমি, তখন ডর্সেট (Dorset) আর ঠুলি (Thule) সংস্কৃতির সাহসী মানুষেরা এই নির্জন আর দূষণ মুক্ত বিশুদ্ধ ভূমিতে আসত শিকারের উদ্দেশ্যে। এখানে বলা প্রাসঙ্গিক যে ইনুইটরা অন্যান্য জনগোষ্ঠির ন্যায় আধুনিক সভ্যতার সাথে মিশে গেলেও শিকারের প্রতি তাদের এখনো অদম্য উৎসাহ। স্হলের বলগা হরিণ (Caribou), মাস্কঅক্স (Muskox), জলের সীলমাছ আর তিমিমাছ এবং আকাশের নানাজাতের বন্যপাখি শিকারের নেশা তাদের রক্তের সাথে মিশে আছে। তখনকার সময় শিকারের উদ্দেশ্যে আসা মানুষেরা অস্হায়ী আস্তানায় (শীতে তুষারের ঘর আর গ্রীষ্মে তাঁবুতে ) বাস করত । ক্রমে ক্রমে শিকারে ভাঁটা পড়লে তারা আবার রওয়ানা দিত নতুন জায়গার সন্ধানে।

১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, ক্যানাডা সরকারের আশির্ব্বাদে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী ইকালুইটে একটি সামরিক বিমান ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে – উদ্দেশ্য ইকালুইটের মধ্য দিয়ে সহজে তাদের ইউরোপীয় মিত্রবাহিনীর নিকট যুদ্ধের সরঞ্জামাদি পৌঁছানো। সেই সময় ইকালুইটের আশেপাশের শিকারের আস্তানা থেকে অনেকটা জোর করেই অনেক ইনুইটকে এই বিমানঘাঁটি নির্মানের কাজে নিয়োজিত করা হয়। এই স্থায়ী কাজের সুযোগে তখনকার ইনুইটরা এই প্রকল্পের পরিত্যক্ত কাঠ আর অন্যান্য ফেলে-দেয়া সামগ্রী ব্যবহার করে ক্রমে ক্রমে তৈরী করতে থাকে তাদের স্থায়ী কুঠির! তখনকার Koojesee Inlet এর কোল ঘেঁষে  - সেই অঞ্চলটিই আস্তে আস্তে হয়ে উঠে ইকালুইট (Iqaluit এর-শাব্দিক অর্থ “মাছের নিবাস”)। বলা প্রাসঙ্গিক এখনো ইকালুইটে মাছের প্রাচুর্য্য, বিশেষ করে এই অঞ্চলের বিশেষ সুস্বাদু মাছ Arctic Char। পরবর্তীকালে এই বিমানঘাঁটির এলাকা আর পাশের Apex Hill মিলে সরকারী তালিকায় এর নাম হয়ে যায় Frobisher Bay। এই নামকরণ করা হয় এক ইংরেজ নাবিক ক্যাপ্টেন Frobisher-এর সম্মানে! এই নাবিকই প্রথম ১৫৭৩ সালে যখন তার দলবল নিয়ে পৃথিবীর পূর্বপ্রান্তে যাওয়ার জন্যে একটি সহজ প্রণালীর সন্ধান করছিলেন তখন তিনি এই অঞ্চলটি আবিষ্কার করেন! ক্যাপ্টেন ফ্রবিশার পরে আরো তিনবার এখানে ফিরে আসেন - উদ্দেশ্য এই উপসাগরের মুখে Kabloona (“সাদা মানুষ”) দ্বীপ থেকে কালো পাথর সংগ্রহ। ক্যাপ্টেন ফ্রবিশার যে কোন কারণেই হোক বিশ্বাস করতেন যে এখানে সোনার খনি আছে! ইতিমধ্যে এখানে  স্থানীয় ইনুইটদের সাথে ফ্রবিশার সাহেবের কিছু সংঘাত সৃষ্টি হয়। কথিত আছে ইনুইটরা ফ্রবিশারের পাঁচজন সহযাত্রীকে আটক করে – আবার অন্যমতে ফ্রবিশার সাহেব চারজন ইনুইটকে বন্দী করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যান, উদ্দেশ্য – ইংল্যান্ডের রাজ পরিবার এবং সে দেশের সাধারণ মানুষদের কাছে তার বীরত্ব জাহির করা। কথিত আছে সেই চারজন ইনুইট তাদের চিরকালীন প্রাকৃতিক নিবাস থেকে বিচ্যুত হয়ে ইংল্যান্ডের মত এক অদ্ভুত নতুন দেশে গিয়ে অচিরেই দেহত্যাগ করে। আর ফ্রবিশার সাহেব স্বর্ণ ভেবে যে প্রস্তর খন্ড দেশে নিয়ে গেলেন অচিরেই প্রমানিত হলো খাঁটি সোনার পরিবর্তে সেটি ছিল মেকি সোনা (Fools gold)। অবশেষ এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় ক্যাপ্টেন ফ্রবিশারের স্বর্ণ বিজয়ের নিষ্ফল অভিযান।

তারপর ক্রমে ক্রমে অষ্টাদশ আর ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইউরোপ আর আমেরিকার অনেক অভিযাত্রী আর তিমি শিকারী উত্তর মেরু অভিযানে আসতে শুরু করে। ক্রমে ক্রমে এই ফ্রবিশার উপসাগর অঞ্চলে পাশ্চাত্য আধুনিক সভ্যতার বিস্তার বাড়তে থাকে। তারপর আসতে শুরু করলো খ্রিষ্টীয় -পাদ্রীরা – প্রচার করতে শুরু করলো আদিবাসী ইনুইটদের  মাঝে খ্রিষ্টধর্ম। এক সময় প্রকৃতি-পূজা এবং অতীন্দ্রিয় সত্বায় বিশ্বাস (Shamanism)-ই ছিল ইনুইটদের মূল ধর্ম – এর বদলে এখন প্রায় সব ইনুইটরাই খ্রিষ্টান। ইকালুইটে এখান প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ইনুইটদের  জন্য আছে বেশ  কয়েকটি গির্জা।

ক্রমেই অন্যান্য এলাকার ইনুইটদের ন্যায় এই ইনুইটদের জীবনেও পশ্চিমা সভ্যতার প্রভাব প্রসারিত হতে শুরু হল। ১৯৫০ সনে হাড়সন এন্ড ব্যা ( Hudson and Bay) কোম্পানির মূল কেন্দ্র এই অঞ্চলে স্থানান্তরিত হল। ১৯৫৫ সনে তাদের কার্যক্রম আরো বর্ধিত হলে DEW LINE পূর্ব সেকশন নির্মানের জন্য অনেক শিল্প-শ্রমিকের প্রয়োজন দেখা দিল! ১৯৫৭ সালের মধ্যে ইকালুইটের জনসংখ্যা বর্ধিত হয়ে দাঁড়ালো ১২০০ এবং তারমধ্যে ইনুইটদের সংখ্যা ৪৮৯।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপান্তে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিমানঘাঁটি ক্যানাডার বিমান বাহিনী (Royal Canadian Air Force)-র নিকট হস্তান্তর করল। ১৯৬৩ সনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সবকিছু গুটিয়ে চলে গেল এবং তখন ইকালুইট ক্যানাডা সরকারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রশাসনিক ও যোগাযোগের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হল! ১৯৮৭ সালে Frobishar Bay-এর  নাম পপরিবর্তন করে Iqaluit (যদিও আগের নাম এটাই ছিল) রাখা হল! ১৯৯৩ সালে ভূমি দাবিনামা চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৯৯৫ সালে ইনুইটদের দ্বারা সরাসরি গণভোটে ইকালুইট নুনাভুটের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি পেল!

নুনাভুট এবং ইনুইটদের ইতিহাস:
গবেষকদের মতে আনুমানিক ৪ হাজার বছর পূর্ব থেকে নুনাভুট অঞ্চলে ধীরে ধীরে মনুষ্য জনগোষ্ঠির বসতি গড়ে উঠে। কিছু গবেষকদের মতে আজ থেকে প্রায় ৮ হাজার বৎসর পূর্বে নুনাভুটের দক্ষিন-পচ্শিম অঞ্চল কিভাল্লিক (Kivalliq)-এ প্রথম একটি ক্ষুদ্র বসতি গড়ে উঠে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা এই অধিবাসীদের দুইটি শ্রেণীতে ভাগ করেন – এদের একটি হল প্রাচীন-এস্কিমো (Paleo-Eskimo) জনগোষ্ঠী, যারা ৭০০ থেকে ৪০০০ বছরের পুরানো, আর অপর শ্রেণীটি হলো নব্য -এস্কিমো (Neo-Eskimo) – যারা প্রায় ১০০০ বছর পূর্বে নুনাভুটে বসতি গড়ে।

আলাস্কার পশ্চিমাঞ্চল থেকে কয়েকটি পরিবারের একটি ক্ষুদ্র প্রাচীন-এস্কিমোদল নুনাভুটে আসে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা তাদের দুইটি শ্রেণীতে বিভক্ত করে – একটি হল প্রাক-ডর্সেট (Pre-dorset), যারা দক্ষিন নুনাভুটে বসতি স্থাপন করে। আর অন্য একটি শ্রেণী যারা উত্তর  নুনাভুটে বসতি স্থাপন করে তাদের বলা হয় ইন্ডিপেন্ডেট (Independent)।

গবেষকদের ধারণা প্রাচীন-এস্কিমো জনগোষ্ঠির মানুষেরা সারাবছর চামড়ার তৈরী তাঁবুতে থাকত। তারা উষ্ণতার জন্য আগুন জ্বালাত আর আর্কটিক তুলার সলতে আর তিমি মাছের তেল ব্যবহার করে Soapstone নামক এক ধরনের পাথরের প্রদীপ জ্বালাত আলোর জন্য। তারা চামড়ার তৈরী পোশাক পড়ত আর পশুর হাড়, দাঁত, শিং আর পাথর দিয়ে নানাবিধ হাতিয়ার তৈরী করত। তারা মূলত হেঁটে চলাফেরা করত তবে কুকুরে টানা স্লেজ গাড়ি এবং ছোট নৌকা ব্যবহার করত এবং পশু শিকার করত। আজ থেকে প্রায় ২৭০০ বছর আগে যখন নুনাভুটের গড় তাপমাত্রা বিশেষভাবে হ্রাস পায় তখন তাদের জীবন যাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। প্রত্নতত্ত্ববিদরা প্রাচীন-এস্কিমোদের এই পরিবর্তিত জীবনধারার নাম দেন ডর্সেট (dorset) সংস্কৃতি।  তখন তারা নতুন জাতের হাতিয়ার তৈরী করে, তাদের শিকারের ধরন পাল্টায় এবং তাদের আবাস গৃহের পরিবর্তন ঘটে! প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে তারাই প্রথম তুষার-ঘর (Igloo) তৈরী করে। এই ডর্সেট জনগোষ্ঠির উন্নত সমৃদ্ধ শিল্প-ঐতিহ্যেরও সন্ধান পাওয়া যায়। তারা তাদের বিভিন্ন সামাজিক উৎসবের সাজ-সজ্জায় পশুর দাঁত আর শিং খোদাই করে বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কর্ম ব্যবহার করত! 

অন্যদিকে প্রায় ১০০০ বৎসর পূর্বে যখন জলবায়ুর ক্রম পরিবর্তনের ফলে নুনাভুটের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে তখন নব্য-এস্কিমো (Neo-Eskimo) জনগোষ্ঠির মানুষেরা আলাস্কার উত্তরাঞ্চল থেকে এসে নুনাভুটে বসতি স্থাপন করে। এই জনগোষ্ঠিটি ছিল তিমি ও সিল মাছ শিকারী। তারা চামড়া দিয়ে মোড়ানো এক ধরনের নৌকা এবং কুকুরে টানা স্লেজ গাড়ি ব্যবহার করত।  তারাও তুষার দিয়ে ইগলু (Igloo) তৈরী করত এবং এই ইগলুর ভিতরে একটি বরফের স্তর দিত ভিতরের তাপমাত্রা সংরক্ষণ এবং বাহির থেকে ভিতরে বাতাস প্রবেশ ঠেকানোর জন্য। তারা ইগলুর ভিতরে আলো আর কিছুটা উষ্ণতার জন্য আর্কটিক তুলার সলতে আর তিমি বা সিল মাছের তেল দিয়ে soap-stone-এর নিমির্ত এক বিশেষ ধরনের প্রদীপ জ্বালাত যাকে Inuit ভাষায় বলে কূল্লিক (Qulliq)। প্রত্নতত্ত্ববিদরা  এই নব্য-এস্কিমোদের দুইটি দলে ভাগ করেন – প্রথম শ্রেণীটির নাম ঠুলি (Thule) আর দ্বিতীয় শ্রেণীটি হল বর্তমানের ইনুইট (Inuit)। নুনাভুটে ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের আগমনের মধ্য দিয়ে ইনুইটদের জীবন ধারায় পরিবর্তনের সূচনা ঘটে এবং ১৫৭০ এর দশকে ক্যাপ্টেন ফ্রবিশারের আগমনের মধ্য দিয়ে ইনুইটদের ঐতিহাসিক যুগের সূচনা হয়। 

শেষ কথা: পথ কোথাও না:
মানুষের জীবনের চলার পথটা কখনো রাঙ্গা, কখনো ধুসর, আবার কখনো বর্ণ-হীন শাদা! এই পথ কখনো খানিকটা সরল, আবার কখনো বেশ আঁকাবাঁকা; কখনো কিছুটা সুগম, আবার কখনো ভয়ানক দুর্গম! তা সে যে রকমই হোক, চলতে তো হবেই! কে, কবে, কখন, না চলতে চলতে  জীবন চালাতে পেরেছে? অতএব জীবন মানেই চলা, আর চলার আর এক নামই জীবন!

ইকালুইটে আসার প্রথম দিনই আমার এক সহকর্মী যখন আমাকে একটা রাস্তা দেখিয়ে বললেন  - এই রাস্তাটির নাম “Road to No-where”, তখন কেন জানি মুহুর্তেই মনটা এক অদ্ভুত আনন্দে নেচে উঠেছিল –মনে কেন জানি এক বিশেষ অনুভুতির জন্ম নিল - মনে হলো – হ্যাঁ - জীবনের এতটা বছর পেরিয়ে হলেও আজ এই পৃথিবীর আসল রাস্তাটির দেখা মিলল  - মনে হলো -আসলে এই পথটাই জীবনের প্রতীক – এটাই আসলে জীবনের পথ! এই পথের কোন ঠিকানা নেই – এই পথের কোন শেষ নেই  - এই পথের কোন গন্তব্য নেই ! এই পথ দিয়ে কেবলই চলতে হয় – শুধুই চলতে হয় – আর এই জীবন পথের নামটিই হল – “পথ কোথাও না “ -  The Road to No-where!

 ড. অমল রায়
ইকালুইট, নুনাভুট
মার্চ ১৮, ২০১৮ সাল